প্রায় এক বছর সাত মাস পর লিখতে বসছি। ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার প্রায় দেড় যুগের ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন হয় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। এর তিন দিন পর গঠিত হয় অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার। সেখানে আমি একজন উপদেষ্টা ছিলাম। সেই পদ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর লিখতে বসেছি। মনে হচ্ছে কলমে কিছুটা আড়ষ্টতার ছাপ রয়ে গেছে। তবে গত দেড় বছরের সরকারের পরিচালনার অংশ হয়ে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা আমার জন্য ছিল এক ভিন্ন জগৎ।
যদিও আমার পাঁচ বছরের পূর্ব অভিজ্ঞতা (নির্বাচন কমিশনে কাজের অভিজ্ঞতা) এ জগৎকে বুঝতে অনেক সহায়তা করেছে। তবু বলতে হয়, যতটুকু বুঝেছি ও নিজের প্রজ্ঞা দিয়ে কাজ করতে চেষ্টা করেছি, তা হিমশৈলের একটি বিন্দুমাত্র। আমাদের দেশের আমলাতন্ত্র, প্রকৃতপক্ষে যাদের মাধ্যমে দেশ পরিচালিত হওয়ার কথা, তা যথেষ্ট জটিল। এই জটিল প্রক্রিয়ার যৎসামান্যও বুঝতে না পারলে যেকোনো নীতিনির্ধারকের পক্ষে গভীরে প্রবেশ করা কঠিন। ফলে স্রোতে গা ভাসানো ছাড়া উপায় থাকে না।
আমাদের দেশের আমলারা যে মেধাবী, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু অতীতে রাজনৈতিক সরকারগুলো দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে প্রশাসনকে গড়ে তুলতে চেয়েছে। বিশেষ করে বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে এই প্রবণতা প্রকট আকার ধারণ করে, যার খেসারত দেশ ও জাতিকে দিতে হয়েছে। অনেক দক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তাকে বিভিন্ন তকমা দিয়ে চাকরিচ্যুত বা প্রান্তিক করা হয়েছে। বাস্তবে প্রায় প্রতিটি সরকারই দলীয় বিবেচনায় আমলাতন্ত্রকে ব্যবহার করতে গিয়ে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব দুর্বল হলে তার প্রভাব পড়ে নীতি বাস্তবায়ন, সেবা প্রদান এবং সামগ্রিক সুশাসনের ওপর। আশা করি ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারকেরা এ বিষয়ে আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল হবেন।
আমার বিবেচনায়, পুলিশকে প্রকৃত অর্থে দলীয় প্রভাবমুক্ত করতে হলে নিয়োগ–কাঠামোকে দুই স্তরে সীমিত করা যেতে পারে। একদিকে কনস্টেবল পর্যায়ে নিয়োগ, অন্যদিকে বিসিএসের মাধ্যমে কর্মকর্তা নিয়োগ। কনস্টেবল হিসেবে যোগদানকারীরা যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে ইন্সপেক্টর পর্যায়ে উন্নীত হবেন। এতে অভ্যন্তরীণ পেশাগত ধারাবাহিকতা তৈরি হবে এবং মধ্যপর্যায়ের পদগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর সুযোগ কমবে।
বহুদিন পর লিখতে বসায় চিন্তাগুলোও যেন কিছুটা বিক্ষিপ্তভাবে এসে ধরা দিচ্ছে। তবে আমার উদ্দেশ্য বাংলাদেশের প্রশাসন নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করা নয়। বরং দায়িত্ব পালনকালে যে অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গিয়েছি, তার সামান্য অংশ পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়াই এই লেখার লক্ষ্য। প্রেক্ষাপটের দীর্ঘ বিবরণে না গিয়ে আমি ৫ আগস্ট ২০২৪-এর সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যা ‘জুলাই বিপ্লব’ নামে পরিচিত, তাকে ঘিরে আমার সীমিত কিছু অনুভূতি প্রকাশ করতে চাই।
হাসিনার শাসন ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। তাঁর শাসনে স্বাধীনচেতা ও নিরপেক্ষ মানুষগুলো কমবেশি মানসিক ও শারীরিকভাবে নিগৃহীত হয়েছে। প্রতিপক্ষ সংগঠন, বিশেষ করে রাজনীতিবিদ ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতনের বিবরণ বলে শেষ করা যাবে না। হাসিনা পতনের আগের ১৫ বছর টিভি টক শো ও আমার লেখালেখি সরকারের বিপক্ষে গেছে। আমাকে তাঁর সরকারের বিরাগভাজন হতে হয়েছে। আমাকে নির্বাচন করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল, যা আমি প্রত্যাখ্যান করেছি। এরপর প্রায় ১০ বছর আমাকে সব সামরিক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ থেকে বিরত রাখা হয়েছিল। এমনকি যেসব সামরিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাঝে-মধ্যে ভূ-রাজনীতি ও অন্যান্য বিষয়ে ‘আউট কোর্স’ হিসেবে আমন্ত্রিত হতাম, তাও বন্ধ ছিল। জাতীয় কুচকাওয়াজ হতেও দূরে রাখা হয়েছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত আমি আমার অবস্থান থেকে হাসিনা সরকারের দমন-পীড়নের বিরোধিতা করেছি। অনেকেরই মনে থাকার কথা, ৪ আগস্ট ২০২৪-এ আমরা কয়েকজন জ্যেষ্ঠ অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা প্রকাশ্যে একটি বক্তব্য দিয়েছিলাম। সেখানে আমি প্রথম বক্তা হিসেবে সামরিক বাহিনীকে নিজ দেশের মানুষের বুকে গুলি না চালানোর আহ্বান জানিয়েছিলাম। অন্যায় ও অবৈধ নির্দেশ অমান্য করার কথাও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল।
দৃশ্যত সামরিক বাহিনী আমাদের সেই আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল। পরিস্থিতির গতি দ্রুত বদলে যায়। হাসিনার পতন ও দেশত্যাগ ত্বরান্বিত হয়। ছাত্র-জনতার সংগ্রাম বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। স্বাভাবিকভাবে নতুন সূচনার অপেক্ষায় ছিল বাংলাদেশ। তবে আমার বিবেচনায় সামরিক বাহিনীর সেদিনের অবস্থান ও ঘুরে দাঁড়ানো বাংলাদেশকে সম্ভাব্য ভয়াবহ পরিণতি থেকে রক্ষা করেছে।
হাসিনার দেশত্যাগ ও মন্ত্রিসভার পতনের পর তিন দিন সরকারবিহীন শূন্যতায় দেশে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠ ছেড়ে চলে যায়। অনেক সদস্য গণরোষের ভয়ে বিভিন্ন জায়গায় গা ঢাকা দেয়। অনেক থানা লুট হয় এবং বহু অস্ত্র খোয়া যায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী এখনো প্রায় দেড় হাজার অস্ত্রের হদিস পাওয়া যায়নি। এসব অস্ত্র উদ্ধার অব্যাহত থাকা বাঞ্ছনীয়। এসব অস্ত্র যত্রতত্র ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব অস্ত্র যেহেতু দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবহার করে তাই এর গোলাবারুদ পাওয়া খুব সহজ বিষয়। নবনির্বাচিত সরকারের শাসনে দেশের আইনশৃঙ্খলার উন্নতি অন্যতম চ্যালেঞ্জ। সে কারণে খোয়া যাওয়া অস্ত্র উদ্ধারকেও অগ্রাধিকার দিতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারে আমার ১৯ মাসের অভিজ্ঞতার শুরু ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট। সেদিন আমাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে আমার স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ৯ দিন। দায়িত্ব গ্রহণের নবম দিনেই পতিত আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে আমার একটি বক্তব্যের একটি অংশকে বিকৃতভাবে প্রচার করে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয়। সেই বিতর্কের জেরেই দায়িত্বে টিকে থাকা সম্ভব হয়নি। পরিহাসের বিষয় হলো, আজ তার চেয়েও বেশি সরাসরি ভাষায় আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার কথা উচ্চারিত হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আমার স্বল্প সময়টি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তখন দেশের বহু স্থানে পুলিশ কার্যত অনুপস্থিত। জনরোষের ভয়ে তারা কর্মস্থলে ফিরছিল না। অন্যদিকে শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষও ছিল গভীর আতঙ্কে। প্রতিশোধপরায়ণতার আবহে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের বাড়িঘর দখল ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ছড়িয়ে পড়ছিল। পরিস্থিতি ছিল অস্থিতিশীল ও খারাপ হওয়ার ঝুঁকিতে।
এই পরিস্থিতিতে আমার প্রথম দায়িত্ব ছিল পুলিশকে কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনা। কিন্তু সে সময় পুলিশ বাহিনী কারও আশ্বাসে আস্থা রাখতে প্রস্তুত ছিল না। এমনকি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশও তারা অগ্রাহ্য করছিল। তাদের ১৭ দফা দাবি সামনে আসে। ক্ষুব্ধ, ভীত ও আস্থাহীন একটি বাহিনীকে আবার দায়িত্বে ফেরানো আমার জীবনের অন্যতম কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। প্রায় পাঁচ ঘণ্টার দীর্ঘ আলাপচারিতার পর অবশেষে তারা কাজে ফিরতে সম্মত হয়।
আমার পরিকল্পনা ছিল সাম্প্রতিক সহিংসতার গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর তদন্ত শুরু করা। বিশেষ করে পুলিশের অস্ত্র অন্যদের দ্বারা ব্যবহারের অভিযোগ যাচাই করা জরুরি ছিল। নানা আলামত ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে কিছু ক্ষেত্রে পুলিশের মারণাস্ত্র সিভিল পোশাকে দলীয় ক্যাডারদের হাতে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া শুরু করার মতো সময় আমি পাইনি। আমাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তখন সরকার থেকে সরে আসতে চেয়েছিলাম। কিন্তু অধ্যাপক ইউনূসের অনুরোধে তা আর করা হয়নি। তিনি নিজেও প্রবল চাপের মধ্যে ছিলেন বলে জানিয়েছিলেন।
ওপরের অভিজ্ঞতার আলোকে আমার দৃঢ়বিশ্বাস, পুলিশ বাহিনীর আমূল সংস্কারে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। পুলিশ কমিশন গঠিত হলেও বাস্তব পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়নি। পোশাক ও লোগো পরিবর্তন ছাড়া কাঠামোগত কোনো রূপান্তর ঘটেনি। এমনকি পোশাকের রংও সবার পছন্দ হয়নি। যদিও লোগো ও পোশাক পরিবর্তন পুলিশের ১৭ দফা দাবির একটি ছিল, তবু এ ধরনের প্রতীকী পদক্ষেপ পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে পারে না।
পুলিশ বাহিনীকে সত্যিকার অর্থে পেশাদার ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হলে কয়েকটি মৌলিক সংস্কার অপরিহার্য। প্রথমত, পুলিশের সার্বিক পরিচালনা, নিয়োগ, পদোন্নতি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর কমিশন গঠন করতে হবে, যার সাংবিধানিক বা আইনি ভিত্তি সুস্পষ্ট থাকবে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হলে নিয়োগপ্রক্রিয়া ও ক্যাডার কাঠামোয় সংস্কার আনতে হবে। মেধা, প্রশিক্ষণ ও পেশাদারত্বকে অগ্রাধিকার না দিলে বাহিনীর ওপর দলীয় প্রভাব কমানো সম্ভব হবে না।
বর্তমানে পুলিশে তিন স্তরে নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রথমত, কনস্টেবল পর্যায়ে সরাসরি নিয়োগ। দ্বিতীয়ত, ইন্সপেক্টর স্তরে নিয়োগ। তৃতীয়ত, বিসিএস ক্যাডারের মাধ্যমে কর্মকর্তা পর্যায়ে নিয়োগ। কাঠামোগত দিক থেকে এই বহুমাত্রিক প্রবেশপথ প্রশাসনিক ভারসাম্য তৈরি করার কথা, কিন্তু বাস্তবে তা সব সময় পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে পারেনি।
আমার বিবেচনায়, পুলিশকে প্রকৃত অর্থে দলীয় প্রভাবমুক্ত করতে হলে নিয়োগ–কাঠামোকে দুই স্তরে সীমিত করা যেতে পারে। একদিকে কনস্টেবল পর্যায়ে নিয়োগ, অন্যদিকে বিসিএসের মাধ্যমে কর্মকর্তা নিয়োগ। কনস্টেবল হিসেবে যোগদানকারীরা যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে ইন্সপেক্টর পর্যায়ে উন্নীত হবেন। এতে অভ্যন্তরীণ পেশাগত ধারাবাহিকতা তৈরি হবে এবং মধ্যপর্যায়ের পদগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর সুযোগ কমবে।
একটি পেশাদার, জবাবদিহিমূলক ও নিরপেক্ষ পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে হলে নিয়োগ ও পদোন্নতি–ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও মেধাভিত্তিক কাঠামো নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই। আশা করি, নীতিনির্ধারকেরা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা পুলিশের সংস্কার নিয়ে যে পরিকল্পনাগুলো ভেবেছিলাম, সেগুলো বাস্তবে রূপ দিতে পারিনি। হয়তো তার দায় আমারই। হয়তো সময়ের আগেই কিছু কথা বলে ফেলেছিলাম।
দুঃখ থেকে যায় যে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত পুলিশ সংস্কার কমিশন আমার লিখিত প্রস্তাবগুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করেছে বলে মনে হয়নি। তবু বিশ্বাস করি, আজ না হোক, কাল হয়তো এ বিষয়গুলো নতুন করে আলোচনায় আসবে। আশা করি, বর্তমান সরকার বিষয়টি গভীরভাবে ভেবে দেখবে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের পথে এগোবে।
ড. এম সাখাওয়াত হোসেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা
মতামত লেখকের নিজস্ব