জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে জাতীয় সংসদে বিতর্ক হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুসারে নির্ধারিত সময়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করায় জাতীয় সংসদে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব না থাকায় প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিতে পারেন না। রাষ্ট্রপতিও অধিবেশন ডাকতে পারেন না বলে তা করেননি।
এ বিতর্কের মূল বিষয়বস্তু হলো বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ ছাড়া কোনো আদেশ জারি করতে পারেন কি না? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংসদ ভেঙে যাওয়া অবস্থায় সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি শুধু অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন, আদেশ জারি করতে পারেন না।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, জামায়াতের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি আদেশ জারি করতে পারেন। তাঁর যুক্তিতে, সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে ‘আইন’–এর সংজ্ঞা অধ্যাদেশের পাশাপাশি আদেশও আইনের অন্তর্ভুক্ত বলে বলা হয়েছে।
তাঁর এই ব্যাখ্যায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি যদি পুরো সংজ্ঞাটি পড়তেন, তাহলে আইন বলতে কী কী এর অন্তর্ভুক্ত তা মানুষ সহজে বুঝতে পারতেন। সংবিধান অনুযায়ী, ‘আইন’ অর্থ কোনো আইন, অধ্যাদেশ, আদেশ, বিধি, প্রবিধান, উপ-আইন, বিজ্ঞপ্তি ও অন্যান্য আইনগত দলিল এবং বাংলাদেশে আইনের ক্ষমতাসম্পন্ন যেকোনো প্রথা বা রীতি।
‘আদেশ’ যে আইনের অন্তর্ভুক্ত সে কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। মূল বিতর্ক হলো, রাষ্ট্রপতি বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোতে ‘আদেশ’ জারি করতে পারেন কি না? সরাসরি উত্তর—না।
ব্যারিস্টার নাজিবুর যে আদেশগুলোর উল্লেখ করেছেন (গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২–সহ) সেগুলো একটি অস্থায়ী ও ক্রান্তিকালীন অবস্থায় প্রণীত। স্বাধীনতা–উত্তর বাংলাদেশে প্রণীত সংবিধানের অধীন গঠিত সংসদের প্রথম বৈঠকের পর এ ধরনের আদেশ জারির কোনো সুযোগ নেই। সংবিধানের চতুর্থ তফসিলে বর্ণিত ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলিকে সংবিধানের ১৫০ অনুচ্ছেদের অনুবলে কার্যকারিতা প্রদান করা হয়েছে।
১৯৭৩ সালের ৭ এপ্রিল, সংসদের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কাজেই সাংবিধানিকভাবে উল্লিখিত তারিখের (১৯৭৩ সালের ৭ এপ্রিল) পর রাষ্ট্রপতি কর্তৃক আর কোনো আদেশ জারির সুযোগ নেই। বাস্তবিকভাবে ওই তারিখের পর বাংলাদেশে আর কোনো আদেশ জারি হয়নি। এ জন্যই ২০২৫ সালে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জারি করা একমাত্র আদেশের বৈধতা/সাংবিধানিকতা নিয়ে এত বিতর্ক।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার পরে প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে আইন প্রণয়নকারী কর্তৃপক্ষের সৃষ্টি করা হয়। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের আইন প্রণয়নের সব ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির কাছে ন্যস্ত থাকবে। রাষ্ট্রপতি অনুপস্থিত থাকলে অথবা কার্যভার গ্রহণে অক্ষম হলে উপরাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপতির সব ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন অর্থাৎ আইন প্রণয়ন করতে পারবেন। এভাবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতিকে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়।
স্বাধীনতাযুদ্ধে বিজয়ের পরে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। পরদিন ১১ জানুয়ারি, ১৯৭২ তিনি অস্থায়ী সংবিধান আদেশ, ১৯৭২ জারি করেন। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে প্রেসিডেন্টকে দেওয়া ক্ষমতাবলে তিনি এই আদেশ জারি করেছিলেন। এই আদেশের মাধ্যমে একটি গণপরিষদের সৃষ্টি করেন, যাঁরা সংবিধান রচনা করবেন এবং একটি সংসদীয় গণতন্ত্রের রাষ্ট্রকাঠামো তৈরি করেন। পরে ১৯৭২ সালের ২২ নম্বর আদেশ দ্বারা গণপরিষদের কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ করেন।
১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর সংবিধান গণপরিষদে গৃহীত হয় এবং ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে বলবৎ হয় (১৫৩ অনুচ্ছেদ)। সংবিধানে প্রজাতন্ত্রের আইন প্রণয়নের মূল ক্ষমতা দেওয়া হয় জাতীয় সংসদকে (অনুচ্ছেদ ৬৫)। এ ছাড়া সংসদ ভেঙে গেলে কিংবা অধিবেশন চলমান না থাকলে প্রেসিডেন্টকে অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে আইন তৈরির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে (অনুচ্ছেদ ৯৩)। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টকে (১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী) আইন ঘোষণা করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ও অন্যান্য কিছু কর্তৃপক্ষকে ডেলিগেটেড লেজিসলেশন বা সীমিত পরিসরে বিধি তৈরির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
সংবিধান গ্রহণ করার সময় সংবিধানের ১৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অস্থায়ী সংবিধান আদেশসহ আটটি আদেশ রহিত করা হয়েছে। তবে ৪৭(২) অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে প্রথম তফসিলে বর্ণিত কতিপয় আদেশকে বিশেষ প্রাধিকার দিয়ে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ এবং প্রথম জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসে ১৯৭৩ সালের ৭ এপ্রিল। অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭৩ সালের ৬ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে সংবিধান বলবৎ ছিল, কিন্তু কোনো সংসদ কার্যকর ছিল না।
এ ক্ষেত্রে আরও একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, গণপরিষদের সংবিধান রচনা করার ক্ষমতা (কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ার) ছিল কেবল, আইন প্রণয়নের ক্ষমতা (লেজিসলেটিভ) ক্ষমতা ছিল না। এ সময়ে আইন প্রণয়নের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য সংবিধানের ১৫০ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে চতুর্থ তফসিলে বর্ণিত বিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্টকে অর্ডার বা আদেশ জারির ক্ষমতা দেওয়া হয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে রাষ্ট্রপতি মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছেন। সব কটিই জারি করেছেন সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে। সাংবিধানিক সব প্রতিষ্ঠানে সংবিধান অনুযায়ী নিয়োগ ও শপথ প্রদান করেছেন। কিন্তু একটিমাত্র আদেশ জারি করার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনায় তিনি সংবিধানের কোনো অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে করেছেন তা উল্লেখ করেননি।
সংবিধানের চতুর্থ তফসিলের তৃতীয় প্যারাগ্রাফে বলা হয়েছে, ‘১৯৭২ সালের অস্থায়ী সংবিধান আদেশ বাতিল হইয়া যাওয়া সত্ত্বেও এই সংবিধানের বিধানাবলি অনুসারে সংসদ যেদিন প্রথমবার মিলিত হইবে, সেই দিন পর্যন্ত এই সংবিধান-প্রবর্তনের অব্যবহিত পূর্বে প্রজাতন্ত্রের আইন প্রণয়নগত ও নির্বাহী ক্ষমতা (প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক আদেশের দ্বারা আইন প্রণয়নের ক্ষমতাসহ) যেরূপে প্রযুক্ত হইয়াছে, তাহা সেইরূপে প্রযুক্ত হইতে থাকিবে।’
অর্থাৎ, সংবিধান অনুযায়ী প্রথম জাতীয় সংসদ বৈঠকে বসার পূর্ব পর্যন্ত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ক্ষমতাবলে প্রেসিডেন্ট আদেশ জারি করতে পারবেন। এই বিধানকে বলা হয়েছে ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলি। উদাহরণস্বরূপ: ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩ (১৯৭৩ সনের ১১ নম্বর আদেশ)’ জারি করেন। এ আদেশের প্রস্তাবনায় চতুর্থ তফসিলের তৃতীয় অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে প্রেসিডেন্ট আদেশ জারি করেছেন, মর্মে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ক্রান্তিকালীন বিধানের ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ শুধু প্রথম সংসদের প্রথম বৈঠক পর্যন্ত বলবৎ ছিল। চতুর্থ তফসিলের সপ্তদশ অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘তবে শর্ত থাকে যে এই সংবিধানের অধীনে গঠিত সংসদের প্রথম বৈঠকের পর অনুরূপ কোনো আদেশ জারি করা হইবে না।’ অর্থাৎ প্রেসিডেন্টের আদেশ জারির ক্ষমতা প্রথম জাতীয় সংসদের প্রথম বৈঠকের দিন থেকে অর্থাৎ ১৯৭৩ সালের ৭ এপ্রিল থেকে আর কার্যকর নাই। এ সময়ের পরে আর কোনো প্রেসিডেন্ট কোনো আদেশ জারি করেননি।
বিদ্যমান ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্ট তাঁর সংবিধান–স্বীকৃত ক্ষমতার বাইরে গিয়ে আদেশ জারি করার ক্ষমতা রাখেন না। বর্তমান প্রেসিডেন্ট একাদশ জাতীয় সংসদ কর্তৃক নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি সংবিধান অনুযায়ী কার্যভার সম্পাদনের শপথ গ্রহণ করেছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কিংবা তাঁর অব্যবহিত পরেও তিনি সাংবিধানিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে বহাল রয়েছেন। তাঁর অধীনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে নির্বাচিত সরকার সংবিধান সংরক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধানের শপথ নিয়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে রাষ্ট্রপতি মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছেন। সব কটিই জারি করেছেন সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে। সাংবিধানিক সব প্রতিষ্ঠানে সংবিধান অনুযায়ী নিয়োগ ও শপথ প্রদান করেছেন। কিন্তু একটিমাত্র আদেশ জারি করার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনায় তিনি সংবিধানের কোনো অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে করেছেন তা উল্লেখ করেননি। শুধু জনগণের পরম অভিপ্রায়ের উল্লেখ করেছেন। কিন্তু অন্য কোনো পদক্ষেপের ক্ষেত্রে, এমনকি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও জনগণের অভিপ্রায়ের কথা বলেননি; বরং সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন আয়োজনের কথা বলেছেন।
আবারও মনে রাখা প্রয়োজন, রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক কাঠামোতে জাতীয় সংসদ কর্তৃক নির্বাচিত। অর্থাৎ, রাষ্ট্রপতি নিজেও সংবিধানের ঊর্ধ্বে নন। সুতরাং, রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জারিকৃত ২০২৫ সনের ১ নম্বর আদেশ রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতাবহির্ভূত।
মো. রুহুল কুদ্দুস সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী; বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য
* মতামত লেখকের নিজস্ব
[আগামীকাল প্রকাশিত হবে এ বিষয়ে হাসনাত কাইয়ুমের অভিমত: সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে সংসদে বিতর্ক কেন?]