জুলাই মানে সাহস, জুলাই মানে স্বপ্নের একটা আকাশ খুলে যাওয়া। জুলাই এক ভয়াবহ দম বন্ধ করা নিপীড়কের কবল থেকে মুক্তি। সাহস ছাড়া আমাদের ওই দিনগুলোতে কিছুই ছিল না। এই সাহস দিয়েছিলেন আমাদের শিক্ষার্থীরা! এই সাহস দিয়েছিলেন সাধারণ মানুষ, যাঁরা কাতারে কাতারে অকাতরে প্রাণ দিয়েছিলেন। শহীদদের লাশের ভার আমাদের এমন সাহস এনে দিয়েছিল, যার ওপর ভর করে আমরা পথে নেমেছিলাম এক প্রবল স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে, ন্যায়বিচারের দাবিতে!
জুলাই অভ্যুত্থান আমাদের ইতিহাসের এক অন্যতম বাঁক, যা রাজনৈতিকভাবেও বিশ্লেষণের প্রয়োজন আছে। আগের গণ-অভ্যুত্থানগুলো, যেমন নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন থেকে অনেক অর্থেই চব্বিশের অভ্যুত্থান আলাদা। প্রথমত, জুলাইয়ে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা অনেক বেশি এবং নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে শিশু, অপ্রাপ্তবয়স্ক ও তরুণদের সংখ্যাও তুলনামূলকভাবে বেশি।
দ্বিতীয়ত, আরেকটি বড় পার্থক্য হচ্ছে, নব্বইয়ের আন্দোলনের নেতৃত্বে শিক্ষার্থীরা থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলোর জোট এবং তাদের প্রকাশ্য সংহতি ও ঐক্য ছিল। কিন্তু চব্বিশে দেখা যায়, রাষ্ট্র এতই নিপীড়ক হয়ে উঠেছিল যে রাজনৈতিক দলগুলো প্রকাশ্যে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানাতে পারেনি, তাদের কৌশলের আশ্রয় নিতে হয়েছে।
তৃতীয়ত, চব্বিশের আন্দোলন শুরু হয়েছিল একটা আপাতদৃষ্টিতে অরাজনৈতিক (নির্দলীয় অর্থে) দাবি থেকে, যা নব্বইয়ের থেকে আলাদা। আন্দোলন গবেষণার ভাষায় বলা যায়, শুরুতে এই আন্দোলনকে সরকারি চাকরিপ্রত্যাশী ‘স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী’ বা ইন্টারেস্ট গ্রুপের আন্দোলন হিসেবে ‘ফ্রেমিং’ করা হয়েছিল। জুনের ৫ তারিখ থেকে ১ জুলাই পর্যন্ত আন্দোলনটা কেবল নির্দিষ্ট ধরনের মানুষের আন্দোলন ছিল। জুলাইয়ের ১ তারিখে বৈষম্যবিরোধী নামকরণের মাধ্যমে আন্দোলনের সংগঠকেরা আন্দোলনটিকে জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেন। যদিও তার অভিঘাত অত স্পষ্ট করে তখনই ধরা দেয়নি।
তবে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের প্রতিক্রিয়ায় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে নব্বইয়ের সঙ্গে চব্বিশের মিল রয়েছে। নব্বইয়ের অভ্যুত্থানে ছাত্রদল কর্মী জাহেদ বা ডা. মিলন হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় যেমন আন্দোলন বিস্ফোরণোন্মুখ হয়েছিল, তেমনি আবু সাঈদ-ওয়াসিম-মুগ্ধদের হত্যাকাণ্ড চব্বিশের আন্দোলনকে বিস্ফোরণোন্মুখ করে অভ্যুত্থানের দিকে নিয়ে গিয়েছে।
তবে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে ফুলবাড়ী আন্দোলনের কিছু কিছু জায়গায়ও বেশ সাযুজ্য আছে। বিশেষত, যেভাবে প্রথমে আন্দোলনকে কেবল ‘স্বার্থসংশ্লিষ্ট’ আন্দোলন বলে চিহ্নিত করে আন্দোলনকারীদের ‘স্বার্থপর’ হিসেবে তকমা ও চিত্রায়িত করার চেষ্টা হয়েছিল, তার সঙ্গে। অন্যদিকে ফুলবাড়ীতে যেভাবে স্থানিক পর্যায়ে আন্দোলন নিজের মতো সংগঠিত ও বিকশিত হয়েছিল, সেদিক থেকেও জুলাই আন্দোলনের সাযুজ্য দেখা যায়।
ফুলবাড়ীতে স্থানীয় মানুষ যখন আন্দোলন সংগঠিত করছিলেন, তখন সরকারপক্ষ থেকে তাদের এবং তাদের আন্দোলনকে খারিজ করার করার জন্য ‘স্বার্থপর’ হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, আন্দোলনকারীরা নিজের জমি রক্ষার সংকীর্ণ স্বার্থে দেশের উন্নয়নের বিরোধিতা করছেন। আন্দোলনকারীদের একটা ইন্টারেস্ট গ্রুপ হিসেবে অবৈধকরণের চেষ্টা চলেছিল।
চব্বিশেও আমরা দেখেছি যে সরকারি পক্ষের লোকেরা আন্দোলনকে চাকরিপ্রত্যাশীদের সংকীর্ণ স্বার্থে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করা হচ্ছে বলে চিত্রায়িত করেছিল। বলা হয়েছিল যে ঘুষ খাওয়া ও দুর্নীতি করার সুযোগের জন্য যারা সরকারি চাকরি পেতে চায়, তারা এ আন্দোলন করছে। ২০১৮ সালে যখন প্রথম কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তখন থেকেই এভাবে ‘ফ্রেমিং’ করার প্রবণতা দেখা যায়।
তা ছাড়া আন্দোলন যেভাবে সংগঠিত হয়েছে, সেখানেও এই সাদৃশ্য দেখা যায়। ফুলবাড়ী আন্দোলনের বিরুদ্ধে হওয়া প্রথম দিকের ‘খারেজি’ প্রক্রিয়া প্রতিহত করতে সেখানকার আন্দোলনকারীরা এই ‘স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী’ পরিচয়ের বাইরে একটা বড় জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পেরেছিলেন।
একইভাবে চব্বিশের অভ্যুত্থানের সংগঠকেরা এ কাজটি করেছিলেন আরও অনেক দ্রুততায় এবং সাফল্যের সঙ্গে। তারা চাকরিপ্রত্যাশী ‘স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী’র আন্দোলনকে জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছিলেন ‘বৈষম্যবিরোধী’ নামকরণের মধ্য দিয়েই, সামগ্রিকভাবে বৈষম্যবিরোধিতার স্বার্থকে তাদের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করে।
২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনের সময়কার নেতিবাচক ফ্রেমিং অভিজ্ঞতা এবং জাতীয় স্বার্থ যুক্ত করার ইতিবাচক প্রভাব আমাদের আন্দোলন সংগঠকদের অজানা ছিল না। ফলে বৈষম্যবিরোধিতা নামকরণ তাঁরা সচেতনভাবেই করেছেন। ইতিহাস যে বর্তমানের সঙ্গে একটি চলমান কথোপকথন—এ ঘটনা তার অন্যতম উদাহরণও। রাজনীতি আসলে ইতিহাসের দেখানো পথ ধরে একটু একটু করে এগোয়। অতীত আন্দোলনের অভিজ্ঞতা যে বিচিত্রভাবে ভবিষ্যতের পথ দেখায়, সেটা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে আগের বিভিন্ন আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় পাঠ করলেও টের পাওয়া যায়।
কর্তৃত্ববাদী সরকারের একটা অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এরা নিজেদের অনেক শক্তিশালী ভাবে, কেননা তারা দমন-পীড়নের প্রবল সক্ষমতা অর্জন করে। তাদের স্বশক্তি সম্পর্কের উচ্চমন্যতাই তাদের আসল দুর্বলতা। তারা জনগণ থেকে এত দূরে চলে যায় যে জনগণকে খুন করে ফেলার বৈধতা প্রতিনিয়ত উৎপাদন করাকেই এরা শক্তি বলে মনে করে। এটা তাদের আরও বেশি দুর্বল করে। ফুলবাড়ীতে তিন তরুণ হত্যার অভিঘাতই সরকার তখন সামলাতে পারেনি। অতীতের বিভিন্ন আন্দোলনের তুলনায় চব্বিশের নিহতের সংখ্যা এত বেশি ও ব্যাপক যে এর অভিঘাত আরও অনেক বড় হবে সেটাই স্বাভাবিক।
মানুষ যখন বুঝে ফেলে যে প্রতিবাদ না করলে আরও ক্ষতির আশঙ্কা আছে, তখন আর ভয় থাকে না, তখন আন্দোলনে আরও বেশি করে যুক্ত হয়। এটাকে ‘ব্যাকল্যাশ’ প্রতিবাদ বলে। চব্বিশেও সরকারের আন্দোলন দমনের নিপীড়নমূলক কৌশলগুলো কাজে লাগেনি। সব দমনমূলক কৌশল প্রয়োগ করেও রাস্তায় নেমে আসা মানুষদের ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে।
স্বৈরশাসনের গুলির মুখে মানুষ যখন ঋজু হয়ে দাঁড়ায়, তখন আর তাদের ঘরে ফেরত পাঠানো যায় না। তৎকালীন রাষ্ট্রীয় কর্তাব্যক্তিদের মুখে শোনা যায়, ‘একটাকে মারি তো একটাই মরে আর বাকিডি যায় না।’ রাষ্ট্রের পীড়নযন্ত্র যখন সব বৈধতা হারায়, তখন নাগরিকেরা আর ভয় পায় না। রাষ্ট্রের পীড়নযন্ত্রের কুশীলবরাও আর টিকতে পারে না। পালাতে হয়।
আজকে দুই বছর পরে এসেও খুব স্পষ্টভাবে বলতে চাই, জুলাইয়ে আমি রাস্তায় ছিলাম, আন্দোলনে ছিলাম, শিক্ষার্থীদের পাশে ছিলাম, অভ্যুত্থানের মুহূর্তে পুলিশের চোখে চোখ রেখে বেসুরো গলায় গেয়েছিলাম ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে’। সেই সময় যা করেছিলাম, জুলাই আবার এলে, হাজারবার তা-ই করব। কারণ, আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে, নিপীড়নের বিরুদ্ধে, হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলাম।
নিজের বা আর কারও স্বার্থে জুলাই করিনি, দেশের জন্য করেছিলাম। জুলাইয়ের অংশ ছিলাম বলে আমার কোনো আক্ষেপ নেই, কোনো দিন হবেও না। সন্তানদের হত্যাকাণ্ড থামানোর জন্য, জনতার বিরুদ্ধে অন্যায় নিপীড়ন বন্ধ করার জন্য জুলাই হয়েছিল। আমরা তার অংশ হয়েছিলাম, প্রতারণার অংশ হইনি, প্রতারিতও হইনি। প্রতারিত হয়তো তাঁরা হয়েছেন, যাঁরা কিছু পাওয়ার আশায় জুলাইয়ের অংশভাগী হয়েছিলেন।
জুলাইয়ের পরে আন্দোলনের কেউ কেউ জুলাই ব্যবসা করেছে, অস্থিতিশীল করেছে দেশকে, অভ্যুত্থানের সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ দখল করেছে বলে, সেটা জুলাইয়ের দায় নয়। জুলাইয়ের সব দায় আওয়ামী লীগ ও হাসিনার স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার, যে ব্যবস্থা প্রায় এক হাজার নাগরিককে হত্যা করেছে। এর পরের অংশের দায় তাদের, যারা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অপরাধে লিপ্ত হয়েছে এবং যাদের প্রশ্রয়ে হয়েছে, তাদের। এই দায় জুলাইয়ের নয়।
জুলাই শহীদ এবং আহত ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার এবং ট্রমার নিরাময় যেদিন হবে, সেদিন জুলাইয়ের কর্তব্য শেষ হবে। যে পরিবর্তনের স্বপ্ন শহীদ শিক্ষার্থী-জনতা আমাদের দেখিয়েছিলেন, যে স্বপ্ন জুলাইয়ের গ্রাফিতিতে আঁকা হয়েছে, সেই সংস্কার যেদিন করা যাবে, কেবল সেদিনই জুলাই শেষ হয়েছে বলা যাবে, নতুবা জুলাই চলমান।
সব নিপীড়ন এবং বিস্মৃতির বিরুদ্ধে চলমান থাকবে জুলাই। যূথতার স্মৃতিতে সব অন্যায় গাঁথা থাকে, ভোলা হয় না। জুলাইয়ের আগের অন্যায়গুলো যেমন লেখা আছে, পরেরগুলোও থাকবে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আগপর্যন্ত জুলাই চলমান।
সামিনা লুৎফা অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব