সিয়াম সাধনার মাস রমজান; তাকওয়ার মাস রমজান। সিয়াম হলো ‘সওম’–এর বহুবচন। এর অর্থ বিরত থাকা। ফারসি, উর্দু, হিন্দি ও বাংলায় সওম বা সিয়ামকে ‘রোজা’ বলা হয়।
আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘রমজান মাস, এতে মানুষের দিশারি এবং সৎ পথের সুস্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। তোমাদের মধ্যে যারা এই মাস পাবে, তারা যেন এই মাসে সিয়াম ব্রত পালন করে।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৮৫)
হিজরি চান্দ্রবর্ষের নবম মাস রমজান। রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস রমজান। এ মাসের প্রধান ইবাদত ‘সিয়াম’ বা রোজা পালন করা। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের জন্য সিয়ামের (রোজার) বিধান দেওয়া হলো, যেমন সিয়ামের বিধান তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগণকে দেওয়া হয়েছিল; যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৮৩)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজান মাসে সিয়াম পালন করবে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।’ (বুখারি: ৩৭)
তারাবিহ নামাজ রমজানের বিশেষ উপহার। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াবের নিয়তে রমজান মাসে রাত জেগে ইবাদত করবে (তারাবিহ নামাজ পড়বে), তার আগের গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হবে।’ (বুখারি: ৩৬)
রমজানে পূর্ণ মাস রোজা পালন করা ফরজ। চাঁদের তারিখের হিসাব রাখা ফরজে কিফায়া। সদকাতুল ফিতর প্রদান করা ও ঈদের সালাত আদায় করা ওয়াজিব। রমজান মাসের সুন্নত হলো প্রতি রাতে ২০ রাকাত তারাবিহ নামাজ পড়া, তারাবিহ নামাজে খতমে কোরআন তথা পূর্ণ কোরআন পড়ার ও শোনার ব্যবস্থা করা, রোজার জন্য সাহ্রি খাওয়া, তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করা, ইফতার করা, ইফতার করানো, কোরআন মজিদ তিলাওয়াত করা, অত্যধিক পরিমাণে দানখয়রাত করা, জাকাত প্রদান করা, রমজানের শেষ দশক ইতিকাফ করা (সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ কিফায়া), রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে শবে কদর সন্ধান করা, তাসবিহ তাহলিল, জিকির, ইস্তিগফার ও দরুদ শরিফ বেশি বেশি পাঠ করা।
‘শবে কদর’ হলো রমজানের বিশেষ উপহার। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইমানসহ সওয়াবের আশায় কদরের রাতে ইবাদত করবে, তার অতীতের সব গুনাহ মার্জনা করে দেওয়া হবে।’ (বুখারি: ৩৪)
জ্ঞানসম্পন্ন, সাবালক, রোজা পালনে সক্ষম, এমন সব মুমিন মুসলিম নারী ও পুরুষের জন্য রমজান মাসে রোজা পালন করা ফরজে আইন।
ঋতুমতী নারী, প্রসূতি মা (প্রসবোত্তর স্রাব চলাকালীন) এবং অসুস্থ ব্যক্তি ও মুসাফিরগণ পরবর্তী সময়ে রোজা কাজা আদায় করবেন। এমন অক্ষম ব্যক্তি যিনি পুনরায় সুস্থ হয়ে রোজা পালনের সামর্থ্য লাভের সম্ভাবনা নেই, তাঁরা প্রতিটি রোজার জন্য একটি সদকাতুল ফিতরের সমপরিমাণ ফিদিয়া গরিব মিসকিনকে প্রদান করবেন। (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৮৪)
সক্ষম ব্যক্তি রোজা না রাখলে কঠিন গুনাহ হবে; এমতাবস্থায় তা কাজা আদায় করতে হবে। কিন্তু রোজা রাখার পর ওজর ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে ভেঙে ফেললে কাজা ও কাফফারা উভয়টি আদায় করতে হবে। একটি রোজার কাজা হলো একটি রোজা এবং কাফফারা হলো একনাগাড়ে ৬০টি রোজা অথবা ৬০ জন মিসকিনকে দুই বেলা আহার করানো অথবা দাসমুক্ত করা।
নবী করিম (সা.) বলেছেন, আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘রোজা আমারই জন্য, আমিই এর প্রতিদান দেব।’ (বুখারি: ২২৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘জান্নাতে রায়্যান নামক একটি বিশেষ তোরণ আছে। এ তোরণ দিয়ে কিয়ামতের দিন শুধু রোজাদারগণই প্রবেশ করবেন। তাঁদের
প্রবেশের পরে এই দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে, তাঁরা ছাড়া আর কেউ এই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না।’ (বুখারি: ১৭৭৫)
রমজান মাসে প্রতিটি নেক আমলের ফজিলত ৭০ গুণ বৃদ্ধি করা হয়। একেকটি নফল ইবাদতের সওয়াব অন্য মাসের ফরজ ইবাদতের সমান। প্রিয় নবী (সা.) বলেন, ‘যখন রমজান মাস আসে, তখন জান্নাতের দ্বারগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের ফটকগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়; শয়তানকে বন্দী করা হয়; এবং ঘোষণা করা হয়, “হে সৎ কর্মশীলগণ অগ্রগামী হোন, আর পাপীরা বিরত হও।”’ (বুখারি: ১,৭৭৮)
● অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম। ই–মেইল: smusmangonee@gmail.com