
স্বাধীনতার ৫০ বছরের বেশি সময় ও গণ–অভ্যুত্থানের দুই বছর পর এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বারবার দেওয়া প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সেই সন্ধিক্ষণ নিয়ে লিখেছেন শরীফ ভূঁইয়া
বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীন বিচার বিভাগের আকাঙ্ক্ষা দীর্ঘদিনের। এই আকাঙ্ক্ষার সূত্রপাত দেশের স্বাধীনতারও আগে। পাকিস্তান আমলে পাকিস্তানের জন্য একটি নতুন সংবিধান প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় এবং পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা ছিল একটি অন্যতম দাবি।
স্বাভাবিকভাবেই ১৯৭২ সালে গৃহীত বাংলাদেশের সংবিধানে দৃঢ় ভাষায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল। সংবিধানে সমগ্র বিচার বিভাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ নির্বাহী বিভাগের পরিবর্তে সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছিল। তবে ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সময় এই সাংবিধানিক অঙ্গীকার ভঙ্গ করা হয় এবং বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের পরিবর্তে রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করা হয়।
জাতির অন্য বহু আকাঙ্ক্ষার মতো, ২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানের পর স্বাধীন বিচার বিভাগের দাবিও নতুন করে গুরুত্ব পায়। এই অভ্যুত্থান সংস্কার নিয়ে বহুধা বিস্তৃত ও গভীর আলোচনার জন্ম দেয়। আইন ও সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত বৃহত্তর বিতর্কের পরিসরে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা একটি অন্যতম প্রধান বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই বিষয়টির গুরুত্বের পরিপ্রেক্ষিতে, জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া প্রথম দিকের পদক্ষেপগুলোর একটি ছিল ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন। এর মধ্যে ছিল বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন ও সংবিধান সংস্কার কমিশন।
পরে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ থেকে বিচার বিভাগকে মুক্ত করার বিষয়ে উভয় সংস্কার কমিশন অভিন্ন সুপারিশ করে। এটা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রণীত জুলাই সনদেও স্থান পায়। তথাপি রাজনৈতিক সুবিধাবাদিতার কারণে বাংলাদেশ আবারও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার এক ঐতিহাসিক সুযোগ হারানোর দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।
স্বাধীন বিচার বিভাগের জন্য নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণকারী সাংবিধানিক কাঠামো বিচারকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সততার মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্নটিই সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে অধস্তন আদালতসমূহের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল-নির্ধারণ, পদোন্নতিদান ও ছুটি-মঞ্জুরিসহ) ও শৃঙ্খলাবিধান সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিল। চতুর্থ সংশোধনী সেই ব্যবস্থা বাতিল করে এসব ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির নিকট হস্তান্তর করে। পঞ্চম ও পঞ্চদশ সংশোধনী অধস্তন আদালতের ওপর রাষ্ট্রপতির কর্তৃত্ব বহাল রাখে, তবে একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শের বিধান করে।
দশকের পর দশক ধরে এই সাংবিধানিক ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক চলে আসছে। বহুল আলোচিত মাসদার হোসেন মামলার রায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে নিলেও তা সংশোধিত ১১৬ অনুচ্ছেদে আরোপিত সীমাবদ্ধতার মধ্যেই আটকে আছে। ওই মামলায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বিচারিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার একটি কাঠামো প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন। তবে ১১৬ অনুচ্ছেদের ভাষার কারণে এ ধরনের ব্যাখ্যার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কেও আপিল বিভাগ সচেতন ছিলেন।
পরে আপিল বিভাগ নিজেই এই কাঠামোগত সমস্যাটির কথা স্বীকার করেন। ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, যত দিন অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিষয়ক ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের হাতে থাকবে, তত দিন প্রকৃত বিচারিক স্বাধীনতা অধরাই থেকে যাবে।
১১৬ অনুচ্ছেদ মামলার রায়ে আদালত কোনো নতুন সাংবিধানিক ধারণা প্রবর্তন করেননি। বরং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে বিদ্যমান একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রেক্ষাপটে আদালত তাঁর সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। বর্তমানে ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)—এই অঙ্গীকারের কথা আগে বহুবার স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছে।
অভ্যুত্থানের পর বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে, ১১৬ অনুচ্ছেদের ধারাবাহিক সংশোধনগুলো প্রথমবারের মতো সুপ্রিম কোর্টের বিবেচনার জন্য পেশ করা হয়। ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট একটি জনস্বার্থমূলক মামলা মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন বনাম বাংলাদেশ (১১৬ অনুচ্ছেদ মামলা) দায়ের করা হয়, যেখানে ওই সংশোধনগুলোর বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়।
১১৬ অনুচ্ছেদ মামলার গুরুত্ব মাসদার হোসেন মামলার তুলনায় অনেক বেশি। কারণ, মাসদার হোসেন মামলাটি যেখানে সংশোধিত ১১৬ অনুচ্ছেদের সীমার মধ্যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল, সেখানে ১১৬ অনুচ্ছেদ মামলা সরাসরি এই সমস্যার অন্তর্নিহিত সাংবিধানিক কারণকে সামনে এনেছে।
১১৬ অনুচ্ছেদ মামলায় হাইকোর্টের রায় ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে দেওয়া হয় এবং পূর্ণাঙ্গ লিখিত রায় ৭ এপ্রিল ২০২৬–এ প্রকাশিত হয়। ওই রায়ে ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশোধনগুলো বাতিল করে অনুচ্ছেদটিকে ১৯৭২ সালের মূল অবস্থায় পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়া হয়। এর ফলে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আবারও সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত হয়। একই রায়ে বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আদালত আইন মন্ত্রণালয়কে তিন মাসের মধ্যে একটি বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ারও নির্দেশ দেন।
রায়ের পর ৩০ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক ও বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার সচিবালয়টি প্রতিষ্ঠা করে। বর্তমান সরকার ১০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে এটি বিলুপ্ত করার আগে বিচার বিভাগীয় সচিবালয়টি কয়েক মাস কার্যকর ছিল।
১১৬ অনুচ্ছেদ মামলার রায়ে আদালত কোনো নতুন সাংবিধানিক ধারণা প্রবর্তন করেননি। বরং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে বিদ্যমান একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রেক্ষাপটে আদালত তাঁর সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। বর্তমানে ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)—এই অঙ্গীকারের কথা আগে বহুবার স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছে।
বিরোধী দলে থাকার সময় বিএনপি বারবার অভিযোগ করেছে যে বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার দণ্ড ও কারাবাস, চিকিৎসার ক্ষেত্রে আরোপিত বিধিনিষেধ এবং দলটির বহু নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে দায়ের করা অসংখ্য মামলা—এসব ঘটনাকে বিএনপি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা না থাকার ফল হিসেবে তুলে ধরেছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার আসামি হয়েছিলেন। এ ধরনের মামলা ও তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়া দণ্ডের কারণে তাঁকে দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকতে হয়েছিল।
তাই বিএনপির সাংবিধানিক সংস্কারের প্রস্তাবনায় বিচার বিভাগ সংস্কার যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করবে, সেটিই ছিল স্বাভাবিক। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে ঘোষিত দলটির ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচিতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করা এবং একটি পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করা হয়েছিল।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কাছে বিএনপি এসব অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছিল এবং বিএনপির কোনো ভিন্নমত ছাড়াই সেগুলো জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত হয়। জুলাই সনদ নিয়ে দলটির যেসব আপত্তি ছিল, তার কোনোটিই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের নিকট হস্তান্তর কিংবা বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল না।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের জন্য দলটির নির্বাচনী ইশতেহারেও একই অঙ্গীকার করা হয়। ইশতেহারে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, অধস্তন আদালতগুলোর নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে থাকবে এবং ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত বিচার বিভাগীয় সচিবালয়কে আরও শক্তিশালী করা হবে।
এই প্রেক্ষাপটে ১০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে সংসদ কর্তৃক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার অধ্যাদেশটি বাতিল করা এবং সচিবালয়টি বিলুপ্ত করা ছিল হতাশাব্যঞ্জক। এটি শুধু বর্তমান ক্ষমতাসীন দলটির বারবার করা অঙ্গীকার থেকে গুরুতর বিচ্যুতি নয়, ১১৬ অনুচ্ছেদ মামলার রায়েরও লঙ্ঘন। হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত না হওয়া বা রায়টি বাতিল না হওয়া পর্যন্ত পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বাধ্যবাধকতা আইনের অংশ হিসেবেই বলবৎ ছিল।
সরকার হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার কোনো উদ্যোগ না নিয়েই উপরিউক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করে। তবে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) ড. বদিউল আলম মজুমদার ২০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে একটি আপিল করেন। একই সঙ্গে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের জন্য আবেদন করেন, যাতে সচিবালয় বিলুপ্তকারী আইনের বিধানগুলোর কার্যকারিতা স্থগিত থাকে এবং বিচার বিভাগীয় সচিবালয়ের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার বিষয়ে স্থিতাবস্থা বজায় থাকে। পরে সরকার ২১ মে ২০২৬ তারিখে আপিল দায়ের করে এবং একই সঙ্গে হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত রাখার জন্য আবেদন করে।
আপিলগুলোর সঙ্গে দাখিল করা আবেদনগুলো ৯ জুন ২০২৬ তারিখে আপিল বিভাগে শুনানি হয়। সেদিন আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করেন। তবে আপিল বিভাগের এই স্থগিতাদেশের পূর্ব পর্যন্ত, অর্থাৎ ১০ এপ্রিল থেকে ৯ জুন ২০২৬ পর্যন্ত, সরকার হাইকোর্টের রায় লঙ্ঘন করে কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।
সমগ্র জাতি গভীর আগ্রহ ও আশাবাদ নিয়ে আপিলগুলোর ফলাফলের দিকে তাকিয়ে থাকবে, যাতে স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় পর দেশ অবশেষে স্বাধীন বিচার বিভাগের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে পারে—যে আকাঙ্ক্ষা দীর্ঘদিন অস্বীকার করার ফলে দেশের মানুষকে অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। আপিল বিভাগ কর্তৃক হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত বহাল রেখে দেওয়া রায় শুধু বিচার বিভাগের জন্য নয়, সমগ্র জাতির জন্যই একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হয়ে থাকবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্নটি এখানে সামনে আসে তা হলো, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান কি দেশের জনগণের প্রতি সরকারের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও বারবার দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে, এসব প্রতিশ্রুতি ৩১ দফা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কাছে পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছিল, জুলাই সনদে লিপিবদ্ধ হয়েছিল, নির্বাচনী ইশতেহারে পুনরায় উল্লেখ করা হয়েছিল এবং গণভোট ও সাধারণ নির্বাচন—উভয় প্রচারণাতেই আবারও জোর দিয়ে বলা হয়েছিল।
দুঃখজনকভাবে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বিএনপি যে সংস্কারকে একসময় অপরিহার্য বলে জোরালোভাবে সমর্থন করেছিল, এখন সেই সংস্কারই দলটির কাছে রাজনৈতিকভাবে অসুবিধাজনক হয়ে উঠেছে বলে মনে হচ্ছে। জনগণ প্রত্যাশা করেছিল, দলটি বিরোধী দল থেকে সরকারে আসার সঙ্গে সঙ্গেই তার দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো ভঙ্গ করবে না।
স্বাধীনতার ৫০ বছরের বেশি সময় ও গণ–অভ্যুত্থানের দুই বছর পর এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বারবার দেওয়া প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিএনপি যদি তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং আপিল বিভাগে বিচারাধীন আপিলগুলোতে হাইকোর্টের রায়ের পক্ষে অবস্থান নেয়, তাহলে দেশের পক্ষে সঠিক পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। আর যদি বিএনপি তার নিজস্ব প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যাওয়ার অবস্থানই অব্যাহত রাখে, তাহলে হাইকোর্টের রায় বহাল থাকবে নাকি বাতিল হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব আপিল বিভাগের ওপর বর্তাবে।
হাইকোর্টের রায়টি সুপ্রতিষ্ঠিত আইনি নীতিমালা এবং আইনের যথাযথ ও সঠিক ব্যাখ্যার ভিত্তিতে প্রদত্ত। প্রয়োজনীয় পর্যালোচনার ভিত্তিতে আপিল বিভাগ এই রায়টি বহাল রাখাই সমীচীন মনে করতে পারেন।
সমগ্র জাতি গভীর আগ্রহ ও আশাবাদ নিয়ে আপিলগুলোর ফলাফলের দিকে তাকিয়ে থাকবে, যাতে স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় পর দেশ অবশেষে স্বাধীন বিচার বিভাগের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে পারে—যে আকাঙ্ক্ষা দীর্ঘদিন অস্বীকার করার ফলে দেশের মানুষকে অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। আপিল বিভাগ কর্তৃক হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত বহাল রেখে দেওয়া রায় শুধু বিচার বিভাগের জন্য নয়, সমগ্র জাতির জন্যই একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হয়ে থাকবে।
ড. শরীফ ভূঁইয়া সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী
মতামত লেখকের নিজস্ব