
সে এক হইহই কাণ্ড রইরই ব্যাপার। মাঠে লেগে গেছে ঈদের ধুম। ঈদের নামাজ শেষ না হতেই নতুন জামাকাপড়ে সাজা কিশোর–কিশোরীর মতো মাঠ সাজছে নানা প্যাভিলিয়নে, ব্যানারে, পোস্টারে। তরুণ থেকে বুড়ো—আজ এ ওকে বুঝিয়ে দেবে কত বলে কত রান। একে অন্যকে ‘বুঝিয়ে দেওয়ার’ এই সুযোগ মাসে মাসে আসে না। বছরে একবার আসে। যার সুবাদে আসে, তার নাম ঈদ।
যে মাঠের কথা বলছি তার ‘মালিকের’ ‘ভালো নাম’ গিরিশচন্দ্র পাইলট উচ্চবিদ্যালয়। ডাকনাম জিসি হাইস্কুল। সময়ের ক্রিকেট পিচে নেমে এই ইশকুল সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছে ২০০২ সালে। এখনো সে নট আউট। সে হিসাবে তার বয়স সোয়া শ বছর। গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার হৃদয়ভূমিতে দাঁড়িয়ে এই শতবর্ষী স্মৃতিবৃক্ষ আজ আর শুধু শিক্ষার স্থান নয়; এটি এক আত্মীয়তার ভূগোল। এখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম নিজেদের শিকড় খুঁজে পায়। সেই শিকড় খুঁজে পাওয়ারও বড় উপলক্ষ হলো ঈদ।
এ দেশের মানুষের কাছে ঈদ মানেই ঘরে ফেরা। এই ফেরার সঙ্গে সম্পর্ক যতটা না পথের, তারও চেয়ে বেশি হৃদয়ের। বছরজুড়ে দেশে–বিদেশে ছড়িয়ে থাকা মানুষ যখন একসঙ্গে ফিরে আসে, তখন গ্রামের আকাশটাও যেন একটু অন্য রকম নীল হয়ে ওঠে; ছাতিমগন্ধা বাতাসে মিশে যায় এক অদ্ভুত প্রত্যাবর্তনের ঘ্রাণ। কাশিয়ানীর সেই চিরচেনা প্রান্তরে দাঁড়িয়ে থাকা জিসি স্কুলের মতো হাজারো প্রান্তিক প্রতিষ্ঠান তখন হয়ে ওঠে এই ফেরার কেন্দ্রবিন্দু; হয়ে ওঠে একেকটি প্রাঙ্গণ, যেখানে সময় থেমে থাকে, অথচ জীবন নবীন হয়ে ওঠে।
ঈদের আগের দিনগুলোতে শুরু হয় সেই বহুল প্রতীক্ষিত মিলন। দূরদেশ থেকে, ব্যস্ত শহর থেকে, জীবনের নানা বাঁক ঘুরে মানুষ ফিরে আসে এখানে—নিজেদের কাছে, নিজেদের মানুষের কাছে।
ঈদের এক দিন আগে সন্ধ্যায় গিয়েছিলাম জিসি স্কুলের প্রাঙ্গণে। পুরো প্রাঙ্গণ দেখে প্রথমে মনে হলো কোনো মেলায় এসেছি। বিভিন্ন ক্লাসরুমে এবং স্কুল চত্বরে শামিয়ানা খাটানো। একেক সালের একেক ব্যাচ আলাদা আলাদা অথচ একসঙ্গে ইফতারের আয়োজন করেছে। কেউ বয়সে তরুণ, কারও মুখে সাদা দাড়ি। কেউ পাঞ্জাবিতে, কেউ প্যান্টে–শার্টে, কেউ শাড়িতে, কেউ সালোয়ার–কামিজে।
১৯৯৫ সালের ব্যাচের আমন্ত্রণে গিয়ে দেখি শিল্পী, কাজল, শামীম, শিমুল, দীপঙ্কর, কৃষ্ণ, পলাশ দত্তরা একত্র হয়েছে ইফতার মাহফিলে। কেউ এসেছে সস্ত্রীক, কেউ সপত্নীক, কারও সঙ্গে ছেলেমেয়ে। বহু বছর পর দেখা হওয়ার পর একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে হয়তো বলে উঠছে, ‘বন্ধু, কী খবর বল! কত দিন দেখা হয়নি।’
এই খোঁজ নেওয়ার মুহূর্তগুলোতে সময়ের ভাষা বদলে যায়। কেউ বলে তার সন্তানের কথা, কেউ বলে ব্যস্ততার গল্প, কেউবা তার অপ্রকাশিত কষ্টের কথা। তখন আর এ কথাগুলো সাধারণ কথোপকথন থাকে না; হয়ে ওঠে এক আত্মার স্পর্শ, এক নিঃশব্দ আলিঙ্গন। তা হয়ে ওঠে সময়ের বিরুদ্ধে এক উজ্জ্বল প্রতিবাদ—যেখানে বলা হয়, ‘দূরত্ব আমাদের আলাদা করতে পারেনি।’
এই খেলা কেবল খেলা নয়, এ এক পুনর্মিলনের ভাষা। যারা একদিন একই বেঞ্চে বসে স্বপ্ন দেখেছিল, আজ তারা আবার এক মাঠে। ব্যাট হাতে প্রতিপক্ষ হিসেবে, কিন্তু অন্তরে একই বন্ধনে। এই খেলার প্রতিটি রান, প্রতিটি উল্লাস, প্রতিটি করতালি বলে উঠবে ‘আছি, আমরা হারাইনি, আমরা এখনো একসঙ্গে আছি। আমরা এখনো একসঙ্গে বাঁচি!’
ইফতারের টেবিলে বসে তারা হাসছিল। গল্প করছিল। ঠাট্টায় মেতে উঠছিল। ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছিল স্মৃতির দরজা। স্কুলের সেই দিনগুলো—ধুলোমাখা মাঠ, ক্লাসরুমের জানালা, শিক্ষকের কড়া দৃষ্টি আর বন্ধুর গোপন হাসি—সব তাদের চোখেমুখে ফিরে আসছিল একে একে। প্রতিটি ব্যাচের নবীন-প্রবীণ বন্ধুরা ঠিক একইভাবে নিজেদের ভেতর হারিয়ে যাচ্ছিল। স্মৃতি হাতড়ে তারা খুঁজে আনছিল সেই হাজারো মুক্তো–মানিক, যেগুলো সময় কখনো মুছে দিতে পারেনি।
এই মিলনের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক গভীর মানবিক সত্য। কেউ আজ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ উকিল, কেউবা ড্রাইভার, পিয়ন বা রাজমিস্ত্রি—কিন্তু এখানে এসে সব পরিচয় যেন গলে যায়। সামাজিক অবস্থান, অর্থনৈতিক পার্থক্য, ধর্মীয় ভেদরেখা—সবই ম্লান হয়ে যায় একটিমাত্র পরিচয়ের সামনে—তারা সবাই বন্ধু। হিন্দু, মুসলমান, খ্রিষ্টান—একই সারিতে বসে ইফতার করছিল। একই স্মৃতির আলোয় তারা নিজেদের উজ্জ্বল করে তুলছিল।
এখানে এমনকি রাজনীতির কোনো রেখাও টানতে পারে না বিভাজনের সীমা। আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি—এ পরিচয়গুলো এই প্রাঙ্গণের বাইরেই ‘পার্ক করা’ ছিল। এখানে মানুষ তার সব লেবেল ছেড়ে কেবল মানুষ হয়ে উঠছিল।
আজ ঈদের দিন। আজ এই জিসি স্কুলে এক বিস্তৃত আনন্দের বিস্ফোরণের দিন। সকাল থেকে পাড়া–মহল্লায় ছড়িয়ে পড়েছে উৎসবের আবহ। কারণ, আজ ‘খেলা হবে’!
জিসি স্কুলের মাঠে সন্ধ্যা নামার আগেই নামবে মানুষের ঢল। বাতাসে মিশবে উচ্ছ্বাস আর অদ্ভুত নস্টালজিক কম্পন। ঠিক সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায়, ২০১৪ বনাম ২০১৫ সালের এসএসসি ব্যাচের খেলা দিয়ে শুরু হবে বহুল প্রতীক্ষিত লিগ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। ১৯৯৫ সালের ব্যাচ থেকে ২০২০ সালের ব্যাচের পাঁচ ওভারের টান টান উত্তেজনার ক্রিকেট লিগ। ২৫টি টিমের এই খেলা চলবে টানা তিন দিন।
ঈদের এই খেলা কেবল ব্যাট-বলের লড়াই নয়; এটি সময়ের বিরুদ্ধে মানুষের এক প্রতীকী প্রতিযোগিতা। যারা একদিন একই ক্লাসরুমে বসে স্বপ্ন দেখেছিল, আজ তারা আবার এক মাঠে দাঁড়িয়ে। তারা মুখোমুখি হবে; কিন্তু প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, বরং একে অপরের অস্তিত্বকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করার জন্য। এখানে প্রতিটি শট, প্রতিটি রান, প্রতিটি উল্লাস যেন তাদের ভেতরের সেই কিশোর সত্তাটিকে আবার জাগিয়ে তুলবে। এখানে কেউ দর্শক, কেউ খেলোয়াড়, কেউ সংগঠক। কিন্তু সবাই একই গল্পের ভাগীদার।
এই সমগ্র আয়োজন আমাদের একটি গভীর সত্যের সামনে দাঁড় করায়। মানুষ যত দূরেই যাক, যত ভিন্ন পথেই চলুক—তার ভেতরের শিকড় কখনো শুকিয়ে যায় না। বরং সঠিক সময়ে, সঠিক স্পর্শে তা আবার সজীব হয়ে ওঠে।
আসলে গিরিশচন্দ্র পাইলট হাইস্কুলের এই ঈদ-উৎসব নিছক একটি বার্ষিক অনুষ্ঠান নয়; এটি এক সামাজিক দর্শন। এখানে দেখি—মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার পেশা, ধর্ম বা রাজনৈতিক অবস্থান নয়; বরং তার স্মৃতি, তার সম্পর্ক, তার একসঙ্গে থাকার ক্ষমতা।
মানুষ যেহেতু তার স্মৃতির মধ্যেই সবচেয়ে বেশি বেঁচে থাকে, সেহেতু সেই স্মৃতির সবচেয়ে উজ্জ্বল অংশ হলো—একসঙ্গে থাকার মুহূর্তগুলো।
এই খেলা কেবল খেলা নয়, এ এক পুনর্মিলনের ভাষা। যারা একদিন একই বেঞ্চে বসে স্বপ্ন দেখেছিল, আজ তারা আবার এক মাঠে। ব্যাট হাতে প্রতিপক্ষ হিসেবে, কিন্তু অন্তরে একই বন্ধনে। এই খেলার প্রতিটি রান, প্রতিটি উল্লাস, প্রতিটি করতালি বলে উঠবে ‘আছি, আমরা হারাইনি, আমরা এখনো একসঙ্গে আছি। আমরা এখনো একসঙ্গে বাঁচি!’
সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক
ই–মেইল: sarfuddin2003@gmail.com