যত দূর মনে পড়ে, আমরা অর্থনীতি বা ব্যবসায় প্রশাসন পাঠকালে যখনই বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের কথা শুনেছি, তখন থেকেই জেনেছি রপ্তানি বাড়াতে স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন করতে হবে আর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মোক্ষম অস্ত্র হচ্ছে সুদের হার বৃদ্ধি। কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে দেখা যাচ্ছে, এই সুপারিশগুলো বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ানোর অস্ত্র ভোঁতা হয়ে গেছে।
সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের যে প্রেসক্রিপশন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে দেওয়া হয়েছিল, সেটি বাংলাদেশে কাজে আসছে না বলে বিভিন্ন মহলে বেশ কিছুদিন থেকেই আলোচনা হচ্ছে। দেশে মূল্যস্ফীতি আবারও বাড়তে শুরু করেছে।
গত নভেম্বরের পর ডিসেম্বরেও মূল্যস্ফীতি বেড়ে প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, সেগুলোর কার্যকর সুফল মেলেনি। উল্টো সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও ঋণের সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের যে নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল, সেটি সরবরাহব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ঋণের অভাবে বেসরকারি খাত আরও দুর্বল হয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথ রুদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি মানুষের সার্বিক ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।
কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম ঘাটতি সৃষ্টি করে সংকটকে কাজে লাগিয়ে কোনো যুক্তি ছাড়াই পণ্যের মূল্যকে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি করে। বাজারের এ ধরনের কারসাজিও বন্ধ করতে হবে।
আমাদের শ্রেণিকক্ষে সামষ্টিক অর্থনীতির শিক্ষকেরা বুঝিয়েছেন, সাধারণত বাজারে অর্থপ্রবাহ বেড়ে গেলে এবং সে কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়লে, অর্থপ্রবাহ কমাতে নীতি সুদহার বাড়াতে হয়। নীতি সুদহার বেড়ে গেলে দেশের ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে নিরুৎসাহিত হয়। আবার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের যে ঋণ দেয়, তার সুদহারেও এর প্রভাব পড়ে। এতে গ্রাহকেরাও ঋণ গ্রহণে নিরুৎসাহিত হন।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ২০২৩ সাল থেকে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান তথা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নীতি সুদহার আরও বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়। কিন্তু সংকোচনমুখী মুদ্রানীতির কল্যাণেও বাজারে মূল্যস্ফীতি তেমন নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি।
অনেকেরই ধারণা, বাংলাদেশে বর্তমান মূল্যস্ফীতিতে মুদ্রাপ্রবাহের পরিবর্তে বাজার ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতাই মূল ভূমিকা রাখছে। ফলে নীতি সুদহার বাড়ানোর খুব একটা প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে দেখা যাচ্ছে না। নীতি সুদহার বাড়ানোয় উল্টো বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমেছে এবং এতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিশীলতা কমছে। গত বছর ঋণ প্রবৃদ্ধি অত্যন্ত মন্থর ছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি ও বাজারের অস্থিরতার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়া হ্রাস পেয়েছে। রয়েছে বিনিয়োগে মন্দাও।
দেশে নতুন বিনিয়োগ হয়নি, বিশেষ করে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে, যা অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য উদ্বেগের কারণ। উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। পাশাপাশি বেড়েছে ব্যবসা পরিচালনার খরচ। রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত বেসরকারি খাতে নেতিবাচক প্রভাব রেখেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৬ দশমিক ২৩ শতাংশে (অক্টোবর ২০২৫), যা এ খাতে আস্থার সংকটের একটি সরাসরি অর্থনৈতিক সূচক। এ সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠছে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ না করার সিদ্ধান্তে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে নভেম্বরে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র নিষ্পত্তি কমেছে ১৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ, যা শিল্পায়নের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। একই সঙ্গে জুনে শেষ হওয়া অর্থবছরে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ (ইকুইটি ক্যাপিটাল) প্রবৃদ্ধি কমেছে ১৬ দশমিক ৯০ শতাংশ।
আমরা দেখেছি, গত বছরজুড়ে দেশে সবজির বাজার বেশ চড়া ছিল। বিশেষ করে শীত মৌসুম শুরুর পরও গত নভেম্বর ও ডিসেম্বরে সবজির দাম তেমন কমেনি। ডিসেম্বরের শেষ দিকে কৃষক পর্যায়ে সবজির দামে বড় পতন হলেও তার সুফল ক্রেতা পর্যায়ে পৌঁছেনি। আবার গত বছর চাল, ডাল, চিনি, আটা, মাছ-মাংস, এলপিজিসহ বেশির ভাগ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। এ কারণে বছরজুড়ে মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিত মাত্রায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
যদিও গত বছর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অনেকটা কমেছে। মূল্য কমেছে চাল, গম, সয়াবিন তেল, গুঁড়া দুধ, মসলাসহ বিভিন্ন পণ্যের। দামের পাশাপাশি গত বছর সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ব্যয়ও কমেছে। তবে বিশ্ববাজারে দাম ও পরিবহন ব্যয় কমার সুফল বাংলাদেশের মানুষ পায়নি। উল্টো আগের দুই বছরের মতো বিদায়ী বছরজুড়েও তাঁদের ভুগতে হয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে।
অন্যদিকে বিশ্ববাজারে কোনো পণ্যের দাম সামান্য বাড়লেও বাংলাদেশে তা খুব দ্রুতই বেশ বেড়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে কেবল সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। মূল্যস্ফীতির রাশ টেনে ধরতে হলে বাজার ব্যবস্থাপনায় পদক্ষেপ লাগবে। বহুমুখী সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে একা কেবল সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দিয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমানো সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের মতো দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেবল সুদহার না বাড়িয়ে সংশ্লিষ্ট অন্য সমস্যাগুলো সমাধানের দিকে আগেও বলেছি সমান নজর দিতে হবে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে। এর জন্য কেবল বাজার তদারক করলেই চলবে না। বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। নিত্যপণ্যের বাজারে চাহিদামাফিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সে জন্য উৎপাদন পর্যায়ে ঘাটতি থাকলে আমদানির ব্যবস্থা করা উচিত। আমদানি বহুমুখীকরণসহ আমদানি-সংক্রান্ত জটিলতাগুলোও দূর করতে হবে। সর্বোপরি বাজার ব্যবস্থাপনায় যেসব অনিয়ম ও দুর্নীতি আছে, তা দূর করতে হবে।
অনেক দিন থেকেই দেশে অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনা এবং বাজার পর্যবেক্ষণ অন্য অনেক সুশাসনের অভাব দেশের মতো দুর্বলভাবে পরিচালিত। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম ঘাটতি সৃষ্টি করে সংকটকে কাজে লাগিয়ে কোনো যুক্তি ছাড়াই পণ্যের মূল্যকে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি করে। বাজারের এ ধরনের কারসাজিও বন্ধ করতে হবে।
মামুন রশীদ অর্থনীতি বিশ্লেষক
*মতামত লেখকের নিজস্ব