মতামত

নির্বাচিত সরকারের জন্য সপ্তক্ষতের নিরাময়

সামনের বছর বন্যা হবে কি না, এটা নিয়ে প্রশ্ন করায় এক গণক বলেছিলেন, ‘বিন্নার গোছা তল তল।’ অর্থাৎ সামনে বন্যার পানি হবে অতি সামান্য, যা বিন্না ঘাসের তল দিয়ে যাবে। এর আরেক অর্থ হলো বন্যা এমনই হবে যে বিন্না ঘাস তলিয়ে যাবে। নতুন বছর সামনে রেখে অনেক অর্থনীতিবিদও এই গণকের মতো দ্ব্যর্থবোধক কথা বলেন। অর্থনীতিবিদদের একটি গুণ হলো তাঁরা সরকারকে খুশি রাখতে সমস্যাকে ভদ্রতা করে ‘চ্যালেঞ্জ’ বলে চালিয়ে দেন। কিন্তু সমস্যাকে যথানামে না ডাকলে সেটি সংকটে পরিণত হয়। 

যদি বিশ্বাস করতে পারি যে নির্বাচন ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহেই হবে, তাহলে এই অন্তর্বর্তী সরকারের আয়ুষ্কাল হপ্তাসাতেক। সুতরাং এই সরকারের অর্থনীতি নিয়ে সমালোচনা করে শেষবেলায় ‘বুড়া মেরে খুনের দায়ী’ হতে চাই না। তাই নজর দেওয়া প্রয়োজন আগামী নির্বাচিত সরকারের দিকে, যার প্রধান দায়িত্ব হবে অর্থনীতির উত্তরণ। কিন্তু এটি নিশ্চিত করার প্রধান পূর্বশর্ত হচ্ছে আইনশৃঙ্খলার রশিগুলো টেনে ধরা, যা একটি নিরাপত্তাময় সমাজজীবন নিশ্চিত করতে পারে। সেই নিরাপত্তাবোধ থেকে উৎসারিত হয় সামাজিক স্থিতিশীলতা, যা থেকে ব্যক্তিপুঁজির উল্লম্ফন ঘটে। 

এই নিরাপত্তাবোধ ও স্থিতিশীলতা ছাড়া অর্থনীতিবিদ কিনসের ভাষায় বিনিয়োগের ‘অ্যানিমেল স্পিরিট’ জাগে না। ছাব্বিশের নতুন সরকারকে বিনিয়োগ বৃদ্ধির এই পাশবিক তেজকে উজ্জীবিত করতে হবে। রাজস্ব আয় না বাড়ালে সরকারও কাজ করতে পারবে না। সরকারের উচ্চমাত্রায় ঋণনির্ভরতার দাপটে ব্যাংকব্যবস্থাও টিকবে না। চাই রাজস্বের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয়। এনবিআর ভেঙে দুই টুকরা করলেই যে রাজস্ব বাড়ে না, তার প্রমাণ ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে।

বিনিয়োগ আর রাজস্ব না বাড়ালে অর্থনীতি জানান দিয়েই বদ্ধ স্ফীতি বা ‘স্ট্যাগফ্লেশনে’ নিমজ্জিত হবে। উচ্চ বেকারত্ব ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সমন্বিত রোগ প্রথম দেখা দেয় মার্কিন মুলুকে সত্তরের দশকে। পরে তা পাঠ্যবইয়ে চলে আসে। এ যেন উচ্চ জ্বর আর আমাশয়ের সহাবস্থান। 

কোনো সরকারের অর্থমন্ত্রীকে সাফল্য দেওয়ার পূর্বশর্ত হচ্ছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ঠিক করা এবং এর পাশাপাশি আইন-আদালতকে গতিশীল করা। এটি প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির কথা, যার ওপর একাধিক নোবেল পুরস্কার ইতিমধ্যেই দেওয়া হয়েছে। কেন জানি অন্তর্বর্তী সরকার এত অর্থনীতিবিদের ভিড়ে সমৃদ্ধ হয়েও এটি বুঝতে পারেনি কিংবা বুঝতে চায়নি। প্রথম আলোতেই ১৪ মাস আগে লিখেছিলাম যে অর্থনীতিতে সরকারের মনোযোগের সংকট রয়েছে। সেটি যে এই শাসনের পুরো সময়েই সত্য হয়ে থাকবে, তা ভাবিনি। 

জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার পর নির্বাচিত সরকারের প্রথম কাজ হবে একটি বিন্যস্ত অর্থনৈতিক কমিশন গঠন করে এই সপ্তক্ষতের প্রতিটি বিষয়ের ওপর সুপারিশ প্রস্তুত করে তা জনতাকে অবহিত করা। অর্থনীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে মানুষ। সেই মানুষ যখন মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও দারিদ্র্যে কষ্ট পায়, তখন সরকারের উচিত দ্রুত তার সমাধানে মনোযোগী হওয়া।

অন্তর্বর্তী সরকারের নজর ছিল ইতিহাস সংস্কারের কসরতে। এর পাশাপাশি গুরুত্ব পেয়েছে সংস্কৃতি, জাতিসত্তা, সংবিধান ও রাজনীতি নিয়ে বড় বড় বুলিসমৃদ্ধ কথাবার্তা। ‘ঐকমত্য’ নাটকের নামে বেড়েছে অনৈক্য। বেড়েছে ভিন্নমতে অশ্রদ্ধা, আক্রমণ ও মবোক্রেসির প্রশ্রয়। মিডিয়াও আক্রান্ত হয়েছে। এসবের উৎপাত ও ভয়ে জিডিপির অংশ হিসেবে স্বদেশি ও বিদেশি—এই উভয় বিনিয়োগই কমে গেছে।

ফলে ২০২৫ সালের অর্থবছরে বাংলাদেশ শতকরা ৪-এর নিচে জিডিপির যে দুর্বল প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, তা কোভিডের বছর বাদ দিলে সাড়ে তিন দশকে সর্বনিম্ন। এর আগের অন্তর্বর্তী সরকারের বেলায় তেমনটি ঘটেনি, যদিও তখন বৈশ্বিক আর্থিক সংকট চলছিল। আরও ছিল বিশ্ববাজারে তেল ও পণ্যের উচ্চমূল্য। নির্বাচিত সরকারের প্রথম দায়িত্ব হবে এই দুর্বল প্রবৃদ্ধিকে বাংলাদেশের সক্ষম প্রবৃদ্ধি তথা প্রায় শতকরা ৮ ভাগে টেনে তোলা। 

ফটো নামানো ও ফটক বদলানোতে ব্যস্ত সরকারের পুঁজিকেন্দ্রিক ফাটকাবাজার শুয়ে পড়েছে। শুধু ২০২৫ সালেই প্রায় এক লাখ কোটি টাকার বাজার মূলধন খোয়া গেছে। শিল্পায়নের দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি এই বাজারই দিয়ে থাকে। একে না জাগালে বড় ব্যবসায়ীরা ব্যাংক খাত লুট করবেই। শেয়ারবাজারে সে রকম লুণ্ঠন সম্ভব হয় না। কারণ, সেখানে বিনিয়োগকারীদের সামনে মালিকদের এক প্রত্যক্ষ জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকে, যা ব্যাংকের টাকার বেলায় একেবারেই নেই। পুঁজিবাদী উন্নত বিশ্ব মানেই শেয়ারবাজারের কার্যকারিতার অবদান। একে টেনে তুলতেই হবে। 

ব্যাংক খাত বড় ব্যবসা ও শিল্পায়নে শুধু চলতি পুঁজি বা ‘ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল’ দেবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগেই স্থায়ী পুঁজির জোগান দেবে। কারণ, তাদের পুঁজিবাজারে ঢোকার সক্ষমতা থাকে না এবং এরা আনুপাতিকভাবে বেশি মাত্রায় বেশি নিয়োগ সৃষ্টি করে থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে ‘দরবেশ’–জাতীয় উদ্যোক্তা ১০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে মাত্র ৫০ জনের নিয়োগ নিশ্চিত করেন। একই পরিমাণ টাকা ১০০ জন খুদে উদ্যোক্তার মধ্যে ভাগ করে দিলে তাঁরা কমপক্ষে এক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবেন। পাঁচজন ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতা ন্যায্য কারণে কর্জের টাকা ফেরত দিতে না পারলেও ব্যাংক তা পুষিয়ে নিতে পারে।

কিন্তু ‘দরবেশ’ শ্রেণির উদ্যোক্তারা পুরো টাকাটাই মেরে দিয়ে ধসিয়ে দেবেন ব্যাংক খাত। এই দুষ্টচক্র থেকে নির্বাচিত সরকারকে প্রথমেই বের হয়ে আসতে হবে। অর্থায়ন সংস্কৃতির এই পদ্ধতিগত সংস্কার একেবারে প্রথম থেকেই শুরু করতে হবে। না হলে অর্থ খাত বাঁচবে না। 

আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে অর্থনীতিতে ছয়টি বড় ক্ষত ছিল। এগুলো হলো ১. উচ্চ মূল্যস্ফীতি ২. বর্ধমান বেকারত্ব ৩. সংক্রমিত খেলাপি ঋণ ৪. দুর্বল রাজস্ব আদায় ৫. অপরিমেয় মুদ্রা পাচার ও ৬. নিম্নমুখী রিজার্ভ। অন্তর্বর্তী সরকার শুধু মুদ্রা পাচার ও রিজার্ভ ক্ষয় রোধের ক্ষেত্রে মোটামুটি সাফল্য পেলেও প্রথম চারটিতে সাফল্য পায়নি। বরং বেকারত্ব, রাজস্ব ও খেলাপি ঋণের হিসাবে অবস্থা আরও খারাপ করে ফেলেছে। এতে নতুন করে যুক্ত হয়েছে সপ্তম ক্ষত। তার নাম বর্ধমান দারিদ্র্য। এটি গত ২০ বছরের অর্জনকে উল্টো দিকে টেনে নিচ্ছে। নির্বাচিত সরকারের কাঁধে পড়বে এই সপ্তক্ষত নিরাময় কর্ম।

১৫ মাসে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মাত্র একমাত্রিক পতন (ওয়ান পারসেন্টেজ পয়েন্ট) কোনো অগ্রগতির মধ্যে পড়ে না। ২০২৪ সালের আগস্টে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ। এটি ২০২৫ সালের নভেম্বরে অতি সামান্য কমে ৮ দশমিক ৯৬ শতাংশে রয়ে গেছে। একই সময়ে ভারত, পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কার মূল্যস্ফীতি কমানোর কৃতিত্ব ১০ গুণ বেশি।

তার মানে এই নয় যে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঠিকমতো কাজ করছে না। কাজের কাজ ওই একটি প্রতিষ্ঠানই করছে। কিন্তু ডুবন্ত ব্যাংক টেনে তোলা ও আয় দুর্বল সরকারকে টাকা দেওয়ার জন্য বাড়তি তারল্য উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে নামতে দিচ্ছে না। তদুপরি মাস্তানদের অক্লান্ত চেষ্টায় চাঁদাবাজির উচ্চ হার ও জোগান–ঘাটতি উচ্চ মূল্যস্ফীতির ধারক হয়ে রয়েছে। এদিকে বিডাও বিদেশি বিনিয়োগ টানার চৌকস চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু তাণ্ডব ও অগ্ন্যুৎসব দেখে বিদেশিরা ভয় পেয়েছে। 

জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার পর নির্বাচিত সরকারের প্রথম কাজ হবে একটি বিন্যস্ত অর্থনৈতিক কমিশন গঠন করে এই সপ্তক্ষতের প্রতিটি বিষয়ের ওপর সুপারিশ প্রস্তুত করে তা জনতাকে অবহিত করা। অর্থনীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে মানুষ। সেই মানুষ যখন মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও দারিদ্র্যে কষ্ট পায়, তখন সরকারের উচিত দ্রুত তার সমাধানে মনোযোগী হওয়া।

অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় অর্ধডজন কমিশন বানিয়েছে। কিন্তু শুধু দারিদ্র্য রোধবিষয়ক একটি আলাদা কমিশন গড়া প্রয়োজন ছিল। কারণ, শতকরা ১৮ ভাগের দারিদ্র্য ২২ ভাগে উঠে যাওয়া বাংলাদেশের গত দুই দশকের অর্জনের এক বিপরীত লজ্জা। দারিদ্র্য বিমোচনে নামডাকওয়ালা সরকার সেটি না করলেও আশা করব নির্বাচিত সরকার তা প্রথমেই করবে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত এই সপ্তক্ষতের নিরাময়ে তাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা কী হবে, তা নির্বাচনী ইশতেহারে সংযুক্ত করা। 

ড. বিরূপাক্ষ পাল যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক অ্যাটেকার্টল্যান্ড-এ অর্থনীতির অধ্যাপক

* মতামত লেখকের নিজস্ব