বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিরোধী দলের দুই নেতা জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম
বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিরোধী দলের দুই নেতা জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম

মতামত

বিরোধী ও সরকারি দলের কেমন ঐক্য চাই

জাতীয় সংসদকে একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হলে যেমন সরকারি দলের দায় রয়েছে, তেমনি বিরোধী ও অন্যান্য দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। রাষ্ট্রগঠন ও গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের আলোচনায় সরকারি ও বিরোধী দল উভয়েরই ভূমিকা জরুরি।

কেননা আমরা যদি মার্কিন রাজনৈতিক তাত্ত্বিক রবার্ট ডালের পলিয়ার্কি, অর্থাৎ বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ধারণা দিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে বুঝতে চাই, তাহলে সেখানে সরকারকে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনী চর্চার ঐতিহ্য নিশ্চিত করতে হবে। বিরোধী দলের কণ্ঠস্বরকে সংসদে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে।

কিন্তু সরকারি দলের নানা দমন–পীড়ন ও অসহযোগিতার কারণে বিগত সময়ে সংসদে একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের উপস্থিতির অভাব আমরা সারাক্ষণই টের পেয়েছি। বিগত আওয়ামী সময়ে একটা সত্যিকার বিরোধী দল না থাকার কারণে সংসদ মূলত অকার্যকর ও সরকারি দলের আজ্ঞাবহ একটি ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়েছিল। কার্যত সরকারি আকাঙ্ক্ষাই সংসদে বিবেচিত হতো এবং ভিন্নমতকে খুব একটা গুরুত্ব দিতে দেখা যেত না। ফলে সংসদ কেবল সাজানো একটি ব্যবস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। জুলাই গণ–অভ্যুত্থান–পরবর্তী গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় আমরা তেমন একটা সাজানো, কিন্তু অকার্যকর সংসদ আর দেখতে চাই না।

আশার কথা হলো দেশগঠনে আমরা নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে জাতীয় ঐক্যের প্রতি গুরুত্ব দিতে দেখি, যখন তিনি বলেন, ‘জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা।’ ঠিক তেমনই আমরা জামায়াতে ইসলামীর আমিরের বক্তব্য থেকে বুঝতে পারি যে তারাও একটি কার্যকর বিরোধী দল হিসেবে সংসদে আসতে চায়। এ ধরনের বক্তব্য প্রজাতন্ত্রের একজন সামান্য জনতা হিসেবে আমাদের আশ্বস্ত করে।

তবে আমাদের অতীত অভিজ্ঞতায় একটি আদর্শ সরকারি ও বিরোধী দলের সহাবস্থান খুব একটা দেখতে পাইনি। অতীতে বিরোধী দলের ভূমিকা কেবলই সরকারি দলের বিরোধিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। বিরোধী দল মানেই যেন ছিল বয়কট, অনাস্থা ও সংসদ থেকে ওয়াকআউট বা বের হয়ে যাওয়া। ফলে আমরা দেখেছি, কী করে সংসদ একটি অচলাবস্থায় পর্যবসিত হয় এবং দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোও নানাভাবে ঝুঁকির মুখে পড়ে। সরকারি দলও তেমন পরিস্থিতিতে খুব একটা ইতিবাচকভাবে বিরোধী দলকে সংসদে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা না নিয়ে তাদের সংসদীয় ব্যবস্থা থেকে আরও দূরে সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করত।

যেখানে বিরোধী দল একটি ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে সংসদে জনগণের স্বার্থ রক্ষার জন্য নিজেদের অভিমত প্রকাশ করবে এবং সরকারকে চ্যালেঞ্জ করবে, সেই ইতিবাচক চর্চা আমাদের সামনে খুব একটা ছিল না। অথচ দেশগঠনে তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা আমাদের বর্তমান বিরোধী দলের মাথায় রাখতে হবে। গণতন্ত্রের যথাযথ বিকাশের জন্যই একটি শক্তিশালী ও কার্যকরী বিরোধী দল প্রয়োজন। তাই বিরোধী দলকে কখনো শত্রু হিসেবে দেখা যাবে না। বিরোধী দলের কার্যকর ধারার মধ্য দিয়ে একটি জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়, যা আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক প্রেক্ষাপটে জরুরি একটি বিষয়।

সরকারি দলকে আইনের শাসন নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে বিরোধী দলের একটি ইতিবাচক ক্ষমতায়নের মাধ্যমে সংসদে তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে। বিরোধী ও সরকারি দলের মধ্যে যখন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে একমাত্র নিয়ম হিসেবে দেখার ও মানার প্রবণতা তৈরি হবে, তখনই গণতন্ত্র একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে।

বিরোধী দলের সঙ্গে জাতীয় ঐক্যের গুরুত্বকে সব রাজনৈতিক দলের অনুধাবন করতে হবে। কেননা একটি দেশের গণতন্ত্র ও সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। ঠিক এ কারণেই বিগত অন্তর্বর্তী সরকার একটি ঐকমত্য কমিশন গড়ে তুলেছিলেন। তারা জাতীয় ঐকমত্য গঠনে বৈপ্লবিক কিছু করতে না পারলেও সব রাজনৈতিক দলকে কিছু বিষয়ে একমত হতে এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচন সঠিকভাবে করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। ঠিক তেমনি বিএনপিকেও বর্তমানে একটি কার্যকর সংসদীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য ইতিবাচক ভূমিকা জারি রাখতে হবে। বিরোধী দলকে বিগত আওয়ামী সময়ের দমন–পীড়নের মধ্য দিয়ে যেতে বাধ্য করার হীন প্রচেষ্টা আমরা বিগত দেড় দশকজুড়ে দেখেছি; যে প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় আমরা দেখতে পাই—কী করে আওয়ামী লীগ ধীরে ধীরে একটি কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়েছিল।

তাই এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে জাতীয় ঐক্য গঠনে সরকারি দলের ভূমিকা এখানে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপিকে পূর্বতন এই বিষয়গুলো থেকে শিখতে হবে, তারা যেন আওয়ামী সরকারের মতো সেই দমন–পীড়নের রাজনীতি শুরু না করে। যে দমন–পীড়নের শিকার খোদ বিএনপি এবং ব্যক্তিক পরিসরের হিসাব নিলে এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী আমাদের নয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেসহ তাঁর দলের হাজারো কর্মী। তাই সব রাষ্ট্রীয় পরিসরকে সরকারদলীয় একটি ব্যবস্থায় যেন পরিণত করা না হয়, সেদিকে বিএনপিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। কেননা এভাবেই ভিন্নমতের ওপর দমন–পীড়নের পথ সুগম হয়।

তাই এই দুই রাজনৈতিক অংশীজন, অর্থাৎ সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে নানা কারণে ঐক্য জরুরি। তার মধ্যে বোধ করি জনগণের প্রতি তাদের জবাবদিহি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সরকারি দলের জনগণের প্রতি জবাবদিহির একটি ক্ষেত্র হলো সংসদ। আর সেই সংসদের দুই অবিচ্ছেদ্য এবং প্রয়োজনীয় অংশীজন হলো বিরোধী ও সরকারি দল। কেননা এই দ্বান্দ্বিকতার মধ্য দিয়েই সংসদ একটি কার্যকর ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হবে, যাতে জনগণের জবাবদিহি নিশ্চিত হবে এবং জনগণের প্রতিনিধিদের যথাযথ অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে জনগণের কণ্ঠস্বর সংসদে প্রতিফলিত হবে।

সরকারি দলকে আইনের শাসন নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে বিরোধী দলের একটি ইতিবাচক ক্ষমতায়নের মাধ্যমে সংসদে তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে। বিরোধী ও সরকারি দলের মধ্যে যখন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে একমাত্র নিয়ম হিসেবে দেখার ও মানার প্রবণতা তৈরি হবে, তখনই গণতন্ত্র একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে।

এই যৌথ অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সংলাপ ও নীতিভিত্তিক আলোচনা হয়ে উঠবে আমাদের সংসদীয় ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এর মধ্য দিয়ে সংসদ হয়ে উঠবে নীতিভিত্তিক আলোচনা ও সমালোচনার একটি ইতিবাচক ও কার্যকর পাটাতন। সরকারি কিংবা সংসদ সদস্যদের প্রস্তাবিত কোনো নীতির ইতিবাচক সমালোচনা মানেই এর বিরোধিতা নয়, বরং এর মধ্য দিয়ে অন্যদের বিকল্প অথচ কার্যকর, সুচিন্তিত ও যৌক্তিক চিন্তাভাবনা উপস্থাপনের একটি সুযোগ তৈরি হয়। এমন চর্চার মধ্য দিয়ে একটি কার্যকর সংসদীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

একটি কার্যকর সংসদীয় ব্যবস্থা থাকলেই আমরা একটি মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারব। আমরা সব সময়ে বলে এসেছি, একটি নিরাপদ ও মানবিক রাষ্ট্র আমাদের সবার আগে প্রয়োজন। নিরাপত্তাহীন একটা দেশে বসবাস করার যন্ত্রণা কেমন হতে পারে, সেই অভিজ্ঞতা আমাদের সবার রয়েছে। সেই মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার জন্য আমাদের দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন কেবল তখনই সম্ভব, যখন বিরোধী ও সরকারি দলের ইতিবাচক ও সহযোগিতামূলক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে একটি কার্যকর ও গঠনমূলক সংসদ গড়ে উঠবে। আমরা এই বিষয়ে আশ্বস্ত হতে চাই, যখন দেখি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষার কথা বলেন।

সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চার জন্যই একটি সক্রিয় ও সহায়ক বিরোধী দল যেমন প্রয়োজন, ঠিক তেমনি প্রয়োজন একটি সহনশীল সরকারি দল। আর এ ধরনের ইতিবাচক চর্চার মধ্য দিয়ে আমরা একটি স্থায়ী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তীর্ণ হব এবং একটি গঠনমূলক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারব। আমরা চাই না সরকারি ও বিরোধী দলের নেতিবাচক বিরোধে আমাদের সংসদ অকার্যকর হোক কিংবা আমাদের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা এবারও থমকে যাক।

  • বুলবুল সিদ্দিকী অধ্যাপক, রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

*মতামত লেখকের নিজস্ব