২১ এপ্রিল জাতীয় সংসদ অধিবেশনে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম সংসদ সদস্যদের একটি ‘সুখবর’ দেন। সেটি হলো প্রত্যেকের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় তাঁদের জন্য সরকার একটি ‘বসার জায়গা’ করে দেবে। শুধু সরকারি দল নয়, বিরোধী দলের সদস্যরাও সরকারের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। কোনো কোনো সদস্য এর সঙ্গে গাড়ির ব্যবস্থা করারও দাবি জানান।
এ বিষয়ে একই দিনে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে একটি প্রজ্ঞাপনও জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘উপজেলাসমূহে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিদর্শনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য উপজেলা পরিষদের পুরোনো কমপ্লেক্স ভবনে (দ্বিতীয় তলায়) উন্নত মানের আসবাব সজ্জিত একটি “পরিদর্শন কক্ষ” (ওয়াশ রুমসহ) স্থাপন করতে হবে। নতুন উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের লক্ষ্যে ডিপিপিতে প্ল্যান ডিজাইনসহ পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কমপ্লেক্স ভবনের দ্বিতীয় তলায় একটি নির্ধারিত কক্ষের সংস্থান রাখার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।’
এটি একটি ভয়ানক সিদ্ধান্ত, যার মাধ্যমে আমাদের স্থানীয় সরকারব্যবস্থাই ধ্বংস হয়ে যাবে বলে আমাদের আশঙ্কা। কারণ, এর মাধ্যমে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা পুরোপুরি সংসদ সদস্যদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়বে। এমনকি ১৯৯১ সালের মতো উপজেলা পরিষদ বাতিল হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দেবে। সর্বোপরি অতীতের মতো স্থানীয় পর্যায়ে ‘এমপি রাজ’ সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হবে।
সরকারের এ সিদ্ধান্ত আমাদের সংবিধানের ওপর একটি নগ্ন হস্তক্ষেপ। বাংলাদেশ সংবিধানের ৫৬(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘জাতীয় সংসদ নামে বাংলাদেশের একটি সংসদ থাকিবে এবং এই সংবিধানের বিধানাবলি-সাপেক্ষে প্রজাতন্ত্রের আইন প্রণয়ন-ক্ষমতা সংসদের ওপর ন্যস্ত হইবে।’ অর্থাৎ ‘হাউস অব দ্য পিপল’ বা জাতীয় সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব হলো মোটাদাগে আইন তৈরি-সংশোধন-বাতিল করা, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, বাজেট অনুমোদন করা এবং নীতিনির্ধারণী বিষয়ে ভূমিকা রাখা। তাই তাঁদের কর্মস্থল হলো লুই কানের তৈরি পৃথিবী–বিখ্যাত ‘আর্কিটেকচারাল মনুমেন্ট’ বা স্থাপত্যগত সৌধ জাতীয় সংসদ ভবন। এ কারণে তাঁদের জন্য ন্যাম ভবনে অফিস ও আবাসনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
এ ছাড়া সিদ্ধান্তটি সংবিধানের ৫৯(১) অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে।’ অর্থাৎ স্থানীয় সরকারও কেন্দ্রীয় সরকারের সমান্তরাল একটি স্বায়ত্তশাসিত সরকার।
ফলে জেলায় নির্বাচিত জেলা পরিষদ, উপজেলায় নির্বাচিত উপজেলা পরিষদ এবং ইউনিয়নে নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ শাসনকার্য পরিচালনা করবে। একইভাবে সিটি করপোরেশনে নির্বাচিত সিটি করপোরেশন এবং পৌরসভায় নির্বাচিত পৌর সরকার প্রতিনিধিরা শাসনকার্য পরিচালনা করবেন।
সিদ্ধান্তটি আমাদের উচ্চ আদালতের রায়েরও পরিপন্থী। অনেকেরই হয়তো জানা নেই যে জোট সরকারের আমলে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জেলা মন্ত্রীর পদ সৃষ্টি করা হয়েছিল। সরকারের এ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন মাননীয় সংসদ সদস্য আনোয়ার হোসেন মঞ্জু উচ্চ আদালতে একটি রিট দায়ের করেন। তিনি দাবি করেন, জেলা মন্ত্রীর কারণে তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকায় স্থানীয় উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারছেন না।
এই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বনাম বাংলাদেশ [১৬ বিএলটি (এইচসিডি) (২০০৮)] মামলার রায়ে মাননীয় হাইকোর্ট প্রজ্ঞাপনটি অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে রায় দেন, মন্ত্রী, হুইপ, সংসদ সদস্য প্রমুখের স্থানীয় উন্নয়নে সম্পৃক্ত হওয়াটা অসাংবিধানিক।
সর্বোপরি সরকারের এ সিদ্ধান্ত বিএনপির বহু আলোচিত ৩১ দফার এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রকাশিত বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
বিএনপির ৩১ দফার ২০ দফায় বলা হয়েছে, ‘স্থানীয় সরকার হলো গণতন্ত্র ও উন্নয়নের প্রাণকেন্দ্র।...ক্ষমতার ব্যাপক বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে অধিকতর স্বাধীন, শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান করা হবে। এসব প্রতিষ্ঠানকে এমনভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে, যেন তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন পরিষেবা প্রদান ও উন্নয়ন কার্যক্রমে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন ও অন্য কোনো জনপ্রতিনিধির খবরদারিমুক্ত স্বাধীন স্থানীয় সরকার নিশ্চিত করা হইবে। মৃত্যুজনিত কারণ কিংবা আদালতের আদেশে পদ শূন্য না হইলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে সরকারি প্রশাসক নিয়োগ করা হবে না। আদালত কর্তৃক দণ্ডপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নির্বাহী আদেশবলে সাসপেন্ড/বরখাস্ত/অপসারণ করা হবে না।’
সংসদ সদস্যদের উপজেলা পরিষদে বসার জায়গা করে দেওয়ার ফলে উপজেলা চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্যদের দ্বন্দ্ব চরমে উঠবে। কারণ, স্থানীয়ভাবে স্থায়ী অফিস স্থাপিত হলে সংসদ সদস্যরাই সব সিদ্ধান্ত নিতে চাইবেন। পিঁড়ির কোনায় কাউকে বসতে দিলে সেই ব্যক্তি পুরো পিঁড়ি দখল করতে চায়—এটিই স্বাভাবিক। কারণ, ক্ষমতার ধর্মই হলো যেখানে ক্ষমতা, সেখানে তা কুক্ষিগত এবং তার অপব্যবহার হয়।
একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে স্থানীয় সরকারকে উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার অঙ্গীকার করে।
সরকারের সিদ্ধান্তটি একটি ‘কালারেবল’ বা রঙিন পদক্ষেপও। যেটি প্রত্যক্ষভাবে করা যায় না তা পরোক্ষভাবে করলে সেটি ‘কালারেবিলিটি’ সমস্যায় ভোগে। বিদ্যমান আইনে সংসদ সদস্যদের উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা করা হয়েছে। পাশাপাশি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের প্রধান নির্বাহী হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। সংসদ সদস্যদের উপদেষ্টার পদ প্রদান কালারেবিলিটি সমস্যার সৃষ্টি করেছে। তাঁদের উপজেলা পরিষদে অফিসের ব্যবস্থা করা এ সমস্যাকে আরও ভয়াবহ রূপ দেবে।
বিদ্যমান ব্যবস্থায় উপজেলা চেয়ারম্যানদের সঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। এই দ্বন্দ্বের একটি কারণ হলো যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যানদের তাঁদের অধস্তন মনে করেন এবং নিজেদের ‘স্যার’ সম্বোধন করার দাবি তোলেন। প্রসঙ্গত, এই সমস্যা তুলে ধরার জন্য নির্বাহী কর্মকর্তাদের একটি অংশ প্রয়াত ড. মুজাফ্ফর আহমদ, ড. তোফায়েল আহমেদ এবং আমাকে উপজেলাতে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এ
পদ্ধতিতে উপজেলা চেয়ারম্যানদের সঙ্গে সংসদ সদস্যদেরও দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়।
সংসদ সদস্যদের উপজেলা পরিষদে বসার জায়গা করে দেওয়ার ফলে উপজেলা চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্যদের দ্বন্দ্ব চরমে উঠবে। কারণ, স্থানীয়ভাবে স্থায়ী অফিস স্থাপিত হলে সংসদ সদস্যরাই সব সিদ্ধান্ত নিতে চাইবেন। পিঁড়ির কোনায় কাউকে বসতে দিলে সেই ব্যক্তি পুরো পিঁড়ি দখল করতে চায়—এটিই স্বাভাবিক। কারণ, ক্ষমতার ধর্মই হলো যেখানে ক্ষমতা, সেখানে তা কুক্ষিগত এবং তার অপব্যবহার হয়।
এ ছাড়া সরকারের সিদ্ধান্তটি সরকার ও দলের মধ্যকার পার্থক্য তিরোহিত করবে, যার কুফল আমরা শেখ হাসিনা সরকারের আমলে দেখেছি। সংসদ সদস্যরা উপজেলায় বসলে দলীয় নেতা-কর্মীদের পদচারণে উপজেলা পরিষদ মুখর হয়ে উঠবে। ফলে সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে উপজেলার সব কার্যক্রম দলের করায়ত্ত হয়ে যাবে, যা কারও জন্যই মঙ্গলকর হবে না।
পরিশেষে এটি না বললেই নয় যে সরকারি ও বিরোধী দলনির্বিশেষে সব সংসদ সদস্যকে সরকারের এ সিদ্ধান্তের প্রতি স্বার্থপ্রণোদিত সমর্থন আমাদের হতাশ করেছে। বহু রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ভোটাধিকারের মাধ্যমে গঠিত সংসদের কাছ থেকে আমরা অনেক ভালো কিছু আশা করেছিলাম। তাই মাননীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে আমাদের সনির্বন্ধ অনুরোধ, আপনারা জনস্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সরকারের বর্তমান এবং অন্যান্য সিদ্ধান্তকে মূল্যায়ন করুন এবং জনগণের দোরগোড়ার সরকারকে কার্যকর ও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিন।
ড. বদিউল আলম মজুমদার সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)
মতামত লেখকের নিজস্ব