বিশ্লেষণ

বাংলাদেশে ‘ডিজিটাল নাগরিকত্ব’ নিয়ে বিভ্রান্তি কেন

বাংলাদেশ যদি সত্যিই একটি দায়িত্বশীল ডিজিটাল সমাজ গড়ে তুলতে চায়, তাহলে তাকে প্রযুক্তির চেয়ে মানুষকে গুরুত্ব দিতে হবে। অ্যালগরিদমের চেয়ে নৈতিকতা, ভাইরালের চেয়ে সত্য আর জনপ্রিয়তার চেয়ে বিশ্বাসযোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এটি কোনো দ্রুত সমাধানের পথ নয়, কিন্তু এটি একমাত্র টেকসই পথ। লিখেছেন রিজওয়ান-উল-আলম

একটা প্রশ্ন দিয়েই শুরু করি। স্মার্টফোন হাতে পেয়েই আমরা সবাই নিজেকে ডিজিটাল পরিসরের একজন সক্রিয় নাগরিক বলে ভাবতে শুরু করেছি। আমরা কি আসলেই ‘ডিজিটাল নাগরিক’?

ইউটিউবার, ব্লগার, ফেসবুক অ্যাকটিভিস্ট, অনলাইন বক্তা কিংবা রাজনৈতিক ভাষ্যকার—অনেকেই তাঁদের কর্মকাণ্ডকে ‘সচেতনতা সৃষ্টি’, ‘সত্য বলা’ বা ‘জনগণের কণ্ঠ’ হিসেবে উপস্থাপন করেন। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রায় অনুচ্চারিতই থেকে যাচ্ছে—অনলাইনে উপস্থিত থাকলেই কি কেউ প্রকৃত অর্থে ডিজিটাল নাগরিক হয়ে ওঠে? ডিজিটাল নাগরিকত্বের জন্য কেবল দৃশ্যমানতা নয়, নাকি আরও গভীর কিছু মানদণ্ড প্রয়োজন?

২.

ডিজিটাল নাগরিকত্বের ধারণাটি কখনোই প্রতীকী বা শোভাবর্ধক হওয়ার জন্য তৈরি হয়নি। এর মূল ভিত্তি ছিল একটি সাধারণ কিন্তু কঠোর উপলব্ধি—যখন নাগরিক জীবন ধীরে ধীরে ডিজিটাল পরিসরে সরে যায়, তখন নাগরিকত্বের দায়িত্বও নতুন রূপ নেয়। যেমন বাস্তব সমাজে নাগরিকদের সত্যনিষ্ঠা, সংযম ও অন্যের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখতে হয়, তেমনি ডিজিটাল নাগরিককেও অনলাইনে নৈতিক, দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক আচরণ করতে হয়। ডিজিটাল নাগরিকত্ব তাই উচ্চ স্বরে কথা বলার ক্ষমতা নয়; বরং দায়িত্বশীলভাবে অংশগ্রহণ করার সক্ষমতার বিষয়।

বাংলাদেশে পার্থক্যটি দিন দিন অস্পষ্ট হয়ে উঠছে, বিশেষত আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। দ্রুত ডিজিটাল সম্প্রসারণ একদিকে নাগরিক অংশগ্রহণের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে; অন্যদিকে ভুয়া তথ্য, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও ডিজিটাল স্বেচ্ছাচারিতার একটি সমান্তরাল জগৎও গড়ে তুলেছে।

এই জগতের প্রধান চালিকা শক্তি শুধু অজ্ঞাত ট্রলকারীরা নন; বরং এমন অনেক প্রভাবশালী অনলাইন কনটেন্ট নির্মাতা, যাঁরা বড় শ্রোতাগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব রাখেন এবং একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সামাজিক সহাবস্থানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। এই দ্বন্দ্বই আজ বাংলাদেশের ডিজিটাল সংকটের কেন্দ্রে।

৩.

ডিজিটাল নাগরিকত্বের ভিত্তি কয়েকটি সুপরিচিত স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এগুলো ডিজিটাল লিটারেসি (ডিজিটাল সাক্ষরতা), নৈতিক যোগাযোগ, অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা, নাগরিক দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহি। এই মানদণ্ডগুলো প্রয়োগ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের অনলাইন পরিসরে ঘোষিত ডিজিটাল নাগরিকত্ব আর বাস্তব আচরণের মধ্যে গভীর ফাঁক রয়েছে।

ডিজিটাল সাক্ষরতা কেবল প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা নয়, বরং নাগরিক বোধেরও প্রশ্ন। একজন ডিজিটাল নাগরিক জানেন তথ্য কীভাবে বিকৃত হয়, গুজব কীভাবে ছড়ায় এবং মিথ্যা কীভাবে বাস্তব ক্ষতির জন্ম দেয়। অথচ বাংলাদেশে বারবার দেখা গেছে, যাচাইহীন দাবি, বিকৃত ছবি বা সাজানো অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেক সময় তা ছড়িয়ে দেন এমন ব্যক্তিরাই, যাঁদের বিপুল অনুসারী রয়েছে এবং যাঁরা যাচাইয়ের ন্যূনতম চেষ্টা করেন না।

এর ফলাফল কেবল অনলাইনে সীমাবদ্ধ থাকে না। অনলাইন গুজব থেকে জনতার সহিংসতা, সাম্প্রদায়িক হামলা এবং সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে একাধিকবার। প্রভাবশালী কণ্ঠগুলো যখন এসব বয়ান জোরালো করে তোলে, তখন তা আর মতপ্রকাশ থাকে না; তা হয়ে ওঠে নাগরিক দায়িত্বহীনতা।

ডিজিটাল নাগরিকের কাজ হওয়া উচিত উত্তেজনা বাড়ানো নয়, বরং সংযম দেখানো। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে উল্টো চিত্র দেখা যায়।

৪.

বাংলাদেশে ডিজিটাল পরিসরের সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রবণতাগুলোর একটি হলো বিদ্বেষমূলক বক্তব্যকে অ্যাকটিভিজমের মোড়কে উপস্থাপন করা। ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, রাজনৈতিক শত্রুকরণ কিংবা নারীবিদ্বেষী ভাষা প্রায়ই নৈতিকতা বা দেশপ্রেমের নামে প্রচার করা হয়।

অনলাইন বক্তৃতা, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ কিংবা তথাকথিত ‘ফাঁস করা তথ্যভিত্তিক’ ভিডিওতে এমন ভাষা ব্যবহৃত হয়, যা বিরোধীদের অমানবিক করে তোলে, সংখ্যালঘুদের ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে চিত্রিত করে এবং সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজকে রাষ্ট্র বা ধর্মের শত্রু বানায়।

এ ধরনের আচরণ ডিজিটাল নাগরিকত্বের নৈতিক ভিত্তির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। মতভেদ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু তা প্রকাশের জন্য সংযম ও মানবিকতা অপরিহার্য। ক্ষমতা, মতাদর্শ কিংবা প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা করা যায় বিদ্বেষ বা সহিংসতা উসকে না দিয়েও। কিন্তু যখন প্রভাবশালীরা সেই সীমা অতিক্রম করেন, তখন তাঁরা গণতান্ত্রিক বিতর্কের পরিবেশকেই দুর্বল করে দেন।

এর চেয়েও উদ্বেগজনক হলো, এ ধরনের কনটেন্ট একটি ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে। বহুত্ববাদ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বা মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলা সাংবাদিক, ব্লগার ও অ্যাকটিভিস্টরা প্রায়ই অনলাইন হয়রানির শিকার হন। হুমকি, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস এবং চরিত্রহননকে ‘নৈতিক দায়িত্ব’ বা ‘ধর্মীয় কর্তব্য’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এটি নাগরিক অংশগ্রহণ নয়; এটি ‘ডিজিটাল জবরদস্তি’।

যেখানে ভিন্নমতকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখা হয়, সেখানে গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, যারা বিদ্বেষ, ভুয়া তথ্য ও ভীতি ছড়ায়, তাদের কি ডিজিটাল নাগরিক বলা যায়? প্রযুক্তিগত অর্থে তারা ডিজিটাল পরিসরের অংশ। কিন্তু নাগরিকত্ব কোনো নিরপেক্ষ ধারণা নয়। এতে অধিকার যেমন আছে, তেমনি দায়িত্বও আছে।

৫.

ডিজিটাল নাগরিকত্ব মানে দায়হীন মতপ্রকাশ নয়। এটি বোঝায় যে কথা বলার প্রভাব আছে, শ্রোতারা প্রভাবিত হয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমিক ক্ষমতা সংযমের সঙ্গে ব্যবহার করতে হয়। যারা বারবার বিভ্রান্তি ছড়ায়, সমাজে বিভাজন তৈরি করে বা অন্যকে বিপন্ন করে, তারা প্রকৃত অর্থে নিজেদের ডিজিটাল নাগরিকের দাবি করতে পারে না। তারা ডিজিটাল সংযোগের সুবিধা নেয়, কিন্তু তারা সামাজিক ভিত্তি ধ্বংস করে।

এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বাংলাদেশে প্রায়ই অনলাইন জনপ্রিয়তাকেই বৈধতা হিসেবে ধরা হয়; অনুসারীর সংখ্যা হয়ে ওঠে বিশ্বাসযোগ্যতার মানদণ্ড। ভাইরাল হওয়া মানে যেন সত্য হওয়া।

এই পরিস্থিতিতে ডিজিটাল নাগরিকত্ব একটি নৈতিক মানদণ্ড না হয়ে স্লোগানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। এই ঝুঁকিটি বাস্তব। এর সমাধান দমন নয়। অভিজ্ঞতা বলে, অস্পষ্ট আইন ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ অনেক সময় উল্টো ফল দেয়। বিদ্বেষ ও ভুয়া তথ্য ঠেকানোর নামে যখন সাংবাদিক বা সমালোচকদের দমন করা হয়, তখন প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা আরও কমে যায় এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট আরও চরম রূপ নেয়।

ডিজিটাল নাগরিকত্ব আইন দিয়ে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। এটি গড়ে তুলতে হয়। এর জন্য প্রয়োজন নিরাপত্তাভিত্তিক নয়, বরং নাগরিক সক্ষমতাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি। লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিটি পোস্ট নিয়ন্ত্রণ করা নয়, বরং সেই সামাজিক বাস্তবতা বদলানো, যেখানে ভুয়া তথ্য ও বিদ্বেষ সহজে ছড়ায়।

৬.

আমাদের যা করতে হবে: প্রথমত, ডিজিটাল সাক্ষরতাকে নাগরিক দক্ষতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। স্কুল, কলেজ ও কমিউনিটি পর্যায়ে তথ্য যাচাই, উৎস চেনা ও অনলাইন প্রোপাগান্ডা বোঝার শিক্ষা দিতে হবে। এই শিক্ষা হতে হবে বাংলায়, স্থানীয় উদাহরণভিত্তিক এবং বাস্তব জীবনের পরিণতির সঙ্গে যুক্ত।

দ্বিতীয়ত, ইতিবাচক ডিজিটাল আচরণকে দৃশ্যমান করতে হবে। দায়িত্বশীল কণ্ঠের অভাব নেই, কিন্তু তারা কম প্রচার পায়। রাষ্ট্র, গণমাধ্যম ও প্ল্যাটফর্মগুলোর যৌথ উদ্যোগে নৈতিক কনটেন্ট নির্মাতাদের সামনে আনা, ফ্যাক্ট-চেকিং জোরদার করা এবং ভুল স্বীকারকে স্বাভাবিক করা জরুরি।

তৃতীয়ত, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্বকে যুক্ত করতে হবে। সহিংসতা ও গুজবের বিরুদ্ধে আলেম, শিক্ষক ও স্থানীয় নেতাদের স্পষ্ট অবস্থান বিদ্বেষমূলক বয়ানের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করতে পারে।

চতুর্থত, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দক্ষ কনটেন্ট মডারেশন, দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং স্বচ্ছতা ছাড়া এই সমস্যা মোকাবিলা সম্ভব নয়।

সবশেষে আইন হতে হবে স্পষ্ট ও সংযত। ক্ষতিকর আচরণ আর বৈধ মতপ্রকাশের মধ্যে পার্থক্য পরিষ্কার না হলে আইন নিজেই সমস্যার অংশ হয়ে ওঠে। ডিজিটাল নাগরিকত্ব শেষ পর্যন্ত একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। প্রযুক্তি দিয়ে মানুষ ইতিবাচক সমাজ গড়ে তুলবে, নাকি ভয় ছড়াবে—এই বাছাই প্রতিনিয়ত হচ্ছে। বাংলাদেশ তরুণ, উদ্যমী এবং ডিজিটালভাবে সক্রিয়। তাই এই শক্তি আশীর্বাদও হতে পারে, আবার অভিশাপও হতে পারে।

৭.

ডিজিটাল নাগরিকত্ব কোনো হ্যাশট্যাগ নয়, কোনো চ্যানেল নয়, কোনো অনুসারীর সংখ্যা নয়। এটি একটি দায়িত্ব। আর সেই দায়িত্ব নতুন করে সংজ্ঞায়িত করাই আজ বাংলাদেশের অন্যতম জরুরি গণতান্ত্রিক কাজ। এই দায়িত্ব নতুন করে সংজ্ঞায়িত না করতে পারলে বাংলাদেশের ডিজিটাল পরিসর ক্রমেই এমন এক জায়গায় পরিণত হবে, যেখানে যুক্তির বদলে উত্তেজনা, তথ্যের বদলে সন্দেহ আর নাগরিক অংশগ্রহণের বদলে ভীতির রাজত্ব চলবে। তখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আর মুক্ত মতবিনিময়ের ক্ষেত্র থাকবে না; তা হয়ে উঠবে শক্তিশালী কণ্ঠগুলোর দখলকৃত একমুখী মঞ্চ।

ডিজিটাল নাগরিকত্বের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ এখানেই। এটি কাউকে নীরব করার প্রশ্ন নয়; বরং সবাইকে দায়িত্বশীল করার প্রশ্ন। এটি কাউকে বাদ দেওয়ার নয়, বরং সবাইকে একই নৈতিক মানদণ্ডের আওতায় আনার দাবি। যাঁরা অনলাইনে বড় শ্রোতাগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছান, তাঁদের দায় আরও বেশি। কারণ, তাঁদের কথার প্রভাবও বেশি। এই বাস্তবতা অস্বীকার করে ডিজিটাল নাগরিকত্বের কথা বলা আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া কিছু নয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আলোচনা আরও জরুরি। কারণ, এখানকার গণতান্ত্রিক পরিসর ঐতিহাসিকভাবেই ভঙ্গুর। যখন অফলাইনে নাগরিক পরিসর সংকুচিত হয়, তখন অনলাইন পরিসর বিকল্প মঞ্চ হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই বিকল্প মঞ্চ যদি একই ধরনের দমনমূলক, বিভাজনমূলক ও দায়িত্বহীন আচরণে ভরে যায়, তাহলে সমাজের জন্য তা কোনো মুক্তির পথ তৈরি করে না।

ডিজিটাল নাগরিকত্ব মানে কেবল রাষ্ট্রের সমালোচনা করা নয়, আবার রাষ্ট্রের পক্ষ নেওয়াও নয়। এর মানে হলো ক্ষমতা যেখানেই থাকুক, তার জবাবদিহি নিশ্চিত করা; মিথ্যা যেখান থেকেই আসুক, তা প্রত্যাখ্যান করা এবং সহিংসতা যেভাবেই বৈধতা পেয়ে থাকুক না কেন, তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। এই অবস্থান নেওয়ার জন্য সাহস লাগে, কিন্তু সেটিই নাগরিকত্বের মূল কথা।

সবচেয়ে বড় কথা, ডিজিটাল নাগরিকত্ব ব্যক্তিগত নৈতিকতার বিষয় হলেও এটি সমষ্টিগত সংস্কৃতির ফল। একটি সমাজ যদি গুজবকে পুরস্কৃত করে, বিদ্বেষকে ভাইরাল করে এবং সংযমকে দুর্বলতা হিসেবে দেখে, তাহলে সেখানে দায়িত্বশীল ডিজিটাল আচরণ ব্যতিক্রম হয়ে যায়। এই সংস্কৃতি বদলাতে হলে আমাদের প্রশ্ন করতে হবে, আমরা কী ধরনের কনটেন্ট দেখছি, শেয়ার করছি এবং প্রশ্রয় দিচ্ছি।

বাংলাদেশ যদি সত্যিই একটি দায়িত্বশীল ডিজিটাল সমাজ গড়ে তুলতে চায়, তাহলে তাকে প্রযুক্তির চেয়ে মানুষকে গুরুত্ব দিতে হবে। অ্যালগরিদমের চেয়ে নৈতিকতা, ভাইরালের চেয়ে সত্য আর জনপ্রিয়তার চেয়ে বিশ্বাসযোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এটি কোনো দ্রুত সমাধানের পথ নয়, কিন্তু এটি একমাত্র টেকসই পথ।

ডিজিটাল নাগরিকত্ব শেষ পর্যন্ত কোনো আইনগত টার্ম নয়, কোনো প্ল্যাটফর্মের নীতিমালাও নয়। এটি একটি সামাজিক চুক্তি, যেখানে প্রত্যেকে স্বীকার করে নেয় যে স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ব জড়িয়ে আছে এবং ডিজিটাল পরিসরও সেই দায় থেকে মুক্ত নয়। এই চুক্তি নতুন করে না লিখতে পারলে, ডিজিটাল বাংলাদেশ কেবল সংযুক্ত থাকবে, কিন্তু ঐক্যবদ্ধ হবে না।

  • রিজওয়ান-উল-আলম সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, মিডিয়া, কমিউনিকেশন এবং জার্নালিজম বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

    *মতামত লেখকের নিজস্ব