
ব্রহ্মপুত্রের আরেক নাম চলন্ত সাগর। এই চলন্ত সাগর পাহাড় থেকে নেমেই বৃহত্তম কিছু চরের জন্ম দিয়েছে ভারত ও বাংলাদেশে। বৃহত্তম কয়েকটি বনাঞ্চলও ব্রহ্মপুত্রপাড়েই। বাংলাদেশের একমাত্র ভাসমান তেল ডিপোটিও ব্রহ্মপুত্রের চিলমারীতেই।
প্রায় তিন যুগ আগে, ১৯৯৪ সালে চিলমারীর একযুগ বইতে মোনাজাতউদ্দিন লিখেছেন, ‘তবে লেখালেখির পর চিলমারীতে হয়েছে একটি ভাসমান ডিপো। এর উদ্দেশ্য ভালো ছিল। বাঘাবাড়ি হয়ে দ্রুত আসবে জ্বালানি তেল আর এলপি গ্যাস। সড়কপথে দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে বৃহত্তর রংপুর-দিনাজপুরে, আটটি জেলা এলাকায়। কিন্তু ডিপো প্রতিষ্ঠিত হলেও নির্বুদ্ধির ডিপোরা সংযোগ-সড়ক তৈরি করেনি, হয়নি নদী খনন, ফলে তেলের বার্জ-ট্যাংকার ঘাটে ভিড়তে পারে না। শুকনো মৌসুমে, জ্বালানি তেলের যখন ভীষণ ক্রাইসিস, তখন চিলমারীর এই ভাসমান তেল-ডিপো থাকে বন্ধ। এই সুযোগটা নেয় একশ্রেণির ডিলার।...ওদিকে তাঁরা ঘুমাচ্ছেন।’
চিলমারী বন্দরসংলগ্ন রমনা রেলস্টেশন। আর ২০০ গজ রেললাইন বসালেই পার্বতীপুর থেকে মালবাহী ট্রেনে জ্বালানি তেল চিলমারী ভাসমান ডিপোয় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
১৯৮৮ সালে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা—তিনটি কোম্পানির ভাসমান ডিপো চালু হয়। ৩০০-৫০০ শ্রমিকের পদচারণে মুখর হয় ডিপো এলাকা, সঙ্গে ট্যাংক লরির শ্রমিক ও তেলের নৌকার মাঝিরা তো আছেই। চা, বিস্কুট ও ভাতের দোকান মিলে ব্যস্ত এলাকায় পরিণত হলো। হাজারখানেক পরিবারে সরাসরি আর্থিক সচ্ছলতা চলে আসে। প্রভাব পড়ে পুরো চিলমারীর অর্থনীতিতে।
কয়েক বছর পর পদ্মা কোম্পানি তাদের ডিপোটি সরিয়ে নেয়। ২০১০-১১ সাল থেকে বাকি দুটিতেও জ্বালানি তেল সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়। ফলে মোনাজাতউদ্দিনের ভাষায়, ‘শুকনো মৌসুমের আগেই (ডিলাররা) তারা ডিজেল মজুত করে রাখে কিংবা সরাসরি নিয়ে আসে বাঘাবাড়ি থেকে। তারপর “ক্যারিং কস্ট” বেশি পড়ার নামে ডিলাররা লাভে লাল হয়ে যায়। এ অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন বিশেষ করে বোরো ধান, গম, আলু, তামাক উৎপাদনে এই বিষয় কী রকম ক্ষতির কারণ হয়ে থেকেছে, আমাদের জ্বালানি মন্ত্রণালয় আর সংশ্লিষ্ট কয়েকটি মহল কোনোক্রমেই বুঝতে চাচ্ছেন না। চৌদ্দ টাকার ডিজেল বিশ টাকায় কিনতে হচ্ছে।’
২০২১ সাল থেকে দুটো ডিপোতেই তেল সরবরাহ বন্ধ। তখন ১৪ টাকার ডিজেল ২০ টাকায় কিনতে হলে ১১৫ টাকার ডিজেল এখন কত টাকায় কিনতে হচ্ছে, ভাবতে থাকুন।
কেন তেল আসছে না? চার বছর ধরে চিলমারী থেকে রৌমারী রুটে দুটি ফেরি চলাচল করছে। বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তারা বলছেন, ফেরি চলাচলের জন্য যে পরিমাণ গভীরতা দরকার, তার চেয়ে দু–তিন ফুট গভীরতা বেশি ব্রহ্মপুত্রে। এ ছাড়া মাঝেমধ্যেই ভারতীয় জাহাজ চিলমারী বন্দরে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স জন্য দাঁড়ায়।
এখানে ডিপো ব্যবস্থাপক হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন রংপুর ডিপোর ব্যবস্থাপক। কর্মকর্তারা চিলমারীতে বদলিকে শাস্তি হিসেবে গ্রহণ করেন।
পুরো চরাঞ্চল এই তেল ডিপোর ওপর নির্ভরশীল। কয়েকটি চরে বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে বটে, কিন্তু চর তো প্রতিবছর ভাঙে, নতুন চরে গড়ে মানচিত্র বদলায়। ফলে বিদ্যুতের ব্যবহার ফসল উৎপাদনে তেমন ভূমিকা রাখেনি। ডিজেল ছাড়া তাই চরাঞ্চলে আবাদ প্রায় অসম্ভব।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঋতুতে বড় পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। অসময়ে বৃষ্টি ও খরা এখন নিত্যসঙ্গী। ফলে ফসল উৎপাদনে ডিজেলের চাহিদা অনেক বেড়েছে।
ব্রহ্মপুত্র তীরবর্তী হাটগুলোয় হাজার হাজার নৌকা ভেড়ে। সেগুলোর জন্য ডিজেল জরুরি। শুধু চিলমারীর জোড়গাছ হাটে রবি ও বুধবারের জন্যই লাগে ৩০ থেকে ৫০ হাজার লিটার ডিজেল। রৌমারীহাট, কুড়িগ্রামের যাত্রাপুরহাট, জামালপুরের বকশীগঞ্জ হাট তো আছেই। এ ছাড়া জেলা ও উপজেলা সদরগুলোয় চিকিৎসা, ব্যবসা, কোর্ট-কাছারি ও সরকারি প্রয়োজনে নৌচলাচল তো আছেই।
এ ছাড়া চরাঞ্চলে ছোট ছোট দোকান গড়ে উঠেছে। ধান, ভুট্টা, গম, চিনা, বাদাম, তিল, তিসিসহ বিভিন্ন ধরনের ডালের মাড়াইকল চালানোর জন্যও ডিজেল দরকার।
চিলমারীর ভাসমান ডিপোর ওপর নির্ভরশীল কুড়িগ্রাম, জামালপুর ও গাইবান্ধা জেলা। নৌপথে যেমন রৌমারী, রাজীবপুর উপজেলাসহ জামালপুর জেলা, তেমনি মাওলানা ভাসানী সেতু হয়ে গাইবান্ধা জেলায় সহজে তেল পৌঁছে যাবে। যে ডিলাররা ৯০ থেকে ১৪০ কিলোমিটার দূরত্বের রংপুর ও পার্বতীপুর এবং ২৫০ কিলোমিটার দূরের বাঘাবাড়ি থেকে তেল আনেন, চিলমারীতে তেল ডিপোটি চালু থাকলে বিপণন ও বিতরণব্যবস্থায় বড় প্রভাব পড়বে।
চিলমারী বন্দরসংলগ্ন রমনা রেলস্টেশন। আর ২০০ গজ রেললাইন বসালেই পার্বতীপুর থেকে মালবাহী ট্রেনে জ্বালানি তেল চিলমারী ভাসমান ডিপোয় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। অথবা রমনা রেলস্টেশনে স্থায়ী ডিপো নির্মাণ করেও কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা ও লালমনিরহাট জেলার তেল চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির আন্দোলনের দাবিতে চিলমারী নদীবন্দরের কাজও চলমান। এটি শেষ হলে ভারতের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি শুরু হবে। সেসব নৌযানের জন্যও জ্বালানি তেলের দরকার হবে।
আলাপের স্পর্শে কবে কেটে যাবে এই দুঃখের কাল, মোনাজাতউদ্দিন?
● নাহিদ হাসান লেখক ও সংগঠক
nahidknowledge1@gmail.com