কক্সবাজারের চকরিয়া সুন্দরবনের বদরখালী চ্যানেলে পরীক্ষামূলকভাবে লাগানো হয়েছিল বাইন প্রজাতির গাছ। বেড়ে ওঠা এসব বাইনগাছ চকরিয়া সুন্দরবনের প্রাণ ফেরাতে আশা জাগাচ্ছে।
কক্সবাজারের চকরিয়া সুন্দরবনের বদরখালী চ্যানেলে পরীক্ষামূলকভাবে লাগানো হয়েছিল বাইন প্রজাতির গাছ। বেড়ে ওঠা এসব বাইনগাছ চকরিয়া সুন্দরবনের প্রাণ ফেরাতে আশা জাগাচ্ছে।

অভিমত–বিশ্লেষণ

চকরিয়া সুন্দরবন ফিরিয়ে আনা কেন জরুরি

আশির দশকে আগ্রাসী চিংড়ি–বাণিজ্যের ফলে ধ্বংস হয়ে যায় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সুন্দরবন। ঘূর্ণিঝড় ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলাসহ বহু কারণে চকরিয়া সুন্দরবন ফিরিয়ে আনা আমাদের অস্তিত্বের জন্য জরুরি। লিখেছেন খলিলউল্লাহ্‌

বাংলাদেশের উপকূলীয় পরিবেশের জন্য একসময় আশীর্বাদস্বরূপ চকরিয়া সুন্দরবন মূলত ডুলাহাজারা ও বদরখালী এলাকার অংশ ছিল। বসতি স্থাপন দিয়ে শুরু হলেও চিংড়ি চাষের জন্যই মূলত এ বন উজাড় করা হয়েছিল। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের গোষ্ঠীস্বার্থে ধ্বংস করা হয়েছে এ বন। নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংকও ১০ একর জায়গায় ৩০টি প্লট নিয়ে মৎস্য চাষ প্রকল্প করে, যা এখনো টিকে আছে।

উপমহাদেশের প্রাচীন ম্যানগ্রোভ বা শ্বাসমূলীয় বনের একটি ছিল চকরিয়া সুন্দরবন। পঞ্চাশের দশকে এ বনের বিস্তৃতি ছিল প্রায় ২১ হাজার ১০২ একর এলাকাজুড়ে। পরবর্তী সময়ে ১৮ হাজার ৫০৮ একর জমিকে সংরক্ষিত বন এবং বাকি অংশকে রক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এখন টিকে আছে মাত্র একটি সুন্দরীগাছ। এ নিয়ে ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই ‘যে বনে একটিমাত্র গাছ’ শিরোনামে প্রথম আলো একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

১৯৭৭ সালে শুরু হয় চকরিয়া সুন্দরবন ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া। ১৯৮৫ সালে এরশাদ সরকার চিংড়ি চাষ নীতিমালা প্রণয়নের মধ্য দিয়ে বনের ধ্বংস ত্বরান্বিত করে। ওই নীতিমালা অনুযায়ী, চিংড়ি চাষযোগ্য যেকোনো বনভূমি আগ্রহীদের লিজ দেওয়ার বিধান করা হয়েছিল।

ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ

এ বছরের ২৮ মার্চ প্রথম আলোর উদ্যোগে চকরিয়া উপজেলা পরিষদের সভাকক্ষে চকরিয়া সুন্দরবন ফিরে পাওয়ার পথ নিয়ে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানসহ বনবিদ্যার অধ্যাপক, বিশেষজ্ঞ, সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগের কর্মকর্তারা এবং স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সে আলোচনায় উপস্থিত থাকায় দেখেছি, ধ্বংস হয়ে যাওয়া বন ফিরিয়ে আনতে সবাই সহযোগিতা করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আলোচনার মূল বক্তব্য নিয়ে প্রথম আলো এক পৃষ্ঠাজুড়ে ক্রোড়পত্রও প্রকাশ করে।

সুখবর হলো, প্রথম আলোর ২১ সেপ্টেম্বর ‘চকরিয়া সুন্দরবনে প্রাণ ফেরার আশা’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চকরিয়া সুন্দরবনের বদরখালী চ্যানেলে ২৫ একর জমিতে ৮০ হাজার বাইনগাছ রোপণ করেছিল একটি এনজিও। সেখানে বাইনগাছের টিকে থাকার হার সন্তোষজনক। এ বছরের জুন মাসে সুন্দরবনের আরও ২৫ একর জমিতে ৪০ হাজার বাইনগাছ রোপণ করা হয়েছে। তবে বনের এলাকায় ইকোসিস্টেম আগে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। তারপর আসবে গাছ লাগানোর প্রক্রিয়া। সে জন্য জমিগুলো আগে পুনরুদ্ধার করতে হবে। তাই এ ব্যাপারে সরকারি উদ্যোগ বেশি জরুরি।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, চকরিয়া সুন্দরবন এলাকার জমি বিভিন্ন সংস্থাকে ইজারা দেওয়ার পরও বন বিভাগের নামে চার হাজার একর বনভূমি রেকর্ডভুক্ত রয়েছে। তাদের প্রথম লক্ষ্য এসব জমি ফিরিয়ে আনা। কারণ মৎস্য, কৃষি ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের ইজারা দেওয়া জমির সীমানা চিহ্নিত না করার ফলে ইজারাগ্রহীতারা বন বিভাগের জমিও দখল করে নিয়েছে। এরপর অন্যান্য ইজারা বাতিল করা হবে। কিন্তু এ প্রক্রিয়া লালফিতার দৌরাত্ম্যের শিকার হয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

একসময়ের ঘন সুন্দরবন চকরিয়ায় এখন একটিমাত্র পুরোনো গাছ আছে

সহাবস্থান দিতে পারে সমাধান

আশির দশক থেকে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের (সরবরাহশৃঙ্খল) অংশ হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের চিংড়ি। বিদ্যমান বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের ধরনই হলো আগ্রাসী পন্থায় বাণিজ্য। অথচ সুন্দরবন রেখেও চিংড়ি চাষ করা যেত। যারা এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত, তাদের আগ্রাসী মুনাফার শিকার হয়েছে চকরিয়া সুন্দরবন।

আশির দশকে রপ্তানি পণ্যের ক্ষেত্রে পোশাকশিল্পের পরই ছিল চিংড়িশিল্প। চিংড়ি চাষে বিপুল মুনাফা থাকায় স্থানীয় পর্যায়ে বহু মানুষের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে সন্দেহ নেই। কিন্তু এর ক্ষতির দিকই বেশি। বন ধ্বংস হওয়া, প্রতিবেশগত ভারসাম্যহীনতা, স্থানীয় পর্যায়ে দ্বন্দ্ব–সংঘাত, ছোট মাছচাষিদের জমি ইজারা নিয়ে নেওয়া, স্থানীয় দরিদ্র মানুষের নিজেদের জমির অধিকার হারানোসহ বহু আর্থসামাজিক ও পরিবেশগত সংকটের কারণ ছিল চিংড়ি চাষ। পুরো বাস্তুসংস্থান ধ্বংস না করে যদি ভারসাম্য রেখে চিংড়ি চাষ হতো, তাহলে এসব সংকট কমানো সম্ভব ছিল বলে গবেষকেরা মনে করেন।

উপকূলীয় ভাঙন, ঘূর্ণিঝড়সহ অন্য দুর্যোগের কারণে উপকূলের আবাসন, জ্বালানি ও পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা, যাতায়াতব্যবস্থাসহ সার্বিক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। চকরিয়া সুন্দরবন এসবের সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য। গবেষকদের মতে, ম্যানগ্রোভ বন জলোচ্ছ্বাস ও ঝড়ের গতিবেগের সঙ্গে এর মাত্রাও কমায়। উপকূলীয় শ্বাসমূলীয় বন কার্বন শুধু ধরেই রাখে না, সমুদ্রে দ্রবীভূত অর্গানিক কার্বনের জোগানদাতা হিসেবেও কাজ করে। 

চকরিয়ায় প্রথম আলো আয়োজিত ২৮ মার্চের আলোচনা সভায় বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় মানুষের পরামর্শ এবং এ বিষয়ে অন্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চিংড়ি চাষ ও সুন্দরবন একসঙ্গেই থাকতে পারে, যা ‘সিলভোফিশারি’ নামে পরিচিত। কিন্তু একাই সব খাওয়ার মনোভাব ত্যাগ করতে হবে। ১০ সেপ্টেম্বর প্রথম আলো কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকেও ম্যানগ্রোভভিত্তিক চিংড়ি চাষের পরামর্শ উঠে এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বর্তমান পদ্ধতির চাষে চিংড়ির মৃত্যুর হার ৬৪ শতাংশ। কিন্তু চিংড়িঘেরের সঙ্গে যদি ম্যানগ্রোভ গাছপালা রাখা হয়, তাহলে তাপমাত্রা কমিয়ে মৃত্যুহার ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনা যায়। খুলনার পাইকগাছায় ১০০ হেক্টর জমিতে এ পদ্ধতির পরীক্ষায় এ ফলাফল উঠে এসেছে বলে জানান আলোচকেরা।

কিন্তু আলোচনায় বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরীর পরামর্শ ছিল, ম্যানগ্রোভভিত্তিক এ পদ্ধতি সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বনের বাইরে যেন করা হয়। অর্থাৎ যেখানে প্রাকৃতিক সুন্দরবন টিকে আছে, সেখানে এ পরীক্ষা না চালিয়ে নতুন কোনো স্থানে করা। এ ক্ষেত্রে চকরিয়া সুন্দরবন একটি উপযুক্ত জায়গা। কারণ, এখানে বনের ঐতিহাসিক দেনা মেটানোর দায় আমাদের রয়েছে।

১৯২৬ সালে ‘দ্য ফ্লোরা অব চকরিয়া সুন্দরবনস’ শীর্ষক গবেষণায় জেমস কোওয়ান এই বনে ৫৩ প্রজাতির উদ্ভিদের তালিকা করেছিলেন। একসময় চকরিয়া সুন্দরবন ছিল বাঘ, হরিণ ও অসংখ্য প্রজাতির পাখির আবাসস্থল। এটি মাছের প্রজননক্ষেত্র হিসেবেও পরিচিত ছিল। এ বন ধ্বংস হওয়ায় স্থানীয় মৎস্যসম্পদ কমে গেছে। বনটি ফিরে পেলে হারিয়ে যাওয়া বন্য প্রাণী ফিরে আসবে, সামুদ্রিক মাছের প্রজনন বাড়বে ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা হবে।

সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ গাছপালা উপকূলীয় এলাকার জন্য দেয়াল হিসেবে কাজ করে। স্বভাবতই চকরিয়া ও পেকুয়ার উপকূলীয় এলাকা ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকিতে রয়েছে। গবেষকদের মতে, চকরিয়া সুন্দরবন থাকলে ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে এক রাতে লাখো মানুষ প্রাণ হারাত না। প্রথম আলোর উদ্যোগে আয়োজিত চকরিয়ার আলোচনা সভায় উপস্থিত স্থানীয় মানুষও বলেছেন বন থাকলে ক্ষয়ক্ষতি হতো অনেক কম। সেবার ঘূর্ণিঝড় কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে মূলত আঘাত হেনেছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চকরিয়া সুন্দরবন ফিরিয়ে আনলে তা তীব্র বাতাসের গতিবেগ কমিয়ে জলোচ্ছ্বাসের ঝাপটা থেকে আশপাশের জনপদকে রক্ষা করবে।

অস্তিত্ব রক্ষায় ফেরাতে হবে বন

বিজ্ঞানীরা বারবার সতর্ক করছেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে ভবিষ্যতে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা ও পৌনঃপুনিকতা বাড়বে। ফলে মানুষ ও অন্য প্রাণীদের সুরক্ষায় উপকূলীয় বন অপরিহার্য। যেসব বন আছে, এর বাইরেও নতুন বন সৃজনের পরামর্শ দিচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। এদিকে আমরা একের পর এক বন বিনাশ করে চলেছি। তাই চকরিয়া সুন্দরবন, যা একসময় ৩০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ছিল, তা নতুন করে ফিরিয়ে আনা আমাদের অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য। 

ম্যানগ্রোভ বন সাধারণ বনের তুলনায় অনেক বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করতে সক্ষম। বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই সময়ে চকরিয়া সুন্দরবন বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন শুষে নিয়ে স্থানীয় তাপমাত্রাকে সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সাহায্য করবে। সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বা সুন্দরবন প্রতি হেক্টরে ন্যূনতম ১৫০ মেগা টন কার্বন সংরক্ষণ করে। সেই হিসাবে প্রায় ৮ হাজার ৪৯৮ হেক্টরের চকরিয়া সুন্দরবনে ১২ লাখ ৭৪ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন কার্বন সংরক্ষণ করতে পারত।

ম্যানগ্রোভ বন একটি গুরুত্বপূর্ণ কার্বন সিঙ্ক এবং সবচেয়ে কার্যকর উপকূলীয় কার্বন বাস্তুতন্ত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে বিবেচিত। তাই বন ধ্বংস হলে একসঙ্গে দুটো ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। একটি গাছ যে পরিমাণ কার্বন সংরক্ষণ করে রাখত, গাছ কেটে ফেলার পর সে কার্বন উন্মুক্ত হয়ে প্রভাব দ্বিগুণ হয়ে যায়। জলবায়ুবিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সম্ভাব্য সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে সহিষ্ণুতা বাড়ানোর অন্যতম উপায় হলো বহুপ্রজাতিভিত্তিক ম্যানগ্রোভ বন। বায়োজেনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভূমিপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে ম্যানগ্রোভ বন।

উপকূলীয় ভাঙন, ঘূর্ণিঝড়সহ অন্য দুর্যোগের কারণে উপকূলের আবাসন, জ্বালানি ও পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা, যাতায়াতব্যবস্থাসহ সার্বিক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। চকরিয়া সুন্দরবন এসবের সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য। গবেষকদের মতে, ম্যানগ্রোভ বন জলোচ্ছ্বাস ও ঝড়ের গতিবেগের সঙ্গে এর মাত্রাও কমায়। উপকূলীয় শ্বাসমূলীয় বন কার্বন শুধু ধরেই রাখে না, সমুদ্রে দ্রবীভূত অর্গানিক কার্বনের জোগানদাতা হিসেবেও কাজ করে। 

এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অনেক দেশেই হারিয়ে যাওয়া ম্যানগ্রোভ বন ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু শর্ত হলো প্রথমে যে জায়গায় বন অবস্থিত, তার ইকোসিস্টেম আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। তাহলে ম্যানগ্রোভ বন নিজেই পুনর্জন্ম লাভ করতে পারে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক।

বন ফিরিয়ে আনলে খাদ্য উৎপাদন, পানি, মাছ, গবাদিপশুর চারণভূমি, জ্বালানি, নির্মাণসামগ্রী, ওষুধ, বুনো খাদ্য, মধু, ঘাস, সামুদ্রিক খাদ্য ইত্যাদির উৎস হিসেবে কাজ করবে। ফলে স্থানীয় অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে। বনকে কেন্দ্র করে পরিবেশবান্ধব পর্যটনশিল্পও গড়ে তোলা সম্ভব।

চকরিয়া সুন্দরবন ফিরিয়ে আনা কেবল পরিবেশবাদী শখের বিষয় নয়, বরং আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে চকরিয়া সুন্দরবন না থাকায় যে জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামী প্রজন্মের জন্য এ বন পুনর্গঠন করা জরুরি।

ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ

প্রথম আলোর ২১ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে চকরিয়া সুন্দরবন ফিরিয়ে আনতে চারটি চ্যালেঞ্জের কথা বলা হয়েছে। ইজারাদারদের অনীহা, পোল্ডার ও চিংড়িঘেরে বাঁধের কারণে জোয়ার–ভাটার প্রবাহ বিঘ্নিত হওয়া, দীর্ঘদিনের লবণ ও চিংড়ি চাষের ফলে মাটির অবক্ষয় এবং পানিপ্রবাহের গতিপথ পরিবর্তন। 

তবে চকরিয়া সুন্দরবন ফিরিয়ে আনার পথে আরও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম চিংড়ি চাষের আন্তর্জাতিক বাজার। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, আশির দশকে বিশ্বব্যাংক ইউএনডিপির সঙ্গে যৌথভাবে চিংড়ি চাষ প্রকল্প করেছিল। এডিবির আলাদা প্রকল্প ছিল। বিশ্বব্যাংক তখন সমালোচনার মুখে সরে এলেও ২০১৮ সালে টেকসই উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মৎস্য প্রকল্পের আওতায় তারা আবারও ১৪টি উপকূলীয় জেলায় চিংড়ি চাষে বিনিয়োগ শুরু করেছে (ডেইলি স্টার, ১৪ জুলাই ২০২৬)।

আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো মহেশখালী দ্বীপের ব্যাপক শিল্পায়ন। মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সময় ইতিমধ্যে বনের অনেক গাছ কাটা হয়েছে। এ ছাড়া মাতারবাড়ী পোর্ট অ্যাকসেস সড়ক নির্মাণের জন্যও এখানকার বন উজাড় হচ্ছে। বন ধ্বংস না করে এসব কর্মকাণ্ড কীভাবে করা যায়, সে বিষয়ে কারও পরামর্শ কি নেওয়া হয়েছে?

এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অনেক দেশেই হারিয়ে যাওয়া ম্যানগ্রোভ বন ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু শর্ত হলো প্রথমে যে জায়গায় বন অবস্থিত, তার ইকোসিস্টেম আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। তাহলে ম্যানগ্রোভ বন নিজেই পুনর্জন্ম লাভ করতে পারে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক।

চকরিয়া এলাকায় গিয়ে জেনেছি, কয়েকটি প্রজন্মের বেশির ভাগই জানে না চকরিয়া সুন্দরবন নামে একটা বিশাল বন ছিল। কিন্তু সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে আলোচিত হওয়ায় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো জানবে, সমাধানের পথ থাকা সত্ত্বেও চকরিয়া সুন্দরবন ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। আর সেটা রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবেই।

  • খলিলউল্লাহ্‌ লেখক ও সাংবাদিক; প্রথম আলোর জলবায়ু প্রকল্প ব্যবস্থাপক

    মতামত লেখকের নিজস্ব