যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সিনেট প্রাইমারিতে আবদুল এল-সাইয়েদের জয় একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। তিনি একজন মুসলিম অভিবাসী পরিবারের সন্তান। তিনি প্রতিষ্ঠিত ডেমোক্র্যাটিক রাজনীতির প্রায় সব প্রচলিত ধারা থেকে আলাদা অবস্থান নিয়েছেন।
এই জয় শুধু সাইয়েদের ব্যক্তিগত সাফল্য নয়। এটি মধ্যপন্থী রাজনীতিবিদদের সেই আত্মতুষ্ট ভাবনাকেও চ্যালেঞ্জ করেছে, যেখানে তাঁরা মনে করতেন প্রগতিশীলদের সাফল্য সীমিত এবং সাময়িক। আগে তাঁরা জোহরান মামদানির মতো নেতাদের উদাহরণ দিয়ে বলতেন, এগুলো বড় শহরের ঘটনা, জাতীয় রাজনীতিতে এর প্রভাব কম। কিন্তু এখন এল-সাইয়েদের জয় এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যে হয়েছে, যা কিনা প্রেসিডেন্ট মনোনয়ন প্রক্রিয়ারও অংশ।
এই সাফল্য অনেকের কাছে আশার বার্তা। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও যারা শক্তিশালী বামপন্থী রাজনীতির উত্থান দেখতে চান, তাঁরা এটিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন।
এল-সাইয়েদের জয় ঠেকাতে তাঁর বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ খরচ করা হয়েছিল। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হেইলি স্টিভেন্স তাঁকে নয় গুণের বেশি খরচে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। এটি ছিল ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেস প্রাইমারির ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল নির্বাচন। শেভরন ও ফিলিপ মরিসের মতো বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান এল সাইয়েদের প্রতিদ্বন্দ্বীকে ৬ কোটি ডলারের বেশি অর্থ দেয়। এর প্রায় অর্ধেক আসে আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটির (আইপ্যাক) সমর্থিত একটি সুপার প্যাক থেকে।
এই জয়ের প্রতীকী গুরুত্বও বড়। এটি দেখায় যে করপোরেট শক্তি ও বিশেষ স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাব ভাঙা সম্ভব। এতে বোঝা যায় ভোটাররা এখন বুঝতে শুরু করেছে যে তাদের গণতন্ত্র অনেকাংশে দখল হয়ে গেছে। আগে যে বিষয়গুলো একজন প্রার্থীকে দুর্বল করত (যেমন অভিজ্ঞতার অভাব বা প্রতিষ্ঠানের সমর্থন না থাকা), এখন তা উল্টো ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রগতিশীল ভোটার এমনিতেই তৈরি হয় না, সময় নিয়ে গড়ে তুলতে হয়। যদি ডেমোক্র্যাটিক দল এই নতুন নেতাদের পাশে না দাঁড়ায়, তাহলে তারা দুর্বল হয়ে পড়বে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই নেতারাই এখন সবচেয়ে কার্যকর পথ দেখাচ্ছেন। তাদের পুরোপুরি সমর্থন না করলে ট্রাম্পবাদ আবারও জিততে পারে।
এতে প্রার্থীকে ব্যয়বহুল স্বাস্থ্যসেবা, অভিবাসীদের প্রতি কঠোরতা এবং অর্থ অপচয়ের রাজনীতির বাইরে থাকা সৎ ও পরিষ্কার ভাবমূর্তির লোক হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।
এই নির্বাচনে ইসরায়েল একটি বড় ইস্যু ছিল। তবে দুই পক্ষের বক্তব্যে পার্থক্য ছিল। এল-সাইয়েদের সমালোচকেরা বারবার ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার নিয়ে কথা বলছিলেন; অথচ এটি সাধারণ ভোটারের কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। এল-সাইয়েদ বিষয়টিকে ভিন্নভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রশ্নটি ইসরায়েলের অস্তিত্ব নয়, বরং প্রশ্ন হলো, কেন সেখানে আমেরিকার করের অর্থ ব্যয় হবে। তাঁর এই অবস্থান ছিল স্পষ্ট এবং অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য।
তবে এই জয় এখনো প্রমাণ করে না যে প্রগতিশীলদের এই সাফল্য সব জায়গায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব। বিশেষ করে সাধারণ নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে প্রগতিশীল রাজনীতিকেরা যে একই ফল আনতে পারবেন, তা জোর দিয়ে বলা যায় না।
ডেমোক্র্যাটিক পার্টি দীর্ঘদিন ধরেই ডোনাল্ড ট্রাম্পকে মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে দুর্বল ছিল। তবে নতুন প্রগতিশীল নেতারা সমাধান দিতে পারে বলে মনে হলেও তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
রিপাবলিকানরা ইতিমধ্যেই তাদের আক্রমণ করা শুরু করেছে। ট্রাম্প তাদের মতো নেতাদের কড়া ভাষায় আক্রমণ করে বলেছেন, এই উদারপন্থীরা দেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটিক দলের মধ্যপন্থীরাও তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। থার্ড ওয়ে নামে একটি মধ্যপন্থী গোষ্ঠী ইতিমধ্যে কোটি কোটি ডলার খরচ করে প্রগতিশীলদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানোর প্রস্তুতি নিয়েছে। তাদের দাবি, যদি এই ধারা প্রেসিডেন্ট মনোনয়ন পর্যন্ত যায়, তবে এমন প্রার্থী আসবেন যিনি রিপাবলিকানদের কাছে পরাজিত হবেন। যদিও অতীতে মধ্যপন্থী প্রার্থীরাও ট্রাম্পের কাছে হেরেছেন।
সমস্যা হলো, যুক্তরাষ্ট্রে প্রগতিশীলদের খুব সহজেই চরমপন্থী বলে দেখানো হয়। এমনকি অনেকে মনে করেন, ট্রাম্প কমলা হ্যারিস বা হিলারি ক্লিনটনের চেয়েও মাঝামাঝি অবস্থানের রাজনীতিবিদ। এ কারণে জাতীয় পর্যায়ে বামপন্থীদের লড়াই কঠিন হয়ে যায়। পরিবর্তনের যে প্রতিশ্রুতি তাদের শক্তি, সেটাকেই উল্টো ভয় বা অনিশ্চয়তা হিসেবে তুলে ধরা হয়।
তবু এল-সাইয়েদ ও মামদানির মতো নেতারা নতুন এক পথ দেখাচ্ছেন। তারা এমন রাজনীতির কথা বলছেন, যেখানে অভিবাসী পটভূমি আর নতুন চিন্তা যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তবতার সঙ্গে মিশে গেছে। তারা না পুরোপুরি মিশে যেতে চেয়েছেন, না নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। বরং নিজেদের অধিকার ও জায়গা তারা স্পষ্টভাবে দাবি করেছেন।
তবে তাদের পথ সহজ নয়। তাদের লড়তে হচ্ছে দুর্বল ডেমোক্র্যাটিক কাঠামো, ডানপন্থীদের তীব্র রাজনৈতিক লড়াই এবং শক্তিশালী করপোরেট প্রভাবের বিরুদ্ধে।
প্রগতিশীল ভোটার এমনিতেই তৈরি হয় না, সময় নিয়ে গড়ে তুলতে হয়। যদি ডেমোক্র্যাটিক দল এই নতুন নেতাদের পাশে না দাঁড়ায়, তাহলে তারা দুর্বল হয়ে পড়বে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই নেতারাই এখন সবচেয়ে কার্যকর পথ দেখাচ্ছেন। তাদের পুরোপুরি সমর্থন না করলে ট্রাম্পবাদ আবারও জিততে পারে।
নাসরিন মালিক ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান–এর একজন কলামিস্ট
দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত