
চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি ভারত থেকে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। এই ঘোষণার দুটি দিক আছে—আইনি এবং রাজনৈতিক দিক। এ বিষয়ে দুই পর্বে লিখেছেন আলী রীয়াজ। আজ প্রকাশিত হলো প্রথম পর্ব।
মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত পলাতক শেখ হাসিনা ১০ জুলাই রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ‘ফিরে আসতে’ আগ্রহী বলে জানিয়েছেন। শেখ হাসিনা একে ‘দেশে ফেরা’ এবং তিনি ‘ফিরে আত্মসমর্পণ’ করবেন বলে বর্ণনা করলেও আইনি এবং বাস্তব পরিস্থিতি এর দুটোর কোনোটিই এ ক্ষেত্রে প্রয়োগযোগ্য নয়।
৫ আগস্ট ২০২৪ বাংলাদেশ থেকে পলায়নের পর যেহেতু তিনি ভারতের আশ্রয়ে আছেন এবং যেহেতু একজন দণ্ডিত অপরাধীর ব্যাপারে বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যকার চুক্তিতে বন্দী বিনিময় ও প্রত্যর্পণের বিষয় আছে, সেহেতু হাসিনার বাংলাদেশে ‘আসার’ বিষয়টি ওই আইনের আওতায়ই নিরূপিত হওয়ার কথা।
দ্বিতীয়ত, যেহেতু তিনি ইতিমধ্যে আদালতে দণ্ডিত হয়েছেন, তিনি আপিল করেননি এবং তাঁকে কোনোরকম জামিন দেওয়া হয়নি, সেহেতু তাঁকে দেশের ভেতরে পাওয়া গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাধ্যবাধকতা হচ্ছে তাঁকে আটক করা।
শেখ হাসিনার এই ঘোষণার বিষয়ে আলোচনার দুটি দিক আছে—আইনি এবং রাজনৈতিক দিক। আইনি দিকটি হচ্ছে ২০১৩ সালে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রত্যর্পণ চুক্তি, যা ২০১৬ সালে সংশোধিত হয়েছে। এই চুক্তির বরাতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সাল থেকেই একাধিকবার হাসিনাকে হস্তান্তরের জন্য অনুরোধ করেছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সরকার এই মর্মে একটি নোট ভার্বালও পাঠায়। ভারত সেই নোট ভার্বালের প্রাপ্তি স্বীকার করলেও এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের একটি মামলায় রায়ে হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পরে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবেই ভারতকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে। স্মরণ করা দরকার যে ট্রাইব্যুনালের রায় প্রকাশের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল যে এই রায় তাদের নজরে আছে। তবে লক্ষণীয় ছিল ওই বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে স্থাপন করে তাদের অবস্থানের একটা ইঙ্গিত দিয়েছিল।
নতুন সরকার গঠনের পর এই বছরের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান নয়াদিল্লি সফরে গেলে তিনি ভারত সরকারের কাছে এই বিষয়টি উত্থাপন করেন। তারই প্রেক্ষাপটে ১৭ এপ্রিল ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তরের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, ‘চলমান বিচারিক এবং অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে (বাংলাদেশের) অনুরোধটি পরীক্ষা করা হচ্ছে। (বিডিনিউজ২৪, ১৭ এপ্রিল ২০২৬)
সম্প্রতি হাসিনার বক্তব্যের বিষয়ে সরাসরি কোনো উত্তর না দিলেও জয়সোয়াল বলেছেন, শেখ হাসিনার বিষয়ে ভারতের মনোভাবের কোনো পরিবর্তন হয়নি। তিনি বলেন, যেকোনো প্রত্যর্পণই আইনি বিষয়। আইনি প্রক্রিয়াতেই এর নিষ্পত্তি হবে (প্রথম আলো, ১৪ জুলাই ২০২৬)। এটাই ইঙ্গিত দেয় যে ভারতে আশ্রিত শেখ হাসিনা কী করবেন, সেটা তাঁর ব্যক্তিগত ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল নয়। ভারত একাধিকবার বলেছে, ‘একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সুরক্ষা এবং নিরাপত্তার কথা ভেবে তাঁকে “সাময়িক” (ফর দ্য টাইম বিয়িং) আশ্রয় দেওয়া হয়েছে।’
ফলে হাসিনা একাই এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, এমন মনে করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। লক্ষণীয়, বাংলাদেশ এবং ভারত দুই পক্ষই এই বিষয়ে একমত যে এই বিষয়ে আইনই প্রাধান্য পাবে। সংশ্লিষ্ট আইনি বিধানগুলো হচ্ছে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের প্রত্যর্পণ চুক্তি এবং ভারতের ১৯৬২ সালের প্রত্যর্পণ আইন। এই চুক্তির অধীন প্রত্যর্পণের জন্য ধাপে ধাপে অগ্রসর হতে হবে এবং মোটাদাগে ছয়টি ধাপ আছে।
প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াটি শুরু হয় অনুরোধকারী রাষ্ট্র কর্তৃক এই বিষয়টি প্রমাণের মাধ্যমে যে সংঘটিত অপরাধটি চুক্তির অধীন একটি ‘প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধ’। চুক্তির অনুচ্ছেদ ২(১) অনুযায়ী, অপরাধটিকে অবশ্যই ‘দ্বৈত অপরাধযোগ্যতা’ নীতি পূরণ করতে হবে; যার অর্থ হলো যে অপরাধমূলক আচরণের কারণে প্রত্যর্পণ চাওয়া হচ্ছে, তা বাংলাদেশ এবং ভারত—উভয় দেশের আইনেই অপরাধ হিসেবে পরিগণিত হতে হবে এবং উভয় দেশের বিচারব্যবস্থায় এর জন্য কমপক্ষে এক বছরের কারাদণ্ডের বিধান থাকতে হবে। আইনি পরিভাষা বা সংবিধিবদ্ধ শ্রেণিবিন্যাসের ভিন্নতা প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না [অনুচ্ছেদ ২(৩)]।
যে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পূর্বেই দণ্ডিত হয়েছেন, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কাছে একটি উপযুক্ত আদালত কর্তৃক প্রদত্ত বৈধ সাজার রায় ও দোষী সাব্যস্তকরণের প্রমাণ থাকতে হবে। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে এবং পরে তাঁর অনুপস্থিতিতে বিচারকার্য সম্পন্ন করে তাঁকে দোষী সাব্যস্তপূর্বক মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছে।
আইনি ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর, বাংলাদেশকে চুক্তির অনুচ্ছেদ ১০-এর বিধানাবলি অনুসরণ করে একটি আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধপত্র প্রস্তুত করতে হবে। এই অনুরোধপত্র বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক কূটনৈতিক মাধ্যমে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিকট প্রেরিত হবে। চুক্তির অনুচ্ছেদ ৪ এবং ১০(১) অনুযায়ী, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ই এই প্রত্যর্পণ অনুরোধ প্রক্রিয়াকরণের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ‘কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ’।
অনুরোধপত্রের সঙ্গে চুক্তির অনুচ্ছেদ ১০(২) অনুযায়ী নির্ধারিত নিম্নোক্ত নথিপত্রসমূহ সংযুক্ত করা বাধ্যতামূলক:
• শেখ হাসিনার একটি নির্ভুল বিবরণ এবং শনাক্তকরণসংক্রান্ত তথ্যাদি;
• অভিযুক্ত অপরাধসমূহ সংঘটনের বস্তুগত তথ্যের বা ম্যাটেরিয়াল ফ্যাক্টসের বিবরণ;
• উক্ত অপরাধসমূহ সৃষ্টিকারী সংবিধিবদ্ধ আইনি বিধানসমূহ; এবং
• প্রযোজ্য শাস্তির বিধানাবলি।
যেহেতু কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তির বিচারের উদ্দেশ্যে নয়, বরং একটি বিদ্যমান রায় কার্যকর করার জন্যই এই প্রত্যর্পণ চাওয়া হচ্ছে, তাই বাংলাদেশকে অনুচ্ছেদ ১০(৪) মেনে নিম্নোক্ত নথিপত্রও প্রদান করতে হবে:
• দোষী সাব্যস্তকরণের রায় ও আরোপিত সাজার একটি প্রত্যয়িত অনুলিপি বা সনদ;
• এই মর্মে একটি সুস্পষ্ট ঘোষণা যে প্রদত্ত রায় ও সাজা বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী এখনো আইনত বলবৎযোগ্য এবং সাজার ঠিক কতটুকু অংশ ভোগ করা বাকি রয়েছে।
অনুরোধটি পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হওয়ার পূর্বে, সংযুক্ত বিচারিক নথিসমূহকে চুক্তির অনুচ্ছেদ ১৩ অনুযায়ী যথাযথভাবে সত্যায়িত হতে হবে। প্রদত্ত রায়, সাজা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং আনুষঙ্গিক প্রত্যয়নপত্রসমূহ যথাযথভাবে সত্যায়িত হয়েছে কি না এবং চুক্তির অধীন সকল পদ্ধতিগত আবশ্যকতা পূরণ করা হয়েছে কি না, তা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরীক্ষা করে দেখবে।
যদিও ২০১৬ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে অনুচ্ছেদ ১০(৩)-এর অধীন সাক্ষ্যপ্রমাণ দাখিলের মাধ্যমে ‘প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত মামলা’ বা প্রিমা ফেসি কেইস প্রতিষ্ঠার বাধ্যবাধকতা বিলুপ্ত করা হয়েছে, তবে ওই সংশোধনীটি মূলত বিচারের জন্য আনীত অনুরোধের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যখন সাজা কার্যকর করার উদ্দেশ্যে প্রত্যর্পণ চাওয়া হয়, তখন অনুচ্ছেদ ১০(৪) দ্বারা আরোপিত অতিরিক্ত প্রামাণ্য নথিপত্রের বাধ্যবাধকতা ওই সংশোধনীর কারণে বাতিল হয়ে যায় না।
যদি নথিপত্র অসম্পূর্ণ বা অপর্যাপ্ত হয়, তবে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের পূর্বে ভারত অনুচ্ছেদ ১০(৫) অনুযায়ী বাংলাদেশের কাছে সম্পূরক তথ্য চাইতে পারে।
এরপর ভারতকে নির্ধারণ করতে হবে যে প্রত্যর্পণে কোনো আইনি বাধা রয়েছে কি না।
• রাজনৈতিক অপরাধ: অনুচ্ছেদ ৬(১) অনুযায়ী, অপরাধটিকে যদি ‘রাজনৈতিক প্রকৃতির’ বলে গণ্য করা হয়, তবে প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে। তবে অনুচ্ছেদ ৬(২)-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে—হত্যা, অপরাধজনক নরহত্যা, অপহরণ, বিস্ফোরকসংক্রান্ত অপরাধ এবং সন্ত্রাসবাদ-সংশ্লিষ্ট গুরুতর অপরাধসমূহকে কোনোভাবেই রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যাবে না।
• সদিচ্ছা বা সরল বিশ্বাস: চুক্তির অনুচ্ছেদ ৮(১) অনুসারে, যদি প্রতীয়মান হয় যে বিচারপ্রক্রিয়াটি সদিচ্ছা (গুড ফেইথ) এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থে সূচিত হয়নি, তবে ভারত প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যান করতে পারে।
• সাংবিধানিক ও মানবাধিকারগত বাধ্যবাধকতা: চুক্তির বাইরেও, ভারতীয় সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের অধীন ভারতের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এর ফলে প্রত্যর্পণের কারণে অনুরোধকৃত ব্যক্তি নির্যাতন, জীবনের স্বেচ্ছাচারী বঞ্চনা, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর অথবা মৌলিকভাবে একটি অন্যায্য বিচারপ্রক্রিয়ার সম্মুখীন হবেন কি না, তা ভারতকে বিবেচনা করতে হবে।
ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে মৃত্যুদণ্ড আরোপ, অনুপস্থিতিতে বিচারকার্য পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মানদণ্ড অনুসরণের বিষয়গুলো সূক্ষ্মভাবে পরীক্ষা করা হতে পারে।
পদ্ধতিগতভাবে অনুরোধটি সম্পূর্ণ হওয়ার পর, ভারত সরকার তাদের অভ্যন্তরীণ ‘প্রত্যর্পণ আইন, ১৯৬২ এবং সংশ্লিষ্ট চুক্তির আলোকে একটি ‘সারবস্তুগত পর্যালোচনা’ গ্রহণ করে। অনুরোধটি ভারতের অভ্যন্তরীণ আইনি শর্তাবলি পূরণ করে কি না এবং প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যান করার মতো কোনো সংবিধিবদ্ধ বা চুক্তিভিত্তিক কারণ রয়েছে কি না, তা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় খতিয়ে দেখে।
এই ধাপে অনুরোধকৃত ব্যক্তির দোষ বা নির্দোষিতা নির্ধারণ করা হয় না। বরং চুক্তির পদ্ধতিগত আবশ্যকতাগুলো পূরণ করা হয়েছে কি না এবং ভারতীয় আইন অনুযায়ী প্রত্যর্পণ আইনত অনুমোদনযোগ্য কি না, তার ওপরই পর্যালোচনার মূল দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে।
আইনি পর্যালোচনা সমাপ্ত হওয়ার পর, ভারত সরকার প্রত্যর্পণের অনুরোধটি মঞ্জুর করা হবে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
যদি প্রত্যর্পণ অনুমোদিত হয়, তবে চুক্তির অনুচ্ছেদ ১৬(১) অনুযায়ী উভয় দেশের পারস্পরিক সম্মতিতে নির্ধারিত একটি স্থানে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের নিকট হস্তান্তর করা হবে। প্রত্যর্পণ মঞ্জুর হওয়ার আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি পাওয়ার এক মাসের মধ্যে বাংলাদেশকে তাঁকে ভারত থেকে সরিয়ে নিতে হবে। পর্যাপ্ত কারণ ব্যতিরেকে এই সময়ের মধ্যে তাঁকে সরিয়ে নিতে ব্যর্থ হলে, ভারত ভবিষ্যতে একই অপরাধের জন্য প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করার অধিকার সংরক্ষণ করে (অনুচ্ছেদ ১৬(২)।
হস্তান্তরের পর, বাংলাদেশ চুক্তির অনুচ্ছেদ ১২-এর অধীন ‘বিশেষত্বের নীতি’ মেনে চলতে বাধ্য থাকবে। এর অর্থ হলো যে অপরাধগুলোর জন্য প্রত্যর্পণ মঞ্জুর করা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে কেবল সেই অপরাধগুলোর জন্যই বিচার বা শাস্তি প্রদান করা যাবে; যদি না ভারত পরে অতিরিক্ত কোনো অপরাধের বিচারের জন্য সম্মতি প্রদান করে। এ ছাড়া চুক্তিতে স্পষ্টভাবে অনুমোদিত পরিস্থিতি ছাড়া ভারতের সম্মতি ব্যতীত তাঁকে তৃতীয় কোনো রাষ্ট্রে পুনঃ প্রত্যর্পণ করা থেকেও বাংলাদেশ বারিত থাকবে।
প্রত্যর্পনের বিষয় বিবেচনায় ভারত ১৯৬২ সালের প্রত্যর্পণ আইন অনুসরণ করবে। সেখানে বলা হয়েছে যে ভারত যদি কোনো ব্যক্তির ব্যাপারে প্রত্যর্পণের অনুরোধ পায়, তবে সরকার একজন ম্যাজিস্ট্রেটকে নিয়োগ করবে, যিনি অভিযোগের তথ্য, প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো যাচাই করবেন। সে ক্ষেত্রে হাসিনাকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির হতে হবে।
এটি প্রকাশ্য আদালতে হওয়ার বাধ্যবাধকতা না থাকায় কীভাবে ম্যাজিস্ট্রেট তাঁর বক্তব্য নেবেন, সেটা নির্ধারিত নয়। ম্যাজিস্ট্রেট যদি নথিপত্র বিবেচনায় নিয়ে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন যে এই অভিযোগ ভারতের আদালতেও গ্রাহ্য হতো, তবে তিনি এই মর্মে কেন্দ্রীয় সরকারকে একটি প্রতিবেদন দেবেন। সেখানে তিনি চাইলে অভিযুক্তের যদি কোনো লিখিত বক্তব্য থাকে, তা–ও সংযুক্ত করতে পারেন। এর ভিত্তিতে ভারত সরকার প্রত্যর্পণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রথম দুটি ধাপ অনুসৃত হয়েছে। চুক্তির অন্য ধাপগুলো কীভাবে অনুসৃত হবে, সেটা কার্যত ভারতের সরকারের ইচ্ছাধীন। ফলে চুক্তির এই সব সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ কখন, কীভাবে নেওয়া হবে, সেটা অনিশ্চিত। ভারত সরকারের ইচ্ছাধীন এই সব পদক্ষেপ রাজনীতি এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ওপরও নির্ভরশীল। ভারত প্রত্যপর্ণ চুক্তির অনুচ্ছেদ ৮(১)-এ বর্ণিত গুড ফেইথ বা সদিচ্ছা বা ন্যায়বিচারের স্বার্থে করা হয়নি বলে মনে করলে অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারে।
ভারত অচিরেই এই ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে না। কেননা সেটা রাজনৈতিক বিবেচনায় ভারতের জন্য অনুকূল নয় এবং প্রত্যক্ষভাবে দুই দেশের সম্পর্ককে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলে দেবে। অন্য দেশের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে যে এই পুরো প্রক্রিয়া সম্পাদন করতে কয়েক বছর পার হয়ে যায়। ফলে ভারতের যুক্তি হবে যে তারা হাসিনার প্রত্যর্পণে ব্যতিক্রমী কিছু করছে না।
আলী রীয়াজ সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর
মতামত লেখকের নিজস্ব
[১ আগস্ট ২০২৬ প্রথম আলোর ছাপা পত্রিকায় লেখাটি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের আইনি প্রক্রিয়ার পর্যালোচনা—এ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে।]