কোনো কারণে সময়মতো রোজা পালন করতে না পারলে তা কাজা আদায় করার বিধান রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সিয়াম বা রোজা নির্দিষ্ট কয়েক দিন (এক মাস)। তবে তোমাদের মধ্যে যারা পীড়িত থাকবে বা ভ্রমণে থাকবে, তারা অন্য সময়ে এর সমপরিমাণ সংখ্যায় পূর্ণ করবে। আর যাদের রোজা পালনের সক্ষমতা নেই, তারা এর পরিবর্তে ফিদইয়া দেবে (প্রতি রোজার জন্য) একজন মিসকিনকে (এক দিনের নিজের) খাবার (বা তার মূল্য) দেবে। অনন্তর যে ব্যক্তি অধিক দান করবে, তবে তা তার জন্য অতি উত্তম। আর যদি তোমরা পুনরায় রোজা পালন করো, তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৮৪)
রোজা রেখে কোনো ওজর বা অসুবিধার কারণে ভেঙে ফেললে তা পরে কাজা আদায় করতে হয়। কাজা হলো একটি রোজার পরিবর্তে একটি রোজা। কাজা রোজা পরবর্তী সময়ে সুবিধামতো সময়ে আদায় করা যায়। সব কাজা রোজা একত্রে আদায় করা জরুরি নয়।
রোজা রেখে ওজর ছাড়া কোনোরূপ শয়তানি ধোঁকায় বা নফসের তাড়নায় তা ভঙ্গ করলে এর জন্য কাজা ও কাফফারা উভয় আদায় করতে হয়। কাফফারা তিনভাবে আদায় করা যায়। একটি দাস মুক্ত করা; ৬০ জন মিসকিনকে দুই বেলা তৃপ্তিসহকারে আহার করানো, ধারাবাহিকভাবে ৬০টি রোজা পালন করা।
যে কয়টি রোজা (রাখার পর) ওজর ছাড়া ভাঙবে, ততটির প্রতিটির পরিবর্তে একটি করে কাজা এবং তার সঙ্গে যুক্ত হবে একই রমজান মাসের জন্য একটি কাফফারা। অর্থাৎ একটি রোজা যৌক্তিক কারণ ছাড়া ভাঙলে তার জন্য কাজা ও কাফফারা মিলে হবে ৬১ রোজা, দুটি ভাঙলে হবে ৬২ রোজা, তিনটি ভাঙলে হবে ৬৩ রোজা।
কাফফারা ৬০টি রোজা একত্রে ধারাবাহিকতা রক্ষা করে রাখতে হয়। কারও যদি কাজা, কাফফারাসহ মোট ৬১ বা তারও বেশি হয়, তবে কমপক্ষে ৬০টি রোজা একটানা আদায় করতে হবে।
কাফফারার রোজার মাঝে বিরতি হলে বা ভাঙলে আবার নতুন করে ৬০টি রোজা রাখতে হবে। অর্থাৎ ৬০টি রোজা পূর্ণ হওয়ার পূর্বে বিরতি হলে পুনরায় নতুন করে এক থেকে শুরু করে আবার ৬০টি পূর্ণ করতে হবে। যে রোজাগুলো রাখা হলো, তা নফল হিসেবে পরিগণিত হবে। কোনো গ্রহণযোগ্য ওজর বা জরুরি কারণে ভাঙলে তা মার্জনাযোগ্য হবে। নারীরা বিশেষ বিরতির সময় বাদ দিয়ে রোজা পালন করবেন।
শিশু নাবালেগ অবস্থায় (সাধারণত মেয়েদের ১১ বছরের আগে ও ছেলেদের ১৩ বছরের আগে) রোজা রাখা ফরজ নয়, তবু তারা নিজেদের আগ্রহে ও বড়দের উৎসাহে রোজা রেখে থাকে। এ অবস্থায় তারা যদি রোজা রেখে কখনো ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় যেকোনোভাবে রোজা ভেঙে ফেলে, তাদের এই রোজার কাজা বা কাফফারা কোনোটিই প্রযোজ্য হবে না। তারপরও যদি তারা বড়দের সঙ্গে কাজা রোজা রাখে, তাতেও বাধা নেই। এবং কাজা রোজা রাখতে শুরু করে তা আবার ভেঙে ফেললে তারও কাজা লাগবে না।
মানবতার মহান বন্ধু মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) কাফফারা আদায়ের অনন্য এক মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
‘একবার রমজানে এক সাহাবি রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর কাছে এসে বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! আমি নিজেকে ধ্বংস করে ফেলেছি, আমি রোজা পালন অবস্থায় স্ত্রী-সহবাস করে ফেলেছি।” নবীজি (সা.) তাঁকে বললেন, “তুমি একজন দাস মুক্ত করে দাও।” সাহাবি বললেন, “এমন সামর্থ্য আমার নেই।” রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, “তবে এর বদলে দুই মাস তথা ৬০ দিন রোজা রাখো।” সাহাবি বললেন, “হে আল্লাহর নবী (সা.)! এমন ধৈর্য আমার নেই।” তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, “তবে তুমি ৬০ জন মিসকিনকে দুই বেলা আহার করাবে।” সাহাবি বললেন, “হে আল্লাহর পয়গম্বর (সা.)! এ রকম আর্থিক সংগতিও আমার নেই।” তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে অপেক্ষা করতে বললেন। কিছুক্ষণের মধ্যে অন্য একজন সাহাবি রাসুল (সা.)–কে এক ঝুড়ি খেজুর হাদিয়া দিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) রোজা ভেঙে ফেলা সাহাবিকে বললেন, “এগুলো নিয়ে গরিবদের মাঝে বিতরণ করে দাও।” সাহাবি তখন বললেন, “ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা.), এই এলাকায় আমার চেয়ে গরিব আর কে আছে?” এ কথা শুনে রাসুলে করিম (সা.) স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি হাসলেন যাতে তাঁর দন্ত মোবারক প্রকাশিত হলো। তিনি বললেন, “তাহলে খেজুরগুলো তুমিই তোমার পরিবার নিয়ে খাও।”’ (সুবহানাল্লাহ)! (বুখারি: ১৩৩৭, মুসলিম: ১১১১)
অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম
smusmangonee@gmail.com