ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-এর সমর্থকেরা।
ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-এর সমর্থকেরা।

মতামত

মোদি অবশেষে বুঝলেন দম্ভের চেয়ে কাণ্ডজ্ঞান বেশি কাজে দেয়

ছাত্রদের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ আন্দোলনের সাফল্য আজকের ভারতের অবস্থা সম্পর্কে আমাদের কী বলে? এ নিয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। তবে কিছু প্রাথমিক বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

প্রথমেই বলতে হয়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বিভিন্ন জরিপ বারবারই দেখিয়েছে, তিনি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা। কিন্তু তাঁর ক্ষমতার উৎস একটাই নয়।

একদিকে অনেক মানুষ তাঁকে ভালোবাসে, অন্যদিকে যারা তাঁকে ভালোবাসে না, তাদের মধ্যে ভয়ের অনুভূতিও আছে। সঠিক হোক বা ভুল, একটি ধারণা তৈরি হয়েছে—সরকারের বিরোধিতা করলে তার কঠিন মূল্য দিতে হতে পারে।

গ্রেপ্তার, অভিযান, জামিন ছাড়াই কারাবাস, চাকরির জায়গা থেকে চাপ, এমনকি পুলিশের নির্যাতন—এসব আশঙ্কা মানুষের মনে কাজ করে।

এখনো বলা যাবে না যে এই ভয় পুরোপুরি কেটে গেছে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি গোলিয়াথকেই একজন ডেভিডের মুখোমুখি হতে হয়।

এই আন্দোলনের সময় প্রতিদিনই প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে স্লোগান দেওয়া হয়েছে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে।

সাধারণত সতর্ক ও সংযত থাকা পত্রিকাগুলোও এই আন্দোলনকে বড়ভাবে তুলে ধরেছে এবং সম্পাদকীয়তেও সরকারের সমালোচনা করেছে।

১৫ বছর আগে এ ধরনের ঘটনা তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হতো না। দিল্লির আন্দোলন বা আন্না হাজারের আন্দোলন তখন বড় সংবাদ ছিল। কিন্তু এখনকার সময়ে এমন খোলামেলা প্রতিবাদ খুব কমই দেখা যায়।

এর মানে এই নয় যে গণমাধ্যম মালিকেরা আর সরকারের ভয়ে নেই বা তাঁরা সুবিধা চাওয়া বন্ধ করেছেন। বরং কখনো কখনো কোনো আন্দোলন এতটাই জনমনে প্রভাব ফেলে যে সেটিকে উপেক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

এই আন্দোলনের শক্তির পেছনে দুটি কারণ ছিল। প্রথমটি ছিল প্রশ্নপত্র ফাঁস। কিন্তু এর পাশাপাশি আরেকটি গভীর অসন্তোষ কাজ করছিল, সেটি হলো সরকারের দম্ভ।

অনেকের মনে হয়েছে, সরকার মনে করছে তাদের হাতে পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনী আছে বলেই তারা যা খুশি করতে পারে।

অনেক দিন ধরে সরকার কঠোর অবস্থানে ছিল। তাদের ধারণা ছিল, লাঠিপেটা করলে আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়বে। কারণ, সরকার গর্ব করে বলে, তারা আন্দোলনে প্রভাবিত হয় না।

কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি, যখন অভিযোগই হয় অহংকারের, তখন তার জবাবে আরও অহংকার দেখানো সবচেয়ে বড় ভুল।

শেষ পর্যন্ত সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। এই পিছু হটা তাদের আরও বেশি অস্বস্তিতে ফেলেছে।

যদি শুরুতেই কিছু দাবি মেনে নেওয়া হতো, তাহলে এতটা মুখ হারাতে হতো না। সমস্যাটি শুধু এই ছিল না যে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেননি।

আসল সমস্যা ছিল, প্রধানমন্ত্রী মনে করেছিলেন তাঁকে সরালে তাঁর দুর্বলতা সামনে চলে আসবে।

কখনো কখনো একগুঁয়েমির চেয়ে সাধারণ বুদ্ধিই বেশি কার্যকর—এই সহজ পাঠটি সরকার শেষ পর্যন্ত শিখেছে।

এই আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ছাত্রদের ভূমিকা। রাজনৈতিক দলের আন্দোলন দেখলে মানুষ সাধারণত সন্দিহান থাকে।

কিন্তু যখন আন্দোলন আসে অরাজনৈতিক তরুণদের কাছ থেকে, তখন মানুষ সেটিকে ভিন্নভাবে দেখে।

মনে হয়, এরা তো আমাদেরই সন্তান, ভাই বা বোন হতে পারে। তাই তাদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের উদ্বেগ বাড়ে।

দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টি আন্দোলনের নেতা অভিজিৎ দীপকে।

এই আন্দোলন মানুষকে স্পর্শ করেছে, কারণ আন্দোলনকারীদের বেশির ভাগই ছিল অপরিচিত। কোনো পরিচিত নেতা বা পেশাদার কর্মী ছিল না।

এতে আন্দোলনে একটি সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্বের অনুভূতি তৈরি হয়। মনে হয়েছে, সাধারণ তরুণেরা তাদের ভবিষ্যতের জন্য লড়ছে, যা সরকার তাদের থেকে কেড়ে নিতে চাইছে।

সরকার কিছু বড় ভুলও করেছে। জায়গা নির্বাচন এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কাশ্মীরে পেলেট গান ব্যবহার করলে হয়তো তা চাপা পড়ে যায়।

মণিপুরে অস্থিরতা থাকলেও তা দূরের ঘটনা মনে হয়। কিন্তু দিল্লির কেন্দ্রে যা কিছু ঘটে, তা সবার নজরে আসে। এখানে সরকারের ভুল করার সুযোগ কম। সরকার সম্ভবত এটি বুঝতে পারেনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিয়মও বদলে গেছে। ১০ বছর আগে ভাড়াটে অনলাইন কর্মী দিয়ে মানুষকে ভয় দেখানো যেত।

এখন সেই প্রভাব কমে গেছে। এমনকি টুইটার নামটিও আর নেই। নিয়ন্ত্রিত বার্তাও এখন আর কাউকে ভয় দেখাতে পারে না।

এই পরিবর্তনের ফলে শাসক দলের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবও কমেছে। প্রতিদিনের হোয়াটসঅ্যাপ বার্তাও আর আগের মতো কাজ করছে না, কারণ অনেক বার্তায় অতিরিক্ত মিথ্যা থাকায় মানুষ গুরুত্ব দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

এই আন্দোলন দেখিয়ে দিয়েছে, পুরোনো কৌশলগুলো দ্রুত অচল হয়ে যাচ্ছে। একটি উদাহরণ দেওয়া যায়।

সরকার আলোচনার জন্য সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুককে বেছে নেয়, কারণ তিনি পরিচিত মুখ। কিন্তু তিনি কেন সরকারের সঙ্গে আলোচনায় রাজি হলেন, তা স্পষ্ট নয়। তিনি আগে আন্দোলন থামানোর অনেক আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

শুধু তা–ই নয়, তিনি ক্যামেরার সামনে অনশন ভেঙেছেন এবং অনেক দাবি থেকে সরে এসেছেন। কিন্তু এতে আন্দোলনকারীদের ওপর কোনো প্রভাব পড়েনি।

তারা তাদের অবস্থানে অটল ছিল এবং অল্প সময়ের মধ্যেই নিজেদের দাবি আদায় করে নেয়। এতে প্রমাণ হয়ে যায়, ওয়াংচুক এই আন্দোলনের প্রকৃত নেতা নন।

পরে তাঁর স্ত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভাষায় কিছু মন্তব্য করেন, যা এই আন্দোলনের সঙ্গে খাপ খায়নি।

গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আন্দোলনকারীরা যাকে ‘গোদি মিডিয়া’ বলে সমালোচনা করেছে, সেই চ্যানেলগুলোর প্রভাব কমে গেছে। তারা যেভাবে প্রতিদিন নিজেদের মতো করে খবর পরিবেশন করে, তাতে মনে হয় তাদের দর্শক এখন শুধু সরকারের পক্ষের মানুষই।

এই আন্দোলনে ধর্ম কোনো বিষয় ছিল না। আশ্চর্যজনকভাবে, তাঁর পক্ষে যাঁরা কথা বলেছেন, তাঁদের মধ্যে শাসক দলের সমর্থকেরাও ছিলেন।

এই পুরো ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় ছিল রাষ্ট্রীয় সহিংসতা। পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনী অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে।

লাঠিপেটা, পেলেট গান ব্যবহার—এসব ঘটনার ভিডিও প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু এখনো কাউকে দায়ী করা হয়নি। ধারণা করা হয়, এই নির্দেশ রাজনৈতিক পর্যায় থেকেই এসেছে।

এই সহিংসতা সরকারের জন্য বড় ভুল প্রমাণ হতে পারে। মানুষ এসব ভুলে যায় না। বিশেষ করে নারী আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে, তা মানুষের মনে গভীর দাগ ফেলেছে।

ভারতে নারীর প্রতি অসম্মান সহজে ক্ষমা করা হয় না। অতীতেও এমন ঘটনার কারণে সরকারগুলোর ক্ষতি হয়েছে।

গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আন্দোলনকারীরা যাকে ‘গোদি মিডিয়া’ বলে সমালোচনা করেছে, সেই চ্যানেলগুলোর প্রভাব কমে গেছে।

তারা যেভাবে প্রতিদিন নিজেদের মতো করে খবর পরিবেশন করে, তাতে মনে হয় তাদের দর্শক এখন শুধু সরকারের পক্ষের মানুষই।

সবশেষে বলা যায়, সরকার অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। নির্বাচন কমিশনকে প্রভাবিত করতে পারে, সংসদ উপেক্ষা করতে পারে, সংসদ সদস্য কিনে নিতে পারে।

কিন্তু প্রতিবাদের শক্তি আলাদা। তা রাস্তায় প্রকাশ পায়, মানুষের মনে জায়গা করে নেয়। আর শেষ পর্যন্ত রাজনীতিবিদদের সেই কণ্ঠ শুনতেই হয়।

  • বীর সাংভি একজন টেলিভিশন সাংবাদিক ও টক শো উপস্থাপক।
    দ্য প্রিন্ট থেকে নেওয়া। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ।