বাংলাদেশের নারী অধিকার, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা বহুদিনের। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নারী উন্নয়নে নানা প্রকল্প হাতে নেওয়ার ধারাবাহিকতায় নারীর অবদান ক্রমেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে দৃশ্যমান হয়েছে। যে অগ্রগতির সাফল্য আমরা প্রায়ই গর্বভরে বলে থাকি। যেখানে নারী অধিকার নিয়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরের গবেষক ও অধিকারকর্মীদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও সোচ্চার কণ্ঠের অবদানও এখানে অনেক।
নব্বইয়ের দশক ও তার পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ যখন একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়, তখন আমরা দেখতে পাই নারী ও শিশুর উন্নয়নকে কেন্দ্র করে সরকারি পর্যায়ে নানা উদ্যোগ। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সরকার নারীর উন্নয়নে বেশ কিছু নীতি উদ্যোগ গ্রহণ করে। এর ফলে দেশের প্রান্তিক নারীদের একটি বড় অংশ ধীরে ধীরে শিক্ষার আলো পেতে শুরু করে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাঁদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেতে থাকে।
এ প্রেক্ষাপটে দুটো বিষয় লক্ষণীয়। প্রথমত, নারীর শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মেয়েশিশু এবং নারীদের উৎসাহিত করার জন্য বৃত্তি প্রদান করা। দ্বিতীয়ত, রেডিমেড গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে নারীর কর্মক্ষেত্র বিস্তার করা, যা রাজধানীর সীমানা পেরিয়ে অন্য বড় শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে এই খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়। নানা সীমাবদ্ধতার ভেতরেও নারীকেন্দ্রিক এমন প্রচেষ্টা নারীর ক্ষমতায়নে সামগ্রিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
কিন্তু বাস্তবতার কঠিন দিকও আছে, যা নারীর অগ্রযাত্রার সেই সাফল্যকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়। নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা, নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো অপরাধ উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি আমাদের দেশের প্রান্তিক ও শহুরে দারিদ্র্যপীড়িত নারী ও শিশুদের আরও পিছিয়ে দেয়।
সাম্প্রতিক সময়ের দেশজুড়ে ঘটে যাওয়া ধর্ষণের ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালে ধর্ষণের ঘটনা দেখা যায় ৫১৬টি, যার মধ্যে শিশু ছিল ২৭০টি। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে, বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ধর্ষণের ঘটনা আরও বেড়ে যাওয়ায়। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালের মোট ধর্ষণের ঘটনা ছিল ৭৮৬টি, এর মধ্য শিশু ধর্ষণের ঘটনা ৫৪৩টি। ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এখানে বিশেষ করে শিশুদের অবস্থা বেশি নাজুক। বিগত দশ বছরের তথ্য বিশ্লেষণেও দেখা যায় যে ৫ হাজার ৬০০ জন শিশু ধর্ষিত হয়েছে সারা দেশে। তাই নারী ও শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের সামগ্রিক চিত্র যে বেশ উদ্বেগজনক তা বলাই বাহুল্য।
২০২৪ সালের অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে ধর্ষণের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া আমাদের আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতার কথা যেমন মনে করিয়ে দেয়, তেমনি নারীকে জনপরিসরে নানা সময় হেনস্তা ও নিগ্রহের মধ্য দিয়ে আরও নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে ধর্মীয় উগ্র মতাদর্শ ব্যবহারের মাধ্যমে।
এমন পরিস্থিতিতে দেশ যখন নারী প্রশ্নে আরও এগিয়ে যাওয়ার কথা, ঠিক সেই সময়ে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, নিগ্রহ ও ধর্ষণের মতো ঘটনার ঊর্ধ্বগতি সমাজে নারীর অংশগ্রহণকে নিরুৎসাহিত করতে পারে। গ্রামীণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাল্যবিবাহ ও স্কুল থেকে ঝরে পড়ার প্রবণতা বৃদ্ধির পেছনেও নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতার বিষয়গুলো নেতিবাচক ভূমিকা রেখে আসছে। এর ফলে নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়, যার মধ্য দিয়ে নারী অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে আরও প্রান্তিক হয়ে উঠতে পারে।
নারীকে এমন প্রান্তিকতার দিকে ঠেলে দেবার এই প্রবণতা বিদ্যমান পিতৃতান্ত্রিক মতাদর্শকেও আরও শক্তিশালী করে। আধুনিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় যখন পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব বহনে নারী ও পুরুষ উভয়ের অবদান জরুরি, তখন নারীকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টা সমাজের জন্য ক্ষতিকর।
এদিকে নারী নেতৃত্ব নিয়েও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশে নারী নেতৃত্ব রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে শুরু করে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের কথা, যেখানে দীর্ঘ সময় নেতৃত্বে ছিলেন দুজন নারী। অথচ এখন এমন এক সময়ে আমরা দাঁড়িয়ে আছি যখন ন্যায়, সাম্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের কথা বলা হচ্ছে, আবার একই সঙ্গে নারীকে নেতৃত্বের জায়গা থেকেও দূরে সরে যেতে হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয় তখন, যখন নারী নিজেই পিতৃতান্ত্রিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে নারীর অধিকার সীমিত করার অবস্থানে দাঁড়ায়। নৈতিকতা ও ধর্মের পুরুষতান্ত্রিক ব্যাখ্যা অনেক সময় নারীকেই নারী নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারে পরিণত করে। পিতৃতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এখানেই—যখন নারীকে নিয়ন্ত্রণ করতে আর সরাসরি পুরুষের প্রয়োজন হয় না।
আমরা যদি লীলা আহমেদের মতো ইসলামি নারীবাদীদের কাজের দিকে নজর দিই তাহলে দেখতে পাই যে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার ভেতরে ইসলামের যে ব্যাখ্যাগুলো গড়ে তোলা হয়েছে, সেগুলো নারীকে আরও অধস্তনতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আমিনা ওয়াদুদ এবং আসমা বারলাসদের মতো মুসলিম নারীবাদীরাও বলে আসছেন যে ধর্মীয় রীতিনীতিকে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার বাইরে থেকে নতুন করে পাঠ করার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
ইসলামি নারীবাদীদের যুক্তির একটি মৌলিক মিলের জায়গা হলো তাঁরা মনে করেন, ধর্ম পিতৃতন্ত্রকে বৈধতা দেয় না বরং পিতৃতন্ত্র ধর্মের নিজ স্বার্থে ব্যবহারের মধ্য দিয়ে নারীকে একটি অধস্তন পরিসরে নিয়ে আসে, যা সমস্যাজনক।
এই জায়গা থেকে আমরা পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারি যে নারীর প্রতি সহিংসতা, নিগ্রহ এবং ধর্ষণের মতো সহিংস আচরণ যেমন পিতৃতান্ত্রিক একটি ব্যবস্থার জন্য হয়ে থাকে, ঠিক তেমনি আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং দুষ্কৃতকারীদের শাস্তি না হওয়ার যে সংস্কৃতি আমাদের দেশে যুগ যুগ ধরে আমরা দেখে আসছি সেই ব্যবস্থাও দায়ী। এর সঙ্গে নারী কিংবা মেয়েশিশুকে ভিকটিম ব্লেমিংয়ের মধ্য দিয়ে আবার তাকেই দোষী হিসেবে উপস্থাপন করার যে ঘৃণ্য চেষ্টা দেখা যায়, যার সঙ্গে সত্যিকার অর্থে ধর্মের কোনো যোগাযোগ নেই। এখানে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে পুরুষের যে ঐতিহাসিক ক্ষমতা সামাজিক পরিসরে বিদ্যমান, নারীর প্রতি সহিংসতা যেন সেই দৃষ্টিভঙ্গিরই বহিঃপ্রকাশ।
নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্ন নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ও সাম্যেরও পরীক্ষা। আইনের প্রয়োগ, দ্রুত বিচার এবং সামাজিক সচেতনতার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। নারীর সম–অধিকার এবং উন্নয়নের প্রশ্নে যেমন রাষ্ট্রীয়ভাবে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দেশের উন্নয়ন ভাবনায় থাকতে হবে, ঠিক তেমনি নারীর ঘরে ও বাইরের নিরাপত্তার নিশ্চয়তাও বর্তমান সরকারের একটি প্রধান অগ্রাধিকার হতে হবে। তা না করতে পারলে দেশের অর্ধেকেরও বেশি জনগোষ্ঠী যাঁরা নারী, মূলধারায় তাঁদের অংশগ্রহণ ধীরে ধীরে অদৃশ্যমান হয়ে পড়বে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
বুলবুল সিদ্দিকী, অধ্যাপক, রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
*মতামত লেখকের নিজস্ব