অভিমত–বিশ্লেষণ

ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা: স্বাস্থ্যে জবাবদিহি ও সুশাসনের নতুন অবকাঠামো

ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল লক্ষ্য মানুষকে সহজে, দ্রুত ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া। এটি কীভাবে স্বাস্থ্য খাতে জবাবদিহি ও সুশাসনের নতুন অবকাঠামো তৈরি করবে, তা নিয়ে লিখেছেন জিয়াউদ্দিন হায়দার

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের সামনে একদিকে রয়েছে বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত, সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ; অন্যদিকে রয়েছে সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ভবিষ্যৎ মহামারি ও উদীয়মান সংক্রামক রোগ মোকাবিলার সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রয়োজন।

এই চ্যালেঞ্জগুলোর অনেকগুলোর সমাধান শুধু নতুন হাসপাতাল নির্মাণ, চিকিৎসক নিয়োগ কিংবা নতুন যন্ত্রপাতি কেনার মাধ্যমে সম্ভব নয়। স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হলে আমাদের জানতে হবে কোথায় রোগী, কোথায় চিকিৎসক, কোথায় ওষুধ, কোথায় শয্যা খালি, কোথায় রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে, কোথায় অর্থ ব্যয় হচ্ছে এবং সেই ব্যয়ের বিপরীতে মানুষ কী সেবা পাচ্ছে। অর্থাৎ একটি আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো নির্ভরযোগ্য ও ‘রিয়েল-টাইম’ তথ্য। এই লক্ষ্য সামনে রেখে সরকার একটি সমন্বিত ‘জাতীয় ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে। এটি শুধু স্বাস্থ্য খাতের ডিজিটালাইজেশন নয়; বরং স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থাপনা, সুশাসন ও জবাবদিহির মৌলিক সংস্কার।

একটি ‘ব্রেন’, অসংখ্য সেবার সংযোগ

প্রস্তাবিত ব্যবস্থাটির দুটি প্রধান অংশ থাকবে। প্রথম অংশটি হবে একটি কেন্দ্রীয় ‘ডিজিটাল আর্কিটেকচার’ বা ‘ব্রেন’। এটি হবে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার ‘ডিজিটাল মেরুদণ্ড’। বিভিন্ন সেবা, প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকর্মী এবং নাগরিকের স্বাস্থ্য–সংক্রান্ত তথ্য নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিতভাবে এই আর্কিটেকচারের সঙ্গে সংযুক্ত হবে।

দ্বিতীয় অংশে থাকবে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। এর আওতায় পর্যায়ক্রমে প্রত্যেক নাগরিকের জন্য ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য কার্ড, ব্যক্তির চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য–সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণের জন্য ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড, এক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে রোগী পাঠানোর জন্য ইলেকট্রনিক রেফারেল ব্যবস্থা, ওষুধ ব্যবস্থাপনার জন্য ফার্মেসি পোর্টাল, রোগনির্ণয় ও পরীক্ষার তথ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ল্যাবরেটরি পোর্টাল, হাসপাতাল ও অন্যান্য স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের সার্বিক ব্যবস্থাপনার জন্য প্রশাসনিক পোর্টাল এবং জরুরি রোগী পরিবহন ও সেবার সমন্বয়ের জন্য অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি সেবা প্ল্যাটফর্ম অন্তর্ভুক্ত থাকবে। পাশাপাশি প্রয়োজন ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যান্য সেবাকেও পর্যায়ক্রমে এই সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে।

এর ফলে একজন নাগরিক দেশের যেখানেই সরকারি স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করুন না কেন, অনুমোদিত স্বাস্থ্যসেবাদাতা প্রয়োজন অনুযায়ী তাঁর প্রাসঙ্গিক স্বাস্থ্যতথ্য দেখতে পারবেন। রোগীকে প্রতিবার নতুন করে নিজের চিকিৎসার ইতিহাস বলতে হবে না, অপ্রয়োজনীয়ভাবে একই পরীক্ষা বারবার করার প্রবণতা কমবে এবং রেফারেল হবে আরও কার্যকর।

পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার বকুলবাড়ি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র

হেলথ কার্ড হবে নাগরিকের ‘মাদার কার্ড’

প্রস্তাবিত ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে প্রত্যেক নাগরিকের জন্য একটি ইলেকট্রনিক হেলথ কার্ড, যা স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে নাগরিকের ‘মাদার কার্ড’ হিসেবে কাজ করবে। জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধনসহ সরকারের বিদ্যমান তথ্যভান্ডারের সঙ্গে নিরাপদ ও আইনসম্মত সংযোগের মাধ্যমে এই কার্ড তৈরি করা হবে; ফলে একই তথ্য বারবার সংগ্রহের প্রয়োজন হবে না এবং প্রত্যেক নাগরিকের জন্য একটি স্বতন্ত্র স্বাস্থ্য পরিচিতি গড়ে উঠবে।

জন্মের পর থেকেই একজন নাগরিকের টিকাদান, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা, রোগনির্ণয়, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ব্যবস্থাপত্র, হাসপাতালে ভর্তি, রেফারেল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনাসহ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যতথ্য পর্যায়ক্রমে এই পরিচিতির সঙ্গে যুক্ত হবে। ফলে দেশের যেকোনো অনুমোদিত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান থেকে সেবা গ্রহণের সময় তাঁর প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যতথ্য নিরাপদভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। দেশের প্রায় ১৮ থেকে ২০ কোটি মানুষের স্বাস্থ্যতথ্য ধারণকারী এই ব্যবস্থা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় তথ্য অবকাঠামোতে পরিণত হবে।

আমাদের লক্ষ্য শুধু একটি ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা তৈরি করা নয়; এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের সেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত হবে, প্রতিটি সেবা অনুসরণযোগ্য হবে, প্রতিটি সম্পদের ব্যবহার যাচাই করা যাবে এবং প্রতিটি পর্যায়ে জবাবদিহি থাকবে।

রোগী ঘুরবে না, তথ্য যাবে

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা হলো কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থার অভাব। ফলে রোগীরা প্রায়ই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এড়িয়ে সরাসরি জেলা, মেডিক্যাল কলেজ বা বিশেষায়িত হাসপাতালে যান, যা উচ্চতর হাসপাতালগুলোতে অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে রোগীকে চিকিৎসার কাগজপত্র ও পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে ঘুরতে হয়, অনেক ক্ষেত্রে একই পরীক্ষা পুনরায় করতে হয় এবং চিকিৎসার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়।

প্রস্তাবিত ইলেকট্রনিক রেফারেল ব্যবস্থা এই চিত্র বদলে দেবে। মূলনীতি হবে—‘রোগী তথ্য নিয়ে ঘুরবে না; প্রয়োজনীয় তথ্য নিরাপদভাবে রোগীর সঙ্গে যাবে।’ রোগীকে রেফার করার সময় তাঁর প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যতথ্য, পরীক্ষার ফলাফল ও রেফারেলের কারণ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ডিজিটালি পৌঁছে যাবে। একই সঙ্গে কোথায় প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ, শয্যা ও চিকিৎসাসেবা পাওয়া যাচ্ছে তা জেনে রোগীকে সঠিক প্রতিষ্ঠানে পাঠানো সম্ভব হবে। উচ্চতর প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা শেষে প্রয়োজনীয় তথ্য আবার স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ফিরে আসবে, যাতে সেখানেই ফলোআপ ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা অব্যাহত রাখা যায়। এভাবে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবার মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি হবে—রোগী সঠিক সময়ে, সঠিক প্রতিষ্ঠানে, সঠিক সেবা পাবেন।

শয্যা না পেয়ে রোগীরা জায়গা নিয়েছেন ওয়ার্ডের মেঝেতে। সেখানে নেই ফ্যান। গরমে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন রোগী ও তাঁর স্বজনেরা। নেই চলাচলের রাস্তাও। জামালপুর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে গতকাল

রোগের আগাম সংকেত ও স্বাস্থ্যনিরাপত্তা

কোভিড-১৯ আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে—মহামারি মোকাবিলায় সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি হলো সময়মতো সঠিক তথ্য। কোনো সংক্রামক রোগ কোথায়, কত দ্রুত এবং কোন জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়াচ্ছে তা যত আগে শনাক্ত করা যায়, তত দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে সংক্রমণ ও মৃত্যু কমানো সম্ভব। ডেঙ্গু, হাম, নিপাহ, ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ ভবিষ্যতের নতুন বা পুনরায় উদীয়মান সংক্রামক রোগ মোকাবিলায়ও এই সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রস্তাবিত ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা দেশের হাসপাতাল, ল্যাবরেটরি, ফার্মেসি এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের তথ্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করবে। ফলে কোনো এলাকায় জ্বর, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, অস্বাভাবিক মৃত্যু কিংবা নির্দিষ্ট রোগের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেলে তা দ্রুত শনাক্ত করে আগাম সতর্কসংকেত দেওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে রোগের বিস্তার পর্যবেক্ষণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ এবং প্রয়োজনীয় জনবল, ওষুধ, টিকা ও অন্যান্য সম্পদ দ্রুত মোতায়েনে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে। তাই এই ডিজিটাল ব্যবস্থা শুধু ব্যক্তির চিকিৎসার তথ্য সংরক্ষণের প্ল্যাটফর্ম নয়; এটি হবে বাংলাদেশের রোগ নজরদারি, মহামারি প্রস্তুতি ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যনিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো।

অপচয় ও দুর্নীতি কমাতে নজরদারি

স্বাস্থ্য খাতে অর্থ ও সম্পদের অপচয়, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, একই পণ্য ক্রয়ে অস্বাভাবিক মূল্য পার্থক্য এবং মজুত ও বিতরণে অসংগতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে। প্রযুক্তি একা দুর্নীতি দূর করতে পারে না, তবে একটি সমন্বিত ও স্বচ্ছ ডিজিটাল ব্যবস্থা অনিয়ম, অপচয় ও দুর্নীতির সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিতে পারে।

কোন হাসপাতালে কত ওষুধ ও সরঞ্জাম সরবরাহ করা হলো, কতটুকু ব্যবহৃত হলো এবং কতটুকু মজুত আছে; কোন পরীক্ষাগারে কতটি পরীক্ষা হলো; কোন অ্যাম্বুলেন্স কোথায় ও কী কাজে ব্যবহৃত হলো; কোন প্রতিষ্ঠান কত রোগীকে কী ধরনের সেবা দিল—এসব তথ্যের ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষিত থাকলে অর্থ ও সম্পদের ব্যবহার সহজেই অনুসরণ ও যাচাই করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ক্রয়, সরবরাহ, মজুত, ব্যবহার ও সেবা প্রদানের বিভিন্ন পর্যায়ে অস্বাভাবিকতা দ্রুত শনাক্ত করা যাবে এবং নিরীক্ষা ও তদারকি আরও কার্যকর হবে।

ফলে প্রস্তাবিত ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা শুধু সেবা প্রদানের দক্ষতা বাড়াবে না; এটি অপচয় ও অনিয়ম কমিয়ে স্বচ্ছতা, সুশাসন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে।

পুরোনো সবকিছু বাতিল নয়

বাংলাদেশে ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থার যাত্রা শূন্য থেকে শুরু হচ্ছে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরসহ স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ইতিমধ্যে একাধিক তথ্যব্যবস্থা চালু রয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য এসব ব্যবস্থা নির্বিচার বাতিল করে নতুন কোনো ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং বিদ্যমান গুরুত্বপূর্ণ তথ্যব্যবস্থাগুলোর কারিগরি সক্ষমতা, কার্যকারিতা, নিরাপত্তা ও ব্যবহারযোগ্যতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা হবে।

যেসব ব্যবস্থা কার্যকর ও নিরাপদ এবং নতুন জাতীয় ডিজিটাল কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয়যোগ্য, সেগুলোকে প্রয়োজনীয় উন্নয়নের মাধ্যমে মূল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হবে। একই ধরনের একাধিক ব্যবস্থার অপ্রয়োজনীয় পুনরাবৃত্তি থাকলে তা যৌক্তিকভাবে সমন্বয় করা হবে এবং যেখানে ঘাটতি রয়েছে, সেখানে দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন ডিজিটাল সমাধান তৈরি করা হবে।

ব্রেন’ থাকবে সরকারের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে

জাতীয় ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল ডিজিটাল অবকাঠামো বা ‘ব্রেন’ হবে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব সম্পদ এবং এর মেধাস্বত্বও সরকারের কাছেই থাকবে। কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠান বা বেসরকারি প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের ওপর স্থায়ীভাবে নির্ভরশীল না হয়ে একটি নিবেদিত দেশীয় সফটওয়্যার প্রকৌশলী দল এই ব্যবস্থার নির্মাণ, উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে। এর জাতীয় পর্যায়ের কৌশলগত তত্ত্বাবধান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে; আর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং এর অধীন বিভিন্ন অধিদপ্তর স্বাস্থ্যসেবা ও ব্যবস্থাপনা–সংক্রান্ত প্রয়োজন নির্ধারণ, ব্যবহার এবং বাস্তবায়নে মূল ভূমিকা পালন করবে।

প্রায় ১৮-২০ কোটি মানুষের স্বাস্থ্যতথ্য ধারণকারী এই ব্যবস্থা হবে দেশের সবচেয়ে বৃহৎ ও সংবেদনশীল জাতীয় তথ্যভান্ডারগুলোর একটি। তাই এর নকশা তৈরির প্রথম দিন থেকেই ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা, ব্যবহারকারীর দায়িত্বভিত্তিক প্রবেশাধিকার, তথ্যের সাংকেতিক সুরক্ষা, প্রতিটি তথ্য ব্যবহারের অনুসরণযোগ্য রেকর্ড, নিয়মিত নিরাপত্তা যাচাই, দুর্যোগকালীন তথ্য সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারব্যবস্থা এবং শক্তিশালী তথ্য-সুশাসন কাঠামো নিশ্চিত করা হবে।

ছয় জেলায় পরীক্ষামূলক যাত্রা

এত বড় ও জটিল একটি জাতীয় ব্যবস্থা একযোগে সারা দেশে চালু করা বাস্তবসম্মত নয়। তাই আমাদের কৌশল হবে—প্রথমে তৈরি, সীমিত পরিসরে পরীক্ষা, অভিজ্ঞতা থেকে শেখা এবং তারপর ধাপে ধাপে সম্প্রসারণ। বাংলাদেশ সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে বর্তমানে অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন একটি প্রকল্পকে এই উদ্যোগের প্রাথমিক অর্থায়নের প্রধান ভিত্তি হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম পর্যায়ে বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, নরসিংদী, ঝালকাঠি, নোয়াখালী ও খুলনা—এই ছয় জেলায় জাতীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্য অবকাঠামো এবং এর সঙ্গে যুক্ত সেবা প্ল্যাটফর্ম পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হবে।

এই ছয় জেলা হবে আমাদের পরীক্ষা ও শেখার ক্ষেত্র, যেখানে প্রযুক্তির কার্যকারিতার পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ব্যবহারযোগ্যতা, রোগীর উপকারিতা, রেফারেল ব্যবস্থার কার্যকারিতা, তথ্যের মান ও নির্ভুলতা এবং দ্রুত তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা যাচাই করা হবে।

গড়ে উঠবে বাংলাদেশের নিজস্ব ব্যবস্থা

এই উদ্যোগের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের নিজস্ব প্রযুক্তিগত, জনস্বাস্থ্য ও ডিজিটাল স্বাস্থ্য সক্ষমতা গড়ে তোলা। দেশে যেমন দক্ষ সফটওয়্যার প্রকৌশলী, ডেটা বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ডিজিটাল স্বাস্থ্য পেশাজীবী রয়েছেন, তেমনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি প্রযুক্তিবিদ ও স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ উচ্চপর্যায়ে কাজ করছেন। আমরা এমন একটি জাতীয় প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে চাই, যেখানে দেশের ও প্রবাসের এই মেধা একসঙ্গে কাজ করবে এবং দীর্ঘ মেয়াদে দেশের ভেতরেই প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তুলবে।

আমাদের লক্ষ্য শুধু একটি ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা তৈরি করা নয়; এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের সেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত হবে, প্রতিটি সেবা অনুসরণযোগ্য হবে, প্রতিটি সম্পদের ব্যবহার যাচাই করা যাবে এবং প্রতিটি পর্যায়ে জবাবদিহি থাকবে। এই ব্যবস্থা সেবার মান ও দক্ষতা বাড়াবে, অপচয় ও দুর্নীতির সুযোগ কমাবে এবং ভবিষ্যৎ মহামারি মোকাবিলায় দেশের সক্ষমতা শক্তিশালী করবে। প্রযুক্তি হবে বাংলাদেশের, তথ্যের নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ থাকবে বাংলাদেশের হাতে, আর সক্ষমতা গড়ে উঠবে আমাদের নিজেদের মেধায়।

  • ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা

    মতামত লেখকের নিজস্ব