
একের পর এক রাজনৈতিক চমক দেওয়ার জন্য পাকিস্তান পরিচিত। একাধিক সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষতবিক্ষত দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, কোনো প্রধানমন্ত্রীই কখনো পূর্ণ পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। পরিহাস হলো, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতিতে একমাত্র ধারাবাহিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা।
একদিকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও দেশের প্রভাবশালী সামরিক কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার দাবি তুলে গর্ব করছে। এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনায় মধ্যস্থতার ভূমিকা। অন্যদিকে আফগানিস্তান এবং সাবেক মিত্র আফগান তালেবানের সঙ্গে বিরোধ মেটাতে পারেনি পাকিস্তান।
বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখাওয়ায় সশস্ত্র হামলাও নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না দেশটি। বালুচ বিদ্রোহী ও তেহরিক–ই–তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) হামলা বেড়ে যাওয়ায় দেশের নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
এখন নতুন দুটি বড় বিতর্ক দেখা দিয়েছে। একটি হলো দেশে নতুন প্রদেশ গঠনের পরিকল্পনা বিবেচনা করা হচ্ছে এমন একটি খবর। বিষয়টি পুরোনো এবং মাঝেমধ্যেই সরকারি ও জনপরিসরের আলোচনায় ফিরে আসে।
তবে ইসলামাবাদে পাকিস্তান ইকোনমিক সামিট ২০২৬–এ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভির বক্তব্যের পর তা নতুন গতি পেয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা যে ব্যবস্থার অধীনে এত দিন বসবাস করছি, তা ভেঙে পড়েছে।’
সামরিক কর্তৃপক্ষের ঘনিষ্ঠ একজন মন্ত্রীর কাছ থেকে এটি ছিল জোরালো বক্তব্য। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করেই নাকভি মন্ত্রিসভায় রয়েছেন; তিনি সামরিক বাহিনীর মনোনীত ব্যক্তি। ২০২৩ সালের ২২ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি পাঞ্জাবের তত্ত্বাবধায়ক মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন।
সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিযুক্ত হওয়ার পর থেকে তিনি সামরিক কর্তৃপক্ষের নীতির পক্ষে নিজের প্রভাব খাটাচ্ছেন। জাতীয় ক্রিকেট দলের বাজে পারফরম্যান্স নিয়ে তীব্র সমালোচনার মধ্যেও নাকভি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) চেয়ারম্যান পদে বহাল রয়েছেন।
তারপরও নাকভি কিংবা তাঁর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস কেউ করেন না। এটি স্পষ্ট করে যে তিনি সামরিক কর্তৃপক্ষের সমর্থন পাচ্ছেন। ফলে তিনি যখন বললেন, ‘সব রাজনৈতিক দলকে একটি কক্ষে একসঙ্গে বসতে হবে—এক দিন, এক মাস কিংবা এক বছর, যত সময়ই লাগুক।
সন্ত্রাসবাদের উৎস যদি সত্যিই পাঞ্জাবের প্রতিবেশী প্রদেশগুলো হয়, তাহলে পাঞ্জাবিদের প্রাধান্য থাকা কেন্দ্রীয় সরকার কী করছে? আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, পাঞ্জাবিদের প্রাধান্য থাকা দেশের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী কী করছে?
নতুন প্রশাসনিক একক ও প্রদেশসহ দেশের প্রতিটি সমস্যার নিষ্পত্তি করতে হবে তাদের’, তখন তাঁর বক্তব্যকে সামরিক কর্তৃপক্ষের চিন্তার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়েছে।
পাকিস্তানের নিরাপত্তা ও সামগ্রিক পরিস্থিতির আলোকে দেখলে এই বক্তব্য থেকে দুটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। প্রথমত, বর্তমান শাসকগোষ্ঠী দেশের ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সমস্যা মোকাবিলা করতে পারছে না। প্রকাশ্যে এই স্বীকারোক্তির অর্থ হলো, সমস্যাগুলো ঠেকানোর সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বড় বড় দাবি করলেও বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখাওয়ায় সশস্ত্র হামলা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, সে বিষয়ে সামরিক কর্তৃপক্ষের কোনো ধারণা নেই। এখন খাইবার পাখতুনখাওয়ার পিটিআই নেতৃত্বাধীন সরকারকে সরানোর অজুহাত তৈরি করা হচ্ছে।
আরেকটি বিতর্ক এই স্ববিরোধিতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ সম্প্রতি বলেছেন, ‘আমার প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে প্রতিবেশী প্রদেশগুলো থেকেই হুমকি বেশি। সেখান থেকে পাঞ্জাবে সন্ত্রাসবাদ আসে। সবার নজর পাঞ্জাবের দিকে।’
মরিয়ম নওয়াজ সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের মেয়ে এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের ভাতিজি। পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি শুধু দেশের সশস্ত্র হামলা নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যর্থতা স্বীকার করেননি; তাঁর বক্তব্যে এমন ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে যে তাঁর প্রদেশ নিজেকে অন্য তিনটি প্রদেশ থেকে আলাদা মনে করে।
মরিয়ম কী বার্তা দিতে চেয়েছেন? নিরাপত্তা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ বিদ্যমান প্রদেশগুলো ভেঙে নতুন প্রদেশ গঠনের প্রস্তাবের জবাব কি এটি? নাকি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে রাজনৈতিক সহিংসতার ভূমিকার ইঙ্গিত, যা দলগুলো নিজেদের সমর্থন ধরে রাখতে ব্যবহার করে? প্রত্যাশিতভাবেই মরিয়মের বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্ন পক্ষের তীব্র নিন্দা কুড়িয়েছে। সহিংসতাপীড়িত খাইবার পাখতুনখাওয়ায় ক্ষমতাসীন পিটিআই বলেছে, মরিয়মের সমস্যা প্রতিবেশী প্রদেশগুলোতে নয়, তাঁর ‘নিজের মানসিকতা ও অগ্রাধিকারে’।
নওয়াজ শরিফ ছিলেন সামরিক স্বৈরশাসক জিয়াউল হকের অত্যন্ত প্রিয়পাত্র। সামরিক বাহিনীর সমর্থনেই তিনি পাঞ্জাব শাসন করতেন। আফগানিস্তানে ব্যবহারের জন্য জিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিলেন। আজ সেই গোষ্ঠীগুলোই পাকিস্তানের দিকে অস্ত্র তাক করেছে।
সন্ত্রাসবাদের উৎস যদি সত্যিই পাঞ্জাবের প্রতিবেশী প্রদেশগুলো হয়, তাহলে পাঞ্জাবিদের প্রাধান্য থাকা কেন্দ্রীয় সরকার কী করছে? আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, পাঞ্জাবিদের প্রাধান্য থাকা দেশের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী কী করছে?
যেভাবেই দেখা হোক, পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষ চাপের মুখে পড়েছে বলেই মনে হচ্ছে। এসব ঘটনার পেছনের কারণগুলো কোনো না কোনোভাবে সামরিক কর্তৃপক্ষের দিকেই ফিরে যায়। তারপরও সরকারকে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কিংবা নীতি ও কর্মকৌশল সংশোধনের চেষ্টা করতে দেখা যাচ্ছে না। বাস্তবতা হলো, পাকিস্তানের অভিজাত শাসকদের অভ্যন্তরীণ বা পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো ধারাবাহিকতা নেই। খুব সম্ভবত এসব সমস্যা দেশটিকে আরও দীর্ঘদিন তাড়া করে ফিরবে।
নাজির আহমদ মির নয়াদিল্লির সেন্টার ফর পিস স্টাডিজের রিসার্চ ফেলো
ফ্রন্টলাইন থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত