সৌদি আরবের দৈনিক আল-মদিনায় কিছুদিন আগে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে মক্কায় প্রবীণ মায়ের দেখভাল করার আকুতি জানিয়ে দুই ভাইয়ের প্রতিযোগিতা। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। মক্কার সাধারণ আদালত দুই ভাইয়ের সেই বিরোধের নিষ্পত্তি করেছেন, যেখানে দুজনই মায়ের হেফাজত চাইছিলেন। রায়ের পর আদালত থেকে বেরিয়ে দুই ভাই–ই ছিলেন সন্তুষ্ট ও হাস্যোজ্জ্বল।
ছোট ভাই মামলাটি করেছিলেন এই যুক্তিতে যে বড় ভাই বয়সে এতটাই প্রবীণ হয়ে গেছেন যে তিনি আর মাকে যথাযথভাবে দেখাশোনা করতে পারবেন না; তাই মাকে নিজের কাছে রাখার অধিকার তিনি চান। ৭৫ বছর বয়সী বড় ভাই আদালতে আপত্তি জানিয়ে বলেন, মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি চান তাঁর মা তাঁর সঙ্গেই থাকুন। তিনি এখনো মায়ের যত্ন নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন—এমনটাই দাবি করেন তিনি।
বিচারক যখন মাকে দুই ভাইয়ের সামনে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কোন ছেলের সঙ্গে থাকতে চান। মা শান্ত কণ্ঠে বললেন, তিনি দুজনকেই সমান ভালোবাসেন; তাই তিনি কোনো পক্ষই বেছে নেবেন না। পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিচারক সিদ্ধান্ত দেন যে বড় ভাই নিজে এতটাই বয়সী যে তাঁরও দেখাশোনার প্রয়োজন রয়েছে। তাই মায়ের হেফাজতের অধিকার ছোট ভাইকেই দেওয়া হলো। রায় ঘোষণার পর দুই ভাইকে আলিঙ্গন করে হাসিমুখে আদালত ত্যাগ করতে দেখে উপস্থিত সবাই গভীরভাবে আবেগাপ্লুত হয়েছেন।
সব সন্তান যদি এমন হয়, তাহলে তো আর কোনো সমস্যা থাকে না। কিন্তু বাস্তবতা বড় নির্মম। আমরা আমাদের চোখের সামনেই দেখি, গায়ে–গতরে বড় হয়ে ওঠার পর সন্তানেরা কীভাবে মা-বাবাকে চোখরাঙানি দেয়। মা-বাবা যেন পরিত্যক্ত ন্যাকড়া। ব্যতিক্রম আছে অবশ্যই।
মানুষের জীবনে সম্পত্তি কখনো কেবল ইট-পাথরের ঘর নয়; এটি স্মৃতির আশ্রয়, সম্পর্কের ছায়া, সময়ের সঞ্চয়। আর সেই সম্পত্তি যখন উত্তরাধিকার আইনের পাতায় লেখা হয়, তখন আইন হয়ে ওঠে মানুষের জীবনের এক নীরব ইতিহাস। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উত্তরাধিকার আইন সংশোধনী সেই ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় যোগ করেছে, যা কেবল আইনগত নয়; বরং গভীরভাবে মানবিক, সামাজিক ও ধর্মীয়।
মানুষের জীবনে সবচেয়ে প্রথম যে দুটি মুখ দেখা যায়—একটি মায়ের, অন্যটি বাবার। এই দুই মুখের ছায়ায়ই শিশুর পৃথিবী গড়ে ওঠে। কিন্তু সময়ের নদী যখন প্রবাহিত হতে থাকে, তখন সেই মুখগুলো ধীরে ধীরে বয়সের রেখায় ভরে যায়। সন্তানেরা বড় হয়, পৃথিবী বিস্তৃত হয় আর সেই দুই মুখ—যারা একদিন সন্তানের পৃথিবী ছিল—ধীরে ধীরে প্রান্তে সরে যায়। বাংলাদেশে এই প্রান্তচ্যুতি আজ এক গভীর সামাজিক সংকটের নাম: প্রবীণ মা-বাবার প্রতি সন্তানের অবহেলা।
অবহেলা সব সময় চিৎকার করে না। অনেক সময় তা নীরব, অদৃশ্য, কিন্তু গভীর। নীরব অবহেলার অদৃশ্য ক্ষতগুলো হলো: নিয়মিত খোঁজ না নেওয়া, চিকিৎসার ব্যয় বহনে অনীহা। আলাপচারিতায় অনাগ্রহ, একাকিত্বে ফেলে রাখা, মানসিক সমর্থনের অভাব ইত্যাদি। দৃশ্যমান ক্ষতগুলো হচ্ছে প্রকাশ্য অবহেলা: আলাদা ঘরে বা আলাদা বাড়িতে রেখে দেওয়া, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, মানসিক বা শারীরিক নির্যাতন এবং বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়া।কেন ঘটে এই অবহেলা?
এ নিয়ে আছে নানান গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ। ঢাকার মতো বড় শহরে কর্মচাপ, যানজট, প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে মানুষের সময় কমে গেছে। শহুরে মানুষ দিনে ৯-১১ ঘণ্টা কর্মক্ষেত্রে ব্যয় করেন। চাকরি, বাসাভাড়া, সন্তানদের পড়াশোনা—সব মিলিয়ে অনেকেই মনে করেন, প্রবীণ মা-বাবার দায়িত্ব নেওয়া ‘অতিরিক্ত বোঝা’।
ইসলামে মা-বাবার প্রতি সদাচরণকে ইমানের অংশ বলা হয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমার প্রভু নির্দেশ দিয়েছেন—তোমরা তাঁর ইবাদত করো এবং মা-বাবার প্রতি সদাচরণ করো।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ১৭:২৩)। আমাদের সংস্কৃতিতেও মা-বাবাকে সম্মান দেওয়া ছিল এক অনিবার্য মূল্যবোধ। কিন্তু বাস্তবতা আজ সেই মূল্যবোধকে চ্যালেঞ্জ করছে।
বাংলাদেশে প্রবীণ মা-বাবার প্রতি সন্তানের অবহেলা শুধু একটি পারিবারিক সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক সংকট। যে সমাজ তার শিকড়কে অবহেলা করে, সে সমাজের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। মা-বাবা আমাদের জীবনের প্রথম আশ্রয়, প্রথম শিক্ষক, প্রথম পথপ্রদর্শক। তাঁদের শেষ বয়সে আমরা যদি তাঁদের পাশে না দাঁড়াই, তবে মানবিকতার মৌলিক ভিত্তিই ভেঙে পড়ে। সমাধান সম্ভব, যদি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র একসঙ্গে দায়িত্ব নেয়। আর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব—সন্তানদের হৃদয়ে মানবিকতার আলো জ্বালিয়ে রাখা।
মানুষের জীবনে সম্পত্তি কখনো কেবল ইট-পাথরের ঘর নয়; এটি স্মৃতির আশ্রয়, সম্পর্কের ছায়া, সময়ের সঞ্চয়। আর সেই সম্পত্তি যখন উত্তরাধিকার আইনের পাতায় লেখা হয়, তখন আইন হয়ে ওঠে মানুষের জীবনের এক নীরব ইতিহাস। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উত্তরাধিকার আইন সংশোধনী সেই ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় যোগ করেছে, যা কেবল আইনগত নয়; বরং গভীরভাবে মানবিক, সামাজিক ও ধর্মীয়।
২০২৬ সালের সংশোধনী, যেখানে মা–বাবা সন্তানদের নামে সম্পত্তি লিখে দিলেও নিজের জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন। এই আইন যেন এক প্রবীণ বাবা বা মায়ের কাঁপা হাতে লেখা একটি নিরাপত্তার চিঠি। কিন্তু সেই চিঠি পড়তে গিয়ে সমাজে শুরু হয়েছে বিতর্ক। ধর্মীয় আইন, দেওয়ানি আইন, পারিবারিক সম্পর্ক—সব মিলিয়ে এই সংশোধনী যেন এক নদীর দুই তীরকে একসঙ্গে ধরে রাখতে চাওয়া একটি সেতু। আর সেই সেতু নির্মাণের শব্দই আজকের বিতর্ক।
নতুন আইনে বলা হয়েছে, একজন মা বা বাবা তাঁর সন্তানের নামে লিখে দিলেও মৃত্যুর আগপর্যন্ত সেই বাড়িতে থাকার, ব্যবহার করার এবং নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার রাখবেন। এটি আইনগত ভাষায় জীবনকালীন ভোগাধিকার। এই ভোগাধিকার যেন এক প্রবীণ মানুষের শেষ বয়সের আশ্রয়। যেন তাঁর নিজের ঘরের দরজায় লেখা, ‘এই ঘর আমার, যত দিন আমি আছি।’আইনটি এসেছে সেই সব গল্পের প্রতিক্রিয়ায়, যেখানে সন্তানেরা সম্পত্তি পেয়ে মা–বাবাকে ভুলে যান, অবহেলা করেন, কখনো কখনো ঘর থেকে বের করে দেন। আমরা দেখেছি, অনেক ক্ষেত্রে মা–বাবা সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পরই তাঁদের দুর্দশা শুরু হয়। নতুন আইন সেই দুর্দশার বিরুদ্ধে এক মানবিক প্রতিরোধ।
কিন্তু আইন যতই মানবিক হোক, ধর্মীয় বিধানের কোনো ব্যাখ্যার সঙ্গে সামান্য সংঘাতও সমাজে বড় আলোড়ন তোলে। বাংলাদেশের মুসলিম ব্যক্তিগত আইন—ফরায়েজ—উত্তরাধিকার বণ্টনের মূল ভিত্তি। হেবা, অর্থাৎ জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি দান—ইসলামি আইনে একটি স্পষ্ট কাঠামো। কোনো কোনো গোষ্ঠী বা দল বলছে, হেবা মানে সম্পত্তি সঙ্গে সঙ্গে হস্তান্তর।
কিন্তু নতুন আইনে হস্তান্তর হলেও দাতা জীবনভর ভোগাধিকার রাখছেন। এতে হেবার মূল কাঠামো বদলে যায়। ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকার বণ্টন জটিল হতে পারে। তাদের ভাষায়, আইনটি ধর্মীয় বিধানের সঙ্গে সংঘাত তৈরি করবে। সরকার বলছে, হেবা থাকবে হেবাই। নতুন আইন কেবল একটি বিকল্প পথ। এই দুই বক্তব্য যেন দুই নদীর দুই স্রোত—একটি ধর্মীয়, অন্যটির বিবেচনা মানবিক ও সামাজিক। আইন সেই দুই স্রোতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভারসাম্য খুঁজছে।
প্রবীণ মা-বাবার প্রতি সন্তানের অবহেলা বাড়ছে। সম্পত্তি নিয়ে নেওয়ার পর মা–বাবাকে ভুলে যাওয়ার ঘটনা সাধারণ হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতা আইনকে মানবিকতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এই সংশোধনীকে কেবল আইন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে এক প্রবীণ মানুষের নিঃশব্দ আর্তি, যে আর্তি বলে, ‘আমার শেষ বয়সে আমাকে আমার ঘর থেকে সরিয়ে দিয়ো না।’ এটি এক মায়ের কাঁপা কণ্ঠ, ‘আমি তোমাদের জন্য জীবন কাটিয়েছি; আমার শেষ বয়সে আমাকে একা রেখো না।’
আইন সেই কণ্ঠগুলোকে শুনেছে। কিন্তু ধর্মীয় বিধানও মানুষের হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত। তাই আইন ও ধর্ম মানুষের মনে একই সঙ্গে অবহেলা ও বিধানভঙ্গ—এই দুই ধরনের ভয়ের বিষয়টিকে তুলে ধরে।
আইন সেই দুই ভয়কে একসঙ্গে শান্ত করতে চায়। এটি যেন এক সেতু, যা মানবিকতার নদীকে ধর্মীয় বিধানের তীরের সঙ্গে যুক্ত করতে চায়।
মহিউদ্দিন আহমদ লেখক ও গবেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব