মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

মতামত

যেভাবে একের পর এক পরাজয় আড়াল করছেন ট্রাম্প

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনোভাবেই, কোনো যুক্তির সামনে পরাজয় স্বীকার করেন না। গত সপ্তাহেই দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ২০ কোটি ডলার দাবি থেকে ট্রাম্প সরে এসেছেন। চলমান আলোচনায় তিনি যে সুবিধাজনক অবস্থানে নেই, তা স্পষ্ট হয়ে উঠতেই তিনি আবারও আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে ফিরে যান।

গভীর রাতে ট্রুথ সোশ্যালে একের পর এক পোস্ট করে হার্ভার্ডের কাছে ১০০ কোটি ডলার দাবি তোলেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে দাবি করেন, ভবিষ্যতে হার্ভার্ডের সঙ্গে তাঁর আর কোনো সম্পর্ক রাখতে ইচ্ছা নেই।

এতে কারও বিস্মিত হওয়ার কথা নয়। কারণ, এই আচরণ ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের স্বভাবেরই প্রতিফলন। তিনি পরাজয় অস্বীকার করেন আগেভাগে সম্পর্ক ছিন্ন করার মাধ্যমে। অর্থাৎ আপনি আমাকে প্রত্যাখ্যান করার আগেই আমি আপনাকে প্রত্যাখ্যান করছি। আপনি আমাকে ছেড়ে যাচ্ছেন না, আমিই আপনাকে ছেড়ে দিচ্ছি।

হার্ভার্ডের কাছে ২০০ কোটি ডলার দাবির বিষয়টি কোনো দান বা সাধারণ অনুদানের প্রসঙ্গ ছিল না। এটি ছিল রাজনৈতিক ও আইনি চাপ প্রয়োগের অংশ হিসেবে উত্থাপিত একধরনের আর্থিক সমঝোতা দাবি।

ট্রাম্প প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ তোলে যে হার্ভার্ডসহ কিছু শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ইহুদিবিদ্বেষ, রাজনৈতিক পক্ষপাত ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে বিক্ষোভ হয়, তা কেন্দ্র করে কংগ্রেসে শুনানি, তহবিল পর্যালোচনা এবং ফেডারেল অর্থায়ন স্থগিতের হুমকি তৈরি হয়।

এই পরিস্থিতিতে প্রশাসন ইঙ্গিত দেয় যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি নির্দিষ্ট নীতিগত পরিবর্তন না আনে, তবে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত, তহবিল বন্ধ কিংবা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এই চাপের মধ্যেই হার্ভার্ডের সঙ্গে আলোচনায় বড় অঙ্কের আর্থিক সমঝোতার দাবি সামনে আসে।

গণমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের সমঝোতার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। ট্রাম্পস টেন কমান্ডমেন্টস বইয়ে লেখকেরা দেখিয়েছেন, ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশলের ১০টি প্রধান স্তম্ভ রয়েছে। এই পূর্বনির্ধারিত আচরণগত ধারা বুঝতে পারলে বোঝা যায়, কীভাবে তিনি ক্ষমতার খেলায় নিজের পছন্দের অস্ত্রগুলো ব্যবহার করেন। তার একটি হলো পরাজয়কে আগেভাগে অস্বীকার করা।

ট্রাম্প অন্যের প্রত্যাখ্যান মেনে নিতে পারেন না। তাঁর দৃষ্টিতে তিনিই সব সময় সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রক। কেউ যদি দ্বিধা প্রকাশ করে, সমালোচনা করে কিংবা সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়, ট্রাম্প দ্রুত দাবি করেন যে সিদ্ধান্তটি তাঁরই। এরপর প্রায়ই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অযোগ্য বা গুরুত্বহীন হিসেবে উপস্থাপন করেন। হার্ভার্ড যখন ইঙ্গিত দিল যে তারা কম টাকার প্রস্তাব মেনে নেবে না, তখন ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া অনুমান করা কঠিন ছিল না। তিনি পরিস্থিতিকে এমনভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন, যেন তিনিই হার্ভার্ডকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

ট্রাম্প একধরনের চিরন্তন অস্বীকারের রাজনীতি গড়ে তুলেছেন। তাঁর জগতে তিনি কখনো প্রত্যাখ্যাত নন, বরং সর্বদা প্রত্যাখ্যানকারী। শিশুদের মধ্যে একটি কথা প্রচলিত আছে, হেড হলে আমি জিতব, টেল হলেও তুমি হারবে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক দর্শন যেন অনেকটা সে রকমই।

এর আগেও এমন বহু ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। ২০১৭ সালে গোল্ডেন স্টেট ওয়ারিয়র্স এনবিএ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর হোয়াইট হাউসে যাওয়ার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে। পরে ট্রাম্প দাবি করেন, তিনিই দলটিকে আমন্ত্রণ বাতিল করেছিলেন।

ওয়ারিয়র্সের কোচ স্টিভ কের তখন মন্তব্য করেন, তারা আমাদের ছেড়ে যাওয়ার আগেই তিনি যেন তাদের ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন। একই বছর শার্লটসভিলে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীদের সমাবেশ নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রতিবাদে বড় বড় কোম্পানির প্রধান নির্বাহীরা তাঁর ব্যবসায়িক উপদেষ্টা পরিষদ থেকে সরে দাঁড়ান। ট্রাম্প তখন দাবি করেন, তিনিই উদারভাবে পরিষদ ভেঙে দিয়েছেন।

এ বছর হোয়াইট হাউসে তেল কোম্পানির প্রধানদের এক বৈঠকে এক্সনমবিলের প্রধান নির্বাহী ড্যারেন উডস ভেনেজুয়েলায় বিনিয়োগে অনাগ্রহ প্রকাশ করলে ট্রাম্প দ্রুত পাল্টা মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, এক্সনকে হয়তো তিনি বাইরে রাখবেন, কারণ তাদের প্রতিক্রিয়া তাঁর পছন্দ হয়নি।

এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়, যখন তাঁর অধীন কেউ চাকরি ছাড়তে চান। ২০২৫ সালের শুরুতে সামাজিক নিরাপত্তা প্রশাসনের ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মিশেল কিং সংবেদনশীল নথিতে প্রবেশাধিকার দেওয়ার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে পদত্যাগ করেন। ট্রাম্প তখন বলেন, কাউকে বরখাস্ত করলে তারা সাধারণত বলে পদত্যাগ করেছে। তিনি ইঙ্গিত দেন, কিংকে আসলে বরখাস্ত করা হয়েছে। অথচ তিনি ৩০ বছর ধরে সংস্থাটিতে কাজ করেছেন এবং প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন।

২০১৮ সালে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিস সিরিয়া থেকে সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে পদত্যাগপত্র দিলে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, তিনি ম্যাটিসকে নির্ধারিত সময়ের দুই মাস আগেই সরিয়ে দিচ্ছেন। এমনকি তাঁর নিজের চিফ অব স্টাফও এ বর্ণনার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। কিন্তু তথ্যের চেয়ে নিজের বয়ান প্রতিষ্ঠাই ট্রাম্পের কাছে মুখ্য।

সবচেয়ে বড় উদাহরণ, ২০২০ সালের নির্বাচনে তাঁর পরাজয়। নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পরও তিনি ফলাফল অস্বীকার করেন। এর আগেই ২০২০ সালের আগস্টে তিনি বলেছিলেন, একমাত্র উপায় যেভাবে তিনি হারতে পারেন, তা হলো নির্বাচন কারচুপি হলে। অর্থাৎ পরাজয়ের সম্ভাবনাকেও আগেভাগে অস্বীকার করে রাখা।

এইভাবে ট্রাম্প একধরনের চিরন্তন অস্বীকারের রাজনীতি গড়ে তুলেছেন। তাঁর জগতে তিনি কখনো প্রত্যাখ্যাত নন, বরং সর্বদা প্রত্যাখ্যানকারী। শিশুদের মধ্যে একটি কথা প্রচলিত আছে, হেড হলে আমি জিতব, টেল হলেও তুমি হারবে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক দর্শন যেন অনেকটা সে রকমই।

  • জেফরি সোনেনফেল্ড ইয়েল স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের লেস্টার ক্রাউন অধ্যাপক।

  • স্টিভেন তিয়ান ইয়েল চিফ এক্সিকিউটিভ লিডারশিপ ইনস্টিটিউটের গবেষণা পরিচালক।

টাইম থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত