মতামত

শিশুর ওপর এত নিষ্ঠুরতার প্রতিকার কীভাবে

রাজধানীর পল্লবীতে শিশু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়ে সবাই যা বলছেন, এ রকম ঘটনায় তা অসংখ্যবার বলা হয়েছে—অপরাধীর কঠোর শাস্তি চাই। কথা হলো, মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ, মিছিল থেকে এমন বক্তব্য ও প্রত্যাশা কি আমরা আগেও জানাইনি? জানিয়েছি। কিছু অপরাধীর শাস্তি হয়নি, তা-ও নয়; দু–চারজনের চরম দণ্ডও হয়েছে। কিন্তু জনগণের তাৎক্ষণিক ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া, ক্রুদ্ধ আকাঙ্ক্ষা বারবার—বিচার ও শাস্তি সত্ত্বেও—বিফলে গেছে। এ ঘটনার পর চট্টগ্রামসহ দেশের নানা এলাকায় আরও কয়েকটি শিশুর ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে।

আগামী দিনের গণমাধ্যমেও কন্যাশিশুর ওপর একই নিষ্ঠুরতার পুনরাবৃত্তির খবর যে চোখে পড়বে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ছেলেশিশুও যে বলাৎকারের শিকার হচ্ছে, তাতে মারাও যাচ্ছে কিংবা কেউবা আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে, তা ভুললেও চলবে না।

আসলে এ দেশে শিশুরা ভালো নেই, তাদের নিরাপত্তাও নেই, আনন্দ-বিনোদনের ব্যবস্থাও নেই। শিশু কেন, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীরা কি সুস্থ–স্বাভাবিক জীবন কাটাতে পারছে, যাতে তারা দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে উঠতে পারে? সমাজে যে প্রবল অস্থিরতা ও মারাত্মক নিষ্ঠুরতার প্রবাহ চলছে, তা সমাজ ও রাষ্ট্রের অবহেলায় দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠা এক গভীর সামাজিক ব্যাধি।

কীভাবে একটা সমাজ তার জনগণের—শিশু থেকে প্রবীণ পর্যন্ত সবার—স্থূল প্রবৃত্তির চর্চার বাইরে সুকুমার বৃত্তির বিকাশের সুলভ কোনো ব্যবস্থা না করে চলমান ব্যাধি প্রকট আকার ধারণ করতে দিচ্ছে? এদিকে কেউ কি মনোযোগ দিয়েছি আমরা—রাষ্ট্র ও সমাজ?

রাষ্ট্র সংস্কার অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কিন্তু সমাজকে অযত্নে–অনাদরে–বেঘোরে নষ্ট হতে দিয়ে কীভাবে গণতান্ত্রিক মানবিক রাষ্ট্র গড়ে উঠবে, সেটা আমার বোধগম্য নয়। মানুষ তো মূলত সমাজেই বাস করে, সমাজকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্র তো বায়বীয় কাঠামো মাত্র। আমাদের রাজনীতি এবং রাষ্ট্রসাধনা তাই অনেক তুলকালাম কাণ্ড করেও মূল কাজে সফল হতে পারে না।

সবাই জানি, মানুষের একটি জৈবিক সত্তা আছে, তার যৌন প্রবৃত্তি জৈব সত্তার স্বাভাবিক প্রবণতা। ফলে কেবল বাইরের বিধিনিষেধ, কঠোর শাস্তির ভয় দেখিয়ে তার আগ্রাসন সফলভাবে ঠেকানো যায় না। এর জন্য প্রয়োজন ভেতর থেকেই মানুষের আরও নানা সৃষ্টিশীল সক্ষমতার উজ্জীবন ঘটানো। সেখানেই আমাদের খামতি ঘটে যাচ্ছে। তাই নজর দিতে হবে মানুষের সৃষ্টিশীলতা তথা সুকুমার বৃত্তির বিকাশের দিকে।

এত ধর্ষণকাণ্ডের মতোই প্রমাণিত সত্য যে কেবল শিক্ষায় সব শিক্ষার্থীর জন্য সুকুমার বৃত্তির চর্চার জায়গা রাখা হয়নি তা নয়, ইতিমধ্যে সমাজের সব স্তরের মানুষের জীবন থেকেই কখন যে সুকুমার বৃত্তির চর্চা উধাও হয়ে গেছে, তা আমরা খেয়াল করিনি। কেউ যেন পরিকল্পিতভাবে গ্রামগঞ্জ থেকে সুকুমার কলা চর্চার সব ধারাকে নির্মূল করে দিয়েছে। তার থাবা এসে পড়েছে শহরেও—কখন যে গরিবের বিনোদনের মূল মাধ্যম প্রেক্ষাগৃহ সারা দেশ থেকে উঠে গেল, মধ্যবিত্ত জীবন থেকে অফিস বা পাড়ার ক্লাবকেন্দ্রিক সুকুমার কলা চর্চার রেওয়াজ ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হলো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংস্কৃতি সপ্তাহ, বার্ষিক নাটক, বার্ষিকী প্রকাশ, এসবে একটা গোটা জাতি ইস্তফা দিয়ে দিল—এ নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্যই হলো না।

কে না জানে যে মানুষের মানবিক হয়ে ওঠার জন্য তার সুকুমারবৃত্তি চর্চার এবং সুকুমার কলা উপভোগের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। নাগরিকের সব পেশাগত দক্ষতা, বৃত্তিমূলক কাজের উৎকর্ষ অর্জন নিশ্চয়ই করতে হবে, মৌলিক শিক্ষাতেও তাকে যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে। কিন্তু তার চাপে একজন সংবেদনশীল দায়িত্ববান মানুষ হয়ে ওঠায় কোনো ব্যত্যয় ঘটানো যাবে না।

যুগপৎ দুই ক্ষেত্রেই মানুষকে দক্ষ হয়ে উঠতে হয়, সফল হতে হয়। নয়তো ভারসাম্যহীন জাতি তৈরি হবে, যা নিশ্চিতভাবেই আমাদের দেশে ঘটছে। যথার্থ মানবিক মানুষ হওয়ার রসদের জোগান দেবে সমাজই, আর সমাজকে সহযোগিতা দেবে রাষ্ট্র।

আমরা জানি, একশ্রেণির ধর্মান্ধ রাজনীতিক ও ধর্ম ব্যবসায়ী সমাজকে একচেটিয়া অধিকারে আনার জন্য অথবা ধর্ম সম্পর্কে তাঁদের ভ্রান্ত ধারণার কারণে শিল্প-সংস্কৃতি অর্থাৎ সুকুমার কলা চর্চার বিরুদ্ধে প্রচারণা, সাংগঠনিক তৎপরতা ও রাজনৈতিক কর্মসূচি দিয়ে সর্বাত্মক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন বহুদিন ধরে। তার ওপর রাজনীতিতে চলেছে সর্বাত্মক ক্ষমতা কবজা করার মত্ততা। এ দুইয়ে মিলে সমাজের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে, মানবিক মূল্যবোধের ঘটেছে চরম অবক্ষয়। প্রায়ই রাষ্ট্র একে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে, মূলধারার রাজনীতি এর সঙ্গে আপস করেছে এবং সমাজের মানুষ বিভ্রান্ত হয়েছেন, দিশা হারিয়েছেন।

এভাবে আমরা আমাদের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে যেমন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি, তেমনি এর অভাবে আমাদের শিক্ষা, মূল্যবোধ, এমনকি ধর্মচর্চাও আত্মিক, নৈতিকতা গভীরতা হারিয়ে ফেলেছে। মানুষের অন্তরে ও চরিত্রে এসবের প্রভাব পড়ছে। কারণ, সুকুমারবৃত্তির চর্চা ও বিকাশ ব্যতীত সত্যিকারের মানবিক মানুষ হয়ে ওঠা সম্ভব নয়। এটাই এ সমাজের এবং চলমান ব্যবস্থার ঘাটতি ও দুর্বলতা।

আজ সমাজে মনুষ্যত্বের আকাল চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। আমাদের শিশুদের রক্ষা করতে হলে সমাজ থেকে ধর্ষক তৈরির প্রবণতা নির্মূল করতে হবে। তাকে তার জৈব প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণ শেখাতে হবে। তার জন্য তারই ভেতরে সুপ্ত থাকা সুন্দর কোমল মানবিক বোধগুলো এবং সৃষ্টিশীল দক্ষতাগুলো জাগাতে হবে একেবারে শৈশব থেকে।

আমরা দেখছি, মানুষ আজ সহজেই মিথ্যা বলছে, কপটতার আশ্রয় নিচ্ছে, প্রবঞ্চনায় লিপ্ত হচ্ছে, চরম অপরাধে জড়াচ্ছে এবং সামগ্রিকভাবে নিষ্ঠুর, প্রতিহিংসাপরায়ণ, ভোগবিলাসী, ইন্দ্রিয়পরায়ণ ও স্বার্থপর হয়ে পড়ছে। সমাজে কান পাতলে ক্রোধ, ভোগ ও লালসার জান্তব ধ্বনি শুনতে পাওয়া যায়। এমন মানুষদের দাপটে সমাজে এক ভয়ের সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়েছে।

শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতির সংযোগ ঘটানোর কথা আমরা বহুকাল ধরে বলে আসছি। আশার কথা, বর্তমান সরকার গুরুত্বটা অনুধাবন করেছেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে কাজটা কঠিন। একে বহু বছরে বেশ কয়েকটি প্রজন্ম সংস্কৃতি-চিন্তা ও বোধ ছাড়াই বড় হয়েছে; গান শোনে না, নাটক দেখে না, বই পড়ে না এমন মানুষ স্কুল শিক্ষকতা এত বেশি রয়েছেন যে তাঁদের পক্ষে কিশোর তরুণদের হারাতে বসা সুকুমার বৃত্তির বিকাশ ঘটানো সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। তারপরও অভিভাবকদেরও একই অবস্থা—সুকুমারবৃত্তির চর্চায় সন্তানদের উৎসাহিত করার সক্ষমতা তাঁদেরও তো নেই। এ অবস্থায় দেশে আজ একটি সাংস্কৃতিক জাগরণ সময়ের দাবি। মানুষের মানবিক অভিযাত্রা যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।

মনে রাখতে হবে, কেবল শিশু ও শিক্ষার্থী নয়, সব বয়সের নাগরিকের মনের সুকুমার বৃত্তি বাঁচিয়ে রাখা, প্রয়োজনে পুনর্গঠন এবং অব্যাহত লালন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়। তাই শিক্ষার্থীদের কথা যেমন সমাজ ও রাষ্ট্র ভাববে, তেমনি সর্বস্তরের সব বয়সের মানুষের মানবিকভাবে বেঁচে থাকার রসদ জোগানোর কথাও তাদের ভাবতে হবে।

আমরা যেন ভুলে না যাই মানুষ বেঁচে থাকে—নট বাই ব্রেড অ্যালোন—কেবল খাবারের ওপর নির্ভর করে নয়, তার মনের পুষ্টি ও তৃপ্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তার পক্ষে ইহকাল ও ইহজীবনকে উপেক্ষা করে কেবল পরকাল চর্চা করলেও চলবে না, সুন্দর–সার্থকভাবে তথা প্রকৃত মানুষের মত ইহজীবন কাটানোর মধ্যেই তার মানবধর্ম রক্ষিত হবে।

আজ সমাজে মনুষ্যত্বের আকাল চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। আমাদের শিশুদের রক্ষা করতে হলে সমাজ থেকে ধর্ষক তৈরির প্রবণতা নির্মূল করতে হবে। তাকে তার জৈব প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণ শেখাতে হবে। তার জন্য তারই ভেতরে সুপ্ত থাকা সুন্দর কোমল মানবিক বোধগুলো এবং সৃষ্টিশীল দক্ষতাগুলো জাগাতে হবে একেবারে শৈশব থেকে।

বাইরের ব্যবস্থা, অর্থাৎ আইন-আদালত, বিচার-শাস্তি, সিসি ক্যামেরা ইত্যাদি নিশ্চয় থাকবে; কারণ, ব্যতিক্রমী মানুষ, মন্দ মানুষ, ব্যবস্থার বাইরে পড়ে থাকা মানুষ, স্বভাবগত নিষ্ঠুর বা পারিবারিক বা জিনগত সমস্যাক্রান্ত কিছু মানুষ থাকবেই, কিন্তু আম-মানুষ নিজের ভেতর থেকেই ব্যবস্থার গুণে সুস্থ পরিবেশের প্রভাবে আপনিই মানবিক মানুষ হয়ে বড় হবে। সেটাই হলো ধর্ষণ-বলাৎকারের মতো ভয়ংকর ব্যাধি নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক পথ।

আমাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং দ্রুত কাজ শুরু করতে হবে। অনেক দেরি হয়ে গেছে, সমাজ ও মানুষ ভয়ংকর সব খেসারত দিচ্ছে—এ আধোগতি রুখে দেওয়ার এটাই সময়।

  • আবুল মোমেন প্রাবন্ধিক, কবি ও সাংবাদিক

মতামত লেখকের নিজস্ব