মতামত

বিশাল বাজেট, রাজস্ব ঘাটতি ও লক্ষ্য অর্জনের পরীক্ষা

বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেছেন। এই বাজেট এমন এক সময়ে প্রণীত হয়েছে, যখন অর্থনীতি শুধু প্রবৃদ্ধিই নয় বরং স্থিতিশীলতা, আস্থা এবং সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা খুঁজছে। এই বাজেটের মূল দর্শন হচ্ছে গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন এবং বিনিয়োগনির্ভর পুনরুদ্ধার।

অনেক দিক থেকেই এই দৃষ্টিভঙ্গি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের প্রধান বিষয়গুলোর প্রতিফলন, যেখানে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি এবং সুশাসনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। 

বাজেটে যথার্থভাবেই সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, জ্বালানি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই হওয়া উচিত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। কারণ, এটি পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে এবং অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করবে।

টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান পুনরুজ্জীবন অপরিহার্য, আর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন নিশ্চিত করতে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিল্প সম্প্রসারণ ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ প্রয়োজন। একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে দারিদ্র্য ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি।

লক্ষ্যভ্রষ্টতা, সুবিধাভোগী নির্বাচনজনিত ভুল, অপচয় এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কার্যকারিতা সীমিত করে এসেছে। বাজেটে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষার কথা বলা হলেও এর সাফল্য নির্ভর করবে উপকারভোগী ডেটাবেজ শক্তিশালী করা, ডিজিটাল বিতরণব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং কার্যকর তদারকি ব্যবস্থার ওপর, যাতে সুবিধাগুলো দক্ষতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকৃত প্রাপকদের কাছে পৌঁছায়।

বাজেটে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনের জন্য বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন এবং রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য গতি আনতে হবে। বর্তমান বিনিয়োগ প্রবণতা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং জ্বালানিসংকটের প্রেক্ষাপটে এই লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না।

অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি অর্থবহভাবে কমাতে হলে কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হবে। যেমন খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করা, পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, বিচক্ষণ মুদ্রানীতি অনুসরণ করা, রাজস্ব ব্যয়ের উৎপাদনশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য অনুকূলে থাকা। বাস্তবে বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বৃদ্ধির মতো কোনো বহিরাগত ধাক্কা এ লক্ষ্যকে বিপন্ন করতে পারে।

বাজেটে মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংগ্রহ করবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। বর্তমান রাজস্ব সংগ্রহের তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। ঐতিহাসিকভাবে রাজস্ব আহরণ বাংলাদেশের অন্যতম দুর্বল ক্ষেত্র। জিডিপির অনুপাতে কর-রাজস্বের হার ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৮ ছিল, যা এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম। ফলে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা কাঙ্ক্ষিত হলেও কর প্রশাসন, কর পরিপালন এবং বাস্তবায়নে বড় ধরনের উন্নতি ছাড়া তা অর্জন করা কঠিন হবে।

৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট বিগত সংশোধিত অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বড়। বৃহৎ জনসংখ্যা ও ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির প্রয়োজন মেটাতে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি প্রয়োজন। তবে মূল প্রশ্ন হলো বরাদ্দের কতটা বাস্তবায়িত হবে এবং সেই ব্যয়ের গুণগত মান কেমন হবে।

এরপর আসে বাজেটঘাটতির কথা। জিডিপির প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ সমপরিমাণ বাজেটঘাটতি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এখনো মোটামুটি সহনীয়। তবে এ ঘাটতির অর্থায়ন ২০২৭ অর্থবছরে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। প্রায় ১ দশমিক ১২ লাখ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। অন্যদিকে সরকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগও বাড়াতে চায়। এ অবস্থায় অতিরিক্ত ব্যাংকঋণ বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত করতে পারে, ঋণের ব্যয় বাড়াতে পারে এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা কমাতে সরকারের উচিত কর সংস্কারের মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধি, করভিত্তি সম্প্রসারণ, কর অব্যাহতি হ্রাস, প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা বাড়িয়ে অপচয় কমানো এবং আরও বেশি স্বল্প সুদের বৈদেশিক অর্থায়ন নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে একটি পরিণত বন্ড বাজার গড়ে তোলা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের অন্যান্য উৎস অনুসন্ধান করা টেকসই ঘাটতি ব্যবস্থাপনার জন্য জরুরি।

রাজস্ব নীতির ক্ষেত্রে ব্যবসার ব্যয় কমানো এবং বিনিয়োগ উৎসাহিত করার লক্ষ্যে সরকার একাধিক কর ও শুল্ক সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে। রপ্তানি সহায়তা, শুল্ক প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং কর-অনুগত্যের ব্যয় কমানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য শুল্কমুক্ত আমদানি সুবিধা সম্প্রসারণ, প্রক্রিয়াগত জটিলতা হ্রাস, ভ্যাট পরিপালন সহজ করা এবং ডিজিটাল কর প্রশাসন শক্তিশালী করার উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য। এসব পদক্ষেপ সামগ্রিকভাবে যৌক্তিক। বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা বর্তমানে প্রতিযোগী দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে রয়েছে।

পরিপালন ব্যয় কমানো এবং বাণিজ্য সহায়ক ব্যবস্থা উন্নত করা প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে পারে, অথচ এতে সরকারের রাজস্ব খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নাও হতে পারে। বরং দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজস্ব আদায়ের ভিত্তি আরও বিস্তৃত হতে পারে।

তবে রাজস্ব আহরণ জোরদার এবং আর্থিক চাপ কমানোর লক্ষ্যে কিছু কর বৃদ্ধির প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। সরকারের উচ্চ ব্যয় প্রতিশ্রুতি এবং আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষাপটে এসব পদক্ষেপের যৌক্তিকতা রয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ জীবনযাত্রার ব্যয় কমাবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। অধিকাংশ সংস্কার সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যহ্রাসের চেয়ে ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নের দিকে বেশি মনোযোগী। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে এর পরোক্ষ সুফল সময়ের সঙ্গে আসতে পারে, তবে সাধারণ পরিবারের জন্য তাৎক্ষণিক স্বস্তি সীমিত হতে পারে।

এই বাজেটের একটি প্রধান লক্ষ্য হলো বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধি। সরকার মোট বিনিয়োগ বাড়িয়ে ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে তা জিডিপির ৪০ শতাংশে উন্নীত করতে চায়। বাজেটে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, শিল্প সম্প্রসারণ এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে প্রশ্ন হলো, বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা কতটা কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আগামী দশকে শ্রমবাজারে প্রবেশকারী নতুন কর্মীদের জন্য বাংলাদেশকে কয়েক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। বিনিয়োগ বৃদ্ধি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে না; বিনিয়োগের ধরন ও গুণগত মানও গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা এবং মান নিয়ে চলমান উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে এই বৃদ্ধি যৌক্তিক। দারিদ্র্য ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি স্বীকার করে বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা ব্যয়ও বাড়ানো হয়েছে। ২০২৬–২৭ অর্থবছরে ৪১ লাখ উপকারভোগীকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশে সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে মূল চ্যালেঞ্জ বরাদ্দের পরিমাণ নয়, বরং এর কার্যকারিতা বৃদ্ধি।

লক্ষ্যভ্রষ্টতা, সুবিধাভোগী নির্বাচনজনিত ভুল, অপচয় এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কার্যকারিতা সীমিত করে এসেছে। বাজেটে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষার কথা বলা হলেও এর সাফল্য নির্ভর করবে উপকারভোগী ডেটাবেজ শক্তিশালী করা, ডিজিটাল বিতরণব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং কার্যকর তদারকি ব্যবস্থার ওপর, যাতে সুবিধাগুলো দক্ষতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকৃত প্রাপকদের কাছে পৌঁছায়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই ভালো ফলাফল নিশ্চিত হয় না। দুর্বল বাস্তবায়ন, সুশাসনের ঘাটতি, ক্রয়প্রক্রিয়ার অদক্ষতা এবং দুর্নীতি সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই ব্যয়ের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যয়ের গুণগত মান উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার, জবাবদিহি এবং বিনিয়োগের প্রতিফলনের ওপর সরকারের জোর দেওয়া ইতিবাচক; তবে এর সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।

ফাহমিদা খাতুন অর্থনীতিবিদ এবং নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)

* মতামত লেখকের নিজস্ব