ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে বসতবাড়ি বিলীন হয়েছে কাসিম উদ্দিনের। নদের আরেক চরে এসে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। ২৯ অক্টোবর কুড়িগ্রামে
ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে বসতবাড়ি বিলীন হয়েছে কাসিম উদ্দিনের। নদের আরেক চরে এসে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। ২৯ অক্টোবর কুড়িগ্রামে

মতামত

ব্রহ্মপুত্রের চরে চিকিৎসাসেবা পৌঁছাল না

গত দেড় বছরে চরশাখাহাতীর পশ্চিম দিকে প্রায় দেড় কিলোমিটার নদীভাঙন হয়েছে। চরশাখাহাতী প্রাথমিক বিদ্যালয়টি দুবার সরাতে হয়েছে। কমিউনিটি ক্লিনিকটিও ভেঙে গেছে।

কথা হচ্ছিল ভেঙে যাওয়া চরশাখাহাতী প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায় নতুন করে বাড়ি করা কয়েক শ পরিবারের সঙ্গে। দুপুরের তীব্র রোদে এক বছর বয়সী শিমুলগাছের নিচে বসে কথা হয় শাপলা মণি (২৮) ও শিরিনা বেগমের (৫৫) সঙ্গে। সামনের মাঠে কৃষকেরা পাট কাটার পর জমিতে ভুট্টা লাগাবেন। তাই লাভজনক গাঞ্জিয়া ধানের বদলে ২৮ ধান লাগাচ্ছেন। দূরে আসামের গারো পাহাড়ের সারি দেখা যাচ্ছে।

চরে সবচেয়ে বেশি কোন রোগ দেখা যায়, তা জানতে চাইলে শিরিনা বেগম বললেন, ‘চরে রোগবালাই কমই আল্লায় দেয়। খালি গর্ভবতীদের বাচ্চা হওয়ার সময়  সমস্যা হয়।’

শিরিনা বেগমের কথা ধরে শাপলা মণি বলেন, ‘ক্লিনিকে একজনই লোক, তা-ও পুরুষ মানুষ। চেকআপ কার্ডে দিন-তারিখ লিখে রাখে। চেকআপের জন্যও থানাহাটে (উপজেলা সদর) যাওয়া লাগে। আর ফ্রেন্ডশিপ এনজিওর এক আপা মাসে একবার আসেন। তিনি সর্দি-কাশির ওষুধ দেন, খিচুড়ি খাওয়ান আর ৫ টাকা নেন। তাঁর নাম ৫ টাকার ডাক্তার।’

চরাঞ্চলে মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে তীব্র ডায়রিয়া ও ডিহাইড্রেশন, শিশুর নিউমোনিয়া, প্রসূতি মায়ের অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, প্রসবজনিত জটিলতা, নবজাতকের শ্বাসকষ্ট বা ধনুষ্টঙ্কার, হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক ও সাপের কামড়

ফেরার সময় শাখাহাতী ঘাটে দেখা হয় কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার ইয়াসিনের সঙ্গে। গোটা উপজেলায় ১৯টি কমিউনিটি ক্লিনিকে ১০ থেকে ১১ জন নারী এ পদে আছেন। চিলমারী, অষ্টমীরচর ও নয়ারহাট—তিনটি ইউনিয়নই ব্রহ্মপুত্রের চরে। এখানে আটটি ক্লিনিকের একটিতেও প্রসবের ব্যবস্থা নেই।

ইয়াসিন জানান, তাঁরা শুধু গর্ভবতী নারীদের ওজন, উচ্চতা, রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও হিমোগ্লোবিন পরিমাপ করেন। এ ছাড়া ২২ ধরনের ওষুধ দেন।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য রফিকুল ইসলাম (৬৭) জানান, গর্ভবতী নারীদের যাতে চরেই নিরাপদে প্রসব করানো যায়, সেটিই তাঁদের প্রধান দাবি।

চরের একজন নারীকে বাড়ি থেকে নদীর ঘাট পর্যন্ত নিরাপদে আনতেই লেগে যায় দুই ঘণ্টা। এরপর নৌকায় ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার উজান বেয়ে উপজেলা সদরে পৌঁছানোও দুই ঘণ্টার মধ্যে সম্ভব নয়। এতেই অনেকের মৃত্যু ঘটে।

ক্লিনিকগুলোয় ২২ ধরনের ট্যাবলেট দেওয়া হয়। এসব ট্যাবলেট যেসব চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়, সেগুলো হলো কৃমিনাশক; উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও বুকের ব্যথা (এনজাইনা) নিয়ন্ত্রণ; গ্যাস্ট্রিক, আলসার, বুকজ্বালা ও পেটে অতিরিক্ত অম্লতা প্রতিরোধ; সর্দি, হাঁচি, অ্যালার্জি ও চুলকানির চিকিৎসা; শরীরে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি পূরণ ও হাড় শক্ত রাখা; রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া দূর করা ও হিমোগ্লোবিন বাড়ানো; পেটে বা অন্ত্রে মোচড় দিয়ে ব্যথা ও ক্র্যাম্প কমানো; জ্বর ও হালকা থেকে মাঝারি ধরনের ব্যথা, যেমন মাথাব্যথা ও শরীরব্যথা কমানো; শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি (অ্যাজমা) ও ব্রঙ্কাইটিসের চিকিৎসা; ভিটামিন বি-এর ঘাটতি পূরণ, দুর্বলতা দূর করা ও স্নায়ুর স্বাস্থ্য ভালো রাখা; ডায়রিয়ার চিকিৎসা এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানো।

এ ছাড়া ত্বক ও মুখের ক্ষত বা ছত্রাকজনিত সংক্রমণের চিকিৎসায় বাহ্যিক অ্যান্টিসেপটিক, চুলকানি ও খোসপাঁচড়া চিকিৎসায় ব্যবহৃত লোশন; ত্বকের কাটাছেঁড়া, ছোটখাটো ক্ষত বা পোড়ার সংক্রমণ, দাদ ও একজিমা প্রতিরোধে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক মলম; চোখের ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ বা ইনফেকশন (যেমন চোখ ওঠা) চিকিৎসায় ব্যবহৃত ড্রপ এবং ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানার কারণে শরীরে পানির ঘাটতি ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা দূর করতে ব্যবহৃত স্যালাইন দেওয়া হয়।

চরাঞ্চলে মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে তীব্র ডায়রিয়া ও ডিহাইড্রেশন, শিশুর নিউমোনিয়া, প্রসূতি মায়ের অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, প্রসবজনিত জটিলতা, নবজাতকের শ্বাসকষ্ট বা ধনুষ্টঙ্কার, হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক ও সাপের কামড়।

অর্থাৎ ডায়রিয়া ছাড়া এসব রোগের প্রায় কোনোটিরই চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা নেই। তাহলে কমিউনিটি ক্লিনিকের কাজ কী?

  • নাহিদ হাসান লেখক ও সংগঠক

    nahidknowledge1@gmail.com