
চলতি বছরের ব্রিকস সম্মেলন নয়াদিল্লিতে শেষ হয়েছে গভীর সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের চেনা প্রতিশ্রুতির মধ্য দিয়েই। কিন্তু সেখানে ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ অনুপস্থিতি।
মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ ব্রিকসের ১১টি সদস্যদেশ এবং ১০টি সহযোগী দেশের অধিকাংশকেই প্রভাবিত করলেও জোটের পক্ষ থেকে দেওয়া ঘোষণাপত্রে এটি সরাসরি স্পর্শ করা হয়নি। এমনকি এই সংঘাতের বস্তুনিষ্ঠ আগ্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রকে ভর্ৎসনাও করা হয়নি।
এ ধরনের কৌশলগত শব্দচয়ন সব সদস্যকে একই কূটনৈতিক ছাতার নিচে থাকার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। তবে এতে এটিও প্রকাশ পেয়েছে যে পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার প্রতি যৌথ অসন্তোষকে সমন্বিত ভূরাজনৈতিক পদক্ষেপ রূপ দেওয়া ব্রিকসের জন্য কতটা কঠিন।
সম্মেলনের কয়েক মাস আগেই সমস্যাটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। গত মে মাসে নয়াদিল্লিতে ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে ইরান যুদ্ধের বিষয়ে কোনো সাধারণ ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। বৈঠকের চূড়ান্ত ফলাফলে সদস্যদের মতপার্থক্যের কথা স্বীকার করে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল—কারও নাম উল্লেখ করা এড়িয়ে যাওয়া হয়।
ইরান চেয়েছিল জোটটি যেন মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের তীব্র নিন্দা জানায়। অন্যদিকে ইউএই এমন কোনো বক্তব্য প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিল, যা ইরানি হামলা এবং তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা উদ্বেগকে উপেক্ষা করে। এই ব্যর্থতা নিছক কূটনৈতিক অস্বস্তি ছিল না; এটি ছিল ব্রিকস সম্প্রসারণের রাজনৈতিক মূল্যের এক স্পষ্ট ইঙ্গিত।
জোটটির পরিসর বৃদ্ধি বিশ্বব্যাপী এর প্রভাব বাড়ালেও এর ভেতরের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকেও আমদানি করেছে। ইরান ও ইউএই এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ। দুটোই ব্রিকস সদস্য হলেও মধ্যপ্রাচ্যে তাদের কৌশলগত হিসাব-নিকাশ একদম বিপরীতমুখী।
ব্রিকস যেন এক বহুকেন্দ্রিকতার ফাঁদে আটকে পড়েছে। এর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর বৈচিত্র্য। এ বৈচিত্র্যই জোটটিকে বিশ্বব্যাপী এমন সব অঞ্চলে গ্রহণযোগ্যতা এনে দিয়েছে, যা ঐতিহাসিকভাবে বিশ্ব শাসনের কাঠামোয় কোনো প্রভাব ফেলার সুযোগ পেত না। কিন্তু এই একই বৈচিত্র্য যৌথ ভূরাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করাকে কঠিন করে তোলে।
তাই একই সংগঠনে তাদের উপস্থিতি একটি অভ্যন্তরীণ সীমা তৈরি করে দেয়, যার বাইরে গিয়ে কোনো সংঘাতের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেওয়া জোটের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে।
সেপ্টেম্বরের সম্মেলন শেষে একটি ঘোষণাপত্র তো এসেছিল, তবে সমঝোতার ধরনটি ছিল বেশ অর্থবহ। কোনো স্পষ্ট ও দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার বদলে ব্রিকস কেবল নিজেদের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য সামাল দেওয়ার এক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়।
ঘটনাটি ইঙ্গিত দেয়, জোটটির প্রধান সমস্যা তাদের অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিক শক্তির অভাব নয়; বরং সেই ক্ষমতাকে একটি একক ভূরাজনৈতিক হাতিয়ারে রূপান্তর করার জটিলতাই তাদের মূল বাধা।
মার্কিন আধিপত্যশীল বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর তাগিদ থেকেই ব্রিকসের উত্থান হলেও ওয়াশিংটনের বিষয়ে এখনো কোনো ঐক্যবদ্ধ অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি জোটটি। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতিটি সদস্যের স্বার্থ ভিন্ন।
ভারত এ দ্বিধাদ্বন্দ্ব সবচেয়ে ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলে। নয়াদিল্লি ব্রিকসকে নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যম মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক বা রাজনৈতিক জোট হিসেবে নয়। তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করছে, ‘কোয়াড’-এ অংশ নিচ্ছে এবং পশ্চিমা অংশীদারদের সঙ্গে ব্যাপক প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখছে। আবার একই সময়ে তারা রাশিয়া ও চীনের সঙ্গেও গভীর যোগসূত্র রাখছে।
ভারতের কাছে ব্রিকসের আসল মূল্য হলো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি কেন্দ্রগুলোর মধ্যে নিজস্ব সুবিধাজনক অবস্থান বজায় রাখা। ব্রিকসকে একটি আমেরিকাবিরোধী জোটে রূপান্তর করলে ভারতের সেই কৌশলগত নমনীয়তাই নষ্ট হয়ে যাবে।
চীন ও রাশিয়ার জন্যও ব্রিকসকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের হাতিয়ার বানানোর সুযোগ কম। রাশিয়ার কাছে পশ্চিমা অর্থনৈতিক চাপ কমানোর জন্য ব্রিকস নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম।
তবে সামরিক জোটের মাধ্যমে আগ্রাসী নীতিতে হাঁটলে তা মস্কোকে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা তারা যেকোনো মূল্যে এড়াতে চায়।
চীনের জন্য হিসাবটি আরও জটিল। বেইজিং একটি বহুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা এবং গ্লোবাল সাউথের শক্তিশালী প্রভাব চায়। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন, বাণিজ্য ও সংস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের যে কাঠামোগত সুবিধা রয়েছে, চীন তা কমাতে আগ্রহী।
কিন্তু ব্রিকস সংক্রান্ত প্রতিটি বিবাদকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি দ্বন্দ্বে নিয়ে যাওয়ার মতো কোনো কারণ চীনের নেই। যুক্তরাষ্ট্রের বাজার এখনো তাদের রপ্তানির বড় ভিত্তি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি অপরিহার্য উপাদান।
অন্যদিকে ব্রাজিল ও ইন্দোনেশিয়া এতে আরও এক ধাপ জটিলতা যোগ করে। ব্রাসিলিয়া আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় আরও ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিনিধিত্ব, উন্নয়ন অর্থায়ন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর দর–কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে চায়।
তবে ব্রিকসকে চীন বা রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক চাল চালার হাতিয়ার বানাতে তারা আগ্রহী নয়। একইভাবে জাকার্তা ব্রিকসকে নিজেদের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক বিকল্প বাড়ানোর পথ হিসেবে দেখে, কোনো একপক্ষ বেছে নেওয়ার মাধ্যম হিসেবে নয়।
ব্রিকস যেন এক বহুকেন্দ্রিকতার ফাঁদে আটকে পড়েছে। এর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর বৈচিত্র্য। এ বৈচিত্র্যই জোটটিকে বিশ্বব্যাপী এমন সব অঞ্চলে গ্রহণযোগ্যতা এনে দিয়েছে, যা ঐতিহাসিকভাবে বিশ্ব শাসনের কাঠামোয় কোনো প্রভাব ফেলার সুযোগ পেত না।
কিন্তু এই একই বৈচিত্র্য যৌথ ভূরাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করাকে কঠিন করে তোলে। প্রতিটি নতুন সদস্য নতুন অর্থনৈতিক সম্পদ, কূটনৈতিক প্রভাব ও রাজনৈতিক বৈধতা যুক্ত করার পাশাপাশি নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকেও সঙ্গে নিয়ে আসে, যা সামাল দিতে হয়।
এটিই ব্যাখ্যা করে কেন ব্রিকস একটি সুসংগঠিত ভূরাজনৈতিক ব্লকের চেয়ে বরং দর–কষাকষির একটি শক্তিশালী জোট হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা বেশি।
আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, দক্ষিণ-দক্ষিণ বাণিজ্য জোরদার, উন্নয়ন অর্থায়নের প্রসার এবং পশ্চিমা আর্থিক কাঠামোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর বিষয়ে জোটটির সদস্যরা একমত হতে পারে। এমনকি স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন, উন্নয়ন ঋণ, জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তার মতো খাতেও তারা দারুণ সহযোগিতা করতে পারে।
কিন্তু কোনো বাস্তব ভূরাজনৈতিক সংঘাতের মুখে কোনো পক্ষ নেওয়ার প্রয়োজন হলেই ঐক্য ভেঙে পড়ে। ইরান যুদ্ধ এ বৈপরীত্যকে দারুণভাবে উন্মোচিত করেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ব্রিকস অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বিষয়টি একেবারেই উল্টো। দৃশ্যমান নাটকীয় কিছু না করে একটি টেকসই উপায়ে আন্তর্জাতিক বিশ্বব্যবস্থার দর–কষাকষির পরিবেশ বদলে দেওয়ার মাধ্যমেই ব্রিকসের প্রকৃত প্রভাব তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করতে ব্রিকসকে বিদ্যমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ধ্বংস করার প্রয়োজন নেই। তারা আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকে আরও বেশি প্রতিনিধিত্বের জন্য চাপ দিতে পারে, বিকল্প উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে পারে, ডলারের বাইরে লেনদেন ব্যবস্থা বাড়াতে পারে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নতুন কূটনৈতিক সুযোগ এনে দিতে পারে। এটিই শেষ পর্যন্ত তাদের সবচেয়ে প্রভাবশালী ভূমিকা হয়ে উঠতে পারে।
তাই বলা যায়, তাদের ভূরাজনৈতিক পদক্ষেপের এ সীমাবদ্ধতাই শেষ পর্যন্ত একধরনের আশীর্বাদ হতে পারে। সরাসরি কঠোর সংঘাত এড়িয়ে যাওয়ার ফলেই হয়তো জোটটি ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনার এবং ক্ষমতার ভারসাম্য বদলানোর বাড়তি সুযোগ পাবে।
রনি পি সসমিতা ইন্দোনেশিয়া স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিকস অ্যাকশন ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক। আল–জাজিরা থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।