
ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর মুখে ‘খেলার বিশুদ্ধতা’ এবং রাজনীতি থেকে এর দূরত্বের কথা আমরা যতই শুনি না কেন, ফুটবল যে স্রেফ কোনো খেলা নয়, তা স্পষ্ট। এটা এখন আধুনিক রাজনীতির ‘সফট পাওয়ার’ ও ‘হার্ড পাওয়ার’ প্রকাশের হাতিয়ারস্বরূপ।
এবারের বিশ্বকাপ টুর্নামেন্ট এমন এক ব্যক্তির (মানে ডোনাল্ড ট্রাম্প) পরিসরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যিনি পুরো পৃথিবীকে দেখেন লেনদেনের চশমায়। তাঁর কাছে সব রাজনৈতিক বা আদর্শিক অবস্থান স্রেফ বাণিজ্যিক চুক্তির অংশ। যেকোনো সময় এগুলো কেনাবেচা যায়।
জাতীয়তাবাদের মতো গভীর ও আত্মপরিচয়মূলক ধারণার ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমগুলো খুব কম সময়ই একসুরে কথা বলতে দ্বিধা করে। কেবল প্রোপাগান্ডা নয়, বরং প্রকৃত সাংস্কৃতিক প্রতিধ্বনিই ফুটিয়ে তোলা হয়। ফলে ব্রিটিশ গণমাধ্যম ইংল্যান্ডের জাতীয় দলকে ঐক্যবদ্ধ ইংল্যান্ডের জীবন্ত প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করে। দলগতভাবে, এই খেলোয়াড়দের প্রায়ই ব্রিটিশ রাজনীতিবিদদের চেয়ে সাধারণ মানুষের অনেক বেশি আসল প্রতিনিধি বলে মনে হয়।
ট্রাম্প কিন্তু ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের মতো জাতিগত বৈচিত্র্যকে কোনো ‘প্রগতিশীল শক্তির বিজয়’ হিসেবে দেখেন না কিংবা বিশ্বকাপকে কোনো গণতান্ত্রিক মরূদ্যানও ভাবেন না। তাঁর কাছে ফুটবল হলো স্রেফ একটি সম্পদ—চুক্তি করার, অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক প্রভাবকে নতুন করে সাজানোর চূড়ান্ত একটি প্ল্যাটফর্ম।
অবশ্যই গভীর রাজনৈতিক সংকট বা সামাজিক অবক্ষয়ের কোনো আশু সমাধান ফুটবলের কাছে নেই। তবু মাঠের এই সবুজ ঘাসই এখনো একটি দেশের সবচেয়ে স্পষ্ট আয়না। রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকেরা খেলোয়াড় ও তাঁদের পারফরম্যান্সকে কেবল তাঁদের প্রযুক্তিগত দক্ষতার জন্য খুঁটিয়ে দেখেন না; বরং এর মাধ্যমে তাঁরা সমাজের ভেতরের কলকবজা বোঝার চেষ্টা করেন।
ঐতিহাসিকভাবে বাস্তবতার তোয়াক্কা না করে জাতীয় ঐক্যের এক কাল্পনিক রূপ তৈরি করতে গিয়ে গণমাধ্যম প্রায়ই বড় ধরনের ভুল করেছে। বর্তমান বেলজিয়ামের কথাই ধরা যাক। জাতিগত, রাজনৈতিক ও ভাষাগত দিক থেকে গভীর বিভাজিত একটি দেশে জাতীয় দলটি বিভক্তির বিরুদ্ধে একাকী প্রাচীর হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
একইভাবে ফ্রান্সে, যেখানে বর্ণবাদী উত্তেজনা প্রতিনিয়ত সামাজিক কাঠামোকে হুমকির মুখে ফেলে, সেখানে উত্তর আফ্রিকান, সাব-সাহারান ও ফরাসি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত বহুজাতিক দলটিকে গণমাধ্যম ও প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ—উভয়েই এক অপরিহার্য ‘প্রতিষেধক’ হিসেবে দেখেন। কারণ, তাঁদের সামনে এর চেয়ে ভালো আর কোনো আখ্যান নেই। যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যমগুলো প্রায়ই ইংল্যান্ড দলকে একটি প্রগতিশীল শক্তির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে, যা ব্রিটেনকে ইউরোপ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চাওয়া জনতুষ্টিবাদীদের গালে একটি বড় চপেটাঘাত।
তবে ফুটবলের এই প্রতীকী রাজনৈতিক ব্যবহারের পাশাপাশি লেখক সাইমন কুপার একটি সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, ‘টুর্নামেন্টটি উপভোগ করুন, কিন্তু এটাকে খুব গুরুত্বসহকারে নেবেন না। ভাববেন না যে বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো বাস্তব জীবনে কোনো প্রভাব ফেলে। এত ঢাকঢোলের পরও একটি সফল টুর্নামেন্ট কোনো প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে পারে না বা বর্ণিল সম্প্রীতিও তৈরি করতে পারে না...বিশ্বকাপ একটি স্বপ্নের মতো উবে যায়। এটি প্রায়ই সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন দেখাতে পারে, কিন্তু একে নতুন রূপ দিতে পারে না।’
কুপারের এই সংশয় যৌক্তিক হলেও এটি আসলে ফুটবলকে বিনিয়োগের খাত ও ভূরাজনৈতিক চালের হাতিয়ারে পরিণত করার চলমান রাজনীতিকে উপেক্ষা করে। দল হেরে যাওয়ার পর বিশ্বনেতারা যখন একে অপরকে সান্ত্বনা দিয়ে মিষ্টি মিষ্টি কূটনৈতিক কথা বলেন, এগুলো আসলে প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের ক্ষোভ প্রশমিত করার জন্য একধরনের কূটনৈতিক বড়ি।
আদতে ফুটবল গভীর রাজনৈতিক শত্রুতা প্রকাশেরও মাধ্যম। এই শত্রুতা কখনো কখনো মারাত্মক সহিংসতায় রূপ নেয়। উদাহরণস্বরূপ ১৯৮৫ সালে ব্রাসেলসের হেইসেল স্টেডিয়ামে লিভারপুল ও জুভেন্টাস সমর্থকদের রক্তক্ষয়ী দাঙ্গার মুখে কোচরা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার অপরাধীদের ‘মব’ বলে নিন্দা করেছিলেন। আবার কখনো কখনো এই শত্রুতা গ্যালারিতে ভিনদেশিদের প্রতি উগ্র ও বিদ্বেষপূর্ণ স্লোগান দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
ফ্রান্স যখন ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ জিতেছিল, তখন কট্টর ডানপন্থীরা এই অশ্বেতাঙ্গ দলকে দেশের জাতীয় প্রতীক হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। দলটির বেশির ভাগ খেলোয়াড় আফ্রিকান বংশোদ্ভূত হওয়ায় মার্কিন কমেডিয়ান ট্রেভর নোয়া রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘আসলে আফ্রিকাই বিশ্বকাপ জিতেছে।’ এই এক রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক কৌতুকই পশ্চিমা বহুসংস্কৃতিবাদের দুর্বলতাকে উন্মুক্ত করে দিয়েছিল।
ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলো যখন ‘ইউরোপিয়ান সুপার লিগ’ প্রকল্পে যোগ দেওয়ার চুক্তি করেছিল, তখন যে তীব্র ও ক্ষিপ্র রাজনৈতিক বিরোধিতা প্রকল্পকে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল, সেটা কিন্তু খেলার বিশুদ্ধতার প্রতি আচমকা কোনো ভালোবাসার কারণে ঘটেনি; বরং এর পেছনে ছিল রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সুরক্ষা নীতি।
আজ আমরা এমন এক বিশ্বকাপে প্রবেশ করছি, যা পরিচালিত হচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুক্তি দিয়ে। ট্রাম্প কিন্তু ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের মতো জাতিগত বৈচিত্র্যকে কোনো ‘প্রগতিশীল শক্তির বিজয়’ হিসেবে দেখেন না কিংবা বিশ্বকাপকে কোনো গণতান্ত্রিক মরূদ্যানও ভাবেন না। তাঁর কাছে ফুটবল হলো স্রেফ একটি সম্পদ—চুক্তি করার, অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক প্রভাবকে নতুন করে সাজানোর চূড়ান্ত একটি প্ল্যাটফর্ম।
আমরা ফুটবলপ্রেমীরা মনে মনে যতই চাই না কেন, কোনো রাষ্ট্রপ্রধানেরই আসলে রাজনীতিকে ফুটবল থেকে আলাদা করার ক্ষমতা নেই। তবে এই চরম চুক্তি–ব্যবসায়ী বা ডিলমেকারের কাছে এসে এই সুন্দর খেলাও বর্তমান দুনিয়ারই প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠবে। এটা এমন এক পরিবেশ, যা খেলোয়াড়সুলভ মনোভাবকে বুড়ো আঙুল দেখায়, কেবল স্কোরবোর্ডের লাভ-ক্ষতির হিসাব গোনে এবং শেষ পর্যন্ত স্টেডিয়াম কেনার ক্ষমতা যার আছে, তার সামনেই মাথা নত করে।
● করম নামা ব্রিটিশ-ইরাকি লেখক। মিডল ইস্ট মনিটর থেকে অনূদিত