মতামত

অন্তর্বর্তী সরকারের যেসব অধ্যাদেশের বৈধতা দেওয়া জরুরি

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি হওয়া অধ্যাদেশগুলোকে আইনে পরিণত করা নিয়ে একধরনের অনিশ্চয়তা লক্ষ করা যাচ্ছে।

সংবিধানের ৯৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অধ্যাদেশগুলোকে বৈধতা দিতে হলে সংসদের প্রথম বৈঠকে উত্থাপন করতে হবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে আইনে রূপান্তর করতে হবে। তা না হলে অধ্যাদেশগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।

সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে, অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে কয়েকটি বাদে বাকিগুলো আইনে রূপান্তরের জন্য সংসদে উত্থাপনই করবে না বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। এ ক্ষেত্রে যুক্তি হিসেবে সময়সংকটকে সামনে আনা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাস মেয়াদে তাড়াহুড়া করে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। সেই হিসাবে গড়ে চার দিনে একটি করে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। সংসদে ৩০ দিনের মধ্যে এসব অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করতে হলে বর্তমান সরকারকে দিনে গড়ে সাড়ে চারটি করে অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তর করতে হবে।

প্রশ্ন হলো, আসলেই কি পরিস্থিতি এ রকম, নাকি অধ্যাদেশের ধরন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রথমেই যে বিষয়টা খেয়াল করতে হবে, তা হলো অধ্যাদেশগুলো সব একরকম নয়, অধ্যাদেশগুলোর ব্যাপ্তি ও গভীরতাও সমান নয়। সে সময় এ রকম অনেক অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে, যেগুলো খুবই সংক্ষিপ্ত ও সুনির্দিষ্ট। এর অনেকগুলোই জারি করা হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করা কিংবা আন্দোলনের দাবিদাওয়া বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে।

যেমন ২০২৪ সালে জারি করা ১৭টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৪টি অধ্যাদেশ জারি করা হয় বিশেষ পরিস্থিতিতে জেলা, উপজেলা, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অপসারণ ও বিকল্প প্রশাসক নিয়োগের জন্য, দুটি অধ্যাদেশ জারি করা হয় শেখ পরিবারের নিরাপত্তাব্যবস্থা বাতিল ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকে এসএসএফের নিরাপত্তাব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসতে, একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয় জাতীয় যুব উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের নাম থেকে শেখ হাসিনার নাম বাদ দিতে।

মনে রাখতে হবে, গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচিত সংসদ হিসেবে এই সংসদের দায়িত্ব অনেক বেশি। বাংলাদেশের টেকসই গণতান্ত্রিক রূপান্তরের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন হবে কি না, তার অনেকটাই নির্ভর করবে সদ্য নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর।

একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয় ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালককে অপসারণ ও নিয়োগের উদ্দেশ্যে, একটি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের বয়সসীমা তুলে দিতে। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা সর্বোচ্চ ৩২ বছর নির্ধারণ করে একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। আবার দায়মুক্তির আইন নামে পরিচিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০ ও গণশুনানি ছাড়াই জ্বালানির দাম সমন্বয়ের বিধান বাতিলে একটি করে অধ্যাদেশ জারি করা হয়।

এই অধ্যাদেশগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া খুব জটিল ও সময়সাপেক্ষ হওয়ার কথা নয়। এখানে কিছু অধ্যাদেশ আছে, যেগুলো অন্তর্বর্তী সরকার বিলুপ্ত হওয়ার কারণে আর প্রয়োজনীয় নয়। কিন্তু কিছু অধ্যাদেশ আছে, যেগুলো খুবই জনগুরুত্বপূর্ণ।

দায়মুক্তি আইন ও গণশুনানি ছাড়াই জ্বালানির দাম নির্ধারণের বিধান বাতিল করার অধ্যাদেশ যার উদাহরণ। এখন নির্বাচিত সরকার যদি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এই অধ্যাদেশগুলো জাতীয় সংসদে অনুমোদন না করে, তাহলে বিগত স্বৈরাচারী সরকারের লুটপাটের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করা আইনগুলো পুনরুজ্জীবিত হবে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

২০২৫ সালে মোট ৮০টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে শেখ পরিবারের নাম বাদ দিতে অন্তত ১০টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। অনেক বিষয়ে একাধিকবার অধ্যাদেশ জারি ও সংশোধন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধনে অধ্যাদেশ জারি হয়েছে মোট চারবার। এর মধ্যে ২০২৫ সালে তিনবার। সাইবার সুরক্ষা, মানবাধিকার কমিশন, মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক, অর্থসংক্রান্ত কতিপয় আইন, সরকারি চাকরি, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) ইত্যাদি বিষয়ে দুবার করে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে।

২০২৫ ও ২০২৬ পর্যায়ে বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, মহেশখালী ইত্যাদি অঞ্চলের উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন ও পুনরায় সংশোধনের জন্য মোট ১০টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। একটি অস্থায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষবিষয়ক অধ্যাদেশ জারি করার আদৌ কোনো প্রয়োজনীয়তা ছিল কি না, তা নিয়ে তর্ক হতে পারে। সাধারণত উন্নয়নবিষয়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের এখতিয়ার বলে মনে করা হয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আরও কিছু অধ্যাদেশ জারির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৬; গ্রামীণ ব্যাংক (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫; জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫; জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫; বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫; বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬; রেজিস্ট্রেশন (অ্যামেন্ডমেন্ট) অধ্যাদেশ ২০২৬; বাংলাদেশ হাউজবিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন (অ্যামেন্ডমেন্ট); বাংলাদেশ বেসরকারি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (রহিতকরণ) অধ্যাদেশ, ২০২৬ ইত্যাদি।

এতৎসত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এমন কিছু অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে, যেগুলো গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে উঠে আসা রাষ্ট্র সংস্কারের জন–আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ রকম কিছু অধ্যাদেশ হলো সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫; পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫; ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫; সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫; জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫; বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫; সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫; গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫; বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ অধ্যাদেশ, ২০২৬; বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ অধ্যাদেশ, ২০২৬; ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৬ ইত্যাদি।

এর মধ্যে আবার কিছু অধ্যাদেশ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের সমালোচনা আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এগুলো আগের আইনের চেয়ে অনেক দিক থেকেই শ্রেয়। উদাহরণ হিসেবে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ ও বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর কথা বলা যেতে পারে। সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে কোন কোন ক্ষেত্রে কনটেন্ট ব্লক ও বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তারের মতো অগণতান্ত্রিক ধারা থাকলেও এতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণকারী নিপীড়নমূলক ধারাগুলো নেই।

একইভাবে শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশে ৫ বছরের বদলে ৩ বছর পরপর ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, ২০ জন শ্রমিকের সম্মতিতে ট্রেড ইউনিয়ন করার বিধান, প্রতিষ্ঠানে ১০০ জন শ্রমিক থাকলে ভবিষ্য তহবিল বাধ্যতামূলক, মাতৃত্বকালীন ছুটি ১১২ দিন থেকে বাড়িয়ে ১২০ দিন, শ্রমিকদের কালোতালিকাভুক্ত করা নিষিদ্ধকরণের মতো বিধান যুক্ত হয়েছে। এতে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি কিংবা শ্রমিক ছাঁটাইয়ের মতো স্বেচ্ছাচারী বিধান বাতিলের দাবি অপূর্ণ থাকলেও শ্রমিকের অধিকার আদায়ের দিক থেকে এই অধ্যাদেশকে বড় ধরনের অগ্রগতি হিসেবে দেখতে হবে।

কাজেই বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলোর বিষয়ে কোনো ঢালাও সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। যেসব অধ্যাদেশ অন্তর্বর্তী সরকারের দৈনন্দিন কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত ছিল, এখন আর যেগুলোর কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই, সেগুলোকে বাদ রেখে বাকি সব অধ্যাদেশ সংসদ অধিবেশনের প্রথম বৈঠকেই উত্থাপন করতে হবে। এরপর বিষয়ভিত্তিক একাধিক সংসদীয় রিভিউ কমিটির মাধ্যমে অধ্যাদেশগুলোকে পর্যালোচনা করে গণতান্ত্রিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

জনস্বার্থের বিপরীতে গিয়ে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর সংকীর্ণ স্বার্থে যেন অধ্যাদেশগুলো গ্রহণ–বর্জনের সিদ্ধান্ত না হয়, সে জন্য সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড অবলম্বন করতে হবে এবং সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তিগুলো লিপিবদ্ধ করে স্বচ্ছতার সঙ্গে জনগণের সামনে উন্মোচন করতে হবে। শুধু অধ্যাদেশ নয়, অন্তর্বর্তী সরকার স্বাক্ষরিত বিদেশি চুক্তি, বিধিমালা, প্রজ্ঞাপন ইত্যাদির ব্যাপারেও একই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচিত সংসদ হিসেবে এই সংসদের দায়িত্ব অনেক বেশি। বাংলাদেশের টেকসই গণতান্ত্রিক রূপান্তরের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন হবে কি না, তার অনেকটাই নির্ভর করবে সদ্য নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর।

  • কল্লোল মোস্তফা বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবেশ ও উন্নয়ন অর্থনীতিবিষয়ক লেখক

    kallol_mustafa@yahoo.com

    মতামত লেখকের নিজস্ব