জীবন্ত মুজিজা মহাগ্রন্থ আল-কোরআন ২৬ রমজান দিবাগত ২৭ রমজানের রাতে মক্কার জাবালে নূর পর্বতের হেরা গুহায় আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে জিবরাইল (আ.)–এর মাধ্যমে সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর প্রতি নাজিলের সূচনা হয়। এই রাতটি বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদাপূর্ণ রাত। এই রাতকে আরবিতে ‘লাইলাতুল কদর’ এবং ফারসিতে ‘শবে কদর’—অর্থাৎ ‘কদরের রজনী’ বা ‘ভাগ্যনিশি’ বলা হয়। ‘কদর’ শব্দের অর্থ সম্মানিত, মর্যাদাপূর্ণ ও মহিমান্বিত; আবার সম্ভাবনাময় ও ভাগ্যনির্ধারণী।
আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘রমজান মাস, যাতে কোরআন নাজিল হয়েছে; যা মানুষের জন্য দিশারি এবং সৎপথের সুস্পষ্ট নিদর্শন ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৮৫) আরও বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আমি এটি নাজিল করেছি মহিমান্বিত রজনীতে। আপনি কি জানেন সেই মহিমান্বিত রজনী কী? মহিমান্বিত সেই রজনী হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। সে রাতে ফেরেশতাগণ এবং রুহুল কুদুস হজরত জিবরাইল (আ.) তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে সব নির্দেশ নিয়ে অবতীর্ণ হন। এই শান্তির ধারা চলতে থাকে উষালগ্ন পর্যন্ত।’ (সুরা-৯৭ কদর, আয়াত: ১-৫)
একদা রাসুলে আকরাম (সা.) বনি ইসরাইলের একজন মুজাহিদ সম্পর্কে বলেন, ‘তিনি এক হাজার বছর আয়ু লাভ করেছিলেন। দীর্ঘ এই আয়ুষ্কালে তিনি দিনে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে রত থাকতেন এবং রাতে ইবাদতে মশগুল থাকতেন।’
শবে কদরে যেসব আমল করা উত্তম: নফল নামাজ আদায় করা—যেমন তাহিয়্যাতুল অজু, দুখুলুল মসজিদ, আওয়াবিন, তাহাজ্জুদ, সালাতুত তাসবিহ, তাওবার নামাজ, সালাতুল হাজাত, সালাতুশ শুকর এবং অন্যান্য নফল নামাজ। নামাজে কিরাত, রুকু ও সিজদা দীর্ঘ করা।
নবীজি (সা.) আরও বলেন, বনি ইসরাইলের চারজন আবেদ ছিলেন। তাঁরা ৮০ বছর ধরে একনাগাড়ে আল্লাহর ইবাদত করেছিলেন। এ সময়ের মধ্যে একমুহূর্তের জন্যও তাঁরা ইবাদত থেকে বিরত হননি। বিখ্যাত এই চারজন আবেদ হলেন হজরত জাকারিয়া (আ.), হজরত আইয়ুব (আ.), হজরত হিজকিল ইবনে আজুজ (আ.) এবং হজরত ইউশা ইবনে নুন (আ.)।
এসব বর্ণনা শুনে সাহাবিগণ (রা.) রীতিমতো বিস্মিত হলেন। তখন হজরত জিবরাইল (আ.) এসে বললেন, ‘হে মুহাম্মদ (সা.)! আপনার উম্মতরা এ কথা শুনে অবাক হচ্ছে? তাদের জন্য আল্লাহ–তাআলা এর চেয়েও উত্তম কিছু রেখেছেন।’ এরপর তিনি সুরা কদর পাঠ করলেন। (তাফসিরে ইবনে কাসির)
শবে কদরের রাতে সূর্যাস্তের পর আল্লাহ–তাআলা প্রথম আকাশে অবতরণ করেন এবং বান্দাদের ডেকে বলেন, ‘কে আছ প্রার্থী? প্রার্থনা করো, আমি দান করব। কে আছ আহ্বানকারী? দোয়া করো, আমি তা কবুল করব। কে আছ অসুস্থ? আমার কাছে চাও, আমি আরোগ্য দান করব। কে আছ অভাবগ্রস্ত? আমার কাছে চাও, আমি প্রাচুর্য দান করব। কে আছ বিপদগ্রস্ত? আমার কাছে চাও, আমি তোমাকে বিপদমুক্ত করব।’ এভাবে তিনি বান্দাদের সব প্রয়োজন পূরণের আহ্বান জানাতে থাকেন। (সহিহ বুখারি: ১১৪৫; সহিহ মুসলিম: ৭৫৮; মুসনাদে আহমাদ: ১৭৯১৫; তাবরানি: ৮৩৭৫; বাযযার: ২৩২০)
প্রিয় নবীজি (সা.) বলেন, ‘যে আল্লাহর কাছে চায় না, আল্লাহ তার প্রতি রাগান্বিত হন।’ (তিরমিজি: ৩৩৭৩)
রমজান মাস এলে রাসুল (সা.) বলতেন, ‘এ মাসে এমন একটি রাত আছে, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। যে এই রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়, সে প্রকৃতপক্ষেই হতভাগ্য।’ (মুসনাদে আহমাদ: ৭১০৮; সুনানে নাসায়ি: ২১০৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে শবে কদর সন্ধান করো।’ (সহিহ মুসলিম)
আরবিতে দিনের আগে রাত গণনা করা হয়। মুফাসসিরিনে কিরাম বলেন, আরবি ‘লাইলাতুল কদর’ শব্দদ্বয়ে নয়টি হরফ রয়েছে। আবার সুরা কদরে ‘লাইলাতুল কদর’ শব্দটি তিনবার উল্লেখ করা হয়েছে। ৯–কে ৩ দিয়ে গুণ করলে বা ৯–কে ৩ বার যোগ করলে সাতাশ হয়। এ কারণেই সাতাশে রমজানের রাতে শবে কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে অনেকে মত প্রকাশ করেছেন। (তাফসিরে মাযহারি)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘তোমরা রমজানের ২৫, ২৭ ও ২৯তম রজনীতে শবে কদর তালাশ করো।’ (মুসনাদে আহমাদ; সহিহ বুখারি)
আরও বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় কদরের রাতে ইবাদত করবে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।’ (সহিহ বুখারি: ৩৪)
শবে কদরে যেসব আমল করা উত্তম: নফল নামাজ আদায় করা—যেমন তাহিয়্যাতুল অজু, দুখুলুল মসজিদ, আওয়াবিন, তাহাজ্জুদ, সালাতুত তাসবিহ, তাওবার নামাজ, সালাতুল হাজাত, সালাতুশ শুকর এবং অন্যান্য নফল নামাজ। নামাজে কিরাত, রুকু ও সিজদা দীর্ঘ করা।
অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম
smusmangonee@gmail.com