বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম সর্বাধিক জনঘনত্বপূর্ণ দেশ।
বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম সর্বাধিক জনঘনত্বপূর্ণ দেশ।

বিশ্লেষণ

জনসংখ্যা নীতির সংস্কার যেভাবে হতে পারে

বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশ। বাংলাদেশের জনসংখ্যা নীতির সংস্কার ও সঠিক বাস্তবায়ন নিয়ে লিখেছেন মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম

জনসংখ্যা নীতি হলো কোনো দেশের সরকার কর্তৃক গৃহীত এমন পরিকল্পনা ও কৌশল, যার মাধ্যমে দেশের জনসংখ্যার আকার, বৃদ্ধির হার, বণ্টন ও গুণগত মান নিশ্চিত বা উন্নত করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করা। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৭৩-১৯৭৮) জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে ১৯৭৬ সালে প্রথম ‘বাংলাদেশ জাতীয় জনসংখ্যা নীতি: একটি রূপরেখা’ প্রণীত হয়। ২০০৪ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা নীতি প্রণয়ন করা হয়, যা ২০১২ হালে হালনাগাদ করা হয়।

এরপর ২০২৩ সালে ২০১২ সালের নীতি হালনাগাদ করার তাগিদ আসে। ২০১৫ সালের পরই বৈশ্বিক টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জন ও জনসংখ্যা উন্নয়ন সম্মেলনের (আইসিপিডি) লক্ষ্যভিত্তিক প্রতিশ্রুতি অর্জনের প্রেক্ষাপটে ‘বাংলাদেশ জনসংখ্যা নীতি ২০১২’ যথার্থতা হারিয়ে ফেলে এবং সুনির্দিষ্ট প্রধান উদ্দেশ্যগুলো অর্জনে বাংলাদেশ সফল না হওয়ায় এবং জাতীয় জনমিতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি হালনাগাদের তাগিদ আসে। এই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালে নীতির খসড়া তৈরির কাজ শুরু এবং পরবর্তী সময়ে ‘বাংলাদেশ জনসংখ্যা নীতি ২০২৪ (খসড়া)’ প্রণীত হয়।

পরবর্তী সময়ে ‘বাংলাদেশ জনসংখ্যা নীতি ২০২৫’ শিরোনামে চূড়ান্ত ঘোষণা আসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস ২০২৫ পালন অনুষ্ঠান (১১ জুলাই ২০২৫) থেকে। এই প্রেক্ষাপটে ‘বাংলাদেশ জনসংখ্যা নীতি ২০২৫’–পূর্বের ‘বাংলাদেশ জনসংখ্যা নীতি ২০১২’-এর হালনাগাদকৃত নীতি হলেও বেশ কয়েকটি কারণে এ নীতি সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে নয়, যার দ্রুত সংস্কার ও সঠিক বাস্তবায়ন দরকার।

নীতির হালনাগাদকরণের বিভিন্ন পর্যায়ে এবং পরিসরে (আনুষ্ঠানিক কর্মশালা ও অনানুষ্ঠানিক) একজন জনসংখ্যাবিজ্ঞানের শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে আমার অংশগ্রহণ ও মতামত প্রদান করার সুযোগ হয়েছিল। খসড়া নীতির চূড়ান্তকরণে আমি আমার পেশাগত অবস্থান থেকে মতামত ও পরামর্শ প্রদান করেছি, যা অনুষ্ঠিত সভায় ও কার্যবিবরণীতে সাদরে গৃহীত হয়। কিন্তু চূড়ান্ত নীতিতে বেশ কিছু ক্ষেত্রে প্রতিফলন হলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। ফলে হালনাগাদকৃত নীতিতে অসামঞ্জস্যতা, সঠিকতা এবং প্রয়োজনীয় দিকে অধিকতর গুরুত্ব না দেওয়ার ব্যাপারটিও লক্ষ করেছি।

হালনাগাদকৃত নীতি ২০২৫ চূড়ান্ত হওয়ার পর সর্বশেষ জাতীয় উপাত্ত বিশ্লেষণে ও নতুন বাস্তবতায় জনসংখ্যাবিজ্ঞানের একজন শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে প্রশ্ন রাখতেই পারি যে ‘হালনাগাদকৃত বাংলাদেশ জনসংখ্যা নীতি ২০২৫’ কি সঠিক পথে রয়েছে? জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে ও মানবপুঁজি তৈরি করতে এ নীতি কি যথার্থ হয়েছে? এ হালনাগাদকৃত নীতি কি আসলেই বাস্তবায়নযোগ্য?

নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার নির্বাচনী ইশতেহার-২০২৬-এ ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ ও আসন্ন ‘লংজিভিটি ডিভিডেন্ড’–এর সুবিধা অর্জনে জনমিতির পরিবর্তনকে অগ্রাধিকার [বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নির্বাচনী ইশতেহার, পৃষ্ঠা-১৭] বাস্তবায়নে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও যৌক্তিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর আলোকে বর্তমান জনসংখ্যা নীতি সংস্কার হওয়া প্রয়োজন বলেই মনে করি।

 সঠিক জনমিতিক পরিস্থিতি, সামাজিক চাহিদা এবং উন্নয়ন অগ্রাধিকার পরিবর্তিত হওয়ায় সে ক্ষেত্রে বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের উচিত হবে দেশের জনসংখ্যা ও সংস্কারকৃত জনসংখ্যা নীতিকে উন্নয়নের কেন্দ্র রেখে কাজ করা। আমার এই লেখায় যে ১৩টি মতামত ও পর্যবেক্ষণ ব্যক্ত করছি, বর্তমান সরকার ও বিভিন্ন অংশীজন চাইলে তার আলোকে ‘বাংলাদেশ জনসংখ্যা নীতি ২০২৫’-এর যৌক্তিক সংস্কার সাধন করতে পারেন।

১. বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশ। আমাদের সব উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে জনসংখ্যা ও জনসংখ্যার কাঠামো ও বণ্টনগত দিকে লক্ষ রেখে সব ধরনের পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়ন করা উচিত। সেই বিচারে জনসংখ্যার গুণগত ও পরিমাণগত উভয় দিকই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। ২০২৫–এর নীতিতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ (জন্মহার কমানো–প্রতিস্থাপনযোগ্য প্রজনন হারে পৌঁছানো) থেকে জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা ও অধিকার দৃষ্টিভঙ্গিতে রূপান্তরিত হয়েছে।

এ নীতি প্রণয়নের পর সর্বশেষ জাতীয় জরিপে (২০২৫) দেখা গেছে, দেশে মোট প্রজনন হার (টিএফআর) বেড়ে গেছে। বর্তমান হালনাগাদকৃত নীতির উদ্দেশ্য নির্ধারণে পরিমাণগত দিককে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হয়নি, যা ২০১২ সালের নীতিতে ছিল। ফলে হালনাগাদ করা জনসংখ্যা নীতি ২০২৫-এর উদ্দেশ্য সংস্কার বা পরিমার্জন করে সময়কাল উল্লেখপূর্বক প্রতিস্থাপনযোগ্য প্রজনন হারে দ্রুত পৌঁছানো এবং তা ধরে রাখা বাঞ্ছনীয়।

পরিবার পরিকল্পনা খাতে ব্যাপক সংস্কার অত্যাবশ্যক। পরিবার পরিকল্পনা খাতে মানবসম্পদ (জনবল) পদের বিপরীতে সংখ্যা ও সরবরাহ শৃঙ্খলে ঘাটতি লক্ষণীয়। অথচ পরিবার পরিকল্পনায় গতি ধরে রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিশেষ করে বয়স নির্দিষ্ট প্রজনন হার—উচ্চ কিশোরী মাতৃত্ব ও উচ্চ বাল্যবিবাহের হার বিষয়ে টার্গেটভিত্তিক লক্ষ্য ও কৌশল থাকা উচিত ছিল, যেমনটি আছে আইসিপিডি+২৫ (জনসংখ্যা ও উন্নয়নবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ২৫ বছর পূর্তি)-এর প্রতিশ্রুতিতে। এ ক্ষেত্রে নীতিতে লক্ষ্যকেন্দ্রিকতা (টার্গেট) থেকে সরে যাওয়াটা যথাযথ হয়নি বলেই মনে করি।

২. বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম সর্বাধিক জনঘনত্বপূর্ণ দেশ। কিন্তু আয়তনে দেশটি ছোট। তাই জনঘনত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। ফলে যেকোনো উন্নয়ন নীতি ও পরিকল্পনায় জনঘনত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। ব্যক্তির সম্পত্তি অর্জনে সীমারেখা নিয়ে পর্যালোচনা করা এবং এ–সংক্রান্ত একটি বিধান সংযোজন করা বা সাংবিধানিক নির্দেশনা প্রদান করার তাগিদ থাকতে পারত।

উচ্চ জনঘনত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে আমাদের যাবতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় নেওয়ার তাগিদ এ নীতির উদ্দেশ্যে প্রতিফলিত হওয়া উচিত ছিল বলে আমি মনে করি, যা হালনাগাদকৃত ‘বাংলাদেশ জনসংখ্যা নীতি ২০২৫’-এ অনুপস্থিত। ফলে বাংলাদেশের বাস্তবতায় জনঘনত্বকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিয়ে নীতি-পরিকল্পনা করা দরকার।

৩. আগের নীতিতে (২০১২) জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের বিষয়টি ছিল অনুপস্থিত। ফলে দেরিতে হলেও হালনাগাদকৃত নীতিতে (২০২৫) জনমিতিক লভ্যাংশে গুরুত্ব পেলেও, এ বিষয়ে সংস্কারের ক্ষেত্র তৈরি রয়েছে। হালনাগাদকৃত নীতি যুগোপযোগী করার যৌক্তিকতা উল্লেখ–সংক্রান্ত অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রথম জনমিতিক লভ্যাংশ নিয়ে শুরু (২০০৫ সাল) ও শেষ (২০৭২ সাল) সংক্রান্ত যে উপাত্ত ব্যবহার করা হয়েছে এবং নির্ভরশীলতার হার উল্লেখ করে যে সময়কাল উল্লেখ করা হয়েছে তাতে প্রাক্কলিত উপাত্তের গুণগত মান ও পরিমাপে ঘাটতি রয়েছে। এ–সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণায় এবং অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ও এ বিষয়ে ২০৩৬ পর্যন্ত অনুকূল সময়কাল রয়েছে।

২০৭২ সাল পর্যন্ত প্রথম জনমিতিক লভ্যাংশ সুযোগ অব্যাহত থাকবে বলে নীতিতে নির্দেশিত বাক্যে উল্লেখ রয়েছে। এটা যথার্থ নয় এবং সংশোধন করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সঠিক গুণগত উপাত্তের ভিত্তিতে যৌক্তিক বিশ্লেষণপূর্বক সংস্কার করা আশু প্রয়োজন বলে মনে করি। পাশাপাশি প্রথম জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনে কোন কৌশলগুলো স্বল্পমেয়াদি আর কোনগুলো দীর্ঘমেয়াদি, সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকতে পারত, যা নীতিতে অনুপস্থিত লক্ষ করছি। এ ক্ষেত্রে লক্ষ রাখতে হবে, দেশের যুবশক্তির ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে জনমিতিক সুবিধা পাওয়ার পরিবর্তে যেন জনমিতিক বোঝা বা অভিশাপ হিসেবে আবির্ভূত না হয়।

৪. বর্তমান জনসংখ্যা নীতিটি কত দিন পরপর হালনাগাদ হবে এবং কোন সময়কাল পর্যন্ত বিবেচনায় রাখা হয়েছে—এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকতে পারত।

৫. জনসংখ্যা নীতি বাস্তবায়নে সরকারের ২৮টি মন্ত্রণালয়ের ভূমিকার কথা বলা হলেও গুরুত্বপূর্ণ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং আইন, বিচার ও সংসদীয় সংক্রান্ত দুটি মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা অনুপস্থিত, যা নীতিতে সংযোজন করা প্রয়োজন।

৬. ‘বাংলাদেশ জনসংখ্যা নীতি ২০২৫’ বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে জাতীয় জনসংখ্যা পরিষদ নিয়মিতভাবে বছরে কমপক্ষে একটি সভা আয়োজন করবে উল্লেখ রয়েছে। অথচ জাতীয় জনসংখ্যা পরিষদের প্রজ্ঞাপনে (৩ সেপ্টেম্বর ২০০৯ তারিখে) বছরে অন্তত দুবার সভায় মিলিত হওয়ার কথা উল্লেখ ছিল। আর পুনর্গঠিত জাতীয় জনসংখ্যা পরিষদের নির্বাহী কমিটির (১২ মার্চ ২০২৫) কার্যপরিধিতে বছরে চারবার সভা অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলা হয়েছে।

ওই কমিটির আমি একজন সদস্য হলেও এখনো গত এক বছরে কোনো সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে উচিত ছিল জনসংখ্যা নীতি ২০২৫-এ জাতীয় জনসংখ্যা পরিষদের সভার সংখ্যা একই (বছরে দুটি) রেখে, একে কীভাবে অধিকতর কার্যকর করা যায়, সেদিকে দিকনির্দেশনা প্রদান করা।

জনসংখ্যার পরিমাণগত ও গুণগত উন্নয়নে মানবপুঁজির বিকাশে, বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দে অগ্রাধিকার দেওয়ার কনির্দেশনা দেওয়া উচিত ছিল। জনসংখ্যা নীতির বাস্তবায়নে ও উন্নয়নে অধিকতর গুরুত্ব প্রদানে একটি স্বতন্ত্র ‘বাংলাদেশ জনসংখ্যা কমিশন’ বা ‘জনসংখ্যা মন্ত্রণালয়’ থাকার যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে; পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এমন দৃষ্টান্ত রয়েছে।

৭. বাংলাদেশের জনসংখ্যা নীতি ২০২৫–এর মৌলিক ভিত্তি এবারই প্রথম সংযোজন করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আইসিপিডি ১৯৯৪ প্রোগ্রাম অব অ্যাকশন (জনসংখ্যা ও উন্নয়নবিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক রেফারেন্স দলিল)-এর ১৫টি মূলনীতিকে জাতীয় নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা অধিকতর যুক্তিযুক্ত হতো বলে মনে করি।

৮. বাংলাদেশে এখন নারীর সংখ্যা পুরুষের চেয়ে বেশি। সংখ্যাগত অবস্থানে নারীরা এগিয়ে থাকলেও গুণগত বিকাশে তাঁরা অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে রয়েছেন। ফলে ২০২৫ জনসংখ্যা নীতিতে জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করা ও জেন্ডার ডিভিডেন্ড অর্জনে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অর্জনে কতিপয় কৌশল উল্লেখ থাকলেও আইসিপিডি প্রোগ্রাম অব অ্যাকশনের আলোকে ‘জেন্ডার সমতা, সমদর্শিতা এবং নারীর ক্ষমতায়ন’কে অধিকতর গুরুত্ব প্রদান করা যেত।

৯. এ নীতিতে জনসংখ্যার উপগোষ্ঠীর সংখ্যাগত ও গুণগত দিক বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী ও অন্যান্য সুরক্ষাহীন জনগোষ্ঠী উল্লেখপূর্বক অনুচ্ছেদ আকারে থাকতে পারত।

১০. বর্তমান নীতিতে আন্তর্জাতিক শ্রম অভিবাসন গুরুত্ব পেলেও দেশের অভ্যন্তরীণ স্থানান্তরের দিকটি যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এটা বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।

১১. জনসংখ্যা নীতি ২০২৫-এর বাস্তবায়ন কৌশলে অ্যাডভোকেসি অর্থাৎ জনসচেতনতামূলক প্রচার, শিক্ষা, তদারকি ও প্রবিধান রাখা উচিত ছিল, যার ভিত্তি জন্ম, মৃত্যু ও স্থানান্তরের মতো মৌলিক জনমিতিক প্রক্রিয়ায় জনসংখ্যার পরিমাণ ও গুণগত দিক বিবেচনায় রাখা। যেমন জেন্ডার পক্ষপাতিত্বে লিঙ্গ নির্ধারণের অপপ্রয়োগ, এইচআইভি/এইডস ইত্যাদি বিষয়ে দিকনির্দেশনা থাকা। 

১২. বর্তমান নীতির সংস্কার বা অধিকতর হালনাগাদ ও বাস্তবায়নে অতি সম্প্রতি মোট প্রজনন হার (টিএফআর) বেড়ে যাওয়া, জন্মনিরোধ পদ্ধতি ব্যবহারের হার কমে যাওয়া, কম বা বেশি বয়সে সন্তান ধারণ ইত্যাদির দিকে লক্ষ রেখে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমকে কীভাবে আরও বেশি জোরদার করা যায়, সেদিকে জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা কৌশল (২০২৫-২০৩০) বাস্তবায়নে নীতিতে দিকনির্দেশনা থাকার প্রয়োজন ছিল।

১৩. বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্ব এক মহাপ্রবণতার মধ্য দিয়ে ধাবিত হচ্ছে, যেখানে রয়েছে জনমিতিক পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ ও প্রযুক্তি বা ডিজিটাল রূপান্তর। ফলে এ মহাপ্রবণতাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রেখে দ্রুত প্রযুক্তির পরিবর্তনে অটোমেশন বা প্রযুক্তির স্বয়ংক্রিয়তা শ্রমজনশক্তিতে কীভাবে প্রভাব ফেলবে, এ ক্ষেত্রে বয়স–জেন্ডারভিত্তিক জনগোষ্ঠী এবং পরিবার কীভাবে খাপ খাওয়াবে বা প্রতিক্রিয়া দেখাবে, বয়স্ক জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধি ও জীবন আয়ুষ্কাল বৃদ্ধিতে কল্যাণমূলক ব্যবস্থার রূপান্তর কীভাবে ঘটবে, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কতটুকু সংকট–সহনশীল হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নীতিতে থাকার প্রয়োজন ছিল।

এখন বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ হলো কীভাবে বিশাল জনসংখ্যা সামাল দেওয়া যায়। বর্তমান ও ভবিষ্যতের বাংলাদেশের জনসংখ্যার চাহিদা পূরণ ও বিশাল জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে হলে সঠিক জনসংখ্যা নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় অঙ্গীকার ও বাস্তবায়নে সুশাসন নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।

  • ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান, পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

  • মেইল: mainul@du.ac.bd

  • মতামত লেখকের নিজস্ব