নারী শ্রমিকেরা এখনো অনেক বেশি বঞ্চনার শিকার হন
নারী শ্রমিকেরা এখনো অনেক বেশি বঞ্চনার শিকার হন

মতামত

মানব উন্নয়নের জন্য কাজ কতটা গুরুত্বপূর্ণ

কাজ বিষয়টি বর্তমান সময়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর সব দেশ আজ কর্মনিয়োজন সমস্যার মুখোমুখি। আমাদের সময়ে কাজের জগৎ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে মানব উন্নয়নে। মানব উন্নয়নের দৃষ্টিকোণ থেকে কাজের ধারণাটি শুধু চাকরি বা কর্মসংস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আরও বিস্তৃত স্বগভীর। কর্মনিয়োজন আয়ের সংস্থান করে এবং সেই সঙ্গে মানুষের মর্যাদা, অংশগ্রহণ স্ব–অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। কিছু শুধু প্রথাগত চাকরির ধারণা এবং কাঠামো দিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজকে বোঝা যায় না—যেমন পরিচর্যার কাজ, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ এবং লেখালেখি বা চিত্রাঙ্কনের মতো সৃজনশীল কাজ।

কাজ ও মানব উন্নয়ন পরস্পর পরস্পরকে জোরদার করে। কর্মনিয়োজন মানুষের আয় ও জীবিকা নিশ্চিত করে, দারিদ্র্য কমায়, ন্যায্য প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করে এবং মানব উন্নয়নকে এগিয়ে নেয়। আবার মানব উন্নয়নে স্বাস্থ্য, জ্ঞান, দক্ষতা ও সচেতনতা বাড়িয়ে মানবপুঁজি বৃদ্ধি করে এবং মানুষের সুযোগ ও চয়নের পরিসর বিস্তৃত করে। তবে কর্মনিয়োজন ও মানব উন্নয়নের এই পারস্পরিক সম্পর্ক স্বয়ংক্রিয় নয়। এটি নির্ভর করে কাজের গুণগত মান, কাজের পরিবেশ, সমাজে কাজের মূল্যায়ন ইত্যাদির ওপর। শুধু চাকরি থাকাই গুরুত্বপূর্ণ নয়, সেই সঙ্গে আরও কিছু বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

যেমন যে কাজ করা হচ্ছে, সেটি কি শোভন ও নিরাপদ? মানুষ কি তাদের কাজ থেকে সন্তুষ্টি পায়? কাজে উন্নতির সুযোগ আছে কি? কর্মব্যস্ততা কি জীবন ও জীবিকার ভারসাম্য বজায় রাখে? কাজে নারী-পুরুষের সমান সুযোগ আছে কি? কাজ মানুষের মর্যাদা ও গর্ববোধ জোগায় কি না এবং তা অংশগ্রহণ ও পারস্পরিক যোগাযোগ সহজ করে কি না, সে বিষয়গুলো কাজের গুণগত মান নির্ধারণ করে। মানব উন্নয়নের সঙ্গে কাজের সম্পর্ক শক্তিশালী করতে কাজকে পরিবেশবান্ধব হতে হবে। কাজ তখনই মানব উন্নয়নের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে সম্পৃক্ত হয়, যখন তা ব্যক্তিগত লাভ ছাড়িয়ে সামাজিক লক্ষ্য—যেমন দারিদ্র্য ও বৈষম্য হ্রাস, সামাজিক সংহতি, সংস্কৃতি ও সভ্যতার উন্নয়নে অবদান রাখে।

অন্যদিকে কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য ও সহিংসতা থাকলে কাজের প্রাসঙ্গিকতা কমে যায় এবং মানব উন্নয়নের সঙ্গে এর সম্পর্ক দুর্বল হয়। কর্মক্ষেত্রে সবচেয়ে দৃশ্যমান বৈষম্য নারী–পুরুষের মধ্যে—পদ, বেতন ও আচরণের নিরিখে। এ ছাড়া বর্ণ, জাতিগত পরিচয় ও প্রতিবন্ধিতার ভিত্তিতেও বৈষম্য ঘটে। কর্মক্ষেত্রে হুমকি, শারীরিক বা মৌখিক নির্যাতনের মতো সহিংসতাও কাজ অন্য মানব উন্নয়নের সম্পর্ককে শিথিল করে।

সংঘাত ও সংঘাত-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও এই সম্পর্ক ক্ষীণ হয়, কারণ এমন পরিস্থিতিতে কাজের অর্থ ধোঁয়াশা হয় এবং সে পরিস্থিতিতে মানব উন্নয়ন শুধু মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়, তার বেশি কিছু নয়। কিছু কিছু কাজ কিন্তু মানব উন্নয়নের নিরিখে ক্ষতিকর। বহু মানুষ এমন সব কাজে নিয়োজিত, যা তাদের জীবনের চয়নবলয়কে সীমিত করে। লাখ লাখ মানুষ নির্যাতনমূলক ও শোষণমূলক পরিবেশে কাজ করে, যা তাদের মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করে এবং মর্যাদা নষ্ট করে—যেমন শিশুশ্রমিক, বাধ্য শ্রম ও পাচারকৃত শ্রমিক।

বিশ্বের ৭০০ কোটির বেশি মানুষের নানা ধরনের কাজ মানব অগ্রগতিতে অবদান রাখছে। প্রায় ১০০ কোটি কৃষিশ্রমিক ও ৫০ কোটির বেশি পারিবারিক খামার বিশ্বের খাদ্যের ৮০ শতাংশের বেশি উৎপাদন করে, যা পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য অত্যাবশ্যকীয়। বিশ্বজুড়ে ৮ কোটি স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের কর্মী মানবসক্ষমতা বৃদ্ধি করছেন। বিশ্বের সেবা খাতের এক শ কোটির বেশি কর্মী মানব অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখছেন। চীন ও ভারতে বিশুদ্ধ জ্বালানি খাতে ২ কোটি ৩০ লাখ চাকরি বিশ্বের পরিবেশগত বজায়ক্ষমতা বাড়াচ্ছে।

কাজের সামাজিক মূল্য ব্যক্তিগত লাভের বাইরেও বিস্তৃত। বিশ্বের ৪৫ কোটির বেশি উদ্যোক্তা উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতায় অবদান রাখছেন। প্রায় ৬ কোটি বেতনভুক্ত গৃহকর্মী মানুষের পরিচর্যার প্রয়োজন মেটাচ্ছেন। শিশু পরিচর্যার কাজ শিশুদের তাদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে। প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের পরিচর্যার কাজ তাদের সক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। শিল্পী, সংগীতশিল্পী ও লেখকদের কাজ মানবজীবনকে সমৃদ্ধ করে। প্রতিবছর প্রায় ৯৭ কোটি স্বেচ্ছাসেবী মানুষ পরিবার ও সমাজকে সাহায্য করেন এবং সামাজিক সংহতি বাড়ান।

আজ আমরা একটি অসম, অস্থিতিশীল এবং অবজায়ক্ষম বিশ্বে বাস করছি। এই বিশ্বের অস্থিতিশীলতার উৎস হতে পারে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক ও আর্থিক সংকট বা সহিংস উগ্রবাদ। আমাদের পৃথিবীর বজায়ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা নিয়েও ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। এসব অন্তরায় মোকাবিলায় কাজ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সেই কাজ হতে হবে মানসম্মত, টেকসই, সমতাবর্ধক, যে কাজ শ্রমিকের অধিকারকে সম্মান করে এবং তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

তবু কর্মক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বঞ্চনা রয়ে গেছে। বিশ্বব্যাপী বেকারত্বের হার প্রায় ৫ শতাংশ, অর্থাৎ ১৯ কোটি মানুষ বেকার। যুব বেকারত্বের হার ১২ শতাংশ, যা সামগ্রিক হারের দ্বিগুণের বেশি। বিশ্বে ২৪ কোটির বেশি শ্রমিক চরম দারিদ্র্যে বসবাস করেন, অর্থাৎ তাঁরা দৈনিক ২ দশমিক ১৫ ডলারের কম আয় করেন। প্রভূত মানবসম্ভাবনা এখনো ব্যবহার করা হয়নি। বিশ্বে ১৫০ কোটির বেশি মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ কর্মসংস্থানে রয়েছে।

প্রায় ১৩ কোটি ৮০ লাখ মিলিয়ন শিশুশ্রমিক রয়েছে, যাদের মধ্যে ৭ কোটি ৯০ লাখ ছেলে ও ৫ কোটি ৯০ লাখ মেয়ে। ২০২৪ সালে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ মানুষ জোরপূর্বক শ্রমে নিযুক্ত ছিল, যা থেকে প্রায় ২৩ কোটি ৬০ লাখ মিলিয়ন ডলার মুনাফা অর্জিত হয়েছে তাদের জন্য, যারা এই বাধ্য শ্রমকে নিয়ন্ত্রণ করে। সারা বিশ্বে শোভন কাজের সংখ্যা কমছে। এ সবকিছুর অর্থ হচ্ছে যে মানব অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে এবং বিদ্যমান বঞ্চনা দূর করতে অবশিষ্ট মানবসম্ভাবনাকে সর্বোত্তমভাবে কাজে লাগাতে হবে।

এ ছাড়া কাজের জগৎ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে—কাজের সংজ্ঞা, কাজের পরিধি এবং কাজের প্রক্রিয়া, সবকিছুই বদলে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের প্রধান চালিকা শক্তি হলো বিশ্বায়ন ও তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব। বর্তমানে বৈশ্বিক বাণিজ্যে পণ্য ও সেবা বাণিজ্যের পরিমাণ ৩৫ লাখ কোটি ডলার, যা ১০ বছর আগের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। বিশ্বে ৯০০ কোটির বেশি মুঠোফোনের সংযোগ রয়েছে এবং ৬০০ কোটির বেশি মানুষ আন্তযোগাযোগ ব্যবহার করে।

এই পরিবর্তন নিশ্চয়ই নতুন সুযোগ সৃষ্টি করছে, তবে সেই সঙ্গে ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বিজয়ী যেমন আছে, তেমনি বিজিতও আছে। বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলে ৪৫ কোটি মানুষ কাজ করছে, যার মধ্যে ১৯ কোটি নারী। দক্ষ কর্মীর জন্য এখনই সবচেয়ে ভালো সময়, আর অদক্ষ কর্মীর জন্য সবচেয়ে খারাপ সময়।

শেষ পর্যন্ত, কাজের মাধ্যমে মানব উন্নয়ন বাড়াতে প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিমালা ও কার্যকর কর্মপরিকল্পনা। এসব নীতিতে কাজের সুযোগ সৃষ্টি, শ্রমিকদের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ (যেমন প্রতিবন্ধী গোষ্ঠী) অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।

নতুন ও উদ্ভাবনী নীতির সুযোগও রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বিশ্বের দেশগুলো তাদের উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে জাতীয় কর্মসংস্থান কৌশলকে রাখতে পারে। দীর্ঘদিন কর্মসংস্থান বিষয়টি উন্নয়ন আলোচনার বাইরে ছিল—এখন সময় এটিকে আবার উন্নয়ন আলাপের কেন্দ্রস্থলে আনার।

তেমনিভাবে বহুদিন ধরে আমরা প্রবৃদ্ধিনির্ভর কর্মসংস্থানের ওপর নির্ভর করেছি। কিন্তু বহু দেশে সমাজে সে কৌশলটি সফল হয়নি; বরং ‘কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধি’ দেখা গেছে। তাই প্রবৃদ্ধিনির্ভর কর্মসংস্থানের বদলে কর্মসংস্থাননির্ভর প্রবৃদ্ধির কথা ভাবা উচিত—যেখানে দরিদ্র মানুষের বসবাসের জায়গায় উৎপাদনশীল ও উপযুক্ত মজুরির কাজ সৃষ্টি হবে, যা চাহিদা বাড়াবে এবং আরও কাজ সৃষ্টি করবে, ফলে কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির একটি ইতিবাচক ঊর্ধ্বমুখী চক্র তৈরি হবে।

প্রচলিতভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একমাত্র লক্ষ্য থাকে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু তারা দ্বৈত লক্ষ্য—মুদ্রাস্ফীতি ও কর্মসংস্থান—নির্ধারণের কথা ভাবতে পারে। এতে আর্থিক নীতি ও রাজস্ব নীতি একসঙ্গে কাজ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে।

নমনীয় কর্মব্যবস্থা ও মাতৃত্ব-পিতৃত্বকালীন ছুটি নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে। একইভাবে ভবিষ্যতের কাজের জন্য উপযুক্ত শিক্ষা ও দক্ষতা প্রয়োজন, কারণ ভবিষ্যতের কাজ অতীতের জ্ঞান দিয়ে করা সম্ভব নয়। যদি বিশ্বের ছয়টি দেশ—ব্রাজিল, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও যুক্তরাষ্ট্র—প্রতিবছর তাদের জাতীয় আয়ের মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ করে, তাহলে ১ কোটি ৪০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।

আজ আমরা একটি অসম, অস্থিতিশীল এবং অবজায়ক্ষম বিশ্বে বাস করছি। এই বিশ্বের অস্থিতিশীলতার উৎস হতে পারে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক ও আর্থিক সংকট বা সহিংস উগ্রবাদ। আমাদের পৃথিবীর বজায়ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা নিয়েও ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। এসব অন্তরায় মোকাবিলায় কাজ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সেই কাজ হতে হবে মানসম্মত, টেকসই, সমতাবর্ধক, যে কাজ শ্রমিকের অধিকারকে সম্মান করে এবং তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

সেলিম জাহান  জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন কার্যালয়ের সাবেক পরিচালক

* মতামত লেখকের নিজস্ব