অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন লিওনেল মেসি
অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন লিওনেল মেসি

মতামত

মেসির বিদায়ে ১০ নম্বর জার্সিও কি অবসরে চলে যাবে  

গত সোমবার লিওনেল মেসি যখন আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিলেন, তখন তার প্রতিক্রিয়া রূপ নিল যেন এক জাতীয় শোকের দৃশ্যে। স্কুলের বাচ্চারা ক্লাসরুমে কেঁদে ফেলল, টেলিভিশনে কাঁদলেন সাংবাদিকেরা, পত্রিকাগুলো ছেয়ে গেল আবেগঘন শ্রদ্ধার খবরে।

প্রিয় তারকাকে শেষবারের মতো ভালোবাসা জানানোর জন্য একটি বিশেষ টেলিফোন লাইন পর্যন্ত চালু করা হলো। সপ্তাহান্তের সব কটি লিগ ম্যাচ শুরুর ১০ মিনিটের মাথায় কিছুক্ষণ খেলা বন্ধ রাখা হয় তাঁর প্রতি সম্মান জানাতে।

‘আমি শূন্য হয়ে গেছি। আর দেওয়ার মতো কিছু বাকি নেই আমার।’ বিদায়বার্তায় লিখেছিলেন মেসি।

একটি অসাধারণ গল্পের অদ্ভুত এক সমাপ্তি ঘটল। বিগত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে মেসি একটি দেশের অযুত প্রত্যাশার ভারী বোঝা একাই বহন করে গেছেন—যে দেশ তাঁকে নিয়ে কখনোই ঠিক নিশ্চিত হতে পারেনি, আসলে সে তাঁকে কী বানিয়ে রাখতে চায়।

তাঁর সঙ্গে অনবরত ডিয়েগো ম্যারাডোনার তুলনা টানা হয়েছে, প্রকাশ্য আবেগ-উচ্ছ্বাসের অভাব নিয়ে সমালোচনা করা হয়েছে, আর ছেলেবেলায় বার্সেলোনা চলে যাওয়ার কারণে বছরজুড়ে তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়েছে কম ‘আর্জেন্টাইন’ বলে।

অথচ তিনি যখন সরে দাঁড়ালেন, আর্জেন্টিনা ও মেসির সম্পর্ক তত দিনে বদলে গেছে পুরোপুরি। যাকে একসময় ‘বাইরের লোক’ বলে গণ্য করা হতো, সময়ের পরিক্রমায় তিনি নিজেই হয়ে উঠেছিলেন দেশটির এক জাতীয় প্রতীক।

১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক হোর্হে ভালদানো মেসির সেই বিদায়কথার উত্তরে লিখেছিলেন, ‘আমরা কানায় কানায় পূর্ণ।’ মেসি নিজেকে উজাড় করে শূন্য করে থাকতে পারেন, কিন্তু আর্জেন্টিনার বুক তিনি ভরিয়ে দিয়েছেন তাঁর সবটুকু দিয়ে।

২১ দীর্ঘ বছরে জাতীয় দলের হয়ে রেকর্ড ২০৭টি ম্যাচ খেলেছেন মেসি—এক আস্ত ফুটবলময় জীবন। করেছেন ১২৫টি গোল, সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ৬৮টি। মেসি মাঠে থাকা মানেই আর্জেন্টিনার শুরুতেই এক গোল এগিয়ে থাকার প্রায় নিশ্চিন্ত নিশ্চয়তা।

ছয়-ছয়টি বিশ্বকাপ খেলেছেন তিনি, ২০২২ সালে কাতারে জিতেছেন শিরোপা, আর পৌঁছেছিলেন আরও দুটি ফাইনালে। তার শেষটি এসেছিল মোটে মাস দুয়েক আগে যুক্তরাষ্ট্রে, যেখানে ৩৯ বছর বয়সেও সেরা ছন্দ দেখিয়েছিলেন তিনি; করেছিলেন ৮টি গোল এবং ৪টি অ্যাসিস্ট।

২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের পর লিওনেল মেসি

তাঁর সবশেষ জাদুকরি প্রদর্শনী ছিল আটলান্টায় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে। ম্যাচের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পিছিয়ে থেকেও ২-১ গোলের অভাবনীয় এক জয় ছিনিয়ে আনে আর্জেন্টিনা—যা দলটির ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় বিজয় হয়ে থাকবে।

আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে ইংল্যান্ডকে হারানো কখনোই স্রেফ একটা ফুটবল ম্যাচ জেতা ছিল না। এই বৈরিতা গভীরতমভাবে জড়িত মালভিনাস দ্বীপপুঞ্জ এবং ১৯৮২ সালের যুদ্ধের সঙ্গে। সেমিফাইনালের পর খেলোয়াড়েরা ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী এক ব্যানার উঁচিয়ে আবারও সে দাবির জানান দেন।

ইংল্যান্ডকে হারানো মানেই পুরোনো সাম্রাজ্যবাদকে হারিয়ে দেওয়া। আর আর্জেন্টিনার ফুটবলে এর অনিবার্য স্মৃতি মানেই ১০ নম্বর জার্সির সেই ম্যারাডোনা—১৯৮৬ বিশ্বকাপে যার অনন্য ভূমিকা অমর করে রেখেছে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ইতিহাসগড়া জয়কে।

মেসির সেই ইংল্যান্ড-বধের ম্যাচটিই শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হলো তাঁর সবশেষ মহাকাব্যিক রূপ হিসেবে। চার দিন পরের ফাইনালে দেওয়ার মতো আর কিছুই তাঁর অবশিষ্ট ছিল না। ক্লান্ত-শ্রান্ত মেসি ম্যাচজুড়ে বলতে গেলে একরকম অকার্যকরই ছিলেন; পুরো ম্যাচে আধিপত্য দেখালেও স্পেনকে ১-০ ব্যবধানের জয় তুলতে লড়াই করতে হয়েছিল অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত।

‘আমার পা দুটো আর সঙ্গ দিচ্ছিল না।’ ম্যাচের পর বাবাকে লেখা এক খোলাচিঠিতে মেসি লিখেছিলেন নিজে। এর ঠিক ২০ দিন পরেই চিরতরে বিদায় নেন তাঁর বাবা।

চোখে জল নিয়ে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে মেসি তাকিয়ে ছিলেন গ্যালারির সেই সমর্থকদের দিকে, যারা তাকে এতটা ভালোবেসে এসেছে। পরাজয়ের গ্লানি হিসেবে যা পৃথিবীর চোখে দৃষ্টিকটু ঠেকেছিল, তা ছিল মূলত এক নিঃশব্দ বিদায়ের সুর। মেসি ততক্ষণে জেনে গেছেন যে এটাই শেষ।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের অনেকেই সেদিন মেসি ও আর্জেন্টিনাকে অভিযুক্ত করেছিল ‘পরাজয়কে সহজভাবে মেনে না নেওয়ার’ অপবাদে। স্প্যানিশ খেলোয়াড়েরা যখন কয়েক মিটার দূরে ট্রফি উঁচিয়ে ধরছিল, তখন মাঠেই পিঠ ফিরিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা; ম্যাচের পরপরই একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঝামেলায়ও জড়িয়ে পড়েছিলেন অনেকে।

দৃশ্যটি দেখতে অবশ্যই ভালো লাগছিল না। কিন্তু মেসির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এর ভেতরের অন্য রূপটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চোখে জল নিয়ে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে মেসি তাকিয়ে ছিলেন গ্যালারির সেই সমর্থকদের দিকে, যারা তাকে এতটা ভালোবেসে এসেছে।

পরাজয়ের গ্লানি হিসেবে যা পৃথিবীর চোখে দৃষ্টিকটু ঠেকেছিল, তা ছিল মূলত এক নিঃশব্দ বিদায়ের সুর। মেসি ততক্ষণে জেনে গেছেন যে এটাই শেষ। আর এই শেষ যাত্রায়, গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন না তাঁর মৃত্যুশয্যায় থাকা প্রিয় বাবা।

জাতীয় দলের হয়ে এক দশকের বেশি সময় বড় কোনো শিরোপা না পাওয়ায় আর্জেন্টিনায় দিনের পর দিন চরম কটূক্তি সইতে হয়েছে মেসিকে। অভিমানে ২০১৬ সালে একবার দল ছাড়ার ঘোষণাও দিয়েছিলেন, পরক্ষণেই ফিরে এসেছেন আবার। আজ তিনি যখন বিদায় নিচ্ছেন, তখন তিনি এক অনন্য অধ্যবসায় ও ধৈর্যের প্রতীক—আজকের এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ায় যা মেলা ভার।

কাতার বিশ্বকাপ লিওনেল মেসি ও আর্জেন্টিনা

তাঁর এই প্রস্থান আর্জেন্টিনায় আরও একটি নতুন দাবির জন্ম দিয়েছে—তাঁর সম্মানে ১০ নম্বর জার্সিটি চিরতরে অবসর দেওয়া হোক।

কিন্তু আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ), যারা এক অবিশ্বাস্য আবেগঘন বিদায়ী ভিডিও তৈরি করেছে, তারা তা করতে পারছে না। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী প্রতিযোগিতামূলক টুর্নামেন্টে স্কোয়াডের জার্সি নম্বর বাদ দেওয়া বা তুলে রাখা অসম্ভব। আর্জেন্টিনা আগেও একবার এই একই মুখোমুখি পরিস্থিতির দাঁড়িয়েছিল।

২০২০ সালে করোনা মহামারির কড়া বিধিনিষেধের মধ্যে যখন ডিয়েগো ম্যারাডোনা মারা যান, গোটা দেশ ডুবে যায় এক অবর্ণনীয় শোকে। সে সময় কবি লিলিয়ানা কাম্পাসো লিখেছিলেন —

‘আমার যদি সাধ্য থাকত, তবে ম্যারাডোনা কফিনটা আমি চুরি করতাম, তারপর ঘুরিয়ে আনতাম শহরের প্রতিটি দরিদ্র পল্লি আর গলি দিয়ে… যতক্ষণ না রোদ, বৃষ্টি, ধূলিকণা আর বাতাস তাকে ছাই বানিয়ে ছড়িয়ে দেয় এই জন্মভূমির পুরোটা আকাশজুড়ে।’

তখনো ১০ নম্বর জার্সিটি অবসরে পাঠানোর প্রবল দাবি উঠেছিল। কিন্তু তা করলে কেড়ে নেওয়া হতো মেসির জার্সিটি—২০০৯ সাল থেকে যা গায়ে চড়িয়ে তিনি নিজের মহাকাব্য রচনা করে চলেছিলেন।

কথাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আর্জেন্টাইন ফুটবলে ১০ নম্বরটি স্রেফ কোনো সাধারণ স্কোয়াড নম্বর নয়। ঐতিহ্যগতভাবেই তা কোনো অনন্য ও সৃজনশীল খেলোয়াড়ের গায়ে শোভা পায়; কেবল দলের আসল জাদুকরের জন্যই সংরক্ষিত থাকে সেই মান। ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের পর ডিয়েগো ম্যারাডোনা এই জার্সিকে এক চিরন্তন রূপ দিয়েছিলেন, আর মেসি সেটাকে নিয়ে গেছেন সম্পূর্ণ নতুন এক উচ্চতায়।

বিশ্বমঞ্চে ১০ নম্বর জার্সিকে ফুটবলীয় প্রতিভার প্রতীক বানিয়েছিলেন অবশ্য পেলে, আর পরবর্তী সময়ে সেই ধারায় হেঁটেছেন বিশ্বের বহু কিংবদন্তি ফুটবলার। তবে আর্জেন্টিনার মাটিতে এই জার্সির যে গুরুত্ব ও গৌরব, তা আর কোথাও ছিল না—যেখানে তা সরাসরি ম্যারাডোনা হাত থেকে এসে পৌঁছেছে মেসির গায়ে।

আর্জেন্টিনা অংশগ্রহণ করা শেষ ১২টি বিশ্বকাপের মধ্যে ১০টিতেই খেলেছেন ম্যারাডোনা ও মেসি। দুজনেই জিতেছেন একটি করে ট্রফি: ম্যারাডোনা ১৯৮৬ সালে, মেসি ২০২২ সালে। এর মাঝখানে দুজনেই দলকে তুলেছেন বিশ্বকাপের আরও তিনটি ফাইনালে—১৯৯০ সালে দিয়েগোর ইতালি, ২০১৪ সালে মেসির ব্রাজিল এবং ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফাইনাল। দুজনে মিলে বিশ্বকাপে মোট ২৯টি গোল করেছেন।

লিওনেল মেসি ও দিয়েগো ম্যারাডোনা

মাঠের এই হিসাবটুকু সহজেই বলে দেয়, আর্জেন্টিনার ফুটবল তাঁদের কাছে কতটা ঋণী। তবে মাঠের বাইরে এই দুজন যা ছড়িয়ে গেছেন, তা স্রেফ কোনো সংখ্যা দিয়ে প্রকাশ করা অসম্ভব। অথচ মানুষ হিসেবে দুজন ছিলেন পরস্পরের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর।

ম্যারাডোনা ছিলেন বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস, চরম উদারতা আর খেয়ালিপনায় ভরা এক চরিত্র। স্প্যানিশ সাংবাদিক রামোন বেসা একবার লিখেছিলেন, কোটি কোটি আর্জেন্টাইন হয়েছিল তাঁর ‘আবেগের দাস’।

বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে মেসি শুরু থেকেই গুটিয়ে রাখা এক আত্মসংযমী মানুষ—সম্ভবত ম্যারাডোনার পতনের ভয়াবহ ট্র্যাজেডি তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন বলেই বুঝেছিলেন এই সীমাহীন খ্যাতির চরম মূল্য।

ম্যারাডোনার হুবহু প্রতিচ্ছবি হয়ে মেসি কিন্তু এই ১০ নম্বর জার্সি নিজের করেননি। একই পাহাড়প্রমাণ প্রত্যাশার ভার তিনি বহন করেছেন সম্পূর্ণ নিজস্ব ঢঙে এবং দিন শেষে জার্সির মালিকানা তিনি নিজের করে নিয়েছেন। এরপর যার আগমন ঘটবে, তাকেও ঠিক এই পথেই হাঁটতে হবে।

উদযাপনরত লিওনেল মেসি

জাতীয় দলের জন্য এগুলো শোক আর চরম এক অভিভাবকহীনতার দিন। আর্জেন্টিনা আগে হারিয়েছে ম্যারাডোনাকে, আর এবার—অন্তত সবুজ গালিচা থেকে—হারিয়ে ফেলল মেসিকেও। তবে আর্জেন্টিনা হলো চিরকাল দুর্দান্ত সব ফুটবলার তৈরির এক অন্তহীন কারখানা, আর ফুটবল বেঁচে থাকে এই আশাতেই যে—একদিন না একদিন নিশ্চিত নতুন কারও আগমন ঘটবে।

স্প্যানিশ ভাষায় একটা চমৎকার কথা প্রচলিত আছে—‘নো আই দোস সিন ত্রেস’ (‘তিন ছাড়া কখনো দুই পূর্ণ হয় না’)। তৃতীয় কোনো কিংবদন্তি এখনো আসেনি। হয়তো আর কোনো দিন দ্বিতীয় ম্যারাডোনা কিংবা দ্বিতীয় মেসি আমরা দেখতেও পাব না। কিন্তু ১০ নম্বর জার্সিটি চিরতরে তুলে রাখার অর্থ হলো—নতুন কোনো রূপকথার সেই সম্ভাবনাকেই একবারে অস্বীকার করা।

আর আর্জেন্টিনা ফুটবল এখনই সেই আশা ছেড়ে দিতে কোনোভাবেই প্রস্তুত নয়।

  • এজেকিয়েল ফার্নান্দেস মুরেস একজন প্রখ্যাত আর্জেন্টাইন ক্রীড়া সাংবাদিক, গ্রন্থকার এবং কলামিস্ট। আল-জাজিরা থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।