সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের স্বার্থ ও উদ্বেগ অভিন্ন নয়
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের স্বার্থ ও উদ্বেগ অভিন্ন নয়

মতামত

মক্কা চুক্তি কি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন শক্তির ভারসাম্য আনবে

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান মক্কায় যে প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে, তা শুধু তিন দেশের সামরিক সহযোগিতার বিষয় নয়। এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাব্যবস্থায় নতুন একটি সমীকরণ তৈরির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নিরাপত্তার জন্য নির্ভরশীল দেশগুলো এখন নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন অনুভব করছে।

কাগজে-কলমে নতুন এ জোট যথেষ্ট শক্তিশালী। তিন দেশের অর্থনীতির সম্মিলিত আকার বিপুল। তাদের হাতে রয়েছে ৫ হাজার ৬০০টির বেশি প্রধান যুদ্ধট্যাংক, ১ হাজার ১০০টির বেশি যুদ্ধবিমান এবং বিপুলসংখ্যক ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। তিন দেশের সেনাবাহিনীতে ১০ লাখের বেশি সদস্য রয়েছে। পাকিস্তানের রয়েছে পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতাও। ফলে সামরিক দিক থেকে এ চুক্তির তাৎপর্য উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

তবে তিন দেশের স্বার্থ ও উদ্বেগ এক নয়। পাকিস্তান একাধিক বিদ্রোহের সঙ্গে লড়ছে এবং তার অর্থের প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় একটি কৌশলগত ভারসাম্য চায় ইসলামাবাদ। সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সে ভারসাম্য তৈরিতে সহায়ক হতে পারে। ভারতও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। দেশটির সাবেক পররাষ্ট্রসচিব কানওয়াল সিবাল এ চুক্তিকে ভারতের স্বার্থের জন্য অত্যন্ত নেতিবাচক বলে মন্তব্য করেছেন।

তুরস্কের প্রয়োজনও আলাদা। দেশটি নিজস্ব প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে চায়। বিশেষ করে ইসরায়েলের ঘন ঘন হুমকির কারণে আঙ্কারা দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চয়তা খুঁজছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ সিরিয়া থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহারে সিরিয়ার নতুন সরকারকে সাহায্য করতে চায় তুরস্ক। দেশটির দ্রুত বিকাশমান সামরিক শিল্পের জন্যও নতুন বাজার প্রয়োজন। ফলে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা তুরস্কের সামরিক ও কূটনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সৌদি আরবেরও নিজস্ব হিসাব রয়েছে। ইরান ও ইয়েমেনের হুতিদের মোকাবিলায় রিয়াদের একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক হাতিয়ার প্রয়োজন। হুতিরা লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথে চাপ সৃষ্টি করেছে এবং সৌদি আরবের তেল স্থাপনায়ও হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে যুদ্ধ ও আঞ্চলিক অস্থিরতার কারণে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অর্থনৈতিক আধুনিকায়নের পরিকল্পনাও বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাঁর অর্থনৈতিক পরিকল্পনারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এসব ভিন্ন স্বার্থের মধ্যেও তিন দেশের একটি অভিন্ন উদ্বেগ রয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রকে আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য মনে হচ্ছে না। সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে এবং ট্রাম্পের বিভিন্ন উদ্যোগে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু ওয়াশিংটনের নীতিতে ধারাবাহিকতার অভাব রিয়াদকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ইসরায়েল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য চাপ দিয়েছেন। এমনকি সৌদি আরবের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতার চুক্তির ক্ষেত্রেও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ আগের আলোচনায় এমন শর্ত ছিল না। ফলে সৌদি নেতৃত্বের কাছে পরিষ্কার হয়েছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও ইসরায়েলকে ঘিরে মার্কিন নীতি সব সময় সৌদি স্বার্থের সঙ্গে মিলবে না।

গাজার ঘটনাও যুক্তরাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করেছে। হামাসের সঙ্গে যে শান্তি পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তাতে গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি কাঠামো ছিল। হামাস ভারী অস্ত্র নিষ্ক্রিয় করতে রাজি হয়েছিল, কিন্তু পুরোপুরি নিরস্ত্র হতে রাজি হয়নি। প্রথম খসড়ায় বলা হয়েছিল, গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনী পুরোপুরি প্রত্যাহারের পর হামাস তার ভারী অস্ত্র নতুন ফিলিস্তিনি প্রশাসনের কাছে জমা দেবে। পরে শর্ত পরিবর্তন করে ইসরায়েলি প্রত্যাহার ও হামাসের অস্ত্র নিষ্ক্রিয়করণকে একই সঙ্গে করার কথা বলা হয়।

যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই অনুষ্ঠানে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফসহ তিন দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ৭ আগস্ট ২০২৬, মক্কা

এরপর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পরিকল্পনাটি কার্যত প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, হামাস পুরোপুরি নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েল গাজা থেকে প্রত্যাহার করবে না। ফলে আবারও দেখা গেল, ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেল আবিবের সম্পর্ক এমন যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট চাইলেই ইসরায়েলকে নিজের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিচালনা করতে পারেন না।

এখানেই গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে হামাসকে নিরস্ত্র করা গেলে যুদ্ধ শেষ হতে পারে। কিন্তু ইসরায়েলের লক্ষ্য সম্ভবত আরও বিস্তৃত। হামাসকে দুর্বল করার পাশাপাশি গাজায় নিজেদের অনুগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে শক্তিশালী করা এবং এর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ সংঘাত সৃষ্টি করা হতে পারে সেই পরিকল্পনার অংশ। এমন সংঘাত তৈরি হলে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি গাজা থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হতে পারেন।

১৯৮২ সালের বৈরুতের ঘটনাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। তখন মার্কিন নিশ্চয়তার ভিত্তিতে ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা বৈরুত ছাড়ে। শরণার্থীশিবিরে থাকা ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তাও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে ইসরায়েলি বাহিনী বৈরুতে প্রবেশ করে এবং তাদের সহযোগী ফ্যালাঞ্জ বাহিনী সাবরা ও শাতিলা শরণার্থীশিবিরে হত্যাযজ্ঞ চালায়। মাত্র ২ দিনে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ ফিলিস্তিনি শরণার্থী ও লেবাননের বেসামরিক মানুষ নিহত হন।

মার্কিন সরকার পরে সরাসরি দায় অস্বীকার করলেও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভেতরে অনেকেই মনে করেছিলেন যে ফিলিস্তিনিদের হতাশ করার নৈতিক দায় যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। কারণ, তারা যুক্তরাষ্ট্রের নিশ্চয়তার ওপর নির্ভর করেই বৈরুত ছেড়েছিল।

এ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতেই মক্কা চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এর সাফল্য অবশ্য নিশ্চিত নয়। সামরিক শক্তি থাকলেই কোনো জোট কার্যকর হয় না। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পারস্পরিক আস্থা এবং প্রয়োজনের সময় সে শক্তি ব্যবহারের সাহস। মিসরের মতো গুরুত্বপূর্ণ আরব দেশ এ উদ্যোগে যুক্ত হলে এর প্রভাব আরও বাড়তে পারে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমছে কি না, সেটি নয়। ইসরায়েলকে সামরিকভাবে কতটা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, সেটিও একমাত্র প্রশ্ন নয়। মূল প্রশ্ন হলো, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিজেদের ভূখণ্ড ও জনগণের ওপর কতটা সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।

মক্কা চুক্তিকে তাই শুধু একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এটি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাব্যবস্থায় সম্ভাব্য পরিবর্তনের একটি সূচনা। তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তান যদি নিজেদের সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক শক্তিকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে দীর্ঘদিনের একক মার্কিন নিরাপত্তা–নির্ভরতার বাইরে নতুন আঞ্চলিক ভারসাম্য তৈরি হতে পারে।

তবে এ উদ্যোগ ব্যর্থ হলে পরিস্থিতি উল্টোও হতে পারে। তখন প্রতিটি আরব দেশ বুঝবে যে ইসরায়েল-প্ররোচিত যুদ্ধের পরবর্তী লক্ষ্য তারা হতে পারে। সে কারণে মক্কা চুক্তির ভবিষ্যৎ শুধু তিন দেশের জন্য নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি সফল হলে অঞ্চলটি নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়ে আরও স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথে এগোতে পারে। আর ব্যর্থ হলে পুরোনো নিরাপত্তাকাঠামো ও সংঘাতের চক্রই আরও শক্তিশালী হবে।

  • ডেভিড হার্স্ট মিডল ইস্ট আইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক।

মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনূদিত।