মতামত

বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকিং খাতের সংকটের প্রকৃত পাঠ

বাংলাদেশের ইসলামি ব্যাংকিং খাত আজ দখলদারি, আমানতকারীর অনিশ্চয়তা এবং জন-আস্থার ক্ষয়ের মতো যে গভীর সংকটের সম্মুখীন, সেটিকে শুধু একটি ব্যাংকিং ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র ধরা পড়ে না। দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রক দুর্বলতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, মালিকানা দখল, অভ্যন্তরীণ ঋণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার ক্ষয়ের পাশাপাশি এর পেছনে রয়েছে একটি প্রভাবশালী বুদ্ধিবৃত্তিক বয়ান, যা ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সন্দেহের চোখে দেখার পরিবেশ তৈরি করেছিল।

বাংলাদেশের ইসলামি ব্যাংকিং খাতের সংকট বুঝতে হলে এই দুই ধারাকে একসঙ্গে দেখতে হবে—একদিকে ‘মৌলবাদী অর্থনীতি’ ধারণার রাজনৈতিক প্রভাব, অন্যদিকে পরবর্তী সময়ে ইসলামি ব্যাংকগুলোর বাস্তব দখল, সুশাসনহীনতা ও লুটপাট।

অধ্যাপক আবুল বারকাতের ‘মৌলবাদী অর্থনীতি’–বিষয়ক ধারণা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতির আলোচনায় প্রভাবশালী। তিনি ধর্মীয় মৌলবাদ, উগ্রবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, দেশীয় রাজনীতি ও অর্থনৈতিক শক্তির সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে চেয়েছেন। উগ্রবাদ, সন্ত্রাসে অর্থায়ন বা ধর্মীয় পরিচয়ের অপব্যবহার অবশ্যই গবেষণা ও নীতিনির্ধারণের বৈধ বিষয়। কোনো দায়িত্বশীল গবেষক এসব প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে পারেন না। কিন্তু তখনই সমস্যা শুরু হয়, যখন ইসলামি ব্যাংক, বিমা, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এনজিও, ট্রাস্ট, ফাউন্ডেশন, গণমাধ্যম, ব্যবসা ও সামাজিক উদ্যোগকে একত্রে ‘মৌলবাদী অর্থনীতি’র বিস্তৃত কাঠামোর মধ্যে রাখা হয়। এতে বৈধ ইসলামি অর্থায়ন, ধর্মভিত্তিক সামাজিক উদ্যোগ, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং জঙ্গিবাদের মধ্যে প্রয়োজনীয় পার্থক্য অস্পষ্ট হয়ে যায়।

কোনো ব্যাংক ইসলামি অর্থায়নের নীতি অনুসরণ করলেই তা মৌলবাদী প্রতিষ্ঠান হয়ে যায় না। কোনো হাসপাতাল ধর্মপ্রাণ দাতাদের অর্থে গড়ে উঠলেই তা উগ্রবাদী প্রকল্প হয় না। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এনজিও বা ব্যবসার প্রতিষ্ঠাতা ধর্মীয় অনুশীলনকারী হলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে জঙ্গি অর্থনীতির অংশ নয়।

একটি কঠোর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রমাণ—মালিকানা নিয়ন্ত্রণ, অডিটকৃত অর্থপ্রবাহ, বেআইনি রাজনৈতিক অর্থায়ন, মানি লন্ডারিং, সন্ত্রাসে অর্থপ্রবাহ বা নিয়ন্ত্রক লঙ্ঘনের নির্দিষ্ট তথ্য। এসব ছাড়া ‘মৌলবাদী অর্থনীতি’ বিশ্লেষণী ধারণার চেয়ে রাজনৈতিক তকমায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

বাংলাদেশের মতো মেরূকৃত রাজনৈতিক পরিবেশে এ ধরনের বয়ানের ফল গুরুতর হতে পারে। কোনো ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে যদি ইসলামি পরিচয়ের কারণেই সন্দেহজনক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপকে সহজে ‘সংস্কার’ বা ‘জনস্বার্থ’ হিসেবে দেখানো যায়। অথচ ইসলামি ব্যাংকিংয়ের প্রকৃত মূল্যায়ন হওয়া উচিত সুশাসন, মূলধন পর্যাপ্ততা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, আমানতকারীর সুরক্ষা, শরিয়াহ পরিপালন, স্বচ্ছ মালিকানা ও নিয়ন্ত্রক জবাবদিহির ভিত্তিতে-আদর্শিক সন্দেহের ভিত্তিতে নয়। সন্দেহের ভাষা যদি প্রমাণের ভাষাকে প্রতিস্থাপন করে, তবে আইনভিত্তিক জবাবদিহির বদলে রাজনৈতিক সুবিধাবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়।

ইসলামি ব্যাংকিং মূলত রিবা পরিহার, সম্পদভিত্তিক অর্থায়ন, ঝুঁকি বণ্টন, নৈতিক বিনিয়োগ, শরিয়াহ তত্ত্বাবধান এবং ধর্মবিশ্বাস—অনুকূল আর্থিক সেবায় আগ্রহী মানুষের সঞ্চয়কে সংগঠিত করার একটি নিয়ন্ত্রিত আর্থিক মডেল। বিশ্বের বহু দেশে এটি প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের বিকল্প নয়; বরং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির একটি পরিপূরক ধারা হিসেবে বিকশিত হয়েছে। বাংলাদেশের ইসলামি ব্যাংকগুলো সব সময় এই আদর্শ পূরণ করেছে কি না, সেটি সম্পূর্ণ আলাদা ও বৈধ প্রশ্ন। কিন্তু কোনো ব্যাংকের ইসলামি পরিচয় বা প্রতিষ্ঠাতাদের রাজনৈতিক পটভূমির কারণে পুরো খাতকে ‘মৌলবাদী অর্থনীতি’র অংশ হিসেবে দেখা বিশ্লেষণগতভাবে দুর্বল, যদি না নির্দিষ্ট অপরাধমূলক প্রমাণ দেখানো যায়।

নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগ বাতিল দাবিতে ইসলামি ব্যাংক গ্রাহক ফোরামের কর্মসূচি ঘিরে সতর্ক অবস্থানে পুলিশ

এখানে প্রশ্নের ধরনই নীতিগত দিক নির্ধারণ করে। যদি প্রশ্ন হয়, ইসলামি ব্যাংকিং কি কোনো গোপন রাজনৈতিক অর্থনীতির অংশ? তাহলে আলোচনার সূচনা হয় সন্দেহ থেকে। কিন্তু যদি প্রশ্ন হয়, ইসলামি ব্যাংকিংকে কীভাবে স্বচ্ছ, সুশাসিত, আমানতকারী-বান্ধব এবং আইনানুগ আর্থিক ব্যবস্থায় পরিণত করা যায়? তাহলে আলোচনার সূচনা হয় প্রাতিষ্ঠানিক নকশা থেকে। বাংলাদেশের দরকার ছিল দ্বিতীয় পথ। কিন্তু বহু ক্ষেত্রে আমরা প্রথম পথের ভাষা ও মানসিকতা দেখেছি। ফলে ইসলামি ব্যাংকিং নিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার আলোচনা পিছিয়ে গেছে, আর রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক হস্তক্ষেপের সুযোগ বেড়েছে।

পরবর্তী ইতিহাস দেখায়, বাংলাদেশের ইসলামি ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ইসলামি অর্থায়নের ধারণা থেকে আসেনি। এসেছে রাজনৈতিক প্রভাব, মালিকানা দখল, নিয়ন্ত্রক সহনশীলতা, অভ্যন্তরীণ ঋণ, দুর্বল বোর্ড সুশাসন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার অবক্ষয় থেকে। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড একসময় দেশের অন্যতম শক্তিশালী বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ইসলামি ব্যাংকিংয়ের প্রধান সফল মডেল হিসেবে বিবেচিত ছিল। কিন্তু পরে ব্যাংকটির মালিকানা ও সুশাসনে ‘নাটকীয়’ পরিবর্তন ঘটে।

সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে এসেছে, ২০১৭ সালে প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর হাতে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় এবং পরে সেই নিয়ন্ত্রণের সময়ে ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকও পরবর্তী সময়ে কয়েকটি ইসলামি ব্যাংকের বোর্ড ভেঙে দেওয়া, বিশেষ নিরীক্ষা এবং ব্যাংক লুটপাটের অভিযোগের মুখে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়।

এখানে একটি গভীর বিদ্রূপ আছে। যেসব প্রতিষ্ঠানকে একসময় আদর্শিকভাবে সন্দেহজনক হিসেবে দেখানো হয়েছিল, সেগুলোকে স্বচ্ছ আইনি সংস্কারের মাধ্যমে রক্ষা করা হয়নি। বরং রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত ব্যবসায়িক স্বার্থ তাদের দখল করেছে। ফলে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আমানতকারীরা ঝুঁকিতে পড়েছেন এবং সামগ্রিক আর্থিক খাতের ওপর জন-আস্থা দুর্বল হয়েছে। ইসলামি ব্যাংকিংয়ের বিরুদ্ধে আদর্শিক সন্দেহ যেমন ক্ষতিকর, তেমনি ইসলামি নামের আড়ালে অনিয়ম, অভ্যন্তরীণ ঋণ, স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষ-ঝুঁকি, আমানতকারীর ক্ষতি বা নিয়ন্ত্রক ফাঁকিও কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইসলামি পরিচয় যেমন অপরাধের প্রমাণ নয়, তেমনি ইসলামি পরিচয় কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য দায়মুক্তির লাইসেন্সও নয়।

অধ্যাপক বারকাতের কাঠামোর একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো সহসম্পর্ক বা অ্যাসোসিয়েশন থেকে কার্যকারণে চলে যাওয়া। কোনো প্রতিষ্ঠানের ইসলামি পরিচয়, কোনো প্রতিষ্ঠাতার ধর্মীয়-রাজনৈতিক পটভূমি কিংবা ধর্মপ্রাণ মানুষের আর্থিক অংশগ্রহণ—এসবের কোনোটিই নিজে নিজে অপরাধ, জঙ্গি অর্থায়ন বা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের প্রমাণ নয়। আবার এই কথা বলার অর্থ এই নয় যে ইসলামি প্রতিষ্ঠানগুলো জবাবদিহির ঊর্ধ্বে। বরং প্রয়োজন আরও শক্তিশালী জবাবদিহি, কিন্তু সেটি হতে হবে প্রমাণভিত্তিক, আইনসম্মত ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক। আইনের শাসন চায় অডিট, তথ্য, তদন্ত ও বিচার; আদর্শিক তকমা নয়।

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ইসলামি ব্যাংকিং সংকট আমাদের একটি কঠিন শিক্ষা দেয়। রাজনৈতিক অর্থনীতি যখন অস্ত্রে পরিণত হয়, প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইসলামি অর্থায়নকে যখন নিয়ন্ত্রিত আর্থিক ব্যবস্থা হিসেবে না দেখে রাজনৈতিক শত্রু হিসেবে দেখা হয়, আমানতকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। আবার ব্যাংক যখন রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত গোষ্ঠীর দখলে যায়, জাতীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বাংলাদেশের আর্থিক সংকটকে তাই ‘মৌলবাদী অর্থনীতি’র বদলে ‘রাজনৈতিক অর্থায়ন’–এর আলোকে দেখা বেশি কার্যকর। এই কাঠামো প্রশ্ন করে—রাজনৈতিক ক্ষমতা কীভাবে ব্যাংক মালিকানা, ঋণ বণ্টন, বোর্ড পরিবর্তন, নিয়ন্ত্রক প্রয়োগ, ঋণখেলাপি সংস্কৃতি, পুঁজি পাচার এবং প্রতিষ্ঠান দখলকে প্রভাবিত করে। এটি ইসলামি ও প্রচলিত—উভয় ধরনের ব্যাংকিং ব্যর্থতার ব্যাখ্যা করতে পারে। দুর্নীতি শনাক্ত করতে ধর্মকে অভিযুক্ত করার দরকার নেই; বরং ক্ষমতা, অর্থ, নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির সম্পর্ক বিশ্লেষণ করাই জরুরি। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ব্যাংকিং বিপর্যয় ধর্মীয় পরিচয়ের সংকট নয়, এটি মূলত সুশাসন ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের সংকট।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে স্পষ্ট হয়, ইসলামি ব্যাংকিং খাতের সংস্কার শুধু শরিয়াহ বোর্ড বাড়ানো বা ধর্মীয় পরিভাষা শুদ্ধ করার বিষয় নয়। শরিয়াহ সুশাসন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। যদি বোর্ড রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়, যদি বড় ঋণ মালিক-ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীর হাতে যায়, যদি নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান চাপে থাকে, যদি অডিট স্বাধীন না হয়, যদি স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষপাতের ঝুঁকি গোপন থাকে, তাহলে শরিয়াহ বোর্ড প্রতিষ্ঠানকে বাঁচাতে পারবে না। ইসলামি ব্যাংকিংয়ের সুরক্ষা আসবে তখনই, যখন শরিয়াহ সুশাসন, ব্যাংকিং আইন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, স্বাধীন অডিট, বোর্ড জবাবদিহি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর তদারকি একসঙ্গে কাজ করবে।

বাংলাদেশের এখন আদর্শিক সন্দেহের পরিবর্তে দরকার নিয়মভিত্তিক ইসলামি আর্থিক কাঠামো। প্রথমত, একটি স্বতন্ত্র ইসলামি ব্যাংকিং আইন প্রণয়ন জরুরি। বহু ট্রিলিয়ন টাকার ইসলামি ব্যাংকিং খাত দশকের পর দশক পূর্ণাঙ্গ আইনি কাঠামো ছাড়া চলতে পারে না। শুধু সার্কুলারভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট নয়। আইনে ইসলামি ব্যাংকের চুক্তি, আমানত-কাঠামো, বিনিয়োগপদ্ধতি, শরিয়াহ সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, অডিট এবং আমানতকারীর অধিকার স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হওয়া দরকার।

দ্বিতীয়ত, শরিয়াহ সুশাসনকে আইনগতভাবে প্রয়োগযোগ্য করতে হবে। শরিয়াহ বোর্ডের লেনদেন পর্যায়ের উপাত্তে প্রবেশাধিকার, স্বাধীন রিপোর্টিং চ্যানেল এবং মালিকের হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষা থাকতে হবে। শরিয়াহ লঙ্ঘন যদি আর্থিক চুক্তি ও আমানতকারীর অধিকারে প্রভাব ফেলে, তবে সেটি শুধু ধর্মীয় প্রশ্ন নয়, নিয়ন্ত্রক লঙ্ঘন হিসেবেও বিবেচিত হওয়া উচিত। তৃতীয়ত, মালিকানা ও বোর্ড সুশাসনকে রাজনৈতিক দখল থেকে সুরক্ষিত করতে হবে। কোনো ব্যাংক তা ইসলামি বা প্রচলিত—যা–ই হোক না কেন, কোনো কংগ্লোমারেট বা রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের ব্যক্তিগত কোষাগারে পরিণত হতে পারে না। স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ প্রদান, অভ্যন্তরীণ আর্থিক ঝুঁকি, বৃহৎ ঋণ পুঞ্জীভবন এবং প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকানা কঠোরভাবে প্রকাশ ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

চতুর্থত, ইসলামি ব্যাংকের জন্য যথাযথ তারল্য উপকরণ দরকার—কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুকুক, ইসলামি ট্রেজারি বিল, শরিয়তসম্মত সরকারি সিকিউরিটিজ এবং জামানতভিত্তিক আন্তব্যাংক উপকরণ। এসব ছাড়া ইসলামি ব্যাংকগুলো কাঠামোগতভাবে পিছিয়ে থাকবে, তারপর সেই দুর্বলতার দায় আবার তাদেরই ওপর চাপানো হবে। প্রচলিত ব্যাংকের জন্য যেসব তারল্য ব্যবস্থাপনা উপকরণ আছে, ইসলামি ব্যাংকগুলোর জন্য তার শরিয়াহসম্মত বিকল্প না থাকলে বাজারে একটি অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। এই কাঠামোগত ঘাটতি পূরণ না করে শুধু ইসলামি ব্যাংককে দুর্বল বলা ন্যায়সংগত নয়।

পঞ্চমত, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। নিয়ন্ত্রক সহনশীলতা কখনো নিরপেক্ষতা নয়, অনেক সময় সেটিই রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত ঋণগ্রহীতা ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ব্যাংক দখলের পথ খুলে দেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি প্রভাবমুক্তভাবে ফিট অ্যান্ড প্রপার টেস্ট, বোর্ড অনুমোদন, বৃহৎ ঋণ-ঝুঁকি সীমা বিধি, ঋণ শ্রেণীকরণ এবং প্রয়োগমূলক ব্যবস্থা নিতে না পারে, তাহলে কোনো ব্যাংকিং খাতই নিরাপদ থাকবে না। ষষ্ঠত, ইসলামি ব্যাংকিংকে একদিকে আদর্শিক দানবীয়করণ, অন্যদিকে ইসলামি পরিভাষার আড়ালে দায়মুক্তি—এই দুই দিক থেকেই সুরক্ষিত করতে হবে। কোনো ব্যাংক ইসলামি বলেই তাকে যেমন সন্দেহ করা যাবে না, তেমনি আবার ইসলামি বলেই তাকে ছাড়ও দেওয়া যাবে না।

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ইসলামি ব্যাংকিং সংকট আমাদের একটি কঠিন শিক্ষা দেয়। রাজনৈতিক অর্থনীতি যখন অস্ত্রে পরিণত হয়, প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইসলামি অর্থায়নকে যখন নিয়ন্ত্রিত আর্থিক ব্যবস্থা হিসেবে না দেখে রাজনৈতিক শত্রু হিসেবে দেখা হয়, আমানতকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। আবার ব্যাংক যখন রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত গোষ্ঠীর দখলে যায়, জাতীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইসলামি ব্যাংকিংয়ের বিরুদ্ধে আদর্শিক প্রচার নয়, বাংলাদেশের দরকার স্বচ্ছ, নৈতিক ও পেশাদারভাবে নিয়ন্ত্রিত একটি আর্থিক খাত, যেখানে ইসলামি ও প্রচলিত ব্যাংক—দুই-ই শক্তিশালী আইন, স্বাধীন তদারকি এবং সমান জবাবদিহির অধীনে কাজ করবে। সেটিই প্রকৃত সংস্কারের পথ।

  • এম কবির হাসান নিউ অরলিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্সের অধ্যাপক ও মফেট চেয়ার—এএওআইএফআইয়ের নৈতিকতা ও গভর্ন্যান্স বোর্ডের সদস্য

*মতামত লেখকের নিজস্ব