
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হয়তো সত্যিই ভেবেছিলেন, ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ ইরানের জনগণকে তাঁদের ধর্মতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে উজ্জীবিত করবে এবং সেখানে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ খুলে দেবে। একসময় মনে হয়েছিল, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সেই ধারণায় বিশ্বাস করেন। তবে ট্রাম্পের হুটহাট করে মত বদল করা, বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ নিয়ে আমেরিকার লক্ষ্য ঠিক না করা এবং সে প্রশ্নে তার ঘন ঘন অবস্থান বদল সেই ধারণাকে দুর্বল করে দিয়েছে।
বেসামরিক মানুষের ওপর বোমা ফেলে ‘শাসন পরিবর্তন’ ঘটানোর ধারণা নতুন নয়। এটি এক শতাব্দীর বেশি পুরোনো ধারণা। দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশ, আমেরিকান ও ইতালীয় সামরিক কৌশলবিদেরা যুক্তি দিয়েছিলেন, দীর্ঘমেয়াদি বোমাবর্ষণ সাধারণ মানুষকে এতটাই মনোবলহীন করে তুলবে যে তারা নিজেদের শাসকদের বিরুদ্ধেই ক্ষোভে ফেটে পড়বে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছিল। জার্মানি ও জাপানের শহরগুলো কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। সে সময় লাখ লাখ বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারান। এরপর কয়েক দশক পর ভিয়েতনাম, লাওস ও কম্বোডিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র আরও তিন গুণ বেশি বোমা ফেলে। কিন্তু এর সব কটি ক্ষেত্রেই একটি বিষয় স্পষ্ট, তা হলো মনোবল ভেঙে পড়া জনগণ নিজেদের শাসকদের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়নি।
বরং উল্টোটা ঘটেছে। আকাশ ফুঁড়ে ধেয়ে আসা সন্ত্রাসের মুখে পড়া সাধারণ মানুষ বিস্ময়কর সহনশীলতা দেখিয়েছে। তারা ভয়াবহ পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে, একত্র হয়েছে এবং এক সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। লন্ডনে ‘ব্লিটজ’ (১৯৪০-১৯৪১ সালে নাৎসি জার্মানি লন্ডনসহ ব্রিটেনের বিভিন্ন শহরে লাগাতার হামলা চালায়। ওই হামলাকে ব্লিটজ বলে)-এর সময় মানুষ গর্ব করে বলত, ‘লন্ডন সব সহ্য করতে পারে।’
১৯৪০ সালের শরতে লন্ডনে নতুন জ্যাকেট কিনতে গিয়ে আমার দাদি হঠাৎ এক প্রবল বিমান হামলার মধ্যে পড়েন। দোকানের কর্মী শান্তভাবে তাঁকে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যান; আর সেই সময়ও তাঁরা বিভিন্ন ধরনের টুইড কাপড়ের গুণাগুণ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
বার্লিনের মানুষও আলাদা ছিল না, হ্যানয়ের মানুষও নয়। আজকের তেহরানের মানুষও একই দৃঢ়তা দেখাচ্ছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমস–এর তেহরান প্রতিনিধি নাজমেহ বোজর্গমেহর লিখেছেন, দিনরাত বোমা পড়ছে, যেকোনো মুহূর্তে মৃত্যু আসতে পারে—এ অবস্থার মধ্যেও তেহরানের মানুষের ‘জীবন নিজের গতিতেই চলতে চায়’। তাদের কাছে পরদিন দুপুরে কী খাওয়া হবে, সেটিই আসল ভাবনা।
১৯৪৪ সালে যখন দিনে আমেরিকার বোমা ও রাতে ব্রিটিশ বোমায় বার্লিন বিধ্বস্ত হচ্ছিল, তখনো সিনেমা হলগুলো ভর্তি থাকত। কনসার্টের টিকিট পাওয়া কঠিন ছিল। বার্লিন ফিলহারমোনিক ভাঙাচোরা ছাদের নিচে অস্থায়ী মঞ্চে অনুষ্ঠান করত। সেখানে শিল্পী ও দর্শক—সবাই শীতের কোট জড়িয়ে বসে থাকতেন।
এ ধরনের স্থৈর্য কোনো বিশেষ মতাদর্শ বা শাসকের প্রতি আনুগত্য থেকে আসে না। যুদ্ধের শেষ দিকে অধিকাংশ বার্লিনবাসী নাৎসিদের ওপর বিরক্ত হয়ে উঠেছিল। আজকের ইরানেও অধিকাংশ মানুষ উগ্র ইসলামপন্থী শাসনের বিরোধী।
ইরানে বহু মানুষ ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলনে প্রাণ দিয়েছেন। কিন্তু সেই প্রতিবাদ কখনো ক্ষেপণাস্ত্রের বৃষ্টির মধ্যে হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে টিকে থাকাটাই সবচেয়ে বড় লড়াই। তারা জানে, ভাঙাচোরা রাস্তায় নেমে সশস্ত্র রেভোল্যুশনারি গার্ড বাহিনীর মুখোমুখি হওয়া মানে প্রায় আত্মহত্যা।
বোমাবর্ষণের মধ্যে সাধারণ মানুষের বিদ্রোহে না নামার আরও একটি কারণ আছে। সেটি হলো এমন সংকটে খাদ্য ও আশ্রয়ের একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে সরকারই। যখন মানুষের সব শক্তি ব্যয় হয় শুধু পরের দিনটুকু বাঁচার জন্য, তখন বিদ্রোহের জন্য আর শক্তি অবশিষ্ট থাকে না।
মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক হস্তক্ষেপ ইরানের ধর্মতন্ত্রকে গণতন্ত্রে রূপান্তর করতে সাহায্য করবে—এই সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। একসময় আমেরিকার উদার মূল্যবোধ (যা তার ‘সফট পাওয়ার’-এর মূল উৎস) নিপীড়িত মানুষের কাছে আশার আলো জুগিয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আজকের প্রশাসন ঠিক তার উল্টো পথে হাঁটছে।
ইয়ান বুরুমা রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে অনূদিত