মতামত

বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ‘টেন কমান্ডমেন্টস’

বিগত দুই দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্য অনস্বীকার্য। তবু স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির এই আখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে আছে একটি মৌলিক দুর্বলতা, যা সেই অগ্রগতির স্থায়িত্বকে (তথা সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট) হুমকির মুখে ফেলছে। অস্বাভাবিকভাবে নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাতই এই দুর্বলতা।

জিডিপির মাত্র ৭ থেকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ কর আদায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চেয়ে অনেক নিচে অবস্থান করছে। যেখানে অনেক নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ রাজস্বের একটি উল্লেখযোগ্য উচ্চতর অংশ সংগ্রহ করে এবং উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো গড়ে জিডিপির প্রায় ১৮-২৫ শতাংশ কর হিসেবে আদায় করে, সেখানে বাংলাদেশ একটি সংকীর্ণ ও কাঠামোগতভাবে দুর্বল রাজস্ব ভিত্তি নিয়েই পরিচালিত হচ্ছে। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যেও বেশ কয়েকটি সমকক্ষ অর্থনীতি উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে গেছে।

এটি শুধু একটি পরিসংখ্যানগত ঘাটতি নয়, এটি একটি কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। যে রাষ্ট্র পর্যাপ্ত রাজস্ব আদায় করতে পারে না, সে তার নিজস্ব কৃষি ও জনকল্যাণমূলক খাতে যথেষ্ট বিনিয়োগ করতে পারে না, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে না এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নকে টেকসই করতে পারে না। অন্য কথায়, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি তার রাজস্ব সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

সুতরাং, জিডিপির তুলনায় করের অনুপাত বাড়ানো কোনো প্রযুক্তিগত সমন্বয় নয়—এটি একটি অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা। করভিত্তির সুনিশ্চিত সম্প্রসারণ, কর প্রশাসন শক্তিশালীকরণ এবং করের টাকার সঠিক ব্যবহার ছাড়া দেশের উন্নতি ক্ষণভঙ্গুর হতে বাধ্য। এই অবস্থায় বাংলাদেশের পক্ষে উন্নয়নের পরবর্তী পর্যায়ে প্রবেশ করা অসম্ভব।

বিগত দুই দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। ২০১৫ সালে নিম্ন-মধ্যম আয়ের মর্যাদা অর্জন থেকে শুরু করে সম্মানজনক জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বজায় রাখা পর্যন্ত, দেশটিকে প্রায়ই একটি উন্নয়নমূলক সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এই অর্জনগুলোর আড়ালে রয়েছে এক আরও ভঙ্গুর বাস্তবতা: এমন একটি অর্থনীতি যা এক সন্ধিক্ষণে এসে পৌঁছেছে, যেখানে প্রবৃদ্ধির অতীতের চালিকা শক্তিগুলো গতি হারাচ্ছে এবং কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোকে উপেক্ষা করা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।

প্রশ্নটি এখন আর এমন নয় যে বাংলাদেশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে কি না—বরং প্রশ্নটি হলো, দেশটি ভালোভাবে, টেকসইভাবে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে কি না।

এই সন্ধিক্ষণে, বাংলাদেশ অর্থনীতির জন্য ‘টেন কমান্ডমেন্টস’ তথা ‘১০ প্রত্যাদেশ’ তথা ১০ অবশ্যকর্তব্য তাহলে কী দেখা যাক:

১. বিনিয়োগ হলো প্রবৃদ্ধির চালিকা শক্তি। অতএব, বিনিয়োগের অর্থ সংগ্রহ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এই অর্থ সংগ্রহের প্রথম এবং প্রধান উপায় হলো কর আদায়। সে জন্যই করভিত্তি সম্প্রসারণ, আদায়প্রক্রিয়া দক্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত করা অবশ্যকর্তব্য।

২. দেশের লাখ লাখ ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারী যাতে বিনিয়োগে অংশ নিতে পারেন, সে জন্য দরকার একটি সুসংগঠিত, বিশ্বাসযোগ্য, শক্তিশালী, সুনিয়ন্ত্রিত, প্রাণবন্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা তথা পুঁজিবাজার। বাংলাদেশে যা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। বেশির ভাগ গতিশীল অর্থনীতিতে এ রকম একটি পুঁজিবাজার উপস্থিত। বাংলাদেশে শেয়ারবাজার বছরের পর বছর ধরে মূলত অকার্যকরই থেকে গেছে, যার বৈশিষ্ট্য হলো—অস্থিরতা, সুশাসনের ব্যর্থতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার ক্রমাগত ক্ষয়। ফলে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীরা হয় অংশগ্রহণে নিরুৎসাহিত হন অথবা অযাচিত ঝুঁকির সম্মুখীন হন, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

৩. লাখ লাখ ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারী যাতে সঞ্চয়ে উৎসাহিত হয়, সে জন্য সঞ্চয়পত্রের এবং সরকারি বন্ডের সুদের হার বাড়াতে হবে।

৪. ক) সঞ্চয়কে উৎসাহিত করতে ব্যাংকের ডিপোজিট রেট বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ভোগের ও বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে নেওয়া ঋণের জন্য লেন্ডিং রেট কমাতে হবে। বিশেষজ্ঞ মত হচ্ছে, ডিপোজিট রেট ও লেন্ডিং রেটের পার্থক্য হওয়া উচিত ৫ শতাংশ, কিন্তু বাংলাদেশে এই পার্থক্য অনেক বেশি।

খ) ব্যাংকিং খাতে সুস্থতা ফিরিয়ে আনতে হলে ব্যাংক সংস্কার কমিটির সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। মূল কথা হলো, রাজনৈতিক বিবেচনা বাদ না দিলে ঋণখেলাপি বন্ধ হবে না। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, ঋণখেলাপির প্রায় শতভাগ ইচ্ছাকৃত। সামান্য অংশের কারণ অদক্ষতা।

৫. বৈদেশিক ঋণ ভালো না, কারণ একটা দেশ ঋণের জালে (ভিশাচ সাইকেল) আটকা পড়ে গেলে বের হওয়া কঠিন—এ রকম একটা ধারণা খুব প্রবল। অনেকে ঋণের জালে আটকা পড়ার উদাহরণ হিসেবে পাকিস্তানের নাম করেন।

এ বিষয়ে মার্কিন অর্থনীতিবিদ জেফ্রি স্যাক্‌স ভিন্নমত পোষণ করেন। নিজস্ব উৎসে তহবিল না থাকলে, ঋণ করতেই হবে। কারণ, কিছু কিছু খাত যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো খাতের উন্নয়ন ছাড়া প্রবৃদ্ধি অর্জন করা অসম্ভব। তবে বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় মানতে হবে। ঋণ হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি (ন্যূনতম ৪০ বছর) এবং স্বল্প সুদ। স্বল্প সুদ ও দীর্ঘমেয়াদি হলে ঋণ পরিশোধ করা সহজ হবে। সরকারি রাজস্ব আয় থেকে মেটানো যাবে। পাকিস্তানের মতো ঋণ পরিশোধের জন্য আবার ঋণ নিতে হবে না। দ্বিতীয়ত, ঋণের অর্থ, বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের সুফল পেতে ১০ বছরের মতো সময় লাগে। এই খাতগুলোতে বিনিয়োগ থেকে সুফল পেতে শুরু করলে অর্থনীতি দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাবে।

৬. শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো ছাড়া কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় প্রবৃদ্ধি অর্জন অসম্ভব। প্রবৃদ্ধির জন্য দরকার সম্পদ এবং সম্পদ কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা হয় তার ওপর। দক্ষতার সঙ্গে সম্পদের ব্যবহারই প্রোডাকটিভিটি বা উৎপাদন ক্ষমতা। তার মানে, সম্পদের পরিমাণই যথেষ্ট নয়। প্রবৃদ্ধির প্রধান নিয়ামক উৎপাদনক্ষমতা। উৎপাদনক্ষমতা ছাড়া প্রবৃদ্ধি সীমিত হতে বাধ্য। উদাহরণস্বরূপ, জাপানের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূলে প্রধান ভূমিকা উৎপাদনক্ষমতা। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উচ্চ বরাদ্দ শিক্ষিত, প্রশিক্ষিত ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরি করার মাধ্যমে এই উৎপাদনক্ষমতা সৃষ্টি হবে।

৭. বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে বিনিয়োগের জন্য অর্থ সংগ্রহ এবং দক্ষতার সঙ্গে তা বণ্টন করার ক্ষমতার ওপর। কিন্তু এখানেও একটি কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে। আর্থিক ব্যবস্থা এখানে ব্যাপকভাবে ব্যাংক–নির্ভর এবং ব্যাংকিং খাত নিজেই খেলাপি ঋণ, দুর্বল সুশাসন এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ঋণের বোঝায় জর্জরিত। এটি উৎপাদনশীল খাতে পুঁজির দক্ষ প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

৮. ডারোন আসিমোগলু ও জেমস এ রবিনসন তাঁদের বই ‘হোয়াই নেশনস ফেইল: দ্য অরিজিনস অব পাওয়ার, প্রসপারিটি অ্যান্ড পোভার্টি’-এর জন্য ২০২৪ সালে নোবেল পান। তাঁদের এ বইয়ের উপসংহার হচ্ছে, কোনো দেশের অর্থনৈতিক সাফল্য বা ব্যর্থতা ভৌগোলিক অবস্থান, সংস্কৃতি বা প্রাকৃতিক সম্পদের দ্বারা নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের ও দুর্নীতির কারণে প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। প্রতিষ্ঠানগুলোকে সত্যিকারভাবে পুনরুজ্জীবিত না করতে পারলে উন্নয়ন অসম্ভব।

৯. যেকোনো মূল্যে ক্যাপিটাল ফ্লাইট তথা পুঁজির বহির্গমন বন্ধ করে তা দেশের অভ্যন্তরে বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

১০. ক) ইমপোর্ট-সাবস্টিটিউট তথা আমদানি–বিকল্প শিল্পকারখানা গড়ে তোলার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে পিপিপি অর্থাৎ পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশিপ প্রকল্প হাতে নিলে ভালো ফল পাওয়া যাবে।

চীনের দ্রুত ও বিস্ময়কর উন্নতির মূলে রয়েছে রাষ্ট্রের ভূমিকা। তবে চীনের ক্ষেত্রে যেটা ঘটেছে, তা পিপিপির চেয়েও ভিন্ন কিছু। রাষ্ট্র এখানে দক্ষ ও প্রকৃত উদ্যোক্তাদের রাষ্ট্রের কল্যাণ কাজে লাগায় এবং অন্য দেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার লক্ষ্যে নির্ধারিত খাতে বিনিয়োগ করার জন্য পুঁজি সরবরাহসহ সব ধরনের গাইডেন্স দিয়ে থাকে। উদ্যোগ থেকে লাভের পরিবর্তে ক্ষতি হলে, রাষ্ট্র ভর্তুকি দেয়।

খ) রপ্তানির বাজার বৈচিত্র্যকরণ অর্থনীতির প্রাথমিক জ্ঞান। এ ক্ষেত্রে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ এম্বাসি বা হাইকমিশন ভূমিকা পালন করতে পারে।

  • এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ। সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ। nntarun@gmail.com

    মতামত লেখকের নিজস্ব