
‘যেকোনো লবি বা প্রভাবশালী গোষ্ঠী হলো রাতের ফোটা ফুলের মতো, অন্ধকারে বেড়ে ওঠে আর আলোর মুখ দেখলে ম্লান হয়ে যায়।’—কথাগুলো আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটির (আইপ্যাক) সাবেক পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক পরিচালক স্টিভ রোজেনের।
স্টিভ রোজেন সহকর্মীকে লেখা এক মেমোতে এমন মন্তব্য করেছিলেন। পরবর্তীকালে ইসরায়েলের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন তথ্য ফাঁসের মতো বড় ধরনের এক গুপ্তচরবৃত্তি কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে চাকরি হারান রোজেন।
প্রকাশ্য আলোচনা যে একটি লবিং সংস্থার জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, সে বিষয়ে রোজেনের পর্যবেক্ষণ সঠিক ছিল। তবে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে আইপ্যাক নিজেই দুটি পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি (প্যাক) গঠনের মাধ্যমে সরাসরি রাজনৈতিক প্রচারণায় যুক্ত হয়ে তাঁর সেই তত্ত্ব পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেয়।
ফলাফল পাওয়া গেল মিশ্র। সম্প্রতি আইপ্যাক ঘোষণা করেছে যে তারা প্যাকগুলোর একটি বন্ধ করে দিচ্ছে।
আইপ্যাক এত দিন ধরে কেবল একটি অ্যাডভোকেসি বা পরামর্শক সংস্থা হিসেবে ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করত; তারা সরাসরি কোনো রাজনৈতিক প্রচারণায় অর্থায়ন করত না, কিংবা কোনো প্রার্থীর পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান নিয়ে তহবিল জোগাত না।
অনেক দিক থেকেই এ কৌশল আইপ্যাকের জন্য বেশি কার্যকর ছিল। এর মাধ্যমে তারা কংগ্রেসে প্রত্যেক সদস্য ইসরায়েলকে কতটা সমর্থন করছেন, সেটির একটি সার্বিক মূল্যায়ন বা ‘রিপোর্ট কার্ড’ তৈরি করতে পারত। এরপর অন্যান্য গোষ্ঠী, যারা মূল প্যাক হিসেবে নিবন্ধিত, তারা সেই রিপোর্ট দেখে সিদ্ধান্ত নিত কোন প্রার্থীকে তহবিল দেওয়া উচিত।
আইপ্যাকের অলাভজনক সংস্থার মর্যাদা থাকার কারণে তারা ইসরায়েলপন্থী মার্কিনদের ইচ্ছার দোহাই দিয়ে কংগ্রেসে ইসরায়েলের পক্ষে কাজ করতে পারত, অথচ তাদের বিদেশি সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে নিবন্ধিত হতে হতো না।
এদিকে আইপ্যাকের সহযোগী সংস্থা আমেরিকান ইসরায়েল এডুকেশন ফান্ড (যা শিক্ষাবিষয়ক অলাভজনক সংস্থা হিসেবে নিবন্ধিত) সরাসরি লবিং থেকে বিরত থাকলেও ‘শিক্ষা সফর’-এর অজুহাতে মার্কিন কংগ্রেস সদস্যদের ইসরায়েলে নিখরচায় ভ্রমণের ব্যবস্থা করে দিত।
কয়েক দশক ধরে এ কৌশল দারুণ কাজ করেছে। দুই দলেই (ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকান) আইপ্যাকের বলয় ছিল মজবুত। মার্কিন সংবাদমাধ্যমেও প্রায়ই বিস্ময় প্রকাশ করে বলা হতো, ইসরায়েলই নাকি একমাত্র বিষয় যা ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকানদের এক জায়গায় মেলাতে পারে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ চিত্রে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। এর কারণগুলো জটিল হলেও ফলাফল হলো—বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে প্রেসিডেন্ট ও কংগ্রেস পদের প্রার্থীরা হঠাৎ করেই দাবি তুলতে শুরু করেন যে ইসরায়েলকে দেওয়া বার্ষিক ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা যুক্তরাষ্ট্রের আইন ও নীতির পরিপন্থী কি না, তা শর্তসাপেক্ষে দেখা উচিত।
আইপ্যাকের প্রভাব কতটা গভীরে ছিল, তা বোঝা যায় এখান থেকেই। স্বাভাবিক এসব শর্ত, যা ইতিমধ্যে মার্কিন আইনেই বিধিবদ্ধ ছিল, সেগুলো নিয়ে কথা বলাকেও একসময় বিতর্কিত মনে করা হতো।
কিন্তু পশ্চিম তীর ও গাজা ভূখণ্ডে ফিলিস্তিনিদের মানবেতর জীবনযাত্রা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ইসরায়েলের উদারপন্থী সমর্থকদের একটি বড় অংশ তাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে শুরু করে।
কংগ্রেসে ফিলিস্তিনের পক্ষে যাতে খুব বেশি কণ্ঠস্বর তৈরি হতে না পারে, সে জন্য শুরুতেই তা দমন করার লক্ষ্যে আইপ্যাক সরাসরি রাজনৈতিক প্রচারে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা দুটি প্যাক তৈরি করে। একটা হচ্ছে আইপ্যাক-প্যাক, যা প্রার্থীর তহবিলে সরাসরি অর্থ দিতে পারে।
অন্যটি হচ্ছে ইউনাইটেড ফর ডেমোক্রেসি প্রজেক্ট (ইউডিপি); এটি একটি সুপার প্যাক। এটি সরাসরি প্রার্থীর প্রচারে অর্থ দিতে না পারলেও নিজেদের পছন্দমতো প্রার্থীর সমর্থনে বিজ্ঞাপনে অনির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে পারে।
আইপ্যাক এত দিন লবিংয়ের জন্য পরিচিত ছিল, কিন্তু এখন থেকে নির্দিষ্ট প্রার্থীদের প্রতি তাদের সমর্থন পরিমাপ করা সহজ হয়ে গেল। ফলে রাজনীতিতে কালো টাকার যে প্রভাব, তার এক বড় প্রতীকে পরিণত হলো তারা।
ওয়াশিংটনে প্রভাব খাটানোর জন্য আইপ্যাকের তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। অন্যান্য লবিং গ্রুপের চেয়ে একে আক্রমণ করা সহজ ছিল, কারণ এটি একটি বিদেশি রাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করত।
দীর্ঘদিন ধরে আইপ্যাক দাবি করে আসছিল যে তারা আমেরিকার ইসরায়েলপন্থী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি। এ যুক্তির কারণেই তারা বিদেশি সরকারের এজেন্ট হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ার আইনি কড়াকড়ি এড়াতে পেরেছিল।
কিন্তু জনগণের আদালতে এ কারিগরি যুক্তির কোনো মূল্য ছিল না। মানুষ স্পষ্ট বুঝতে পারছিল যে আইপ্যাক মূলত একটি ভিন্ন দেশের স্বার্থ রক্ষা করছে।
যেহেতু তারা প্রকাশ্যে নির্বাচনে কোটি কোটি টাকা ঢালছিল এবং প্রার্থীদের অর্থায়ন করছিল, তাই রাজনীতিতে বড় অঙ্কের অর্থের প্রভাব নিয়ে মার্কিন জনগণের মধ্যে যে ক্ষোভ ছিল, তার মুখে পড়ে তারা।
ফলস্বরূপ, ‘আইপ্যাক’ নামটি একটি নেতিবাচক বা বিষাক্ত নাম হিসেবে পরিচিতি পেতে শুরু করে। এতে বড় ভূমিকা রাখেন বার্নি স্যান্ডার্স, যিনি প্রথম অনুধাবন করেছিলেন যে আইপ্যাককে জনসমক্ষে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সম্ভব।
নতুন করে অঢেল অর্থ খরচের ক্ষমতা পেলেও তা দিয়ে মার্কিন রাজনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলার বদলে আইপ্যাক কেবল যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের ভাবমূর্তিকেই আরও ক্ষতিগ্রস্ত করল।
বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটদের ক্ষেত্রে এটি সত্য ছিল। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অধীনে ইসরায়েল বছরের পর বছর ধরে ডেমোক্র্যাটদের দূরে সরিয়ে দিচ্ছিল, যদিও অধিকাংশ আমেরিকান ইহুদিই মূলত ডেমোক্র্যাটের সমর্থক।
ইসরায়েলের ভাবমূর্তির পতন এবং আইপ্যাকের এ গ্রহণযোগ্যতার অভাব সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এ বছরের মিশিগান রাজ্যের নির্বাচনী প্রচারণায়।
আসন্ন নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস পুনরুদ্ধারের আশা করছে এবং সিনেটে তাদের জয়ের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। এ নির্বাচনের অন্যতম নির্ণায়ক রাজ্য হলো মিশিগান।
মিশিগানের রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স একজন চেনা মুখ। চরম ডানপন্থী ব্যক্তি, তাঁর পেছনে রয়েছে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান, উগ্র খ্রিষ্টান গোষ্ঠী এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন।
অন্যদিকে, সব বাধা টপকে ডেমোক্রেটিক দলের মনোনীত প্রার্থী হয়েছেন আবদুল আল-সায়েদ। একে তো মুসলমান, তাঁর ওপর ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ও ইরান যুদ্ধ নিয়ে তাঁর মতামতের কারণে তাঁকে প্রচুর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
আবদুল আল-সায়েদ প্রাইমারি নির্বাচনে আইপ্যাকের দীর্ঘদিনের সমর্থিত কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেন্সকে হারিয়ে এক কঠিন জয় ছিনিয়ে নেন।
এই স্টিভেন্স ২০২২ সালে আইপ্যাকের সহায়তায় অ্যান্ডি লেভিনকে হারিয়েছিলেন। লেভিন মিশিগানের একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান এবং ইহুদি সম্প্রদায়ের সুপরিচিত নেতা ছিলেন। তিনি নিজেকে উদারপন্থী জায়নবাদী মনে করতেন, যিনি ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান’-এ বিশ্বাসী ছিলেন।
তবে আল-সায়েদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে স্টিভেন্সকে আইপ্যাক যে পরিমাণ সমর্থন দিয়েছিল, তা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়।
পুরো প্রচারণায় স্টিভেন্স আল-সায়েদের চেয়ে ১২ গুণ বেশি অর্থ খরচ করেন। আইপ্যাক এবং অন্য ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলো নিজেদের বিজ্ঞাপন ও প্রার্থীর তহবিলে প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলারের বেশি ঢালে।
আইপ্যাকসহ স্টিভেন্সের অন্য সমর্থকেরা যেভাবে আল-সায়েদের বিরুদ্ধে মুসলমানবিদ্বেষী প্রচারণা চালিয়েছিল, স্টিভেন্স তার থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখেছিলেন, কিন্তু এর জোরালো কোনো প্রতিবাদ জানাননি। বিষয়টি সবাই লক্ষ করেছিল এবং পরবর্তীকালে তিনি যখন রিপাবলিকানদের মুখোমুখি হন, পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অবশেষে এক হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর আল-সায়েদ স্টিভেন্সকে পরাজিত করেন। আইপ্যাকের সঙ্গে সম্পৃক্ততা তাঁর পরাজয়ের কারণ ছিল না বলে দাবি করলেও, স্টিভেন্স নিজেই পরোক্ষভাবে তা স্বীকার করে নেন।
স্টিভেন্স বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয়, অনেকেই এটা নিয়ে আলোচনা করছিলেন এবং তাঁরা বিষয়টি পছন্দ করেননি। কারণ, হয়তো তারা বুঝতে পারেনি যে এ গোষ্ঠী কী। আইপ্যাক হলো ৬০ লাখ আমেরিকান ইহুদির একটি সংগঠন... কিন্তু অনেকেই গভীরভাবে হতাশ কারণ নেতানিয়াহু আমাদের শান্তি এনে দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।’
সপ্তাহান্তে এক নাটকীয় মোড়ে মিশিগান ডেমোক্রেটিক পার্টি স্টিভেন্সকে দল থেকে বহিষ্কার করে, কারণ তিনি ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল আল-সায়েদের বদলে রিপাবলিকান প্রাক্–প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থন দেওয়ার ঘোষণা দেন।ই
এদিকে, আল-সায়েদের রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্স মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্য আরও বাড়িয়ে দেন। তিনি বারবার মিথ্যা অভিযোগ তুলতে থাকেন যে আল-সায়েদ মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে যুক্ত এবং তিনি নাকি বলেছিলেন যে ৯/১১-এর হামলার যোগ্য শাস্তিই পেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
কিন্তু এমন স্তরের কাদা–ছোড়াছুড়ির পরও প্রাইমারি শেষ হওয়ার পরপরই রজার্সের নির্বাচনী টিম গোপনে আইপ্যাককে অনুরোধ করে যেন তারা রজার্সকে সমর্থন করা থেকে বিরত থাকে। আইপ্যাক কতটা গ্রহণযোগ্যতাহীন হয়ে পড়েছে, এটি তারই বড় প্রমাণ।
পরবর্তীকালে অবশ্য রজার্স, যাঁর সমর্থক গোষ্ঠীর মধ্যে ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের কিছু উগ্র ইসরায়েল সমর্থক রয়েছেন, প্রকাশ্যে আইপ্যাকের সমর্থন গ্রহণ করেন।
তবে উগ্র ডানপন্থী হওয়া সত্ত্বেও আইপ্যাকের টাকা নিতে রজার্সের এ প্রাথমিক দ্বিধাই প্রমাণ করে যে আইপ্যাকের প্রতি সাধারণ মানুষের বিরূপ মনোভাব কতটা তীব্র।
আবদুল আল-সায়েদ ও মিশিগানের সিনেট লড়াই আইপ্যাকের ক্ষীয়মান ভাবমূর্তির একটি উদাহরণমাত্র। এ ঘৃণার কারণেই আইপ্যাক রাজনৈতিক প্রার্থীর সরাসরি অর্থায়নের খেলা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে।
তবে আইপ্যাক ইউডিপি নামক সুপার প্যাকটি চালু রাখবে। তাদের আশা, এর মাধ্যমে তারা গোপনে নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারবে যাতে মানুষ বুঝতে না পারে যে উসকানিমূলক বিজ্ঞাপনের পেছনে আইপ্যাক রয়েছে। এসব বিজ্ঞাপনে প্রায়ই ইসরায়েলের কোনো উল্লেখ থাকে না, তবে ফিলিস্তিনিদের অধিকারের কথা বলা প্রার্থীকে হেয় করতেই এগুলো ব্যবহার করা হয়।
কিন্তু ‘ইউডিবি’কেও যদি আলোর মুখ দেখানো সম্ভব হয়, তবে ‘আইপ্যাক-প্যাক’-এর মতো এটিও স্তব্ধ হয়ে যাবে। একটি বর্ণবাদী ও গণহত্যা পরিচালনাকারী শাসনব্যবস্থাকে বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য আইপ্যাক ক্লান্তিহীনভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
মিচেল প্লিটনিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। মিডল ইস্ট আই থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।