নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনে নরেন্দ্র মোদি ও সি চিন পিং
নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনে নরেন্দ্র মোদি ও সি চিন পিং

মতামত

মোদি-সি সম্পর্কের আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের বড় খেলা

বাস্তব রাজনীতির দৃষ্টিতে বলা যায়, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং শেষ পর্যন্ত নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে আসবেন কি না, সেটিই ছিল সম্মেলনের মূল আকর্ষণ। তিনি আসার পর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক।

ভারতের জন্য এই বৈঠকের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল। প্রথমত, দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের যে উষ্ণতা তৈরি হয়েছে, তা ধরে রাখা। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝানো যে ভারত বিশ্বে অন্য বন্ধুদের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখে এবং প্রয়োজনে তাদের ওপর প্রভাবও রাখতে পারে।

তবে চীনের দৃষ্টিতে সি চিন পিংয়ের নয়াদিল্লি সফর মূলত ভারতকেন্দ্রিক ছিল না। ২০২৩ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলন এড়িয়ে যাওয়ার পর তাঁর এবারের সফর ছিল যুক্তরাষ্ট্রকে একটি বার্তা দেওয়ার সুযোগ। বিশেষ করে ওয়াশিংটনে তাঁর রাষ্ট্রীয় সফরের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে এই বার্তার গুরুত্ব ছিল বেশি।

বৈঠকের পর ভারত ও চীন আলাদা বিবৃতি প্রকাশ করে। দুটি বিবৃতি তুলনা করলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে।

প্রথমত, দুই দেশের বিবৃতির দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য রয়েছে। চীনের বিবৃতি ভারতের তুলনায় অনেক দীর্ঘ। ইংরেজি সংস্করণে সেটি প্রায় তিন গুণ। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে চীনের মূল মনোযোগ ছিল ভারত। বরং চীনের বক্তব্যে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই পক্ষের প্রতিই বার্তা ছিল। ভারতের বিবৃতিতে ব্রিকস নিয়ে কোনো গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ নেই।

অন্যদিকে চীনের বিবৃতিতে ‘ব্রিকস সহযোগিতা আরও বাড়ানো’, বৈশ্বিক দক্ষিণ, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা এবং জি-২০-এর প্রসঙ্গ রয়েছে। ভারত ব্রিকসের মাধ্যমে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার চেষ্টা করেছে, একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কও যেন ভারসাম্যপূর্ণ থাকে, সে বিষয়ে সতর্ক থেকেছে। চীন সেই সূক্ষ্ম ভারসাম্যের বিষয়ে তুলনামূলকভাবে কম আগ্রহী। তারা ব্রিকসকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে।

দ্বিতীয়ত, দুই দেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। ভারতের বিবৃতিতে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। সেখানে সীমান্ত–সংক্রান্ত আগের চুক্তি ও সমঝোতাগুলো মেনে চলার কথা বলা হয়েছে।

চীনের বিবৃতিতেও সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতার কথা আছে। তবে তারা মানুষে-মানুষে যোগাযোগ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় দুই দেশের সহযোগিতার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এর একটি কারণ হতে পারে, গত মাসে দুই দেশের সীমান্তবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধিদের ২৫তম বৈঠকের শেষে প্রকাশিত ‘আট দফা ফলাফল ও ঐকমত্য’-এ সীমান্ত নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এরই মধ্যে হয়েছে।

বর্তমানে চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এক বছর পর চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ২১তম জাতীয় কংগ্রেস। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক চীনের জন্য প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্রিকসের মতো কাঠামোর মাধ্যমে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রকে কিছুটা দূরে রাখার কৌশলও তারা চালিয়ে যেতে চায়।

তবে এবারের যৌথ ঘোষণায় মূলত প্রতিশ্রুতির কথাই বেশি আছে। যেমন সীমান্ত নির্ধারণ ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে ‘দ্রুত ও বাস্তব অগ্রগতি’ অর্জনের বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের আলোচনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই অগ্রগতির সুনির্দিষ্ট অর্থ কী এবং বিশেষজ্ঞদের কাজের পরিধি কী হবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। একইভাবে নদীর পানির প্রবাহ–সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান এবং সংশ্লিষ্ট সমঝোতা স্মারক নবায়ন নিয়ে বৈঠকের কথা বলা হয়েছে। অথচ এ বিষয়টি দুই দেশের বিশেষ প্রতিনিধিরা অন্তত দুই বছর ধরে আলোচনা করছেন।

তৃতীয়ত, দুই বিবৃতিতেই ভালো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ধারণা তুলে ধরা হলেও চীনের বক্তব্যে ভারতকে কী করতে হবে, তা অনেক বেশি স্পষ্ট। সি চিন পিং বলেছেন, ভারত ও চীন পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং অংশীদার। একে অপরকে হুমকি হিসেবে না দেখে উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। তিনি ‘হস্তক্ষেপ’ দূর করা এবং উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বহুপক্ষীয় সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছেন। একই সঙ্গে সীমান্তের বিষয় এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার জন্য ‘দ্বৈত পথে’ এগোনোর কথা বলা হয়েছে।

২০২৪ সালে সীমান্ত থেকে সেনা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর ভারতও ধীরে ধীরে এই অবস্থানের দিকে এগিয়েছে। তবে চীন আরও বেশি কিছু চায়। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, সীমান্ত ইস্যুতে ভারতের জোর কমানোই চীনের প্রত্যাশা।

‘হস্তক্ষেপ’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তা অবশ্য চীনের বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয়নি। ফলে ভবিষ্যতে নানা বিষয়কে এর আওতায় এনে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ চীনের হাতে থাকছে। চীন আরও চায়, ভারত-চীন সম্পর্কের বিষয়ে ভারতের জনমতকে আরও ইতিবাচক করা হোক।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন বারবার এমন অবস্থান নিয়েছে। তাদের বক্তব্য হলো, সম্পর্কের ‘ইতিবাচক শক্তি’ ধরে রাখতে চীনবিরোধী সমালোচক এবং বর্তমান ভারত-চীন সম্পর্কের উষ্ণতা নিয়ে সন্দিহানদের নীরব রাখা প্রয়োজন। চীনের বিবৃতিতে ভারতের তাইওয়ান ও তিব্বত-সংক্রান্ত নীতি ও অবস্থানের কথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতের বিবৃতিতে এ দুটি বিষয় নেই।

চতুর্থত, চীন ভবিষ্যতের জন্য একটি নিরাপত্তাব্যবস্থাও রেখে দিয়েছে। দুই দেশ যে ‘অংশীদার, প্রতিদ্বন্দ্বী নয়’—এই অবস্থানকে তারা দুই দেশের উন্নয়নের পর্যায় এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল একটি ‘কৌশলগত সিদ্ধান্ত’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। এই বক্তব্য থেকেই চীনের চিন্তাভাবনার একটি দিক স্পষ্ট হয়। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে পরিস্থিতি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বেইজিংও নিয়মিত অবস্থান বদলেছে।

বর্তমানে চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এক বছর পর চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ২১তম জাতীয় কংগ্রেস। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক চীনের জন্য প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্রিকসের মতো কাঠামোর মাধ্যমে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রকে কিছুটা দূরে রাখার কৌশলও তারা চালিয়ে যেতে চায়।

কিন্তু অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বদলে গেলে চীন আবার তার পরিচিত কঠোর অবস্থানে ফিরে যেতে পারে।

জাবিন টি জ্যাকব দিল্লির শিব নাদার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও গভর্ন্যান্স স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক এবং হিমালয়ান স্টাডিজ সেন্টার অব এক্সেলেন্সের পরিচালক।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে নেওয়া অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ