
গত ৭ মার্চ পার্বত্য চট্টগ্রামে বম সম্প্রদায়ের কিছু সদস্যের বিনা বিচারে কারাগারে অন্তরিন থাকার ৭০০ দিন পূর্ণ হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে নারী ও শিশুরাও রয়েছে। ২০২৪ সালের একটি ব্যাংক ডাকাতির ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
এ ঘটনার সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠী কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক নারী দিবস সামনে রেখে মানবাধিকারকর্মী ও নেটিজেনরা অনলাইনে একটি প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন এবং ভার্চ্যুয়াল প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনের মাধ্যমে আটক ব্যক্তিদের অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানান।
অধিকারকর্মীদের পরিচালিত ফেসবুক পেজ ‘বম লাইভস ম্যাটার’-এর তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৩০ জন নারী ও শিশু ছিল। তাদের মধ্যে আটজন নারী এখনো বিনা বিচারে কারাগারে বন্দী এবং তাঁদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় একাধিক মামলা করা হয়েছে। প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও তদন্ত কার্যত স্থবির, কোনো অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়নি এবং জামিনের আবেদন এক আদালত থেকে আরেক আদালতে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
এ সংকটের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক টানাপোড়েন। ২০১৭ সালে বম সম্প্রদায়ের কয়েকজন তরুণ কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) গঠন করেন। ২০২২ সালের অক্টোবরে নিরাপত্তা বাহিনী এই সংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। অভিযোগ ছিল যে তারা সমতলের উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এ অভিযানের সময় ২০২৪ সালের এপ্রিলে বান্দরবান জেলার রুমা ও থানচি উপজেলায় ব্যাংক ডাকাতি এবং পুলিশের অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ ওঠে।
এর পরবর্তী অভিযানে বম আদিবাসী সম্প্রদায়ের ১৯৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যাঁদের মধ্যে নারীসহ প্রায় ৯০ জন এখনো কারাগারে বন্দী রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, অসুস্থতা ও যথাযথ চিকিৎসার অভাবে কয়েকজন বন্দী কারাগারে বন্দী অবস্থায় মারা গেছেন।
২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের নয়জন বিশেষজ্ঞ এবং প্রতিনিধিদল অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের কাছে একটি চিঠি পাঠায়। চিঠি প্রেরকেরা জাতিসংঘে খাদ্য, মানবাধিকার, পরিবেশ এবং আদিবাসী অধিকারের মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কাজ করেন।
চিঠিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা পার্বত্য চট্টগ্রামে বম আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতি আচরণ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, বম জনগোষ্ঠীর ওপর বিদ্যমান দমন-পীড়ন আসলে এ অঞ্চলের আদিবাসী জনগণের বিরুদ্ধে চলমান দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যেরই প্রতিফলন। তাঁরা আরও উল্লেখ করেন, বিভিন্ন সরকারি নির্দেশনা ও সামরিক বিধিনিষেধের কারণে বহু আদিবাসী পরিবারের জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত জুমচাষ ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়েছে। এর ফলে হলুদ ও আদার মতো গুরুত্বপূর্ণ ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা আদিবাসীদের আয় ও জীবিকা নির্বাহের জন্য অপরিহার্য কৃষিজ উৎপাদন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আদিবাসী বম গ্রামবাসীরা খাদ্য ও নিত্যসামগ্রী পাওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধের মুখে পড়েছেন। চাল কেনা বা পরিবহনের ওপর বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে এবং তাঁদের নিজেদের উৎপাদিত ফসলের বিপণনও নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যার ফলে বহু পরিবার দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের সময় আরোপিত এসব নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা কার্যত পুরো জনগোষ্ঠীর ওপর সমষ্টিগত শাস্তি হিসেবে কাজ করছে।
যদি কোনো বন্দীর বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকে, তবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে তা আদালতে উপস্থাপন করা। আর যদি এমন প্রমাণ না থাকে, তবে নারী ও শিশুসহ নিরপরাধ মানুষকে আটকে রাখা হবে স্বেচ্ছাচারমূলক আটক এবং সমষ্টিগত শাস্তির শামিল। এমন আচরণ কেবল দেশের সংবিধানসম্মত অধিকারের লঙ্ঘনই নয়, বরং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকারের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বিনা জামিনে কারাগারে আটক, ব্যাপক ভূমি বেদখল এবং সে অঞ্চলে অতিরিক্ত সামরিকীকরণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়া তাঁদের চিঠিতে জুমচাষে বিধিনিষেধ আরোপের আইনগত ভিত্তি, কেএনএফ-বিরোধী অভিযানের সময় বম জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেকাংশের বাস্তুচ্যুতি, বেসামরিক জনগণকে সুরক্ষা প্রদান এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধের জন্য গৃহীত পদক্ষেপ নিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। পাশাপাশি খাদ্য ও জীবিকার ওপর আরোপিত এই বিধিনিষেধ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ—সে প্রশ্ন তোলা হয়।
কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান এই চিঠির কোনো জবাব দেননি। এদিকে বম জনগোষ্ঠীর চলমান দুর্ভোগ অব্যাহত রয়েছে। অনেকে এখনো বিচার ছাড়াই কারাগারে বন্দী রয়েছেন ও অনেকেই আয়ের উৎস থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। তাঁদের অনেকেই খাদ্য ও জরুরি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং তাঁদের অনেকে পূর্বপুরুষের ভূমি থেকেও উচ্ছেদের শিকার হচ্ছেন। নবগঠিত বিএনপি সরকারের উচিত জরুরি ভিত্তিতে এই বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি দেওয়া এবং এই বিদ্যমান অবিচারগুলো নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
এ ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; এগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আরোপিত দীর্ঘদিনের প্রান্তিকতা ও বৈষম্যের প্রতিফলন। তাই বর্তমান সংকট মোকাবিলায় কেবল অতীতের অন্যায়কে স্বীকার করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন তাৎক্ষণিক ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ। অন্তত আইনের শাসনের মৌলিক নীতিমালা অনুসারে, যাদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, তাদের দ্রুত অভিযোগ গঠন করে স্বচ্ছ ও ন্যায্যবিচারের আওতায় আনা উচিত। বছরের পর বছর অভিযোগপত্র ছাড়াই কিছু মানুষকে কারাগারে আটকে রাখা ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং বিচারব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থাকে দুর্বল করে তোলে।
যদি কোনো বন্দীর বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকে, তবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে তা আদালতে উপস্থাপন করা। আর যদি এমন প্রমাণ না থাকে, তবে নারী ও শিশুসহ নিরপরাধ মানুষকে আটকে রাখা হবে স্বেচ্ছাচারমূলক আটক এবং সমষ্টিগত শাস্তির শামিল। এমন আচরণ কেবল দেশের সংবিধানসম্মত অধিকারের লঙ্ঘনই নয়, বরং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকারের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
বর্তমান পরিস্থিতি আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও রাষ্ট্রের মধ্যে অবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। খাদ্য, জীবিকা ও চলাচলের ওপর সমষ্টিগত বিধিনিষেধ দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা বয়ে আনতে পারে না; বরং এটি ক্ষোভ বাড়িয়ে তোলে এবং সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীকে আরও প্রান্তিক করে তোলে, যারা ইতিমধ্যেই দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে।
বিনা বিচারে কারাগারে অন্তরিন যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রমাণের অভাবে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা সম্ভব হয়নি, তাঁদের মুক্তি দেওয়া আইনের শাসনের প্রতি আস্থা পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে এবং ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির প্রতি সরকারের প্রতিশ্রুতির প্রমাণ দেবে। একই সঙ্গে নির্বিচার গ্রেপ্তার, স্বেচ্ছাচারমূলক আটক এবং বম জনগোষ্ঠীর ওপর আরোপিত বিধিনিষেধের বিষয়ে একটি স্বাধীন পর্যালোচনা জরুরি, যাতে নিরাপত্তা অভিযানের নামে মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা আর না ঘটে।
বাংলাদেশের মূলধারার সাধারণ জনগণ, নাগরিক সমাজ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়—সবাইকে এই সংকটের ন্যায্য সমাধানের জন্য এগিয়ে আসতে হবে। যাঁদের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ নেই, তাঁদের অবিলম্বে মুক্তি, জীবিকা ও ভূমির অধিকার পুনরুদ্ধার এবং আদিবাসী জনগণের অধিকার সুরক্ষা—এসবই পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও আস্থার ভিত্তি গড়ে তোলার জন্য অপরিহার্য।
বিচার যদি বিলম্বিত হয়, তবে তা বিচার অস্বীকারেরই শামিল। কারাগারে আটক বমদের ক্ষেত্রে ৭০০ দিনের বেশি সময় ধরে বিনা বিচারে কারাবাস কোনো প্রশাসনিক বিলম্ব নয়; এটি ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে একটি গভীর ব্যর্থতা। এই অন্যায়ের সংশোধন অর্থাৎ অভিযোগ ছাড়া আটক ব্যক্তিদের মুক্তি এবং ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করা—শুধু আইনি দায়িত্বই নয়, এটি একটি নৈতিক বাধ্যবাধকতাও বটে।
মিলিন্দ মারমা আদিবাসী লেখক ও অধিকারকর্মী।
ই–মেইল: milinda.marma@gmail.com
* মতামত লেখকের নিজস্ব