
ইশতেহারের ক্ষেত্রে পর্যালোচনার একটা অসুবিধা হলো, কোনো দলই ইশতেহারে ভালো ভালো কথা বলতে কার্পণ্য করে না। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিও ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু সমস্যা হলো, যতক্ষণ পর্যন্ত সেই ভালো ভালো কথা কাজে প্রমাণিত না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত সেগুলা স্রেফ প্রতিশ্রুতিই। তাতে জনগণের জীবনের কোনো পরিবর্তন আসলে হয় না।
বিএনপির ইশতেহারেও বহু জায়গায় এমন সব প্রতিশ্রুতি আছে, যেগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, তা স্পষ্ট উল্লেখ নেই। তাই সেসব নিয়ে আলোচনা করাটা আপাতত অর্থহীন। বরং বিএনপির ৪৮ পৃষ্ঠার ইশতেহারের উদ্বেগজনক কিছু জায়গা নিয়েই এই সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা।
বিএনপিও জামায়াতে ইসলামীর মতো ‘মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস’ তুলে ধরতে চায়। কিন্তু সেই সঠিক ইতিহাস আওয়ামী লীগ কিংবা জামায়াতের মতো আরেকটা দলীয় ইতিহাস যদি হয়, তাহলে কোনো লাভ নেই। দরকার সব প্রকার দলীয় বয়ানমুক্ত নির্মোহ ইতিহাস। সেই ইতিহাস দলটি কীভাবে সংকলিত করবে, তা নিয়ে ইশতাহারে পরিষ্কার কিছু বলা নেই।
বিএনপি উচ্চকক্ষে যেসব বিশিষ্ট নাগরিক, পেশাজীবীদের আনতে চায়, তাঁদের কিসের ভিত্তিতে নির্বাচন করা হবে, সেটার কোনো পরিষ্কার মেকানিজম তার ইশতেহারে দেয়নি। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলো যদি নিম্নকক্ষের আসনসংখ্যার ভিত্তিতেই উচ্চকক্ষে প্রতিনিধিত্ব করে, তাহলে উচ্চকক্ষ করে লাভটা কী? এ প্রশ্নের উত্তরও বিএনপির ইশতেহারে নেই।
বিএনপি ইশতেহারে বলেছে, সম্পাদিত আন্তর্জাতিক যেকোনো চুক্তি সম্পর্কে জাতীয় সংসদকে অবহিত করা হবে। কিন্তু কতটুকু অবহিত করা হবে, কীভাবে অবহিত করা হবে, সেটা ইশতেহারে পরিষ্কার নয়। আন্তর্জাতিক চুক্তি হওয়ার ক্ষেত্রে আগে তো সংসদে সেই চুক্তি নিয়ে তর্কবিতর্ক করার সুযোগ দিতে হবে।
সম্পাদন করে অবহিত করলে তো আসলে কোনো ফায়দা নেই। রাষ্ট্রপতির ক্ষমাপ্রদর্শনের ক্ষেত্রে বিএনপি ইশতেহারে বলেছে, আইনের দ্বারা নির্ধারিত মানদণ্ড, নীতি ও পদ্ধতি অনুসরণ করে রাষ্ট্রপতি ক্ষমাপ্রদর্শনের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন। কেন এ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর পরিবারের সম্মতি নেওয়ার সংস্কার-আলাপটি বিএনপি পাশ কাটাল, তার কোনো ব্যাখ্যা ইশতেহারে নেই!
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) কিংবা জামায়াতের মতোই অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ঘটা রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, মব সন্ত্রাসের বিচার করার কোনো পরিষ্কার প্রতিশ্রুতি বিএনপি তার ইশতেহারে দিতে পারেনি। ব্যাপারটি দুঃখজনক। বিএনপি বলেছে, স্থানীয় সরকারের কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি আদালত কর্তৃক দণ্ডপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে নির্বাহী আদেশবলে সাসপেন্ড বা বরখাস্ত করা হবে না।
এটা একটা বিপজ্জনক ধারণা। কারণ, আদালতের রায় আসতে সময় লাগে। সত্যিকারের কোনো অপরাধী স্থানীয় সরকার সদস্য যদি আদালতের রায় আসার বিলম্বকে পুঁজি করে স্থানীয় সরকারের ক্ষমতাকে কাজে লাগান? যদি মামলার বাদীকে হয়রানির মুখে ফেলেন? প্রমাণ নষ্ট করে কিংবা ক্ষতিসাধন করেন, সেটা কীভাবে ঠেকানো হবে? বিএনপির ইশতেহারে এর কোনো পরিষ্কার উত্তর নেই।
নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতার মধ্যে আনতে বিএনপি বছরে একবার উন্নয়নকাজের জন্য উন্মুক্ত সভা আয়োজন করবে বলেছে। কিন্তু এসব সভায় সবাই যে মেম্বার–চেয়ারম্যানের কথার সঙ্গে ‘ঠিক ঠিক’ করে আসবেন না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
অন্যদিকে এসব সভায় উপযুক্তভাবে জনপ্রতিনিধিদের চেপে ধরতে মানুষের কাছে টেন্ডার পাস হওয়া উন্নয়ন প্রকল্পের ডিপিপি উন্মুক্ত করা প্রয়োজন, যাতে মানুষ বিস্তারিত তথ্য দেখার সুযোগ পান। অথচ এ কাজ, যেটা করতে সরকারের কোনো বাড়তি পয়সা খরচ করতে হয় না, সেটি করার ব্যাপারে অন্যান্য দলের মতো বিএনপিও চুপ।
বরেন্দ্র অঞ্চল নিয়ে বিএনপির খাল খনন আদৌ কতটা কাজে দেবে, সেটা বলা মুশকিল; বরেন্দ্র অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জন্য যেখানে এখন রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং বা বৃষ্টির পানিকে মাটির নিচে পাঠিয়ে পানির স্তর ঠিক করায় মনোযোগ দেওয়া দরকার সবচেয়ে বেশি।
সে রকম কোনো কিছু বিএনপির ইশতেহারে চোখে পড়ল না। তারা নানান জলাধার তৈরি করার বললেও কোনটাই মাটির নিচের পানির স্তর ঠিক করার জন্য তৈরি করবেন না, স্রেফ খাওয়ার পানির সংকট মেটানোর জন্য বানাবেন।
পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ইশতেহারে বিএনপি যে এক্সক্লুসিভ ট্যুরিজম জোন গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেটা পাহাড়ে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর জন্য বিপজ্জনক বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। কারণ, এসব ট্যুরিজম জোন গড়তে গিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষের উচ্ছেদ হওয়ার উদাহরণের অভাব নেই।
বিএনপি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য যৌক্তিক মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কথা বললেও সেটা কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, তার কোনো পরিষ্কার ব্যাখ্যা ইশতেহারে দিতে পারেনি। জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নিয়েও কোনো প্রতিশ্রুতি নেই বিএনপির ইশতেহারে।
অন্যান্য দলের মতোই বিএনপির ইশতাহারের পররাষ্ট্রনীতিতেও পরিষ্কারভাবে অসম চুক্তি বাতিল এবং গোপন চুক্তি প্রকাশের কোনো প্রতিশ্রুতি দেখা গেল না; যদিও তারা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ক্রয়ে গোপন চুক্তি করবে না বলে কথা দিয়েছে। একই সঙ্গে এই খাতে বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি যৌক্তিক রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে পুনর্বিন্যাস করার কথা বলেছে।
বিএনপির ইশতেহারে বন্য প্রাণীদের আবাসস্থল ও অভয়ারণ্য এলাকায় শিল্পকারখানা স্থাপনকে নিষিদ্ধ করা নিয়ে কিছু বলা নেই। অন্যদিকে নদীপাড়ের ইকো-ট্যুরিজম করার যে প্রতিশ্রুতি বিএনপি দিয়েছে, তাতে আশঙ্কা জাগে। কারণ, ইকো-ট্যুরিজমের যে নতুন করে নদীর পাড় দখল–দূষণের অজুহাত হবে না, এর নিশ্চয়তা নেই। বিএনপি সরাসরি বলেছে যে তারা অর্থনীতির উদারীকরণ করবে।
অর্থাৎ মুক্তবাজার অর্থনীতিই হবে তার মূল অর্থনৈতিক দর্শন। কিন্তু দলটা শ্রমিকদের যেসব প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে—বন্ধ হওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল, চিনিকল ইত্যাদি পুনরায় চালু করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে—সেটা তো উদারীকৃত মুক্তবাজার অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
এনসিপির মতো বিএনপিও ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট বা এফটিএ করার কথা বলেছে। প্রশ্ন হলো এফটিএ করা হলে বাংলাদেশের মতো দুর্বল দেশের স্বার্থ কীভাবে রক্ষিত হবে, এটার কোনো ব্যাখ্যাও ইশতেহারে নেই। ইশতেহারে বিএনপি ২০৩০ সালের মধ্যে ন্যাশনাল এনার্জি মিক্সে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান ২০ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ খাতে পরিবেশবিনাশী কয়লার ব্যবহার নিয়ে তার কোনো আলাপ নেই।
সুন্দরবনবিনাশী কুখ্যাত রামপাল কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো শ্বেতহস্তী ধরনের প্রকল্প সম্পর্কে বিএনপির ইশতেহারে স্পষ্ট কোনো অবস্থান নেই।
পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ইশতেহারে বিএনপি যে এক্সক্লুসিভ ট্যুরিজম জোন গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেটা পাহাড়ে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর জন্য বিপজ্জনক বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। কারণ, এসব ট্যুরিজম জোন গড়তে গিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষের উচ্ছেদ হওয়ার উদাহরণের অভাব নেই।
সর্বশেষ যে কথা বলতে চাই, তা হলো, বিএনপির ইশতেহারে নানা বিষয়ে অধিকতর তদন্ত, কমিশন, শ্বেতপত্রের কথা বলা হলেও এতে খুব পরিষ্কার করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ঘটা দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দেশবিরোধী চুক্তি নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়ার কথা থাকা উচিত ছিল। অন্যান্য দলের মতোই তারাও সেই প্রতিশ্রুতি দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
ফলে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, অন্তর্বর্তী সরকারকে একটি অন্যায্য ‘ব্ল্যাংক চেক’ দেওয়ার ব্যাপারে বিএনপিও পিছপা হয়নি—তাদের ইশতেহার পর্যালোচনা করে এ কথা এখন তাই নির্দ্বিধায় বলাই যায়।
মাহতাব উদ্দীন আহমেদ লেখক, গবেষক এবং সদস্য, গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি। ই-মেইল: mahtabjuniv@gmail.com
*মতামত লেখকের নিজস্ব