
সাঁওতাল, ওঁরাও, মাহাতোসহ সমতলের জাতিসত্তাগুলোর প্রধান উৎসব সহরায়। সাধারণত কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয়। মূল আনুষ্ঠানিকতা তিন দিনের হলেও ধুমধামের রেশ থাকে চার থেকে পাঁচ দিন।
রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, বগুড়া, জয়পুরহাট, নওগাঁ, রংপুর, দিনাজপুর, খুলনা, সিলেট অঞ্চলে বিপুল উদ্দীপনা ও উৎসাহের সঙ্গে সহরায় উৎসব পালন করা হয়। এ উৎসবে গোয়ালপূজা করা হয়, তাই এর আরেক নাম গোয়ালপূজা। সাঁওতাল, ওঁরাও, মাহাতো, বড়াইক, কুর্মি, সিং, পাহান, মাহালি, বেদিয়াসহ আরও কয়েকটি জাতিসত্তা তাদের নিজ নিজ রীতিতে পালন করে।
সমাজ গবেষক ও লেখক ড. খ ম রেজাউল করিমসহ দুজন গবেষক তাঁদের ‘মাহাতো জনগোষ্ঠী: সমাজ ও সংস্কৃতি’ বইয়ে মাহাতোদের নিজস্ব রীতিতে সহরায় উৎসব পালনের বিষদ বর্ণনা দিয়েছেন। কুড়মালি ও বাংলা ভাষায় তুলে ধরেছেন মাহাতোদের জীবনঘনিষ্ঠ একটি গীত, ‘কাঁড়ওয়াহি পুছঅ হাও কেঁড়িয়াকে, কেঁড়িয়া পুছঅ হাও জেঠা মাইরে, কেঁহিয়া গঅ আমা দাসেআকে চানদাওয়ারে? কেঁধিয়া লাগতাও সহরায় রে...’। বাংলায় এর অর্থ হচ্ছে, পুরুষ মহিষ জিজ্ঞাসা করছে স্ত্রী মহিষকে, স্ত্রী মহিষ জিজ্ঞাসা করছে বৃদ্ধ মহিষকে, কবে হবে দাসাইপূজা? কবে হবে সহরায় রে?
উৎসবের পাঁচ দিন আগে থেকে প্রতি রাতে গৃহপালিত পশুদের শিংয়ে তেল দেওয়া হয়, নেওয়া হয় বিশেষ যত্ন। পুরো বাড়ি পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন করা হয়, সেই সঙ্গে লাঙল, জোয়াল, মই, কৃষিকাজে ব্যবহৃত সব ধরনের যন্ত্রপাতি। বাহারি রকমের আলপনা আঁকা হয় বাড়ির পুরো দেয়ালে। চালের গুঁড়া পরিমাণমতো পানিতে মিশিয়ে একধরনের মিশ্রণ তৈরি করে গরুকে যেখানে খাবার দেওয়া হয়, সেই চাড়ি থেকে শুরু করে গোয়ালঘর, বাড়ির আঙিনা, প্রতিটি ঘরের দরজা পর্যন্ত আলপনা আঁকা হয়। আলপনা আঁকার পর থেকেই কিশোর–কিশোরীর মনে উৎসবের আমেজ বিরাজ করে। সন্ধ্যার পর শুরু হয় ঘি ও তেলের প্রদীপ প্রজ্বালন পর্ব। প্রতিটি ঘরের দরজা, গরু-মহিষ রাখার ঘর, ধানের খেত, গোয়ালঘর, খামার, ফলবান বৃক্ষ ও অন্যান্য আয়ের উৎসসূচক স্থানে পিঁড়ায় তারা মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে আসে।
উৎসব চলাকালে মাহাতোরা রাঙ্গাহেরি, চিত্রাহেরি, চিনুয়ার, কাপসা ও অন্যান্য পূজা করে। মাহাতোদের বাড়িতে তুলসীগাছের নিচে মাটির ঢিবিই হলো পিঁড়া। পুজোর প্রাথমিক কাজ মূলত ভক্তি প্রদর্শনের আর সেটা পিঁড়া থেকেই শুরু।
অর্ধেক রাত্রি থেকে শুরু হয় গ্রাম জাগানো (জাগারনা)। গ্রামের প্রতি বাড়িতে গিয়ে সবাই মিলে গীতের মাধ্যমে মঙ্গল কামনা করা হয়। গরু–মহিষ, ধানের খেত, খামার, ফলবান বৃক্ষ—সব আয়ের উৎসসূচক স্থানে গিয়ে মঙ্গল কামনা করা হয়। গৃহকর্তারা তাঁদের আপ্যায়ন করেন। আনন্দের সঙ্গে ভিন্ন মাত্রা যোগ করতে কোনো বাড়িতে ছোট শিশু থাকলে তাকে কোলে নিয়ে নাচানো হয়, কাঁদানো হয়।
পরের দিন সকালে গরু-মহিষ, ধানের শিসের মালা তেল, সিঁদুর, রং দিয়ে বিভিন্ন রকম সাজে সজ্জিত করা হয় ও নাচানো হয়। বরণডালায় বরণ (চুমানো) করা হয়। এরপর শুরু হয় গরেয়াপূজা। কাঁঠালের ডাল ৩-৫ খাঁজ করে কেটে গোয়ালে পূর্ব দিকে গেঁড়ে প্রদীপ জ্বালিয়ে ধূপ, সিঁদুর, রুটি ইত্যাদি দিয়ে মুরগি/পাঁঠা বলির মাধ্যমে করা হয় গরেয়াপূজা। সহরায় উৎসবের সময় সাঁওতাল, ওঁরাও, মাহাতোদের পল্লিগুলোতে নারী-পুরুষ মাতোয়ারা হয়ে ওঠেন ঝুমুর খেলায়।
সহরায় উৎসবে মূলত গৃহপালিত পশুর মঙ্গল কামনা ও কৃষিকার্য সুচারুভাবে সম্পন্নের জন্য শক্তির বন্দনা করা হয়। সমতলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষগুলো ধর্মীয় উদ্দীপনা ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে প্রাচীনকাল থেকে এখন পর্যন্ত কোনো রকম পরিবর্তন ছাড়াই এ উৎসব পালন করে আসছে। নিজেদের ঐতিহ্য রক্ষায় তাঁরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
উজ্জল মাহাতো লেখক ও গবেষক