বাংলাদেশে প্রতিবছর ১ থেকে ১ দশমিক ২ কোটি পশু কোরবানি করা হয়, যার বড় অংশই শহরাঞ্চলে জবাই হয়।
বাংলাদেশে প্রতিবছর ১ থেকে ১ দশমিক ২ কোটি পশু কোরবানি করা হয়, যার বড় অংশই শহরাঞ্চলে জবাই হয়।

মতামত

কোরবানির দিনে সচেতনতা: প্রস্তুতি, ব্যবস্থাপনা ও দায়িত্ববোধ

কোরবানির দিনটি মুসলমানদের জন্য শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং ত্যাগ, সহমর্মিতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক অনন্য উপলক্ষ। এদিনের প্রতিটি কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হয় আমাদের শৃঙ্খলা, পরিচ্ছন্নতা, জনস্বাস্থ্য–সচেতনতা এবং পশুর প্রতি মানবিক আচরণ।

বাংলাদেশে প্রতিবছর ১ থেকে ১ দশমিক ২ কোটি পশু কোরবানি করা হয়, যার বড় অংশই শহরাঞ্চলে জবাই হয়। এই বিশাল আয়োজনের ফলে কোরবানির দিনে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোয় ২০ থেকে ৩০ হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যা যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রায় ৬০ শতাংশ সংক্রামক রোগ ও ৭৫ শতাংশ নতুন উদীয়মান রোগ প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ায়। এ বাস্তবতায় কোরবানির দিন আমাদের জন্য শুধু ধর্মীয় দায়িত্ব নয়, বরং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। তাই কোরবানির পুরো প্রক্রিয়া—আগের দিনের প্রস্তুতি থেকে শুরু করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত—সচেতনভাবে সম্পন্ন করা অত্যন্ত জরুরি।

প্রথমত, কোরবানির আগের দিনের প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় পশু এনে অপরিষ্কার বা অপ্রস্তুত স্থানে বেঁধে রাখা হয়, যা পশুর জন্য কষ্টদায়ক এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ। কোরবানির পশুর জন্য পরিষ্কার, শুকনা ও নিরাপদ একটি জায়গা নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল করবে। পশুকে পরিষ্কার পানি ও পর্যাপ্ত খাবার দিতে হবে এবং অতিরিক্ত ভিড় ও শব্দ থেকে দূরে রাখতে হবে। এতে পশুর মানসিক চাপ কমে এবং তা সুস্থ থাকে। পশুকে অযথা ভয় দেখানো, মারধর করা বা বিনোদনের বস্তু হিসেবে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ অনুচিত।

দ্বিতীয়ত, কোরবানির স্থান নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক ক্ষেত্রে রাস্তার পাশে বা ড্রেনের পাশে কোরবানি করা হয়, যা পরিবেশদূষণ ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে। তাই সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত স্থান ব্যবহার করাই উত্তম। বাসায় কোরবানি করলে এমন স্থান নির্বাচন করতে হবে, যেখানে পানিনিষ্কাশনের ব্যবস্থা আছে। প্লাস্টিক বা ত্রিপল ব্যবহার করলে পরিষ্কার করা সহজ হয় এবং রক্ত ও বর্জ্য ছড়িয়ে পড়া কমে।

তৃতীয়ত, কোরবানির সময় পশুর কল্যাণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। ইসলাম ধর্মে জবাইয়ের সময় পশুর কষ্ট কমানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই ধারালো ছুরি ব্যবহার করা এবং প্রশিক্ষিত ব্যক্তির মাধ্যমে জবাই করা উচিত। পশুকে অন্য পশুর সামনে জবাই না করা এবং অযথা টানাটানি না করা প্রয়োজন। জবাইয়ের আগে পশুকে পানি পান করানো এবং শান্ত রাখা উত্তম। গবেষণায় দেখা গেছে, পশুর স্ট্রেস বেশি হলে মাংসের গুণগত মান কমে যায়।

চতুর্থত, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা কোরবানির দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। জবাইয়ের সরঞ্জাম পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত থাকা উচিত। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে জবাই করলে খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। কাঁচা মাংস বা রক্ত স্পর্শ করার পর সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধোয়া জরুরি। যাঁরা সরাসরি কাজ করেন, তাঁরা গ্লাভস ব্যবহার করলে সংক্রমণের ঝুঁকি কমে। শিশুদের এসব কাজ থেকে দূরে রাখা উচিত।

সামাজিক সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোরবানি এমনভাবে সম্পন্ন করা উচিত, যাতে তা অন্যের জন্য অসুবিধার কারণ না হয়। রাস্তা বা ড্রেন নোংরা না করা, আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং প্রতিবেশীর স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রাখা আমাদের সবার দায়িত্ব।

পঞ্চমত, কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কোরবানির সময় উৎপন্ন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য দ্রুত অপসারণ না করলে তা পানি ও মাটিদূষণ সৃষ্টি করে। অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ফেলে রাখলে ড্রেনেজ–ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ে। তাই বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে জমা করে সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে অপসারণ করা উচিত। সম্ভব হলে পুঁতে ফেলা যেতে পারে।

ষষ্ঠত, কোরবানির চামড়া সংরক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিষয়। বাংলাদেশে কোরবানির সময় সংগৃহীত চামড়ার বাজারমূল্য কয়েক হাজার কোটি টাকার বেশি। কিন্তু সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করার কারণে অনেক চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। চামড়া সংগ্রহের পর দ্রুত লবণ ব্যবহার করতে হবে। সাধারণভাবে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে লবণ না দিলে চামড়া নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। চামড়া শীতল ও শুকনা স্থানে সংরক্ষণ করা উচিত।

সপ্তমত, মাংস সংরক্ষণ ও বণ্টনেও সচেতনতা জরুরি। কোরবানির মাংস দ্রুত পরিষ্কার করে ভাগ করতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংরক্ষণ করতে হবে। ফ্রিজে রাখার আগে মাংস পরিষ্কার ও প্যাকেটজাত করা উচিত। দরিদ্র মানুষের মধ্যে বণ্টনের সময় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা জরুরি, যাতে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।

এ ছাড়া সামাজিক সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোরবানি এমনভাবে সম্পন্ন করা উচিত, যাতে তা অন্যের জন্য অসুবিধার কারণ না হয়। রাস্তা বা ড্রেন নোংরা না করা, আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং প্রতিবেশীর স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রাখা আমাদের সবার দায়িত্ব।

পরিশেষে বলা যায়, কোরবানির দিনটি শুধু ধর্মীয় আচার পালনের দিন নয়, এটি আমাদের সচেতনতা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার একটি বাস্তব পরীক্ষা। সঠিক পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা একটি নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশবান্ধব কোরবানি নিশ্চিত করতে পারি। কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন আমরা এই ইবাদতের মাধ্যমে মানুষের কল্যাণ, পরিবেশের সুরক্ষা এবং পশুর প্রতি সহমর্মিতা নিশ্চিত করতে পারব।

  • ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির শিক্ষক, গবেষক ও লেখক, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম। akmhumayun@cvasu.ac.bd