
বিশ্ব ইতিহাসে স্বৈরশাসকের অভাব নেই। পার্থক্যটা তৈরি হয় তাঁদের পরিণতিতে। কেউ ক্ষমতাচ্যুত হন গণ-অভ্যুত্থানে। কারও পতন ঘটে নিজের ঘনিষ্ঠ মহলের ক্ষমতার লড়াইয়ে। কেউ দেশছাড়া হয়ে মারা যান। কেউ শেষ দিনগুলো কাটান কারাগারে। খুব কম ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো বিদেশি শক্তি সরাসরি হস্তক্ষেপ করে স্বৈরশাসককে গ্রেপ্তার করে অন্য দেশে নিয়ে গিয়ে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
তবে মিয়ানমারের স্বৈরশাসকেরা অদ্ভুত ভাগ্যবান। জেনারেল নে উইন থেকে থান শ্বে কিংবা মিন অং হ্লাইং পর্যন্ত গল্পটা প্রায় একই। তাঁরা দেশটাকে ধ্বংস করেছেন। মানুষকে নির্মমভাবে দমন করেছেন। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে তাঁরা কেউই প্রায় কখনো জবাবদিহির মুখে পড়েননি। এই ভাগ্য বলতে আমি নৈতিক ভাগ্য বোঝাচ্ছি না। কোনো কর্মফলের ধারণাও নয়। এটি আসলে দায়মুক্তি, যেখানে জোর করে কাউকে জবাবদিহি করানো হয় না।
চলতি বছরের শুরুতে বিশ্ব চমকে ওঠে একটি খবরে। ভেনেজুয়েলার শক্তিশালী নেতা নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে নাকি কারাকাস থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী গ্রেপ্তার করে নিউইয়র্কে নিয়ে গেছে। সেখানে তাঁদের মাদকসংক্রান্ত মামলায় আটক রাখা হয়েছে। এই অভিযানের আইনগত বৈধতা নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনে বিতর্ক চলছেই। সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু রাজনৈতিক বার্তাটি স্পষ্ট। একটি পরাশক্তি চাইলে কোনো স্বৈরশাসকের ক্ষমতার অবসান এক রাতেই ঘটতে পারে।
মাদুরোই প্রথম নন, যাঁর ক্ষেত্রে এমনটা ঘটেছে। ১৯৮৯ সালে পানামার শাসক ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযানে ক্ষমতাচ্যুত করে। ওয়াশিংটন এই অভিযানকে ন্যায্যতা দিয়েছিল মার্কিন নাগরিকদের সুরক্ষা, গণতন্ত্র রক্ষা, মাদক পাচার দমন এবং পানামা খাল চুক্তি রক্ষার যুক্তিতে। নোরিয়েগাকে পরে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গিয়ে বিচার করা হয়।
নে উইন দীর্ঘজীবী ছিলেন, কিন্তু অপমান নিয়েই মারা গেছেন। তাঁর দাফনও হয়নি। ছাই ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল নদীতে। থান শ্বে বা মিন অং হ্লাইং হয়তো একদিন সামরিক কবরস্থানে শুয়ে থাকবেন। কিন্তু একদিন যখন স্বৈরতন্ত্রের অবসান হবে, তখন তাঁদের কবর মানুষের ঘৃণার স্মৃতিস্তম্ভ হয়েই থাকবে।
২০০৩ সালে ইরাকে পূর্ণমাত্রার সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল, ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে। পরে তদন্তে দেখা যায়, এই দাবি সত্য ছিল না।
লিবিয়ার ঘটনা আবার কিছুটা আলাদা। ২০১১ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনে ন্যাটো সেখানে সামরিক হস্তক্ষেপ করে। লক্ষ্য ছিল বেসামরিক মানুষকে রক্ষা করা। ন্যাটো মূলত আকাশ ও নৌপথে ভূমিকা রাখে। শেষ পর্যন্ত লিবিয়ার ভেতরের শক্তিগুলোই মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে ধরে হত্যা করে।
এই ঘটনাগুলো এক রকম নয়। কিন্তু এগুলো একটি নির্মম সত্য সামনে আনে। অনেক সময় স্বৈরশাসকের পতন শুধু জনগণের প্রতিরোধে ঘটে না, বরং ঘটে কোনো শক্তিধর দেশের সিদ্ধান্তে।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত তিনভাবে অপছন্দের সরকার বা শাসকদের অপসারণ করেছে। একটি হলো সরাসরি সামরিক আগ্রাসন। সেনা নামিয়ে শাসককে ধরে ফেলা এবং পুরো শাসনব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া। সাদ্দাম বা নোরিয়েগার ঘটনা এর উদাহরণ।
দ্বিতীয়টি হলো গোপন হস্তক্ষেপ। প্রকাশ্যে সেনা না নামিয়ে স্থানীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে অর্থ, অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা সহায়তা দেওয়া। ইরান, গুয়াতেমালা বা চিলির ঘটনাগুলো এই ধরনের।
তৃতীয়টি হলো অভ্যন্তরীণ বিরোধীদের সমর্থন দেওয়া। নিষেধাজ্ঞা দিয়ে শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করা এবং ভেতরের অসন্তোষকে শক্তিশালী করা। নিকারাগুয়া বা লিবিয়ায় এই কৌশল দেখা গেছে।
তবে বাস্তবতা হলো, এই ধরনের হস্তক্ষেপ বহু ক্ষেত্রে দীর্ঘ মেয়াদে ব্যর্থ হয়েছে। আফগানিস্তান ও ইরাক তার বড় উদাহরণ।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়। যখন যুক্তরাষ্ট্র অন্য অনেক দেশে এমন হস্তক্ষেপ করেছে, তখন মিয়ানমারের জেনারেলদের ক্ষেত্রে কেন নয়। তাঁরা কি সত্যিই অতিমাত্রায় ভাগ্যবান। নাকি ওয়াশিংটনের চোখে মিয়ানমার যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ নয়। নে উইন ২৬ বছর একনায়কতন্ত্র চালিয়ে দেশটিকে ধ্বংস করেছিলেন। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবু তিনি নব্বইয়ের বেশি বয়সে নীরবে মারা যান। কোনো আদালতে তাঁকে দাঁড়াতে হয়নি।
থান শ্বের শাসনকে একসময় যুক্তরাষ্ট্রের সরকার প্রকাশ্যে অত্যাচারের প্রতীক বলেছিল। তিনি প্রায় দুই দশক ভয় আর দুর্নীতির মাধ্যমে দেশ শাসন করেন। তবু তাঁকে কেউ গ্রেপ্তার করেনি। তিনি নিজ শর্তেই ক্ষমতা ছেড়েছেন এবং দৃশ্যত এখনো দায়মুক্ত। এরপর এলেন মিন অং হ্লাইং। অনেকের মতে, তিনিই মিয়ানমারের ইতিহাসের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক শাসক।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে যে মামলা চলছে, সেখানে রাষ্ট্রের দায় বিচার করা হয়। ব্যক্তির বিচার সেখানে হয় না। ব্যক্তিগত অপরাধের জন্য অন্য কাঠামো রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কৌঁসুলি মিন অং হ্লাইংয়ের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। আর্জেন্টিনার একটি আদালতও সর্বজনীন বিচারব্যবস্থার আওতায় তাঁর বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করেছেন। এর পাশাপাশি মিয়ানমারের অপরাধ অর্থনীতি আরও বিস্তৃত হয়েছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটি এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় অবৈধ আফিম উৎপাদকদের একটি। সংঘাত ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যেই এই উৎপাদন ১০ বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এই সবকিছু সত্ত্বেও মিন অং হ্লাইং এখনো মুক্ত। তিনি বিদেশে যাতায়াত করছেন। রাজনৈতিক সমঝোতা করছেন। ভুয়া নির্বাচনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ বৈধতা তৈরির চেষ্টা করছেন।
তাহলে প্রশ্নটি থেকেই যায়। কেন মিয়ানমারের স্বৈরশাসকেরা অন্যদের মতো গ্রেপ্তার হন না, অপসারিত হন না। ভেনেজুয়েলা বা পানামা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশী। তাদের যুক্তরাষ্ট্র নিজের উঠান বলে মনে করে। সেখানে সমস্যা হলে তারা সরাসরি হস্তক্ষেপ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের মূল কারণগুলো সাধারণত তিনটি। একটি হলো মতাদর্শ। শীতল যুদ্ধের সময় সমাজতন্ত্র ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র বহু দেশে সরকার পরিবর্তনে নেমেছিল।
দ্বিতীয়টি হলো জাতীয় স্বার্থ। গণতন্ত্রের নামে তখন আমেরিকার অভিযানের প্রকৃত চালিকা শক্তি থাকে নিরাপত্তা ও অর্থনীতি। ভেনেজুয়েলার বিপুল তেল সম্পদ কিংবা ইরাকের তেল এর উদাহরণ।
মিয়ানমারের ক্ষেত্রে এই স্বার্থগুলো তেমনভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জড়িত নয়। এখানকার জেনারেলরা নিষ্ঠুর হলেও তারা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা অর্থনীতির জন্য সরাসরি হুমকি তৈরি করে না।
তৃতীয়টি হলো ভূরাজনীতি। মিয়ানমার চীনের প্রতিবেশী। কার্যত এটি এখন চীনের ছায়াতলে। সেখানে সরাসরি মার্কিন হস্তক্ষেপ মানে বেইজিংয়ের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘাত। ওয়াশিংটনের কাছে সেই ঝুঁকি নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশ মিয়ানমার নয়।
এই কারণেই ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে পেছনে সরে যায়। নেতৃত্ব দেওয়া হয় আঞ্চলিক জোটকে। মিয়ানমারের জেনারেলদের এই নিরাপত্তাই তাঁদের ভাগ্য।
তবে একটি বার্মিজ প্রবাদ আছে। দীর্ঘ জীবন মানেই গৌরব নয়। নে উইন দীর্ঘজীবী ছিলেন, কিন্তু অপমান নিয়েই মারা গেছেন। তাঁর দাফনও হয়নি। ছাই ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল নদীতে।
থান শ্বে বা মিন অং হ্লাইং হয়তো একদিন সামরিক কবরস্থানে শুয়ে থাকবেন। কিন্তু একদিন যখন স্বৈরতন্ত্রের অবসান হবে, তখন তাঁদের কবর মানুষের ঘৃণার স্মৃতিস্তম্ভ হয়েই থাকবে।
• ক্যো জ্ওয়া মো দ্য ইরাবতীর নির্বাহী সম্পাদক
দ্য ইরাবতী থেকে নেওয়া, ইংরেজিতে থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত