নারীর সাহসকে কাজে লাগানো হয়েছে। তারপর তাঁর সামনে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই বন্দোবস্ত নারীকে রাস্তায় চেয়েছিল, টেবিলে চায়নি
নারীর সাহসকে কাজে লাগানো হয়েছে। তারপর তাঁর সামনে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই বন্দোবস্ত নারীকে রাস্তায় চেয়েছিল, টেবিলে চায়নি

মতামত

বন্দোবস্তের বাইরে নারী, রাজনীতির বাইরে নয়

২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছবিটা অন্য রকম ছিল। মধ্যরাতে হলের তালা ভেঙে ছাত্রীরা রাস্তায় নেমেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে দেশের ছোট-বড় ক্যাম্পাসে মিছিলের সামনের সারিতে ছিলেন তাঁরা। পুলিশ আর ছাত্রলীগের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন সোজা হয়ে। গুলির মুখেও পিছু হটেননি।

সাভার, গাজীপুর, টঙ্গীর পোশাকশ্রমিক নারীরা কারখানা ছেড়ে আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। সন্তানকে বাঁচাতে শত শত মা রাস্তায় নেমেছিলেন। সরকারি-বেসরকারি সব বিশ্ববিদ্যালয়েই নারীরা সমান সক্রিয় ছিলেন। অনেক সমন্বয়ক ছিলেন নারী। আন্দোলনের ধকল তাঁরা শরীরে নিয়েছেন। মারধর, গ্রেপ্তার, অনলাইনে ও সামনাসামনি হয়রানি, কিছুই বাদ যায়নি।

তারপর সরকার পড়ল। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা বলা হলো। কিন্তু প্রতারিত হলো মানুষ, প্রতারিত হলেন নারীরা। নতুন আয়োজনে রাজনীতির পুরোনো কাঠামোই টিকে গেল। অভ্যুত্থান-পরবর্তী এই আয়োজনে নারীরা প্রায় অদৃশ্য। ছাত্রনেতৃত্বে গড়া নতুন দল এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে নারীর সংখ্যা হাতে গোনা। অন্তর্বর্তী সময়ের নানা কমিশন আর সংলাপের টেবিলেও নারীর উপস্থিতি ছিল দুর্বল।

একটা কমিশন অবশ্য নারীর প্রশ্নে জোরগলায় কথা বলেছিল। নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন গঠিত হয়েছিল ২০২৪ সালের নভেম্বরে, শিরীন হকের নেতৃত্বে। পরের বছর এপ্রিলে তারা প্রায় সাড়ে চার শ সুপারিশ জমা দেয়। উত্তরাধিকারে সমান অধিকার, অভিন্ন পারিবারিক আইন, সংসদে নারীর আসন বাড়ানো, এমন অনেক প্রস্তাব ছিল সেখানে। এরপরই শুরু হয় আক্রমণ। কয়েকটি ধর্মাশ্রয়ী দল সমাবেশ করে, প্রকাশ্যে অশ্লীল ভাষায় আক্রমণ করে। অন্তর্বর্তী সরকারের ১১টি সংস্কার কমিশনের মধ্যে কেবল এই একটিকেই এমন তীব্র বাধার মুখে পড়তে হয়। সুপারিশগুলো চাপা পড়ে যায়।

নারীরা এবার নিজের চোখে দেখলেন, রাস্তার সাহস আর ক্ষমতার ভাগ এক জিনিস নয়। সামনের সারিতে থাকা যথেষ্ট নয়, সিদ্ধান্তের টেবিলেও জায়গা করে নিতে হয়। এই উপলব্ধিই পরের লড়াইয়ের পুঁজি। কোনো আন্দোলনই পুরোপুরি ব্যর্থ হয় না। এই আন্দোলন হয়তো এখনই ব্যবস্থার খোলনলচে বদলাতে পারেনি। কিন্তু এই লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা পরেরবারের প্রস্তুতিকে শক্ত করবে।

তারপর এল নির্বাচন। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। জুলাই সনদে দলগুলো অন্তত ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিল। সেই সামান্য কথাও কেউ রাখেনি। ৫১টি দলের মধ্যে ৩০টি একজন নারীকেও মনোনয়ন দেয়নি। প্রার্থীদের প্রায় ৪ শতাংশ ছিলেন নারী। সাধারণ আসনে জিতে আসেন মাত্র সাতজন।

জামায়াত একজন নারীকেও প্রার্থী করেনি। দলটির আমির স্পষ্ট বলেছেন, কোনো নারী তাঁদের দলের নেতৃত্ব দিতে পারবেন না। এনসিপির ছবিটা আরও জটিল। বড় দলগুলোর মধ্যে তারাই সবচেয়ে বেশি নারীকে মনোনয়ন দিয়েছিল। অথচ সেই দলই ভোটের আগে জামায়াতের সঙ্গে জোট বাঁধে।

এনসিপির নারী নেতাদের অনেকে প্রকাশ্যে এর প্রতিবাদ করেন। তাঁরা বলেন, এই জোট জুলাইয়ের চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা, আর এতে নারীর রাজনীতি আরও কঠিন হবে। দল তাঁদের কথা শোনেনি। প্রচারের মাঠেও নারী প্রার্থীদের রেহাই ছিল না। অনলাইনে চরিত্রহনন, হুমকি, রাস্তায় বাধা, পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা। ব্যক্তিগত জীবন, চেহারা নিয়েও ট্রলের শিকার হন কেউ কেউ।

এই পরিস্থিতির পেছনের কাঠামোটা ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বা বিআইজিডির একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় স্পষ্টভাবে এসেছে। গবেষণাটি বলছে, আসল প্রশ্ন কেবল নারীর সংখ্যা নয়, প্রশ্নটা প্রকৃত কর্তৃত্বের। এখানে তিন ধরনের প্রতিনিধিত্বের কথা বলা হয়েছে: নিছক উপস্থিতি, নীতিতে প্রভাব আর নেতৃত্ব নিয়ে সমাজের ধারণা বদলে দেওয়া। জুলাইয়ের নারীরা উপস্থিতি দেখিয়েছেন, কিন্তু তাঁদেরকে প্রভাবের জায়গায় পৌঁছাতে দেওয়া হয়নি। শুধু উপস্থিত থাকা এক জিনিস, নীতিতে প্রভাব রাখা আরেক।

নারীরা ঘরে-কর্মক্ষেত্রে-জনপরিসরে বিপুল দায়িত্ব বহন করেন, অথচ মনোনয়ন, বাজেট বা সিদ্ধান্তের ওপর তাঁদের হাত থাকে সামান্য। গবেষকেরা একে বলছেন দায়িত্ব আছে, ক্ষমতা নেই। সংরক্ষিত আসনও নারীর অংশগ্রহণ বাড়িয়েছে কেবল, প্রকৃত কর্তৃত্ব দেয়নি। এই আসনগুলো অনেক সময় দলীয় আনুগত্যের পুরস্কার হয়ে দাঁড়ায়, নেতৃত্বের পথ হয়ে ওঠে না।

মনোনয়নই সবচেয়ে বড় বাধা, যেখানে যোগ্যতার চেয়ে পৃষ্ঠপোষকতা আর টাকার জোর বড় হয়ে ওঠে। আর নারী প্রার্থীদের ওপর যে হামলা, তা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা একধরনের কৌশল, নারীকে সিদ্ধান্তের জায়গা থেকে সরিয়ে রাখার কৌশল। গবেষণাটি আরও দেখিয়েছে, সংখ্যালঘু, আদিবাসী, দলিত কিংবা হিজড়া জনগোষ্ঠীর নারীদের বাধা আরও বহুস্তরের।

তাহলে আন্দোলনের সামনের সারির নারীরা ক্ষমতার ভাগে কেন পেছনে? আমার পর্যবেক্ষণ একটাই। আন্দোলন যখন স্বতঃস্ফূর্ত, নারী তখন নিজের জায়গা নিজেই করে নেন। সেখানে তাঁর কর্তাসত্তা, তাঁর এজেন্সি খোলা মাঠ পায়। কিন্তু সেই এজেন্সিকে যে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মুখোমুখি হতে হয়, অর্থাৎ দল, সরকার আর সংসদের মুখোমুখি, তখনই দরজা বন্ধ হয়ে যায়। বাধাটা আসে চেনা যুক্তিতে।

কখনো ধর্মের দোহাই, কখনো ভোটের হিসাব, কখনো ‘এখন সময় নয়’ ধরনের বাস্তবতার অজুহাত। এই সরে যাওয়া সাংস্কৃতিক নয়, স্বাভাবিকও নয়। এটা তৈরি করা এক পরিস্থিতি। নারীর সাহসকে কাজে লাগানো হয়েছে, তারপর তাঁর সামনে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই বন্দোবস্ত নারীকে রাস্তায় চেয়েছিল, টেবিলে চায়নি।

তবে একটা কথা পরিষ্কার করা দরকার। নারীরা ক্ষমতার ভাগ থেকে বাদ পড়েছেন, এ কথা সত্য। কিন্তু তাঁরা রাজনীতির বাইরে চলে যাননি। রাজনীতি মানে কেবল দল, সংসদ বা মিছিল নয়। রাজনীতি থাকে ঘরে, শ্রেণিকক্ষে, কর্মক্ষেত্রে, পর্দার ওপারে, প্রতিদিনের সিদ্ধান্তে। যে নারী পরিবারে নিজের মত জানান, কর্মক্ষেত্রে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন, অনলাইনে গালির জবাব দেন, তিনিও রাজনীতি করছেন। যে ছাত্রী শ্রেণিকক্ষে প্রশ্ন তোলেন, যে নারী শ্রমিক ন্যায্য মজুরি দাবি করেন, যে মা তাঁর মেয়েকে ভিন্নভাবে বড় করেন, তাঁরা প্রত্যেকে প্রচলিত ক্ষমতাসম্পর্ককে নাড়া দিচ্ছেন। আনুষ্ঠানিক দরজা বন্ধ হলেই রাজনীতি থেমে যায় না।

মানুষ প্রতিটি লড়াই থেকে শেখে। প্রতিটি প্রতিরোধ তার কর্তাসত্তাকে আরও ধারালো করে। আর প্রতিটি প্রতিবাদ নেতৃত্ব নিয়ে মানুষের ধারণাকেও একটু একটু করে বদলে দেয়। জুলাইয়ের নারীরা যা শিখেছেন, তা তাঁদের সঙ্গেই থেকে গেছে। এমনকি এই পিছিয়ে পড়াও একধরনের শিক্ষা।

নারীরা এবার নিজের চোখে দেখলেন, রাস্তার সাহস আর ক্ষমতার ভাগ এক জিনিস নয়। সামনের সারিতে থাকা যথেষ্ট নয়, সিদ্ধান্তের টেবিলেও জায়গা করে নিতে হয়। এই উপলব্ধিই পরের লড়াইয়ের পুঁজি। কোনো আন্দোলনই পুরোপুরি ব্যর্থ হয় না। এই আন্দোলন হয়তো এখনই ব্যবস্থার খোলনলচে বদলাতে পারেনি। কিন্তু এই লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা পরেরবারের প্রস্তুতিকে শক্ত করবে।

এনসিপির যে নারীরা জোটের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন, যে প্রার্থীরা গালি হজম করেও প্রচার চালিয়ে গেছেন, যে অধিকারকর্মীরা কমিশনের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাঁরা কেউ হার মানার ভঙ্গিতে দাঁড়াননি। এঁরাই সেই ধারালো কর্তাসত্তার প্রমাণ। যে নারী মধ্যরাতে তালা ভেঙে বেরিয়েছিলেন, তিনি আর আগের মানুষ নন। তাঁর জাগ্রত কর্তাসত্তা নানা রূপে, নানা জায়গায় নিজেকে জানান দেবে। কেবল পরের মিছিলের অপেক্ষায় নয়, প্রতিদিনের জীবনের প্রতিটি স্তরে।

নারীদের বন্দোবস্তের বাইরে রাখা গেছে। রাজনীতির বাইরে রাখা যায়নি, যাবেও না।

  • ড. কাজী মারুফুল ইসলাম অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

    মতামত লেখকের নিজস্ব