আমরা একটি দীর্ঘ সময় পরে জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। এ নিয়ে গণমানুষের মধ্যে আগ্রহ ও উদ্দীপনার যেমন শেষ নেই, তেমনি নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের ধরন কেমন হবে, সে বিষয়েও মানুষের মধ্যে নানা গুঞ্জন ও আলাপ দেখতে পাই। জাতীয় সরকার তেমনই একটি বিষয়।
এখানে উল্লেখ্য যে জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনের পরে একটি জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলছে। আর বিএনপি তাদের মিত্র, যাদের সঙ্গে আসন সমঝোতা করে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, তাদের নিয়েই সরকার গঠনের কথা বলছে। এই বিষয়গুলোর ফয়সালা বোধ করি নির্বাচনের পরেই হবে। তবে জাতীয় সরকারের বিষয়টি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কতটা যৌক্তিক, সে বিষয় নিয়ে বিশদ আলোচনা জরুরি। কেননা এই ধারণার বিশদ বিশ্লেষণ না করে এই আলাপে যাওয়া আমাদের গণতন্ত্রের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।
জাতীয় সরকার হলো ঐকমত্যভিত্তিক সরকার, যেখানে সাধারণত বিরোধী দলগুলো সরকারের অংশ হয়। ফলে সেখানে কোনো বিরোধী দল থাকে না এবং সবাই একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে কাজ করবে বলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে। সেই জায়গা থেকে জাতীয় সরকারের ধারণা আকর্ষণীয় শোনালেও, নির্বাচনের পরে এর বাস্তবায়ন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট ডাল তাঁর পলিআর্কি: পার্টিসিপেশন অ্যান্ড অপজিশন বইয়ে বলেন, আদর্শ গণতান্ত্রিক চর্চায় বহুদলীয় একটি ব্যবস্থা থাকা জরুরি, যেখানে নাগরিকেরা স্বাধীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক পরিসরে অংশ নিতে পারে। কিন্তু জাতীয় সরকারের ধারণায় এ বিষয়টি ভিন্নভাবে কাজ করে, যেখানে কার্যত বহুদলীয় অংশগ্রহণ একটি একক সরকারব্যবস্থার মধ্যে আত্তীকরণ ঘটে, যা কোনোভাবেই আদর্শ একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নয়।
আমরা যদি আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে জাতীয় সরকারের অভিজ্ঞতাগুলো দেখি, তাহলে দেখতে পাই, গৃহযুদ্ধ, রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো যখন ঝুঁকির মুখে থাকে এবং সহিংসতার পরিস্থিতিতে জাতীয় সরকার সাময়িক সময়ের জন্য একটি স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে পারে, কিন্তু স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রেক্ষাপটে এটি জনমত ও বিরোধী রাজনীতিকে উপেক্ষা করে। এর সঙ্গে সমাজে ধর্মীয় ও সামাজিক বিভাজন বৃদ্ধির মতো ঝুঁকিও দৃশ্যমান হয়। তাই জাতীয় সরকারকে একটি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হিসেবে দেখা হয় না বরং একে দেখা হয় একটি ব্যতিক্রম হিসেবে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয় সরকার নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সবার আগে আমাদের বোঝা দরকার, জাতীয় সরকার ধারণা আদতে আমাদের জন্য কী ধরনের প্রভাব নিয়ে আসতে পারে।
প্রথমেই যে বিষয়টা এখানে গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হলো রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় সরকারের অংশ হলেও তাদের মধ্যে যখন নিজ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, অর্থাৎ দলীয় স্বার্থ নিয়ে কাজ করার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হবে, তখন জাতীয় স্বার্থসংবলিত অগ্রাধিকারগুলোর বাস্তবায়ন সমস্যাজনক হয়ে পড়বে এবং তা দীর্ঘসূত্রতার বেড়াজালে আটকে যেতে পারে। ফলে নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘ ও সমস্যাজনক হয়ে পড়বে, যা কার্যত জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। এর মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আবারও বিভাজনের রাজনীতি শুরু হতে পারে।
তবে এখানে বড় ভয়ের বিষয় হলো যদি এই বিভাজন সমাজের মধ্যেও ছড়িয়ে যায়। তাহলে মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক দলকেন্দ্রিক বিভাজন আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের কায়েমি স্বার্থসংবলিত (ভেস্টেড ইন্টারেস্ট) বিষয়াবলি যেমন জাতীয়ভাবে রাজনৈতিক দলগুলোকে বিভাজিত করতে পারে, ঠিক তেমনই তার সমর্থকদেরও বিভাজিত করতে পারে। যে বিভাজনের চূড়ান্ত পরিণতি হতে পারে রাজনৈতিক সহিংসতা। এভাবে আমরা সামাজিকভাবেও আরও বিভাজিত হয়ে পড়ব।
এর সঙ্গে আমাদের বিশেষভাবে ধর্মভিত্তিক বিভাজনের ঝুঁকির ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে, কেননা ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের প্রচেষ্টা জুলাই গণ–অভ্যুত্থানপরবর্তী সময়ে এতটাই বেড়েছে যে ভোট দেওয়াকেও কোনো কোনো গোষ্ঠী জান্নাত লাভের উপায় হিসেবে প্রচার করছে। তাই ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের প্রচেষ্টা আরও যে বৃদ্ধি পেতে পারে, সে বিষয়ে কোনো সংশয়ের অবকাশ নেই।
এ ছাড়া জাতীয় সরকার যদি কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতা ভাগাভাগির কৌশল এবং রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তসম্পর্ক উন্নয়ন ও স্থিতিশীল করার একটি কৌশলী প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে গণতন্ত্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য যেমন মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, আইনের শাসন, যা ছাড়া গণতন্ত্র সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বেচ্ছাচার শাসনে রূপ নিতে পারে, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা, বিরোধী রাজনীতির অধিকার, নাগরিক অংশগ্রহণ, অবাধ নির্বাচন, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন ও বিচারব্যবস্থা ইত্যাদি পরিসর আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বাংলাদেশের মতো দুর্বল প্রতিষ্ঠান ও কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষার দেশে জাতীয় সরকার গঠন কোনো গণতান্ত্রিক সমাধান নয় বরং তা গণতন্ত্রকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে ঠেলে দিতে পারে
জাতীয় সরকার যেহেতু রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে গঠিত হয়, তাই সেখানে বিরোধী দলের কোনো ধারণা থাকে না। তাই এখানে সব রাজনৈতিক দল সরকারের অংশ হয়ে ওঠে। বিরোধী দল না থাকার ফলে একটি একপক্ষীয় সরকারের বিকাশ ঘটতে পারে, যেখানে জাতীয় সরকারের কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার বলয় তৈরি হওয়ার মধ্য দিয়ে আধুনিক গণতন্ত্রের মৌলিক শর্তগুলোকে ক্ষুণ্ন করতে পারে।
তাই এ ধরনের বিরোধী দলহীন সরকার গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে ওঠে। বিরোধী দল যখন আর বিরোধী থাকে না, তখন রাজপথ, সংসদ ও জনপরিসরে কাউন্টার ন্যারেটিভ বা বিকল্প বয়ান দুর্বল হয় এবং ক্ষমতার বিকল্প পরিসর ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে। ফলে কর্তৃত্ববাদী সরকার নামক একটি দানব তৈরি হওয়ার সুযোগ অনেক বেশি থাকে।
বিরোধী দলহীন রাজনীতির কারণে জনগণের সামনেও আর কোনো বিকল্প রাজনৈতিক পাটাতন থাকে না। ফলে জনগণকে একটি রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এতে করে রাষ্ট্রব্যবস্থায় জনগণের অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে তারা সরকার থেকে দূরে চলে যায়।
এসব প্রক্রিয়ায় নির্বাচনী ন্যায্যতা ক্ষুণ্ন হলে সরকার ও জনগণের মধ্যে তখন তৈরি হয় আস্থা, ভরসা ও বিশ্বাসের দূরত্ব। এভাবে রাষ্ট্রীয় পরিসরে জনগণের অংশগ্রহণও কমে যেতে থাকে। যে সময়ে আমরা মানুষের মধ্যে গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণের একটি স্পৃহা দেখতে পাই, যে গণতন্ত্রের নৈতিক পথের দিকে মানুষ তাকিয়ে আছে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে, এমন একটি সময় জাতীয় সরকারের ধারণা আমাদের যদি আরও বিভক্তির দিকে নিয়ে যায়, তা আমাদের জন্য একটি হতাশার বিষয়ই হবে। এতে করে নির্বাচন ও গণতন্ত্র নিয়ে জনগণের উৎসাহ আবারও ক্ষোভে রূপান্তরিত হতে পারে।
পরিশেষে তাই বলা যায়, বাংলাদেশের মতো দুর্বল প্রতিষ্ঠান ও কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষার দেশে জাতীয় সরকার গঠন কোনো গণতান্ত্রিক সমাধান নয় বরং তা গণতন্ত্রকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে ঠেলে দিতে পারে। আমাদের জন্য এখন প্রয়োজন একটি কার্যকর সংসদ, যেখানে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকবে এবং রাজনৈতিক দলগুলো তর্ক-বিতর্ক ও আলোচনার মধ্য দিয়ে আমাদের দেশের সাংগঠনিক রূপান্তর ঘটাবে।
আমাদের জন্য প্রয়োজন গণতন্ত্রের মৌলিক বিষয়গুলোর প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর ও সংস্কারকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো একটি সংসদীয় ব্যবস্থা। এতে করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আরও শক্তিশালী হবে আর ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের রাজনীতি স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে। এর মধ্য দিয়ে আমরা ধীরে ধীরে কাম্য সংস্কারপ্রক্রিয়াকেও বেগবান করে একটি স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক দেশ গঠনে এগিয়ে যাব। তাই বলা যায়, জাতীয় সরকার নয় বরং বাংলাদেশের জন্য অধিক প্রয়োজন অবাধ নির্বাচন, শক্তিশালী বিরোধী দল, জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান ও কার্যকর সংস্কার।
বুলবুল সিদ্দিকী অধ্যাপক, রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব