
বাংলাদেশে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হওয়া পাবলিক পরীক্ষাগুলোর মধ্যে এসএসসি ও এইচএসসি নিঃসন্দেহে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এর পাশাপাশি দাখিল, আলিম, কারিগরি পরীক্ষাও লাখো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।
যদিও দেশে ইংরেজি মাধ্যমসহ বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা রয়েছে, তবু সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষার্থী এই জাতীয় পাবলিক পরীক্ষার মাধ্যমেই উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের পথে এগিয়ে যায়।
ফলে এই পরীক্ষাগুলোর ফলাফল কেবল একটি বছরের মূল্যায়ন নয়; বরং তা একজন শিক্ষার্থীর পুরো জীবনের পরিচয়পত্রে পরিণত হয়।
কিন্তু আমাদের বর্তমান পরীক্ষাব্যবস্থায় একটি মৌলিক প্রশ্ন নতুন করে তোলা দরকার। কোনো শিক্ষার্থী যদি একটি বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়, তাহলে তাকে কেন পরবর্তী পরীক্ষার জন্য পুরো এক বছর অপেক্ষা করতে হবে?
এই এক বছরের অপেক্ষা কি সত্যিই শিক্ষার মান নিশ্চিত করে, নাকি এটি আমাদের তরুণ জনশক্তির মূল্যবান সময়ের অপচয় ঘটায়?
একজন শিক্ষার্থীর জীবনে খারাপ দিন আসতেই পারে। অসুস্থতা, মানসিক চাপ, পারিবারিক সংকট, দুর্ঘটনা কিংবা অন্য কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির কারণে সে নির্দিষ্ট একটি পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল করতে না–ও পারে।
একটি দিনের দুর্বল পারফরম্যান্স কি তার পুরো বছরের পরিশ্রমকে অস্বীকার করতে পারে? আরও বড় প্রশ্ন হলো, সেই একটি দিনের ব্যর্থতার জন্য তার জীবন থেকে একটি সম্পূর্ণ বছর কেড়ে নেওয়া কতটা ন্যায়সংগত?
শিক্ষাব্যবস্থার উদ্দেশ্য শাস্তি দেওয়া নয়; বরং শেখার সুযোগ তৈরি করা। একজন শিক্ষার্থী যদি কোনো বিষয়ে দুর্বল হয়, তাহলে তাকে দ্রুত পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ দেওয়াই হওয়া উচিত আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য।
অথচ আমাদের দেশে একজন অকৃতকার্য শিক্ষার্থীকে দীর্ঘ এক বছর অপেক্ষা করতে হয়। এই সময়ে তার সহপাঠীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, নতুন জীবনে প্রবেশ করে, আর সে মানসিকভাবে পিছিয়ে পড়ে।
অনেক ক্ষেত্রে এই অপেক্ষা হতাশা, আত্মবিশ্বাসহীনতা ও পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার মতো নেতিবাচক প্রবণতাও তৈরি করে।
বিশ্বের অনেক দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এ ক্ষেত্রে অনেক বেশি নমনীয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোনো কোর্সে অকৃতকার্য হলে নির্দিষ্ট সময় পর পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মান নির্ধারণী পরীক্ষায়, যেমন আইইএলটিএস, টোফেল বা এসএটি—পরীক্ষার্থী চাইলে একাধিকবার পরীক্ষা দিতে পারে।
সেখানে লক্ষ্য থাকে একজন শিক্ষার্থীর সর্বশেষ সক্ষমতা যাচাই করা, অতীতের একটি ভুলকে চিরস্থায়ী শাস্তিতে পরিণত করা নয়।
অবশ্যই এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার কাঠামো আন্তর্জাতিক ভাষাদক্ষতা পরীক্ষার মতো নয়। এখানে নিরাপত্তা, প্রশ্নপত্র প্রস্তুতি, প্রশাসনিক ব্যয় ও পরীক্ষার নিরপেক্ষতা—এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।
তাই একই ব্যবস্থা হুবহু অনুসরণ করা সম্ভব না–ও হতে পারে। কিন্তু তাই বলে একটি বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীকে এক বছর অপেক্ষা করানোই একমাত্র পথ—এমন ধারণারও কোনো যৌক্তিকতা নেই।
প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান যুগে বছরে একাধিকবার সীমিত পরিসরে রিটেক বা সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা আয়োজন করা অসম্ভব নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো আন্তর্জাতিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে আমাদের পরীক্ষা ও ভর্তি ক্যালেন্ডারের অসামঞ্জস্য। বাংলাদেশে অনেক সময় পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল এমন সময় প্রকাশিত হয়, যখন বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে।
ফলে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেলেও কেবল সময়ের অসামঞ্জস্যের কারণে ছয় মাস থেকে এক বছর অপেক্ষা করতে বাধ্য হয়।
এটি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; বরং দেশের জন্যও সম্ভাবনাময় মানবসম্পদের অপচয়।
আমাদের দেশে ভর্তি পরীক্ষায় এসএসসি ও এইচএসসির ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে জিপিএর ভিত্তিতে আবেদন করার যোগ্যতাই নির্ধারিত হয়। অর্থাৎ একটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া বা প্রত্যাশার চেয়ে কম নম্বর পাওয়া একজন শিক্ষার্থীর সামনে বহু দরজা বন্ধ করে দিতে পারে।
প্রশ্ন হলো, একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত মেধা কি একটি মাত্র পরীক্ষার একটি দিনের ফলাফল দিয়ে বিচার করা উচিত? নাকি তাকে নিজের সক্ষমতা প্রমাণের আরেকটি ন্যায্য সুযোগ দেওয়া উচিত?
এখানে আরেকটি বিষয় বিবেচনা করা জরুরি। আমরা প্রায়ই বলি, তরুণেরাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
কিন্তু বাস্তবে যদি একজন তরুণকে প্রশাসনিক কাঠামোর কারণে এক বছর বসিয়ে রাখা হয়, তাহলে সেটি কি এই সম্পদের যথাযথ ব্যবহার?
একটি বছর শুধু ক্যালেন্ডারের বারো মাস নয়; এটি একটি শিক্ষাজীবন, একটি কর্মজীবন এবং অনেক ক্ষেত্রে একটি পরিবারের স্বপ্নের সঙ্গে জড়িত।
এ কারণে এখন সময় এসেছে আমাদের পাবলিক পরীক্ষাব্যবস্থা নতুনভাবে মূল্যায়ন করার। প্রয়োজনে বছরে নির্দিষ্ট সময়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য দ্রুত সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা চালু করা যেতে পারে।
যারা নিজেদের ফল আরও উন্নত করতে চায়, তাদের জন্যও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ইমপ্রুভমেন্ট পরীক্ষার সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে।
সার্টিফিকেটে প্রয়োজনে উল্লেখ থাকতে পারে যে ফলাফলটি রিটেক পরীক্ষার মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে। এতে স্বচ্ছতাও বজায় থাকবে, আবার একজন শিক্ষার্থীর জীবন থেকেও একটি মূল্যবান বছর হারিয়ে যাবে না।
পরীক্ষার মান যেন কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু সংস্কারের ভয় দেখিয়ে বর্তমান ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে চিরস্থায়ী করে রাখারও সুযোগ নেই। আধুনিক বিশ্বে শিক্ষাব্যবস্থার মূল দর্শন হলো সুযোগ, সংশোধন ও অগ্রগতি। একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত পরিচয় তার একটি খারাপ দিন নয়; বরং তার শেখার ক্ষমতা, অধ্যবসায় ও ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি।
এ ধরনের সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অবশ্যই শিক্ষাবিদ, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা বোর্ড, প্রশাসন ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বিস্তৃত আলোচনা প্রয়োজন।
পরীক্ষার মান যেন কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু সংস্কারের ভয় দেখিয়ে বর্তমান ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে চিরস্থায়ী করে রাখারও সুযোগ নেই। আধুনিক বিশ্বে শিক্ষাব্যবস্থার মূল দর্শন হলো সুযোগ, সংশোধন ও অগ্রগতি।
একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত পরিচয় তার একটি খারাপ দিন নয়; বরং তার শেখার ক্ষমতা, অধ্যবসায় ও ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যদি সেই দ্বিতীয় সুযোগটুকু না দেয়, তাহলে আমরা শুধু একজন শিক্ষার্থীকে নয়, একটি সম্ভাবনাকেও হারাই।
সময় এসেছে প্রশ্ন করার—একটি বিষয়ে ব্যর্থতার জন্য একজন তরুণকে এক বছর অপেক্ষা করানো কি সত্যিই শিক্ষার স্বার্থে, নাকি এটি কেবল একটি পুরোনো ব্যবস্থার অবশিষ্ট রীতি? উত্তর খুঁজতে হবে এখনই।
কারণ, শিক্ষা এমন একটি ব্যবস্থা হওয়া উচিত, যা শিক্ষার্থীর পথ সহজ করে, অযৌক্তিকভাবে দীর্ঘ নয়; যা সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়, অকারণে বন্ধ করে না।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে এসএসসি, এইচএসসি এবং অন্যান্য সমমানের পাবলিক পরীক্ষায় দ্রুত রিটেক ও সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষার সুযোগ চালু করার বিষয়ে এখনই জাতীয় পর্যায়ে একটি আন্তরিক আলোচনা শুরু হওয়া উচিত।
এটি শুধু শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার নয়, বরং দেশের তরুণ প্রজন্মের সময়, মেধা ও ভবিষ্যতের প্রতি একটি ন্যায়সংগত বিনিয়োগ।
মো. ইমরান আহম্মেদ, লেখক ও গবেষক। ই–মেইল: emranahmmed1991@gmail.com
মতামত লেখকের নিজস্ব