গত এক যুগের বেশি সময়ে রাজনীতি ও সমাজে নানা চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ যে অর্থনৈতিকভাবে উল্লেখযোগ্য উন্নতি অর্জন করেছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
দাতা তহবিল ও নিজ তহবিলনির্ভর বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ, বৃহৎ মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরদের প্রবেশ ও বিস্তার, বিদ্যুৎ উৎপাদনে সন্তোষজনক প্রবৃদ্ধি, পাঁচ তারকা হোটেল চেইন প্রতিষ্ঠা, সরকারি ও বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোর বড় উড়োজাহাজ ক্রয়, আলিপে ও সাংহাই–শেনঝেন স্টক এক্সচেঞ্জে ইকুইটি বিনিয়োগ, জাপান টোব্যাকো ইন্টারন্যাশনালের (জেটিআই) স্থানীয় তামাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ এবং জ্বালানি, সিমেন্ট, টেলিকম ও টেক্সটাইল খাতে বিদেশি বড় ইকুইটির বিনিয়োগ—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ মহলে বাংলাদেশকে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।
আইএফসি, সিডিসি (বর্তমানে বিআইআই) কিংবা এআইআইবি; যে প্রতিষ্ঠানই হোক না কেন—সবাই বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির উত্থানে আরও বেশি করে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে এবং এখনো দেখাচ্ছে, বিশেষ করে অবকাঠামো খাতে, এমনকি ম্যানুফ্যাকচারিং খাতেও।
এসব বিনিয়োগের বৃহৎ আকারের কারণে বৈশ্বিক এফএমসিজি (ভোগ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য) সম্প্রদায়ের দ্রুত সম্প্রসারণ হওয়া স্থানীয় ভোক্তা বাজারের অংশ হওয়ার আগ্রহও স্পষ্ট হয়েছে। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে (কয়েক বছর ধরে ভারতের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি হারে) গ্রাহক ব্যয় বেড়েছে, যা বাংলাদেশকে বৈশ্বিক ভোক্তা ব্র্যান্ডগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের কাছে ‘এড়িয়ে যাওয়া যাবে না’—এমন একটি অঞ্চলে পরিণত করেছে।
ডিজিটাল ইন্টারফেস ও একীভবনের গতি দ্রুত হয়েছে। কিছু কিছু দেশের প্রাধান্য থাকলেও আন্তর্জাতিক অবকাঠামো নির্মাতারা বাংলাদেশের বড় নির্মাণ ও ইমারত প্রকল্পের চুক্তিতে অংশ নিয়েছে। বহু ক্রসবর্ডার পরিকল্পনার পূর্ণ বাস্তবায়ন হচ্ছে বিদেশি পরামর্শক, প্রকল্প ব্যবস্থাপক ও বিপণন ব্যবস্থাপকদের মাধ্যমে। হোলি আর্টিজানের মর্মান্তিক ঘটনার পর ইউরোপীয় বা উত্তর আমেরিকার ব্যবসায়ীদের আগমন হয়তো কমেছে, তবে এ অঞ্চলের ‘দেখতে একই রকম’ বিদেশিদের আসা তাতে বাধাগ্রস্ত হয়নি।
জনপ্রিয় ও শক্তিশালী সরকারই কেবল মসৃণ ও ধারাবাহিক সংস্কার নিশ্চিত করতে পারে। একই সঙ্গে সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল এবং ব্যক্তিগত ও কায়েমি স্বার্থমুক্ত সংসদ সদস্যরাই প্রয়োজনীয় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিবেশী দেশগুলোর মানুষের আসাও থেমে থাকেনি। ভ্রমণসতর্কতা থাকা সত্ত্বেও উন্নয়নকর্মীদের একটি ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি আমরা দেখতে পেয়েছি, যাঁরা বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে যুক্ত রয়েছে বা হচ্ছে। আমাদের সমাজে হয়তো বিশৃঙ্খলা রয়েছে কিংবা বাড়ছে, তবে একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধিও হচ্ছে। বিভিন্ন খাতে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছেন, যা নতুন ও বিদ্যমান বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। গ্রাহকের চাহিদা এবং স্থানীয় ভোক্তা ব্যয় বৃদ্ধিই এর প্রধান চালিকা শক্তি।
মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি, ক্ষুদ্রঋণের বিস্তার এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সপ্রবাহ বৃদ্ধি বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে ‘বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ’ সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে। এ ক্ষেত্রে অনেকেই বেসরকারি খাতকে কৃতিত্ব দেবেন—আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী মহলে ‘বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ’ তৈরির জন্য এবং বিশেষভাবে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’-এর উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির জন্য। তবে ‘বেসরকারি খাতবান্ধব’ নীতিকাঠামো এবং এমনকি রাজনীতিবিদদের ভূমিকাকেও কিছু কৃতিত্ব দিতেই হয়।
এখন আসে অনিবার্য প্রশ্ন—এরপর কী? কীভাবে এই প্রবৃদ্ধিকে আরও টেকসই এবং কম বেদনাদায়ক করা যাবে? যারা আলোচিত বই হোয়াই নেশনস ফেল বা কেন রাষ্ট্র ব্যর্থ হয় পড়েছেন, তারা হয়তো এ প্রশ্নের কিছুটা উত্তর পেয়েছেন। ফলাফলকেন্দ্রিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে প্রয়োজন অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ, নিয়মিত সংস্কার, সাধারণ মানুষের স্বার্থে বিনিয়োগ এবং নজরদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা।
বিনিয়োগ বৃদ্ধি আন্তর্জাতিক সূচকে দেশের অবস্থান উন্নত করতে পারে, তবে তা সাধারণ মানুষের জন্য মসৃণ বা ‘অত্যাচারহীন’ প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করে না। দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য সহায়ক নীতি ও কৌশল সংস্কার অপরিহার্য।
প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং কিংবা অধ্যাপক ইউনূস বা তাঁর উত্তরসূরি বড় আকারের জিটুজি বা বিটুবি চুক্তি সহজ করতে পারেন, কিন্তু চুক্তি-পরবর্তী বাস্তবায়ন তদারকি তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়। এর মধ্যে রয়েছে ভূমি অধিগ্রহণ, লাইসেন্স প্রদান, অফ-টেকার চুক্তি, বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ ও ইকুইটি–প্রবাহ, ক্ষতিপূরণ–কাঠামো, মালিকানা বা যৌথ উদ্যোগসংক্রান্ত আইনি ব্যবস্থা, বিরোধ নিষ্পত্তি, মুনাফা ও লভ্যাংশ প্রেরণ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপকের প্রাপ্যতা।
প্রবৃদ্ধির স্থায়িত্ব নিয়ে আলোচনা উঠলে বিশ্লেষকেরা সাধারণত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, বৈষম্য, সাধারণ মানুষের স্বার্থরক্ষা এবং মানবসম্পদে বিনিয়োগ—বিশেষ করে মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার দিকে দৃষ্টি দিতে বলেন। একই সঙ্গে মানসম্পন্ন মানবসম্পদ ও কর্মপরিবেশের জন্য পরিবহনব্যবস্থা, কার্যকর রেল ও সড়ক যোগাযোগ এবং দক্ষ সমুদ্র ও নৌবন্দর অপরিহার্য। সরকারি স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য।
সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহি, স্বাধীন বিচার বিভাগ, প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ এবং সর্বোপরি প্রবৃদ্ধিবান্ধব নীতি শাসনের মাধ্যমে ধারাবাহিক দক্ষতা অর্জন সম্ভব। প্রায় ৮০ বছরের পুরোনো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রণীত ‘ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশনস অ্যাক্ট’ কিংবা ৬০ বছরের পুরোনো ভূমি অধিগ্রহণ বা পরিবহন আইনের কাঠামো দিয়ে সামনে এগোনো যাবে না। সংস্কারের জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী ও দূরদর্শী রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যা প্রতিফলিত হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে।
জনপ্রিয় ও শক্তিশালী সরকারই কেবল মসৃণ ও ধারাবাহিক সংস্কার নিশ্চিত করতে পারে। একই সঙ্গে সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল এবং ব্যক্তিগত ও কায়েমি স্বার্থমুক্ত সংসদ সদস্যরাই প্রয়োজনীয় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম।
বহু চ্যালেঞ্জের মধ্যেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণে বাংলাদেশের সক্ষমতা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে এই মনোযোগকে দীর্ঘমেয়াদি অর্জনে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন সক্ষমতা নির্মাণ, প্রক্রিয়ার পুনর্নকশা এবং নীতি সংস্কারে গভীর ও নিরপেক্ষ পর্যালোচনা। একই সঙ্গে নতুন বাস্তবতায় ধর্ম ও দারিদ্র্য বিমোচনের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতির বিষয়টিও অবহেলা করা যাবে না।
মামুন রশীদ অর্থনীতি বিশ্লেষক
*মতামত লেখকের নিজস্ব