
সিডনিতে ১৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে সরাসরি অভিবাসন আইনের পেশার সঙ্গে যুক্ত থেকে একটি নিষ্ঠুর সত্য খুব কাছ থেকে দেখেছি, মানুষ যখন প্রতারকের মিষ্টি কথায় মোহগ্রস্ত হয় তখন সত্যভাষণকে শত্রু মনে করে।
সিডনিতে বসে প্রায়ই দেশ থেকে পরিচিত-অপরিচিত মানুষের ফোন বা বার্তা পাই। কারও আত্মীয় আপেল বাগান বা কমলা বাগানের ফল তোলার ভিসায় অস্ট্রেলিয়ায় আসছেন, কারও আবার লাখ লাখ টাকায় নিশ্চিত স্থায়ী নাগরিকত্বের হাতছানি।
কাগজপত্র খুঁটিয়ে দেখে যখন বলি, ‘এটি নিরেট জালিয়াতি, এক টাকাও দেবেন না’, অধিকাংশ মানুষ তা বিশ্বাস করতে চান না। উল্টো যুক্তি দেখান, ‘অনলাইনে তো ভিসা দেখাচ্ছে!’ অনেকে তো বলেই বসেন, ‘এত টাকা যেহেতু খরচ করছি, আর কিছু দিয়েই দেখি না কী হয়!’ কিন্তু পরিণাম যা হওয়ার তা-ই হয়; সারা জীবনের সঞ্চয় আর ভিটেমাটি খুইয়ে মানুষটি যখন বিমানবন্দরে বা বিদেশের মাটিতে আটকে যান তখন ফের ফোন আসে। কিন্তু তখন আর কিছু করার থাকে না।
অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসনব্যবস্থা পৃথিবীর অন্যতম কঠোর ও নিয়ন্ত্রিত কাঠামো। অস্ট্রেলিয়ার ভিসা টাকায় কেনা যায় না। ভিসা দেওয়ার একমাত্র কর্তৃত্ব দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভিবাসন বিভাগের। কোনো ব্যক্তি, নিয়োগকর্তা, এজেন্ট, এমনকি কোনো আইনজীবীও ভিসার নিশ্চয়তা দিতে পারেন না। কেউ ‘গ্যারান্টি’ দিলেই বুঝবেন, প্রতারণা। মধ্যপ্রাচ্যের মতো কফিল বা ভিসা কেনাবেচার কোনো ব্যবস্থা অস্ট্রেলিয়ায় নেই। স্থানীয় বাজারে দক্ষ কর্মী না পেলে তবেই একজন অস্ট্রেলীয় নিয়োগকর্তা বিদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ বা স্পনসর করার আবেদন করতে পারেন। এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও দীর্ঘ প্রক্রিয়া; বাংলাদেশ থেকে এই পথে খুব কম মানুষই আসতে পারেন।
অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন পর্যবেক্ষণ কর্তৃপক্ষ ‘ওমারা’ সম্প্রতি তাদের নজরদারি বহুগুণ বাড়িয়েছে। ২০২১-২২ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৬১ জনেরও বেশি নিবন্ধিত অভিবাসন পরামর্শকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। খোদ অস্ট্রেলিয়াতেই অনিবন্ধিত ভুয়া দালালদের লাইসেন্স ধার দিয়ে কাজ করানোর অভিযোগে একাধিক অভিবাসন পরামর্শকের লাইসেন্স বাতিল হয়েছে। যেখানে খোদ অস্ট্রেলিয়াতেই জালিয়াতির বিরুদ্ধে এমন সাঁড়াশি অভিযান চলছে সেখানে বাংলাদেশে বসে কিছু অসাধু চক্র লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে ‘নিশ্চিত ভিসা’র যে গল্প সাজায়, তা যে কতটা ফাঁপা, কতটা প্রতারণা তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই।
প্রতারকদের সাধারণ কৌশলগুলো শুরুতেই চিনে রাখা দরকার। অস্ট্রেলিয়া সরকারের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটের ঠিকানা শেষ হয় ডট গভ ডট এইউ দিয়ে। প্রতারকেরা প্রায় একই নামে ডট কম বা ডট নেট ঠিকানার নকল ওয়েবসাইট বানিয়ে সেখানে ‘ভিসা যাচাইয়ের’ ভুয়া ব্যবস্থা দেখায়। নামী প্রতিষ্ঠানের প্যাড ও লোগো নকল করে ভুয়া কাজের নিয়োগপত্র তৈরি করে। ইন্টারনেট নম্বর থেকে ফোন করে বোঝায়, কলটি সরাসরি অস্ট্রেলিয়া থেকেই এসেছে। আর তাদের সবচেয়ে বড় টোপ হলো ‘আগে ভিসা, পরে টাকা’।
প্রতারক চক্র সাধারণত অস্ট্রেলিয়ার ‘ওয়ার্কিং হলিডে’ (সাবক্লাস ৪১৭) কিংবা ‘ই-ভিজিটর’ (সাবক্লাস ৬৫১) ভিসার মতো ক্যাটাগরি বেছে নেয় যেগুলোর অনুমোদিত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নামই নেই। প্রতারকেরা অনলাইনে আবেদনপত্রের ঘরে অনুমোদিত দেশের নাম বসিয়ে দ্রুত ডিজিটাল ভিসা বের করে। এরপর সুকৌশলে তথ্য সংশোধনের সুবিধা নিয়ে আবেদনকারীর বাংলাদেশি পাসপোর্ট নম্বর যুক্ত করে। ফলে সরকারের প্রাথমিক যাচাই ব্যবস্থায় ভিসা মঞ্জুর দেখালেও বাস্তবে ওই ভিসা দিয়ে সরাসরি যাত্রা করা অসম্ভব। আবার কখনো ‘মেরিটাইম ক্রু’ (সাবক্লাস ৯৮৮) ভিসার আশ্রয় নেয়। পরে প্রতারকেরা ভুক্তভোগীকে প্রথমে নেপাল, মালদ্বীপ, ফিজি বা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশে যেখানে বাংলাদেশিদের সাধারণত ভিসা লাগে না সেখানে পাঠায়। মনে রাখবেন, ঢাকা থেকে সরাসরি অস্ট্রেলিয়ার টিকিট না কেটে অন্য দেশ হয়ে ঘুরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাবও নিশ্চিত বিপদের বড় লক্ষণ।
সিডনির বোটানির বাসিন্দা তবারক খান এর আগে এক সংবাদের জন্য নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেছিলেন, ‘আমার ভাতিজা এক এজেন্সির ফাঁদে পড়েছিল। সরকারি যাচাই ব্যবস্থায় ভিসা দেখালেও ধরন দেখেই আমি নিশ্চিত হই এটি ভুয়া। ভাতিজাকে বহুবার বললাম, কোনো শর্টকাট নেই। কিন্তু প্রতারকদের কথায় সে এতটাই অন্ধ ছিল যে আমাদের কথা কানেই তোলেনি। শেষ মুহূর্তে নেপাল যাওয়ার টিকিট কাটার সময় পুরো জালিয়াতি ধরা পড়ে।’
একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিলেন সিডনির লেপিংটনের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হারুন উর রশিদ। তাঁর এক আত্মীয়কে কৃষি ভিসায় এনে তিন বছরে স্থায়ী নাগরিকত্বের লোভ দেখিয়ে প্রায় ১৬ লাখ টাকার চুক্তি করেছিল এক চক্র। হারুন রশিদ বলেন, ‘আমার আত্মীয়ের সাধারণ কাজের ভিসার ন্যূনতম ইংরেজি বা পেশাগত যোগ্যতাই ছিল না। বিষয়টি নিয়ে আগেই সতর্ক করেছিলাম, কিন্তু তিনি শোনেননি। পরে আবেদন নম্বর ও মঞ্জুর নম্বর মেলাতে গিয়ে স্পষ্ট জালিয়াতি ধরা পড়ে।’
এমন আরো অনেক সিডনিপ্রবাসী বাংলাদেশিদের অভিজ্ঞতাও অভিন্ন। চটকদার বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে মানুষ মূল নিয়মগুলো ভুলে যায় এবং আত্মীয়দের বাস্তবসম্মত পরামর্শ অগ্রাহ্য করে।
১. ভাষা ও পেশাগত মূল্যায়ন ছাড়া ভিসা অসম্ভব: প্রায় সব কাজের ভিসায় আন্তর্জাতিক ইংরেজি ভাষার পরীক্ষায় (যেমন আইইএলটিএস) নির্দিষ্ট নম্বর এবং অনুমোদিত সংস্থা থেকে কাজের যোগ্যতার সনদ বাধ্যতামূলক। ‘ইংরেজি লাগবে না, অভিজ্ঞতা লাগবে না’—এমন কথা মানেই নিশ্চিত প্রতারণা।
২. নিবন্ধিত আইনজীবী ছাড়া কারো পরামর্শ নয়: অস্ট্রেলিয়া সরকারের আইন অনুযায়ী ভিসা পরামর্শ দেওয়ার জন্য অভিবাসন পরামর্শককে অবশ্যই ‘ওমারা’র নিবন্ধিত হতে হয়। সরকারি ওয়েবসাইটে (মারা ডট জিওভি ডট এইউ) গিয়ে বিনামূল্যে যেকোনো নিবন্ধিত অভিবাসন পরামর্শকের নাম বা লাইসেন্স নম্বর যাচাই করা যায়।
৩. প্রযুক্তি ও যাচাই: অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসনের সমস্ত কাজ হয় সরকারের একমাত্র অফিশিয়াল পোর্টালে (হোমঅ্যাফেয়ার্স ডট জিওভি ডট এইউ)। যদি দরকার পরে আজকাল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অনুবাদ প্রযুক্তির কল্যাণে যে কেউ ইংরেজি ওয়েবসাইটের তথ্য সহজে বাংলায় রূপান্তর করে পড়ে নিতে পারেন। প্রয়োজনে সরকারি নম্বরে কথা বলা বা দূতাবাস থেকে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব।
৪. অগ্রিম অর্থ লেনদেন বন্ধ করুন: ব্যক্তিগত ব্যাংক বা মুঠোফোন হিসাবে টাকা পাঠানো থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন এবং ঢাকার অস্ট্রেলীয় হাই কমিশনের নির্ধারিত ক্লিনিকের বাইরে কোথাও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাবেন না।
অস্ট্রেলিয়ায় সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা অন্যায় নয় কিন্তু অসচেতনতা ও অন্ধ মোহের কারণে সেই স্বপ্ন যেন সর্বনাশা দুঃস্বপ্নে রূপ না নেয়। বৈধ যোগ্যতা ও নিয়মতান্ত্রিক পথই অভিবাসনের একমাত্র চাবিকাঠি। স্বজন ও বিশেষজ্ঞদের সাবধানবাণী সময়মতো শুনলে বহু পরিবার নিঃস্ব হওয়া থেকে বেঁচে যেতে পারে।
কাউসার খান প্রথম আলোর সিডনি প্রতিনিধি ও অভিবাসন আইনজীবী
মতামত লেখকের নিজস্ব