দুপুর প্রায় ১২টা। শুটিং করছি রুবেল আনুশের ‘অপরিচিত’ নাটকের। লোকেশনটা ঢাকার অদূরে নবাবগঞ্জের কোমরগঞ্জ বাজারে। এটা ছিল একটা কাঠের আড়ত।
বেশ বড়ই আড়তটা। একরখানেক জায়গা নিয়ে। দেয়ালঘেরা। ইটের দেয়াল। আসলে এখানে বিভিন্ন এলাকা থেকে বড় বড় গাছের গুঁড়ি নিয়ে আসা হয় ‘নছিমনে’ করে। তারপর হয় বিক্রিবাট্টা।
এর ভেতরেই আমার শুটিং চলছিল। আড়তে ঢোকার মুখেই একটা গুমটি ঘর। সেটিও পাকা, তিন দিকেই খোলা। পাহারাদারের জন্য তৈরি।
নাটকের চরিত্রে আমি গরিব মাস্টার। মেয়ের বিয়ের জন্য ব্যাংক থেকে সারা জীবনের সঞ্চয় তুলে নিয়ে বাড়ি যাচ্ছি। এখানেই হারিয়ে যায় টাকার ব্যাগটি। তারপর থেকে দিনের পর দিন পাগলের মতো সেটা খুঁজে বেড়াচ্ছি এই আড়তেই।
শুটিংয়ের ফাঁকে আমি বসে আছি সেই গুমটি ঘরে। ইউনিটের লোকজন ক্যামেরা-লাইট ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত। এ সময়ে আমার পাশে এসে বসলেন একজন বৃদ্ধ।
প্রোডাকশন বয়রা তাঁকে কয়েকবার তাড়া লাগাল উঠে যাওয়ার জন্য; কিন্তু তিনি অনড়। চুপচাপ গ্যাঁট হয়ে বসে রইলেন, যেন কানে শুনতে পান না।
পরনে চেক লুঙ্গি, গায়ে গেঞ্জি। বেশ ময়লা। বয়স হয়েছে বেশ, সেটা বোঝা যায়, শরীরের কোঁচকানো চামড়া দেখে। দাড়ি বেশ লম্বা। প্রায় সবই সাদা। তবে মাঝেমধ্যে কালো ছোপ। চোখ দুটো ছোট হলেও জ্বলজ্বলে।
তাঁর হাবভাব দেখে আমি বেশ উৎসাহিত হলাম তাঁর সঙ্গে কথা বলার জন্য। সুন্দর করে একটা সালাম দিলাম। এবার আমার দিকে তাকালেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে; সালামের উত্তরটা দিলেন শুধু মাথা ঝাঁকিয়ে। কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ।
এবার তিনি লুঙ্গির ট্যাঁক থেকে বের করলেন একটি সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাই। একটি সিগারেট ধরিয়ে প্যাকেট ও দেশলাই রাখলেন যথাস্থানে।
তারপর বেশ লম্বা লম্বা টানে মুখভর্তি ধোঁয়া ছাড়তে লাগলেন। তাঁর দৃষ্টি মাটির দিকে। বসে রয়েছেন সাহেবি কায়দায় পায়ের ওপর পা তুলে।
একটু ঝুঁকে ডান হাতের কনুইটা হাঁটুতে রেখে মৌজ করে ধূমপান করছেন। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল—এ মুহূর্তে পৃথিবীতে এর চেয়ে আরামদায়ক কিছু নেই।
—এখনো সিগারেট খান?
আলাপ শুরু করি আমি।
—পনেরো বছর থেইকা খাই।
দৃষ্টি মাটিতেই তখনো।
—বয়স কত?
—দুই কম আশি।
—কোনো অসুবিধা হয় না?
—নাহ।
—পরিবারে আপত্তি করে না?
—পরিবার নাই।
—ছেলেমেয়েরা?
—হেরাও নাই।
—কোথায়?
—জানি না।
—নামটা বলবেন?
এবার মাথা উঠিয়ে দেখলেন আমাকে। চোখ দুটো জ্বলে উঠল মনে হয়। একটা সন্দেহ ঝিলিক দিল মুহূর্তের জন্য।
—পত্রিকার মানুষ?
—না, না। আমি একজন অভিনেতা। শুটিং করছি এখানে।
এবার ভালো করে দেখলেন আমাকে।
—দেখছি তো মনে হয় আপনেরে।
আমি হাসলাম একটু। তিনি কিন্তু নির্বিকার।
—আমি মুন্সি।
—আইডি কার্ড আছে?
—কী?
—জাতীয় পরিচয়পত্র?
—হ।
—ভোট দেবেন?
—না।
বলেই সিগারেটটা আধখাওয়া অবস্থায় ছুড়ে ফেলে দিলেন।
—কেন, না কেন?
—কারে দিমু?
—পছন্দের মানুষকে।
এবার প্রোডাকশন বয় এসে বেশ কড়া গলায় তাড়া লাগাতেই উঠে পড়লেন বিরক্ত হয়ে। আমি উঠে তাঁর পিছু নিলাম। উত্তর তো শোনা হয়নি তখনো। ডাকলাম পেছন থেকে—
—বড় ভাই!
—আবার কী?
—বললেন না তো ভোট দেবেন কি না!
—আমার কুনু পছন্দের মানুষও নাই, পছন্দের দলও নাই।
স্পঞ্জের স্যান্ডেলে ফটফট আওয়াজ তুলে আবার হাঁটা দিলেন মুন্সি।
আমাকে আর সুযোগ না দিয়ে হনহন করে চলে গেলেন মুন্সি। এদিকে সহকারী ডিরেক্টর অস্থির হয়ে ছুটে এসেছে ততক্ষণে আমার কাছে। —স্যার, কোনো সমস্যা? —হ্যাঁ, সমস্যা। তবে আমার নয়; জাতীয়। আমি হেসে বললাম।
আমি নাছোড়বান্দা। আবার পিছু নিয়ে জিজ্ঞাসা করি:
—কেন পছন্দের কেউ নেই?
—অ্যারা যখন ভুট চায়, মনে হয় মিঠা মিঠা বিয়ার গীত গায়; আর যহন পাশ কইরা গদিতে বসে তখন তো লাগে এক একজন সিনেমার ভিলেন। মোনাফেক।
আমাকে আর সুযোগ না দিয়ে হনহন করে চলে গেলেন মুন্সি। এদিকে সহকারী ডিরেক্টর অস্থির হয়ে ছুটে এসেছে ততক্ষণে আমার কাছে।
—স্যার, কোনো সমস্যা?
—হ্যাঁ, সমস্যা। তবে আমার নয়; জাতীয়।
আমি হেসে বললাম।
আবুল হায়াত অভিনেতা