
বর্তমান দুনিয়ার সবচেয়ে বড় আসর বিশ্বকাপ ফুটবল। বিশ্বকাপ এতটাই আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু যে যুদ্ধের মতো বিষয়কেও তা ছাপিয়ে যায়। এর চেয়ে বড় বৈশ্বিক আসরের কথা চিন্তাও করা যায় না। অথচ দুনিয়ার ৪৮টা দেশ এই চলমান টুর্নামেন্টে অংশ নিলেও অংশ নিতে পারছে না পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল দুটি দেশ ভারত আর চীন। যদিও এই দুই দেশে বিশ্বকাপ নিয়ে মাতামাতির অভাব নেই।
বিশ্বকাপের ধারেকাছেও নেই অষ্টম জনবহুল দেশ বাংলাদেশ। দেশটির জন্য অবশ্য আরেকটা বড় লজ্জা আছে, বাংলাদেশ হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় মানুষের দেশ, যারা কখনো অলিম্পিকে একটা পদকও জেতেনি। অথচ দেড় লাখ লোকের কুরাসাও বিশ্বকাপ খেলে, মাত্র ৩৪ হাজার লোকের দেশ স্যান ম্যারিনো অলিম্পিকে পদক পেয়েছে।
আধুনিক যুগে একটা দেশের শ্রেষ্ঠত্বের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি খেলাধুলা। কেবল যে পদক জেতা বা বড় আসরে খেলা তা-ই না, খেলাধুলা জাতি গঠনে ও পরিচয় নির্মাণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। পরিসংখ্যান বলে যে খেলাধুলার অর্জনের দিক দিয়ে বাংলাদেশ তলানির দিকে। অথচ এই বিপুল জনসংখ্যার দেশে ফুটবল নিয়ে মাতামাতির শেষ নেই।
বিশ্বকাপ এলেই গোটা দেশ ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনায় ভাগ হয়ে যায়, বড় বড় পতাকায় ছেয়ে যায়। খোদ আর্জেন্টিনার চেয়ে এই দেশে আর্জেন্টাইন সমর্থক বেশি, হয়তো পাগলামিও। কিন্তু বাংলাদেশ কেন বিশ্বকাপ খেলতে পারে না? অতি সংক্ষেপে আলাপ করা যাক।
ইউরোপে ফুটবলের উত্থান হয়েছে শিল্পবিপ্লবের পর জমি থেকে উচ্ছেদ হয়ে জীবিকার খোঁজে শহরে যাওয়া শ্রমিক শ্রেণির হাত ধরে। নিজেদের পরিচয় খোঁজার তাড়নায় ক্লাব গঠন করেছে অথবা বিভিন্ন ক্লাবের সমর্থক হয়েছে। এশিয়ার দেশগুলো ঐতিহাসিকভাবেই ছিল কৃষিভিত্তিক। একটা সময় একটা বড় অংশের মানুষ শহরে এসেছেন, কিন্তু তাঁরা শহুরে হননি বরং গভীরভাবে নিজেদের গ্রামীণ শিকড় বজায় রেখেছেন।
ফলে ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার যে ঢল দেখা যায়, সেই সব মানুষ শহুরে ক্লাবের সঙ্গে তেমন শক্তভাবে একাত্ম হননি। পশ্চিমবঙ্গে ইস্ট বেঙ্গল, মোহনবাগান আর মোহামেডান ঘিরে যে আত্মপরিচয়ের টান, সেটা হয়েছে দেশভাগের মতো ঘটনার কারণে।
এখন আমরা বাংলাদেশের দিকে তাকাই? বাংলাদেশের একটা তরুণ কোন ভরসায় ফুটবলে মনোযোগ দেবে? ফুটবল কি তাঁকে জীবিকার নিরাপত্তা দেবে? গরিব ছেলেদের যতই প্রতিভা থাক, ওদের এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা আর বিনিয়োগ কই? প্রতিষ্ঠানই-বা কই? ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা নিয়ে ক্ষণিকের উত্তেজনা দেখিয়ে আবার উপার্জনের খোঁজে যাওয়াটাই তো এঁদের একমাত্র উপায়।
প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশে তো আবাহনী আর মোহামেডান নিয়ে উত্তেজনা ছিল। তা কেন মিইয়ে গেল? প্রথমত, এই উত্তেজনা এমন এক সময়ের গল্প, যখন সংস্কৃতি আর রাজনীতিটা নিয়ন্ত্রণ করতেন মধ্যবিত্ত। নব্বইয়ের দশকের পর নিওলিবারেলিজমের আবির্ভাবে মধ্যবিত্ত এই নিয়ন্ত্রণ হারাল। আর ঢাকা শহর সামষ্টিক পরিচয় হারিয়ে ফেলল।
খেলার মাঠ, সিনেমা হল, পাবলিক লাইব্রেরি কিংবা এলাকার পার্কগুলো পরিণত হলো বুনো পুঁজিবাদের শিকারে। এর সঙ্গে যুক্ত হলো রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন। ফলে যেই ক্লাবের খেলা দেখতে একসময় নারী, শিশুরাও যেত, সেই ক্লাবগুলো হয়ে গেল রাজনৈতিক দখলদারি আর জুয়া খেলার জায়গা। দ্বিতীয়ত, আবাহনী আর মোহামেডান ছিল অনেকটাই উসকে দেওয়া উত্তেজনা। এদের বাইরে সত্যিকারের ক্লাব সংস্কৃতি এ দেশে গড়েই ওঠেনি।
ভারতের মতো বাংলাদেশও ফুটবলের বদলে ক্রিকেটের দিকে ঝুঁকে গেল এই শতকের গোড়ার দিকে। জনসংখ্যা বাদে অন্য সবকিছুতে পিছিয়ে থাকা, প্রায় ক্ষমতাহীন দক্ষিণ এশিয়ার যে গুটিকয় জায়গায় আধিপত্য তার একটা হলো ক্রিকেট। এই কারণে বাংলাদেশ গুরুত্ব পেল। যদিও এই দেশে ক্রিকেটের চেয়ে ফুটবল বরাবরই এগিয়ে ছিল, পাকিস্তান আমলে জাতীয় দল হতো পূর্ব অংশের খেলোয়াড়দের দিয়েই, কিন্তু ক্রিকেটের ধাক্কায় ফুটবল পিছিয়ে গেল।
স্বাধীনতার পর এ অঞ্চলে ফুটবল নিয়ে রাষ্ট্রীয় বা বাণিজ্যিকভাবে বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সবাই ব্যস্ত ছিল ফুটবলের উন্মাদনার ফলটা ভোগ করতে, কিন্তু সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশিদের কাঠামো নির্মাণ ও দীর্ঘ পরিকল্পনার যে অভাব তার প্রভাব ছিল ফুটবলেও। সবকিছু থেকেই রাজনৈতিক ফায়দা এবং লুটপাটের ব্যাপার তো ছিলই।
ফুটবল যখন ধুঁকছে তখন ক্রিকেট হাজির হলো দমকা বাতাস হয়ে। এই দেশের বিপুল জনসংখ্যা ক্রিকেট-বাণিজ্যের বড় লক্ষ্যবস্তু হলো, আর ক্রিকেটটা ঠিক ক্লাবভিত্তিক খেলা না বরং একটা এলিট খেলা। গত শতকের শেষের দিকে তা হলো জাতীয়তাবাদী প্রজেক্ট। ভারতের মতো বাংলাদেশও এই সুযোগ লুফে নিল।
এমন না যে ঘরোয়া ক্রিকেট দেখতে বাংলাদেশিরা মাঠে যায় বা ক্রিকেটের সৌন্দর্যে বেশির ভাগ বিমোহিত হয়। বরং খেলাধুলার দুনিয়ায় কোনো স্থান না পাওয়া এই দেশের মানুষ জাতীয়তাবাদে বুঁদ হয়ে ক্রিকেটকে বেছে নিল, যা একসময় এই দেশে গুটিকয় অভিজাতের খেলা ছিল।
আবার মূল প্রশ্নে ফিরে আসি। ফুটবলের উন্নতি কি কেবল ক্লাব সংস্কৃতি আর দীর্ঘকালের ঐতিহ্য দিয়েই হয়? না। ভারত বা চীনের উদাহরণে স্পষ্ট যে ঐতিহ্য খুব জরুরি। কিন্তু ফুটবল রোমান্টিকদের সবচেয়ে প্রিয় উদাহরণ ব্রাজিলও দেখায় যে ফুটবলের জন্য দরকার বিপুল বিনিয়োগ ও প্রণোদনা।
১৯৫০ সালে মারাকানা ট্র্যাজেডির পর ব্রাজিল ঠিক তাই করে। যদিও বলা হয়, ব্রাজিলের ফাভোলা বা বস্তিতে বেড়ে ওঠা শিশুরা জীবনযাপনের কারণেই তুখোড় ফুটবলার হয়, কিন্তু ব্রাজিলের পরবর্তীকালে দুনিয়ার সেরা দল হয়ে ওঠার একটা বড় কারণ বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা। ব্রাজিলের এই বিশাল পরিকল্পনা নিয়ে গাদা গাদা বই লেখা হয়েছে।
গত কয়েক দশকে এই কাজটি করছে একদা ঐতিহ্য না থাকা এশিয়া ও আফ্রিকার দলগুলো। জাপানের গল্প তো প্রায় সবাই জানে, নতুন নতুন বিস্ময় হয়ে আসছে ভিয়েতনাম ও তাজিকিস্তানের মতো দল। ক্রীড়াবিজ্ঞানের আধুনিক প্রয়োগে শুধু যে ফুটবলের উন্নতি হচ্ছে তা-ই না, তরুণদের জীবনধারাও পরিবর্তিত হচ্ছে।
এখন আমরা বাংলাদেশের দিকে তাকাই? বাংলাদেশের একটা তরুণ কোন ভরসায় ফুটবলে মনোযোগ দেবে? ফুটবল কি তাঁকে জীবিকার নিরাপত্তা দেবে? গরিব ছেলেদের যতই প্রতিভা থাক, ওদের এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা আর বিনিয়োগ কই? প্রতিষ্ঠানই-বা কই? ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা নিয়ে ক্ষণিকের উত্তেজনা দেখিয়ে আবার উপার্জনের খোঁজে যাওয়াটাই তো এঁদের একমাত্র উপায়।
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, এই হতাশার মধ্যে দারুণ একটা আশার আলো আছে। আমাদের মেয়েরা। ছেলেরা যেই জায়গায় যাওয়ার স্বপ্নও দেখতে পারছে না, মেয়েরা সেখানে পৌঁছে গিয়েছে। সীমিত সুযোগ আর বিপুল সামাজিক বাধার পরেও ওরা এগিয়ে যাচ্ছে।
এর গভীরে অবশ্য অন্য একটা দুঃখের দিক আছে। আমাদের মেয়েরা আসছে কলসিন্ধুরের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে। বেশির ভাগ জায়গায় বঞ্চিত পাহাড়ি মেয়েরা নিজেদের উজাড় করে দিচ্ছে। তবে ফিফার প্রণোদনার লোভেই হোক আর প্রথম আলো কিংবা ব্র্যাকের মতো প্রতিষ্ঠানের আন্তরিকতাতেই হোক, এই মেয়েরা সামান্য হলেও কাঠামোগত প্রণোদনা পাচ্ছে। অল্প হলেও কোচিং পাচ্ছে, দুই বেলা খাবার পাচ্ছে। তাতেই ওরা তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে। ওদের সাফল্যেই আবার প্রমাণ হয় যে সঠিক পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও সদিচ্ছা জরুরি।
বাংলাদেশে হামজা চৌধুরীর মতো বিশ্বমানের খেলোয়াড়েরা দেশের হয়ে খেলার জন্য ফিরছেন। আমরা দেখছি প্রবাসীর সন্তানদের দেশে ফেরানোর এই মডেলে সফল হচ্ছে মরক্কোর মতো দল। তবে ক্লাবভিত্তিক বনিয়াদ আর দীর্ঘ পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ না থাকলে ফুটবল এগোয় না। মরক্কোও দীর্ঘদিন ধরে এই কাজটি করে সাফল্য পেয়েছে। প্রবাসীরাও ফিরছেন ওই প্রজেক্টের সফলতা দেখেই।
বাংলাদেশের সামনে অনেক উদাহরণ, অনেক কিছু পাওয়ার হাতছানি। কিন্তু কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় কি আমরা আদৌ হতে পারব? ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার বদলে কি নিজেদের পতাকা নিয়ে উচ্ছ্বাস করতে পারব পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আসরে?
সৈয়দ ফায়েজ আহমেদ ক্রীড়া বিশ্লেষক ও সাংবাদিক
মতামত লেখকের নিজস্ব